সাতক্ষীরায় ৩ দিনের হরতালে ১৩ জনের প্রাণহানি: পরিবারগুলোর দায়িত্ব কে নেবে?


প্রকাশিত : March 7, 2013 ||

পত্রদূত রিপোর্ট: গত ৩ দিনের হরতাল এবং এর আগে ও পরের সহিংস ঘটনায় সাতক্ষীরায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। অন্তত ৫০ লাখ টাকার সরকারি গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে বিনষ্ট করা হয়েছে। গাড়ি পোড়ানোসহ অন্যান্য মালামালের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে অন্তত ২ কোটি টাকার। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ লুটপাট চালিয়ে ক্ষতি করা হয়েছে আরও কয়েক কোটি টাকার। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে জামায়াত-শিবির এ নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে। এখনও গ্রামে গ্রামে রাস্তায় পড়ে আছে লক্ষ লক্ষ টাকার গাছ। চোরা গুপ্তা হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন অব্যাহত রয়েছে। জেলাবাসীর জান মাল রক্ষার্থে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ, বিজিবি, দাঙ্গা পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য সংস্থা গুলিবর্ষণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন, নিহত ১৩ ব্যক্তির পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? সরকার না জামায়াত শিবির। এসব হিসাব-নিকাশ নিয়েই জেলার অলি গলিতে আলোচনার শেষ নেই।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্র“য়ারি জামায়াত-শিবির সাধারণ মানুষের জানমালসহ সরকারি সম্পদ ক্ষতিসাধনের টার্গেট নিয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা করে। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশ শহরের সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। ওইদিন বিকাল ৪টায় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রস্তুতি নিয়েই কদমতলা থেকে শহরে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশ মিছিলটিকে সার্কিট হাউজ মোড়ে বাধা দেয়। মিছিলটি ওই বাধা অতিক্রম করে শহরে ঢোকার চেষ্টায় শুরু হয় গোলা গুলি। কয়েক হাজার রাউন্ড টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সট গানের গুলি ছোড়া হয়। এক ঘণ্টার অধিক সময় এভাবেই চলেছে দুই পক্ষের গোলাগুলি। মিছিলকারীরাও তাদের কাছে থাকা দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি নিক্ষেপসহ হাত বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশকে নাজেহাল করে ফেলে। এক পর্যায়ে নামানো হয় বিজিবি। তখনও জামায়াত শিবির তাদের স্থান থেকে সরে দাড়াতে নারাজ। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে বিজিবি গুলি চালানোর সাথে সাথে ৫/৭ মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং পুরো এলাকা পুলিশের দখলে চলে আসে। এ ঘটনায় সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাড়ায় ৬ জন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ ও বৃদ্ধ। এসময় গুলিবিদ্ধ হয় আরও অনেকে। নিহতদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের কোন নেতা-কর্মীকে চিহ্নিত করা যায়নি। সবই গ্রামের নীরিহ মানুষ, যাদেরকে ইসলাম প্রচারের জন্য নিয়ে এসে জামায়াত-শিবিরের নেতারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওইদিন সন্ধ্যায় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা সিটি কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি আল-মামুনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে মারপিট, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় মামুনকে উদ্ধার করে খুলনায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এসময় মামুনের সহকর্মী শাহিনকে পিটিয়ে জখমের ঘটনায় তারও মৃত্যু হয়। এ দিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে মোট ৮ জন। এর একদিন পর গত শনিবার জামায়াত শিবির জেলায় অর্ধ দিবস হরতাল পালন করে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। প্রশাসনের কঠোর নজদারিতে শহরে হরতাল আহবানকারীরা ঢুকতে পারেনি। এরপর জামায়াত শিবির কেন্দ্রের ডাকে রবি ও সোমবার হরতাল পালন করে। মঙ্গলবার বিএনপির ডাকে পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। এক টানা ৩দিনের এ হরতালে জামায়াত-শিবির গ্রাম থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত সড়ক-মহাসড়ক কেটে, রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে, মিছিল করে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে জেলাকে অচল করে দেয়। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব দেখে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতা-কর্মী এবং সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। এরই মধ্যে হরতালের দ্বিতীয় দিনে সদরের রইচপুর এলাকায় গ্রামের মধ্যের রাস্তায় গাছে গুড়ি ফেলানো থাকায় বিজিবির গাড়ি যেতে বাধা সৃষ্টি হয়। বিজিবি’র দুটি গাড়ি ফিরে আসার সময় হরতালকারীরা গাড়ি দুটি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিবি কয়েক রাউণ্ড গুলি চালায়। এতে মাহাবুবর রহমান নামের বিএনপি সমার্থক এক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এর আগের দিন কলারোয়ার উফাপুর এলাকায় অবরোধকৃত সড়কে পড়ে থাকা গাছ সরাতে যেয়ে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে একই পরিবারের দুই ভাইসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবারের হরতালে কলারোয়া উপজেলা পরিষদের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণে আহত ৬ জনের মধ্যে শুকুর আলী নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিহত ১৩ ব্যক্তির পরিবারে চলছে শোকের মাতম। যারা নিহত হয়েছে তাদের সকলেই সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ। জামায়াত-শিবির নানা করম গুজব ছড়িয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে মৃত্যু মুখে পতিত করেছে, এই পরিবারগুলোর দায়িত্ব কে নেবে, এটাই প্রশ্ন সকলের?