জেলায় প্রাথমিকে টাকায় নাম্বার বদলে বৃত্তি তদন্তে প্রমানিত, দোষিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কমিটির সুপারিশ


প্রকাশিত : এপ্রিল ২০, ২০১৭ ||

আব্দুস সামাদ: জেলায় টাকার বিনিময়ে প্রাথমিকে প্রাপ্ত নাম্বার পাল্টে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় ইতোমধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তৎকালিন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিদপ্তর সুপারিশ করেছেন।
এদিকে, দুর্নীতির দায় থেকে মুক্তি পেতে কালিগঞ্জ উপজেলার তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটাএন্ট্রি অপরেটর মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে দরবার শুরু করেছেন। কালিগঞ্জ উপজেলার তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন তিন দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন কালিগঞ্জে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম।
তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রামান পাওয়া গেলেও এখনো কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি জানিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, বর্তমানেও ফারুক হোসেন সহাকারী শিক্ষা অফিসার হিসেবে এবং ভবতোষ সরকার ডাটাএন্ট্রি অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জানাযায়, তৎকালিন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপরেটর ভবতোষ সরকার টাকার বিনিময়ে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেশি নাম্বার দিয়ে রেজাল্ট শীট তৈরি করে বৃত্তির জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে অধিদপ্তরে প্রেরণ করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পক্ষে মঞ্জুরুল হক নামে একজন অভিভাবক মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেন। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে জরুরী তদন্তের নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলম বর্তমান কালিগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিমকে দিয়ে তদন্ত করান এবং তিনি নিজেও ঘটনা স্থলে গিয়ে খোজ নেন।
অপরদিকে, কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারও অভিযোগের তদন্ত করার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে বিষয়টির তদন্ত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এ তদন্ত কমিটি তিনটি রোল নিয়ে তদন্ত করে একটি রোলে নাম্বার পাল্টে বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা খুজে পেয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। অন্য তদন্ত কমিটি প্রায় ১০জন শিক্ষার্থীর নাম্বার বদলে দেওয়ার সত্যতা পেয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্টি অপরেটর ভবতোষ সরকার ১০থেকে ২০হাজার টাকার বিনিময়ে কম নাম্বার প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বার দিয়ে নম্বার সিট তৈরি করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে প্রেরণ করেন। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে সে নম্বার সিট অধিদপ্তরের প্রেরণ করেন। এতে যারা বিদ্যালয় গুলোতে কম মেধাবী শিক্ষার্থী বলে প্রচন ছিল তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেশি নাম্বার পাইয়ে দেয়া হয় এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নাম্বার কমিয়ে দেয়ায় তারা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। প্রাপ্ত বৃত্তির তালিকায়ও অনেক কম মেধাবী শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়েছে বলেও দেখা যায়। তাছাড়া তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফরুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপরেটরের নিকট আত্মীয়সহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নাম্বার পাল্টে দিয়ে বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলমের গঠিত তদন্ত কমিটি তৎকালিন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটাএন্ট্রি অপরেটর ভবতোষ সরকারের বিরুদ্ধে ৯জন শিক্ষার্থীর নাম্বার বদলে দেওয়ার সত্যতা পান। একই সাথে কমিটি শিক্ষার্থীর ফলাফল বদলে বেশি নম্বার দিয়ে বৃত্তি পেতে সহযোগীতা করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নাম্বার কমিয়ে দিয়ে বৃত্তি না পাওয়ার অভিযোগের সত্যতা খুজে পান। তদন্ত কমিটি এসব বিষয়ে সত্যতা পেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
এদিকে, জেলার আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শামসুন্নাহসহ জেলা বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও ডাটা এন্ট্রি আপারেটরের বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা ডাটাএন্ট্রি অপারেটরের সাথে যোগসাযোগে নাম্বার বদলে এ ধরণের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।  র্দীঘ দিন ধরে সাতক্ষীরা জেলায় এ চক্রটি সক্রিয়ভাবে কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এ বছর প্রথমই এ অভিযোগের সত্যতা খুজে পাওয়া গেলো।
বিষয় সম্পর্কে অভিযুক্ত তৎকালিন কালিগঞ্জ উপজেলা ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফরুক হোসেন বলেন, কয়েকটা নাম্বার ভুল হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হয়েছে। বর্তমানে আমি সাতক্ষীরার বাইরে আছি। এর বেশি কিছু না। অপর অভিযুক্ত ডাটাএন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকার বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানিনা। আমি শুধু মাত্র ডাটা এন্ট্রি করেছি মাত্র।
এ বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা বর্তমান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম বলেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে আমি বিষয়টি তদন্ত করেছি। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। আমি আমার প্রতিবেদন জেলা অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে।
অপর দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান জানান, বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে। আমি সুপারিশ করে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট প্রতিবেদন পেশ করেছি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলম বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে কালিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্টি অপরেটর ভবতোষ সরকার ফলাফল বদলে দিয়েছিল। বিষয়েটি গুরুত্বের সাথে দেখে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে বিষয়ে প্রমানিত হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। এখন অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
তিনি আরও বলেন, যদি কালিগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার অন্য কোন উপজেলার শিক্ষার্থীরা মনে করে তাদের নাম্বার বদলে দেওয়া হয়েছে। তাহলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অথবা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটি পুনরায় বিবেচনার জন্য যাচাই বাছাই করে দেখা যেতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কয়টি অভিযোগ এসেছে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত ১১এপ্রিল ২০১৭ মঙ্গলবার ঘোষিত বৃত্তির ফলাফলে জেলার ৭টি উপজেলা থেকে ১হাজার ১জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বাধিক সাধারণ গ্রেডে ১৪৫জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৮৬ জন, কালিগঞ্জ উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৫৩জন, আশাশুনি উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৬৯জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৫৬জন, কলারোয়া উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ১২৩জন, ট্যালেন্টপুলে ৫২ এবং সম্পূরক বৃত্তি লাভ করেছে ৬ জন। তালা উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৬২জন, দেবহাটা উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৩৩জন এবং ট্যালেন্টপুলে ২৩জন ও শ্যামনগর উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৬৮জন বৃত্তি লাভ করেছে।