সাতক্ষীরায় ‘বর্ণালী আর্ট’-এর ৫০ বছর পূর্তি: সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুতি সভা
সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ও সুনামধন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিষ্ঠান ‘বর্ণালী আর্ট’-এর ৫০ বছর পূর্তি তথা সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার বেলা ১১টায় শহরের শহীদ নাজমুল সরণিস্থ বর্ণালী আর্ট ইনস্টিটিউট কার্যালয়ে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়।
বর্ণালী আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক মোঃ রিয়াসাত আলীর সভাপতিত্বে সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোস্তফা হাসান।
এছাড়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা কালেক্টরেট স্কুল এর চিত্রশিল্পী ও আর্ট শিক্ষক জামান হোসেন, রংতুলী এড এর স্বত্বাধিকারী ও চিত্রশিল্পী মহিবুল্লাহ, ঝাউডাঙ্গা কলেজ এর প্রভাষক নাজমুন্নাহার, পিএন বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল এর আর্ট শিক্ষক নাজমুছ সাহাদাত, চিত্রশিল্পী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিংশুভ দেবনাথ।
প্রস্তুতি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে চলতি বছর ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে সুবর্ণ জয়ন্তীর মূল উৎসব উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অনুষ্ঠানটি সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠনের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
দিনব্যাপী এই উৎসবের সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- বর্ণাঢ্য র্যালি, স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী, কবিতা আবৃত্তি, আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং একটি বিশেষ চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী। এছাড়া এই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি স্থায়ী ‘অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ (প্রাক্তন শিক্ষার্থী পুনর্মিলনী কমিটি) গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য বর্ণালী আর্টের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ রিয়াসাত আলী ১৯৪৩ সালের ১ জুলাই পুরাতন সাতক্ষীরার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মরহুম হেকমী আব্দুল হাকিমের জ্যৈষ্ঠ পুত্র। রিয়াসাত আলী ঐতিহ্যবাহী মহেশ্বরপাশা স্কুল অব আর্টস থেকে চিত্রশিল্পের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সান্নিধ্যে থেকে চিত্রাঙ্কনের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
চিত্রশিল্পী রিয়াসাত আলী ১৯৭৫ সালে পুরাতন সাতক্ষীরা হাটখোলায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ‘বর্ণালী আর্ট’ নামে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি শহরের শহীদ নাজমুল সরণিতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সাতক্ষীরা ইউনিট কার্যালয়ের বিপরীতে নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয় এবং পূর্ণাঙ্গ ‘বর্ণালী আর্ট ইনস্টিটিউট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
গত ৫০ বছরে এই ইনস্টিটিউট থেকে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী চিত্রাঙ্কনের দীক্ষা নিয়েছেন। এখানকার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উচ্চপদে অত্যন্ত সুনামের সাথে কর্মরত আছেন। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জাতীয় শিশু পুরস্কার, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিচালিত বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় একাধিকবার শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব অর্জন করেছেন।
শুধু একজন আদর্শ শিক্ষকই নন, রিয়াসাত আলী একজন সমাজসচেতন কালজয়ী শিল্পীও বটে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতার চরণ- “ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন/ বেলা বয়ে যায় খায়নিকো বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন”- এর মর্মস্পর্শী ভাবকে তিনি তাঁর তুলির ছোঁয়ায় ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে এক অসহায় দাদি ও তার নাতির দুর্ভিক্ষের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। এছাড়া সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে জলরং, তেলরং-এর পাশাপাশি পেনসিল স্কেচ ও কলমের আঁচড়ে তিনি গ্রাম-বাংলার নৈসর্গিক প্রকৃতি ও লোকজীবনকে পরম মমতায় ক্যানভাসবন্দি করেছেন।
প্রস্তুতি সভায় বক্তারা বর্ণালী আর্টের এই গৌরবময় ৫০ বছরের যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে সর্বস্তরের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।












