আবদুল্লাহেল বাকির টর্চার সেলে ‘পাকিস্তানের শত্রুদের’ গরম পানিতে চুবানো হতো


প্রকাশিত : মার্চ ২০, ২০১৭ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার আবদুল্লাহেল বাকি ১৯৬৪ সালে তৎকালিন সাতক্ষীরা মহকুমার আলিপুর ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগ নেতা হিসাবে দারুণ দাপট ছিল আবদুল্লাহেল বাকির। এভাবে টানা ২৪ বছর যাবত  একই ইউনিয়নের ইউনিয়ন কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট অথবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭৮ সালে সাতক্ষীরা মহকুমার ৭৮টি ইউপি চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে গঠিত চেয়ারম্যান সমিতির সভাপতিও ছিলেন তিনি। এছাড়া সাতক্ষীরা কো অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন আবদুল্লাহেল বাকি।
আব্দুল্লাহেল বাকির পিতার নাম হাজী জমিরুদ্দিন। বৈমাত্রেয় সহ তারা দুই ভাই দুই বোন। এরা হলেন আব্দুল্লাহেল বাকি, আহলে হাদীস নেতা ড. আসাদুল্লাহ আল গালিব, জামিলা খাতুন ও হালিমা খাতুন।
তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল্লাহেল বাকির দুই স্ত্রীর প্রথম জন টরি বেগম মারা গেছেন। এখন বেঁচে আছেন ছোট স্ত্রী সাজেদা খাতুন। তার ৯ মেয়ে ও ৩ ছেলে এবং ৬৪ জন নাতি নাতনী রয়েছেন। মেয়েরা হলেন লতিফা খাতুন, তৈয়বা খাতুন, হেনা খাতুন, মিনা খাতুন, আছিয়া খাতুন, সালমা খাতুন, তাহমিনা খাতুন ও মৌহসেনা খাতুন। অপর মেয়ে নাজমা খাতুন মারা গেছেন। আবদুল্লাহেল বাকির তিন  ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বেসিক ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মেজ ছেলে মোস্তাজারুর রহমান বাবুল সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যাপক এবং ছোট ছেলে মোস্তাফিরুর রহমান হাবুল একজন মুদী ব্যবসায়ী। বর্তমানে বাকশক্তি হারানো আব্দুল্লাহেল বাকি খুলনায় তার বড় ছেলের বাসায় থাকতেন। এক সপ্তাহ আগে তাকে গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার আলিপুর ইউনিয়নের বুলারাটিতে নিয়ে আসা হয়।
একাত্তরে আব্দুল্লাহেল বাকির নাম শুনলে মানুষ আতংকিত হয়ে উঠতো। সাতক্ষীরা সদর থানা থেকে মাত্র ২০০গজ দূরে সুলতানপুর বড়বাজারমুখী সড়কের পূর্ব পাশ ঘেঁষে ছিলো রাজাকার বাকির টর্চারিং সেন্টার। বর্তমানে সেটি অগ্রনী ব্যাংক। এভারগ্রীন ট্রেডের দোতলায় এ ভবনটি ছিলো ডায়মন্ড কোম্পানীর স্টার হোটেল হিসাবে পরিচিত। এর পরিচালক ছিলেন অবাঙালি মুসা খান। আবদুল্লাহেল বাকিকে পাকিস্তানি সেনা মেজরের সাথে তুলনা করে বলা হতো মেজর বাকি।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, সাতক্ষীরার ত্রাস আব্দুল্লাহেল বাকি তার দোসরদের নিয়ে ‘পাকিস্তানের শত্রু নিধন’ এর লক্ষ্যে গড়ে তোলেন এই টর্চার সেল। এখানে ধরে আনা কথিত কাফেরদের বেত লাঠি ও মুগুর দিয়ে আঘাত করা ছাড়াও ছুরি এবং ব্লেড দিয়ে দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চিরে লবন দেওয়া হতো। গরম পানিতে চুবিয়ে ধরা হতো। ঝুলিয়ে মারা হতো বেত। কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে মজা দেখতেন মেজর বাকি সহ তার সহযোগীরা। কয়েকদিনের নির্যাতনের পর কোন স্বীকারোক্তি না পাওয়া গেলে বাঙালি সন্তানদের নিয়ে যাওয়া হতো পাকিস্তানি জঙ্গি সেনাদের  কাছে। এরপর  সীমান্তের বাঁকাল, মাহমুদপুর অথবা বিনেরপোতায় নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো তাদের। মেজর বাকির টর্চার সেলে নেওয়া পুষ্পকাটী গ্রামের তরুন ছাত্র আনসার আলী আর র্ফিরে আসেনি। মেজর বাকি, মেজর খালেক, মুকিত, জুম্মান, শওকত এবং গফুরদের নির্যাতনে তার প্রাণবায়ু শেষ হয়ে যায়। জানা গেছে বাকির টর্চার সেলের দুই ঘাতক কসাই ছিলেন খান রোকনুজ্জামান ও কবির আহমেদ। তারা আনসারের লাশ নিয়ে পরিবারের হাতে পৌছে দিয়ে বলেছিলেন ‘পাকিস্তান সরকারের বিরোধীতার এটাই ফল’। দেবহাটার ঘলঘলিয়ার তরুণ ছাত্র খলিলুর রহমানকে রাজাকার বাকি পরিচালিত ডায়মন্ড টর্চার সেলে এক সপ্তাহ নির্যাতন চালিয়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের গোপন খবরাখবর নেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খলিলুর রহমান মুক্ত হয়ে নৌ কমান্ডো হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ করে বীরত্বের সাথে দেশে ফিরে আসেন। সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুরের মো. নজরুল ইসলামকে গাড়ির চাকায় বেঁধে দেহের চামড়াশূন্য অবস্থায় টেনে আনা হয় বাকির টর্চার সেলে। কয়েকদিনের নিপীড়নের পর ঘাতকরা নজরুলকে বাঁকাল খালের ধারে ছুড়ে ফেলে দেয়। দুদিন পর সাতক্ষীরা থানার ওসি তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেও তিনি একই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন পাকিস্তানি সৈনিককে দেখে আতংকে সরে পড়েন। বাকির নেতৃত্বে আলিপুরের মাহমুদপুরে ছিলো আরও একটি কিলিং সেন্টার। শহরের স্টার ডায়মন্ড হোটেলে টর্চার করে কিছু উদ্ধারে ব্যর্থ হলে কথিত কাফেরদের পাঠানো হতো মাহমুদপুরে। সাড়ে চার দশক পর আজও এ অঞ্চলে কথিত আছে ‘কি ছিলো কপালের ফের, যাব টাকি সোদপুর, গেলাম কিনা মাহমুদপুর’। মুক্তিযুদ্ধকালে সেখানে রোজ ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত লাশ ফেলা হতো বলে এলাকাবাসি জানান।
১৯৭১ এর ৩০ নভেম্বর আলিপুর পুষ্পকাটী এলাকায় কয়েকশ’ মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান  নেন। এ  খবর পেয়ে পাকিস্তানি বাহিনী খুলনা অভিমুখে পলায়ন শুরু করতেই আতংকিত মেজর বাকি, মেজর খালেক, খান রোকনুজ্জামান, কবির আহমেদ ও জহুরুল ইসলামসহ অন্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে গা মিশিয়ে পলায়ন করে। তাদের মধ্যে রাজাকার খালেক ওরফে মওলানা আবদুল খালেক মন্ডল যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। রাজাকার কবির আহমেদ মারা গেছেন। এছাড়া খান রোকনুজ্জামান ও জহুরুল ইসলাম ওরফে টিক্কা খান সহ অন্যরা বেঁচে আছেন।