আইলার ১৬ বছর: লোনা পানি আর স্বজন হারানোর ক্ষত আজও শুকায়নি উপকূলে
নাজমুল শাহাদাৎ (জাকির): আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছিল শতাব্দীর অন্যতম প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১৬টি বছর পার হয়ে গেলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির জীর্ণ বেড়িবাঁধ আর লোনা পানির গ্রাসে থাকা লাখো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। লোনা পানির আগ্রাসন, সুপেয় পানির তীব্র সংকট আর স্বজন হারানোর ক্ষত নিয়ে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন উপকূলীয় এই জনপদের বাসিন্দারা।
২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার প্রভাবে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই ল-ভ- হয়ে গিয়েছিল সাতক্ষীরার উপকূল। ভেসে গিয়েছিল মানুষ, গবাদিপশু আর ঘরবাড়ি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সে সময় সাতক্ষীরায় ৭৩ জন নিহত, দুই শতাধিক আহত এবং প্রায় ৬ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। ১৬ বছর পর সরকারি নথির সেই পরিসংখ্যানের হিসাব মিললেও, উপকূলের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব চিত্রটা বদলায়নি একটুও।
শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার ৯ নম্বর সোরা গ্রামের মাজেদ শেখের পরিবারের কাছে আইলার স্মৃতি আজও এক জীবন্ত নরক। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে নৌকাডুবিতে তিনি তিন মেয়ে ও গর্ভবতী পুত্রবধূসহ পরিবারের ছয়জনকে হারান। চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, দুজনের খোঁজ আর কোনোদিন মেলেনি। স্বজন হারানোর সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মাজেদ শেখ ও তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন। একটি জীর্ণ খড়ের কুঁড়েঘরে কাটছে তাঁদের জীবন। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতর পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। পুনর্বাসন আর স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের সরকারি-বেসরকারি শত প্রতিশ্রুতি থমকে গেছে তাঁদের মাত্র এক ফুট উঁচু, তালপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি ব্যবহারের একমাত্র টয়লেটের কাছেই।
একই এলাকার সালমা খাতুনের গল্পটি আরও মর্মস্পর্শী। জলোচ্ছ্বাস শুরু হলে পরিবারের ১৯ জনকে নিয়ে নৌকায় উঠেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাঝনদীতে প্রচ- স্রোতে নৌকাটি উল্টে গেলে মুহূর্তেই প্রাণ হারান পরিবারের ১১ জন। প্রচ- স্রোতের মধ্যে পিঠে বড় মেয়ে আর কোলে দুধের শিশুকে নিয়ে টানা তিন ঘণ্টা পানিতে ভেসেছিলেন সালমা। বড় মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও তাঁর চোখের সামনে লোনা পানি আর ঠান্ডায় নিথর হয়ে যায় কোলের শিশুটি। ১৬ বছর পরও মে মাস এলেই সেই নদী, স্রোত আর সন্তানের শেষ মুহূর্তের আকুতি তাড়া করে ফেরে সালমাকে।
আইলা-পরবর্তী দিনগুলোর স্মৃতি আজও এই জনপদের মানুষকে শিউরে তোলে। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল লাশ। অনেকের শরীর এতটাই পচে গিয়েছিল যে শেষ গোসলটুকু পর্যন্ত করানো সম্ভব হয়নি। বস্তায় ভরে, বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কাদার ভেতরেই দাফন করা হয়েছিল অনেককে।
১৬ বছর পার হলেও এই জনপদের মানুষ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। স্থানীয় সংকটের পাশাপাশি এখন বড় হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। লবণপানির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতিতে নষ্ট হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, কমেছে কর্মসংস্থান এবং তীব্র আকার ধারণ করেছে সুপেয় পানির সংকট।
প্রতি বছরই টেকসই বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকার বাজেট ও বরাদ্দ থাকলেও উপকূলের মানুষের ভাগ্য বদলানোর মতো স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হয়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, উপকূলজুড়ে জলবায়ু সহনশীল ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, দীর্ঘ সময় পর এবার গাবুরাতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ মাঠপর্যায়ে চলমান রয়েছে। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা এই ধীরগতির উন্নয়ন উপকূলের মানুষের লোনা পানির আতঙ্ক পুরোপুরি দূর করতে পারছে না। আইলার দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও মাজেদ শেখের নিখোঁজ সন্তানদের শেষ দাফনটুকু করতে না পারার আফসোস কিংবা সালমা খাতুনদের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আজও মুছতে পারেনি কোনো উদ্যোগ। উপকূলাবাসীর একটাই দাবি—ত্রাণ বা অনুদান নয়, তাঁরা বাঁচতে চান একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে।












