আশাশুনির ভূমিহীন জনপদে সন্ত্রাসী হামলায় আহত ১০: গ্রেপ্তার ৩ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ৩০লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুটপাট


প্রকাশিত : মার্চ ৩, ২০১৭ ||

পত্রদূত ডেস্ক: ভূমিহীন ও তাদের সহায়তাকারি ৭৬ জনের নামে পৃথক দুটি মামলা দিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর পুরুষশূণ্য ভূমিহীন এলাকায় বসির আহম্মেদের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কাটাখালি এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। হামলায় কমপক্ষে ১০জন ভূমিহীন আহত হয়েছেন।
হামলাকারিরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও ভূমিহীনদের বসতঘর ও রান্না ঘর, চিংড়ি ঘের মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘের কর্মচারিদের বাসা, মাছ, টাকা লুটপাটের পর আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এ সময় ভাঙচুর ও আগুনের হাত থেকে রেহাই পায়নি কাটাখালি মধ্যপাড়া জামে মসজিদটিও। পালিয়ে যাওয়ার সময় ভূমিহীনরা বসির আহম্মেদের এক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীকে দা সহ আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে আশাশুনি উপজেলার কাটাখালি এলাকায় গেলে দেখা গেছে শরাফপুর এতিমখানার পাশে ২০টির মত ইঞ্জিনচালিত ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। কিছুদূর যাওয়ার পর মোল্লার মোড়ে ৩০/৩৫জন যুবক হাতে লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। শোভানালী ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যার হাজিপুরের জালাল গাজীর বাড়ির সামনে হাজীপুর, ছয়কোনা, কাটাখালি, বাউচাষ, বাঁকড়া, শরাফপুর এলাকার কয়েক’শ ভূমিহীন নারী ও পুরুষ হাতে লাঠি নিয়ে বসিরের সন্ত্রাসী বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য রাস্তা ও বিলের মধ্যে অবস্থান করছেন। এ সময় তারা হাজিপুর গ্রামের গণি সরদারের ছেলে ওবায়দুল কাদেরকে (২৫) কুপিয়ে জখম করার অভিযোগে ধাওয়া করে শরাফপুর গ্রামের আলিমুদ্দিন মোল্লার ছেলে বসির বাহিনীর সদস্য আলমগীর হোসেনকে (২৭) একটি কাটারিসহ আটক করে। কিছুক্ষণ পর কাটাখালি মধ্যপাড়া জামে মসজিদের সামনে যেয়ে দেখা গেছে মসজিদের পাঁচটি জানালা ও একটি দরজা ভাঙচুর করা হয়েছে। মসজিদের পিছনের দেয়াল সংলগ্ন ইমাম বাগেরহাটের রামপাল গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের বসতঘর, রান্না ঘর পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে ভষ্মীভূত করে দেওয়া হয়েছে। তারই পাশে মিলন গাজীর মাছের ঘেরের পাহারাদারদের বাসা, মাছের সেট ভাঙচুর ও লুট করা হয়েছে। তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে বসির বাহিনীর সদস্যরা। মসজিদের কাছাকাছি ভূমিহীন রফিকুল ইসলামের বসতঘরটি ভাঙচুরের পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তখনো জ্বলছিল আগুন, বের হচ্ছিল ধোঁয়া।
হাজীপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, শাহীন হোসেন ও মিলন গাজী জানান, শোভনালী ইউপি’র চেয়ারম্যান জালাল গাজীর কাটাখালি ঘেরের মধ্যে থাকা প্রায় ৮৫ বিঘা সরকারি খাস জমি ২০০৭সালে ভূমিহীনদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই জমি ভূমিহীনরা একসনা বন্দোবস্ত নেয়। পরবর্তীতে শরাফপুরের বসির আহম্মেদ ও তার ভাই সালাউদ্দিন লাল্টু জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল করে নিজের দখলে নেয়। এ নিয়ে প্রতিনিয়িত সংঘাত চলে আসছিল। ভূমিহীনদের প্রতিহত করতে বসির আহম্মেদ পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে একের পর এক ঘের দখল, লুটপাট ও চাঁদাবাজির ১১টি মামলা করে। এসব মামলায় চার শতাধিক নারী ও পুরুষকে আসামী করা হয়। এসব মামলায় ইউপি সদস্য হাবিবুল্লাহসহ কয়েকজন ভূমিহীন বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন।
তারা আরো জানান, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে স্থানীয়দের সহায়তায় ভূমিহীনরা জালিয়াতির মাধ্যমে দখলে রাখা বসির ও তার ভাই সালাউদ্দিন লাল্টুর ৮৫ বিঘা চিংড়ি ঘেরের জমি (পানি শূণ্য) বুধবার সকালে দখলে নেয়। খণ্ড খণ্ড জমি নিয়ে তারা ছোট ছোট ঘের করার জন্য বাঁধ নির্মাণ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বসিরের পক্ষ থেকে বুধবার রশীদের দায়েরকৃত মামলায় ৪৬ জন ও অপরটিতে সালাউদ্দিন লাল্টুর দায়েরকৃত মামলায় ৩০জন ছাড়া অজ্ঞাতনামা দু’ শতাধিক ব্যক্তির নামে ঘের লুটপাট ও চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়। মামলায় র্ভমিহীন সদস্য ছাড়াও তাদের সহায়তাদানকারি হাজিপুর গ্রামের মিলন গাজী, আশরাফ গাজী, গিয়াসউদ্দিন, তুহিন গাজী, শাহাবুদ্দিন গাজী, রমজান গাজী, হামিজউদ্দিন গাজীকেও আসামী করা হয়। পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে হাজিপুর গ্রামের হামিদ সরদারের ছেলে আবুল আহসান, কাটাখালি গ্রামের আব্বাস ঢালীর ছেলে আলমগীর হোসেন, একই গ্রামের আছিরদ্দির মেয়ে হাফিজা খাতুন ও হরিশ্চন্দ্র মন্ডলের ছেলে বৈদ্যনাথ মণ্ডলকে আটক করে।
প্রত্যক্ষদর্শী কাটাখালি গ্রামের ভূমিহীন রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা খাতুন, আফছার সরদারের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন, আলমগীর ঢালীর স্ত্রী তাহমিনা খাতুন ও আমজাদ হোসেনের স্ত্রী নূরুজ্জাহান জানান, বৃহষ্পতিবার সকাল সাতটার দিকে উপজেলার বালিয়াপুর, ছয়কোনা, শরাফপুর, জোড়দিয়া ও বাঁকড়া এলাকা দিয়ে বসির আহম্মেদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা কাটাখালি এলাকায় ঢোকে। তাদের হাতে ছিল রামদা, লোহার রড, বোমা, চাইনিজ কুড়াল, ক্রেস্ট ও পাইপগান। তিন শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীর নেতৃত্ব দেয় হাজীপুরের মহিদ হাজরা, শাহীন বাবু, র‌্যাব ও পুলিশের সোর্স বলে পরিচিত কাটাখালির আমিরুল সরদার, ভাই হাফিজুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, চড়–, ছয়কোনা গ্রামের রাজ্জাক মোড়ল, বাঁকড়ার বনমালী বাছাড়, কামালকাটির বারিক গাজী, শরাফপুরের আব্দুর রশিদ।
তারা আরো জানান, আমিরুল সরদার, তার দু’ ভাইসহ ছাদেক ও আব্দুল কাদের কয়েকজন সন্ত্রাসীকে নিয়ে কাটাখালি মধ্যপাড়া জামে মসজিদের সামনের দেয়াল, পাঁচটি জানালা ও একটি দরজা ভাঙচুর করে। পরে তারা মসজিদের পিছনে ইমাম সাদ্দাম হোসেনের বসতঘর, রান্না ঘর, পাশেই থাকা মিলন গাজীর ঘের পাহারাদারদের বাসা, মাছের সেট ও অফিসঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে তাতে প্রেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখায় মসজিদের কিছু অংশ কালো হয়ে যায়। পরে তারা ভূমিহীন রফিকুলের বসতঘরে থাকা জিনিসপত্র লুটপাট করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। বাধা দেওয়ায় ওবায়দুল কাদের ও তারাসহ কমপক্ষে ১০জন ভূমিহীন আহত হয়েছে। তাদেরকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ভূমিহীনরা সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করলে উভয়পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পালিয়ে যাওয়ার সময় শরাফপুর গ্রামের সন্ত্রাসী আলমগীর হোসেনকে একটি কাটারিসহ ভূমিহীনরা আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।
ক্ষতিগ্রন্ত মিলন গাজী জানান, ভূমিদস্যু বসির আহম্মেদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা তার ২৭০ বিঘা মাছের ঘেরের চার মন বাগদা, ১০ মনেরও বেশি তেলাপিয়া, ঘেরে ব্যবহৃত কয়েকটি শ্যালো ম্যাশিন, ৩০টি’র বেশি টর্চ লাইট, পাঁচটি সোলার লাইট, পাঁচটি মোবাইল, নগদ আড়াই লাখ টাকাসহ ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট করেছে। এ ছাড়া তার ১০লক্ষাধিক টাকার আসবাবপত্র ভাঙচুর ও পুড়িয়ে ক্ষতিসাধন করে।
এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে বসির আহম্মেদের মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
তবে বসিরের সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কাটাখালি গ্রামের আমিরুল সরদার জানান, বসির আহম্মেদ ও তার ভাই সালাউদ্দিন লাল্টুর কোবালা মূলে কেনা জমি বুধবার ভূমিহীনরা দখলে নিলে জমির মালিকরা বৃহস্পতিবার তা উদ্ধার করেছে। ঘটনার সময় তিনি কাটাখালি বাজার এলাকায় উপস্থিত থাকলেও কে বা কারা ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে তা তার জানা নেই।
আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে উপপরিদর্শক পীযুস দাসের নেতৃত্বে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। গ্রামবাসিদের হাতে আটক আলমগীল হোসেনকে চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বুধবারে বসির আহম্মেদের পক্ষে দায়েরকৃত দু’টি মামলায় তিনজনকে বৃহস্পতিবার ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।