বুধহাটায় সংখ্যালঘুর জমি জাল দলিলের মাধ্যমে আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ


প্রকাশিত : এপ্রিল ২১, ২০১৭ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশী শক্তি প্রয়োগ ও অনিয়ম দুর্নীতির মধ্যদিয়ে প্রস্তুতকৃত দলিলের উপর ভিত্তি করে এতিম সংখ্যালঘুর জমি দখলের পায়তারার অভিযোগ উঠেছে। ত্রিশ বছর ধরে ভারতে বসবাসকারি নাগরিক বিশ^জিত দেবনাথকে দেশে এনে কথিত জন্মনিবন্ধন তৈরি করে কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টার ঘটনায় জেলাব্যপি তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালত ও অরিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরকৃত পৃথক মামলার নির্দেশও মানছেন না এই ভূমিদস্যুরা। প্রশাসনের নিরবতায় জীবন সংকটে ভূগছেন সংখ্যালঘূ এই পরিবারটি। আলোচিত ঘটনাটি জেলার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা এলাকায়।
আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা গ্রামের মৃত অজিত দেবনাথে ছেলে স্বরজিত দেবনাথ জানান, বিগত ২০১২ সালে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার জন্য অনেক জমাজমি বিক্রয় করে চিকিৎসা করা হয়। সেসময় আমরা বেশ ঋণী হয়ে যাই। ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাবার মৃত্যু হয়। কোন রকমে দিন আনা দিন খাওয়া করে বেঁচে আছি। এরপরও আমাকে পড়ালেখা করতে হয়। এরআগে আমার বাবার প্রথম স্ত্রী রাণী দেবনাথ ও তার ছেলে বিশ^জিৎ দেবনাথ ৩০ বছর আগে ভারতের বিরাটি নামক স্থানে চলে যায়। পরে আমার বাবা তার ওই ছেলের অংশ বিশেষ জমি বিক্রয় করে সেদেশে দিয়ে সেটেল করে দেয়। আর এদেশে যা থাকে তা আমার মা ও আমি নিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছি। দীর্ঘ ৩০ বছরের মধ্যে বিমাতা ওই ভাই কখনও বাংলাদেশে আসেনি। সে এদেশের নাগরিকও নন এবং ভোটারও হয়নি।
এদিকে আমি এতিম থাকায় ও অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় এলাকার কুচক্রী একটি মহল আমার সম্পদ আত্মসাতের ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এলাকার প্রতিবেশি জনৈক তপন দেবনাথ তার পুরো পরিবার ভারতে অবস্থানসহ সেদেশে গাড়ি বাড়ি তৈরি করে এখন ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় চেয়ারম্যান আ. ব. ম মোছাদ্দেক কে সঙ্গে নিয়ে ভারতের বিরাটি থাকা আমার বিমাতা ভাই বিশ^জিৎকে সাজিয়ে গত বছরের ২৪ অগাস্ট আশাশুনি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে ২৯৪৪ নং রেজিস্ট্রি জাল কোবালা দলিল সৃষ্টি করেছে। যার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৯ বিঘা জমি লিখে নেয়া হয়েছে বলে জানানো হচ্ছে। যার মুল্য অন্তত দেড় কোটি টাকা। উক্ত জমির মধ্যে বুধহাটা বাজারের ৪টি দোকানঘর ও জমিসহ বিলান এবং বাস্তভিটা রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারিরা এসব দোকানের ভাড়াটিয়াদের ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ডিড সৃষ্টি করে তাদেরকে ভাড়া দিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। বিষয়টি জানতে পেরে গেল বছরের ৭ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপার বরাবর প্রতিকার চেয়ে আবেদন করা হয়। পুলিশ সুপার তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে আশাশুনি থানার ওসিকে নির্দেশ প্রদান করেন। সেখানে কপি পৌছানের পর ওসির পক্ষে এসআই সোয়েব হোসেনকে দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবারের অভিযোগ প্রতিকার চেয়ে আবেদন করলে পুলিশ থেকেই এসব দোকানের ভাড়াপ্রাপ্তি বন্ধ করার চেষ্টা করছে। একই সাথে ষড়যন্ত্রকারিদের পক্ষেই তাদের অবস্থান দিনে দিনে পরিস্কার হচ্ছে।
এদিকে নিহত অজিত দেবনাথের স্ত্রী ললিতা দেবনাথ জানান, ভারতীয় নাগরিককে নামমাত্র একটি জন্ম সনদ দেখিয়ে আশাশুনি সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সম্পাদনকৃত কথিত কোবালা দলিলের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ নভেম্বর দেওয়ানী ৫৮/২০১৬ এর বিবাদী তপন কুমার দেবনাথ, আ. ব. ম মোছাদ্দেক, বিশ^জিৎ দেবনাথ ও গোলাম এলাহী আশাশুনি সাব রেজিস্ট্রারকে বিবাদী করে যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতে একটি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মোট দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে যা বিচারাধীন। এছাড়াও উক্ত দলিলটি ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চেয়ারম্যান দূর্ণীতি দমন কমিশন ঢাকায় একটি অভিযোগ প্রদান করা হয়। যা গেল বছরের ৮ ডিসেম্বর অভিযোগটির ক্রমিক নং ৭০ প্রাপ্তি স্বীকার করেন। বর্তমানে অভিযোগটি তদন্তাধীন।
ললিতা দেবনাথ আরও জানান, কথিত দলিল মূলে জমির মালিক দাবিদার তপন দেবনাথের অন্য ৪ভাই দীর্ঘদিন ভারতে চলে গেছে। তপনের দুই ছেলে ভারতের কোলকাতার বাবুআটি এলাকায় বাড়ি দোকান ও গোডাউন নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করছে। স্ত্রীও বছরের ১১মাস ভারতেই থাকে। দ্বৈত এই নাগরিক তপন দেবনাথ আমাদের জমি বিক্রি করে যেকোন সময় ভারতে চলে যাবে শোনা যাচ্ছে। এদেশের সম্পদ ভারতে পাচারের অভিযোগ এনে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, কুচক্রী তপন দেবনাথ আমাদের প্রায় ৩ বিঘা জমি কয়েক বছর জবর দখল করে রেখেছে। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ৫২ শতকের আরও একটি প্লট দখল করে প্রাচীর নির্মানের চেষ্টা করলে এলাকাবাসী সহয়তায় তা ভেঙ্গে দেয়া হয়। বর্তমানে বুধহাটা বাজারের ৪টি দোকান দখলের পায়তারা অব্যাহত রেখেছে। একই সাথে বিলান আড়াই বিঘা জমি পাশর্^বর্তী হাবাসপুর গ্রামের রমজানের নিকট বন্ধক রাখা দীর্ঘদিন। সেই জমিতে এবার লাগানো বোরো ধানের ভাগ দাবি করছে তপন দেবনাথ।
মৃত অজিত দেবনাথে স্ত্রী ললিতা দেবনাথ ও ছেলে স্বরজিত দেবনাথ আরও জানান, আমরা হিন্দু। আমাদের গায়ে শক্তি নেই। আমরা চরম অসহায়। তাই আমাদেরকে পিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে সমাজের বৃত্তবানরা। কুচক্রী তপন দেবনাথ বুধহাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোসাদ্দেককে সামনে রেখে নিজে ফায়দা লোটার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এসব ব্যাপারে জমির ক্রেতা তপন দেবনাথ টেলিফোনে জানান ভারতে থাকলেও তার জন্ম সনদ, ১৯৭৪ সালের বুধহাটা বিবিএম হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির সনদ রয়েছে। আমরা তার কাছ থেকে ৯ বিঘার অধিক জমি ক্রয় করেছি। এঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা আদালতে জবাব দাখিল করেছি। এরমধ্যে চেয়ারম্যান মোসাদ্দেকের রয়েছে ৬ শতক। অধিকাংশ জমি তার দখলে আছে দাবী করে বলেন, আমাদেরও কাগজপত্র আছে এক জায়গায় বসে কথা বলবেন বলে জানান। তবে চেয়ারম্যান মোসাদ্দেকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে কথা বলা যাইনি।