কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প: টিআরএম ভূক্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পেতে চরম ভোগান্তি


প্রকাশিত : মে ১৮, ২০১৭ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রায় ২৬২ কোটি টাকার কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পে প্রধান বাধা টিআরএম প্রকল্পভুক্ত জমির মালিকদের ফসলের ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে চরম ভোগান্তি পোয়াতে হচ্ছে। ভূমি অধ্যাদেশ আইনের জটিলতা সহ জমির মালিকদের নামপত্তনে জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বহুল আলোচিত কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প। তথ্য মতে, ২০১১ সালে প্রকল্প কার্যক্রম শুরু থেকে প্রায় ৬ বছর অতিক্রান্ত হলেও জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে মাত্র ১ বছরের। পরের ক্ষতিপুরণ কবে দেয়া হবে তারও কোন পরিকল্পনা নেই। দ্বিতীয়ত: টিআরএম এর মুখ্য উদ্দেশ্য পলি দ্বারা বিল ভরাটের বিপরীতে বিল ব্যবস্থাপনায় নেট-পাটার দৌরাত্বে টিআরএম প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে। টিআরএম ভুক্ত জমির মালিকদের ফসলের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও বিলের মধ্যে নেট-পাটার সমস্যাটি টিআরএম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা ও কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পে প্রধান বাধা বলে এলাকাবাসি মনে করছেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিগ্রহন করা জমির মালিকদের টাকা প্রদানের বিষয়টি প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন। তিনি এ বিষয়ে বলেন, অধিগ্রহণ  করা জমির মামলা গুলো জটিল। একটি জমির দাবিদার অনেক। মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধে সমস্যা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকৃত মালিক নিশ্চিত হওয়ার পর টাকা দেয়া হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কপোতাক্ষ নদের দৈর্ঘ্য ২৪০ কিলোমিটার এবং এর ক্যাচমেন্ট এরিয়া ১.০২ লক্ষ হেক্টর। প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এ নদের অববাহিকায় বাস করে। নব্বই-এর দশকের শেষের দিকে কপোতাক্ষ অববাহিকার জলাবদ্ধতা শুরু হয় এবং ২০০০ সালের পর থেকে জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রূপ নেয়। পলি জমে কপোতাক্ষ নদ ভরাট হবার কারণে এ অঞ্চলে ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত উপর্যোপরি বন্যা ও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এলাকা জুড়ে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কপোতাক্ষের বুকে জমা হওয়া পলি অপসারনের মাধ্যমে কপোতাক্ষকে রক্ষা করার জন্য জনগণ আন্দোলন শুরু করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী জনসভায় ঘোষনা দেন, তিনি নির্বাচিত হলে কপোতাক্ষ নদ পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নেবেন। এর ধারাবাহিকতায় মহাজোট সরকার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর চার বছর মেয়াদী কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পটি (প্রথম পর্যায়) অনুমোদন করে।
প্রকল্পে নদটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রধানত: ২টি কাজ নির্ধারণ করা হয়। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ও খেশরা ইউনিয়নের পাখিমারা বিলে ১৫৬১.৯৬ একর জমির উপর জোয়ারাধার স্থাপন করা এবং কপোতাক্ষ নদের ৯০ কিলোমিটার অংশ খনন করে জমে থাকা পলি অপসারণ করা।
কিন্তু বাস্তবে এই কপোতাক্ষ খনন কাজ চলতে থাকে শম্বুক গতিতে। পাউবো ২০১৩ সালে পাখিমারা বিলের টিআরএম ভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ২০১২ ও ২০১৩ সালের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রাক্কলিত ব্যয়ের মোট ১৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩০ হাজার ৬৮১.১৬ টাকা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে ৭ কোটি টাকা সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনকে প্রদান করা হয়। আর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২মে ১৭ পর্যন্ত ৩ কোটি ৪৬ লাখ  টাকা জমির মালিকদের পরিশোধ করা হয়। এ পর্যন্ত টিআরএম ভুক্ত ৭শ’৯২ জন জমির মালিক তাদের জমির ক্ষতিপুরণেরর জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। আর এই আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে ৬শ’ ৫৭টি। অপেক্ষমান রয়েছে ১শ ৩৫টি আবেদন। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্বেও এ পর্র্যন্ত জমির মালিকদের ১ বছরের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রায় অর্ধেক পরিশোধ করা হয়েছে। পাখিমারা বিলের জোয়ারাধারের জন্য ১৫৬১.৯৬ একর জমি হুকুম দখল করা হলেও নানা জটিলতার কারনে জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে বলে এলাকাবাসির অভিযোগ। ফলে একদিকে যেমন বিল অধিবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অস্থায়ী মাইগ্রেশন হতে শুরু করেছে অন্যদিকে তেমনি বিলের মধ্যে নেট-পাটা দিয়ে পলি ভরাটে চরম বাঁধাগ্রস্থ করেছে। যে কারণে জমির মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ সহ নেট-পাটার দৌরাত্বের কারণে জনমনে সহিংস ঘটনার আশংকাও বাড়ছে।
মূলত: কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প কাজের একটি মূল অংশ হলো পলিতে কপোতাক্ষের ভরাট হওয়া ৯০ কিলোমিটার খননের মাধ্যমে পলি অপসারণ করা। এর মধ্যে ভাটির দিকের ২৩ কিলোমিটার ড্রেজার দিয়ে এবং উজান এলাকার ৬৭ কিলোমিটার এক্সকেভেটর দিয়ে খনন করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুসারে নদীর ভাটির অংশের দিক থেকে নদী খনন শুরু না করে প্রথমে উজানের দিকের নদী খনন করা হয় এবং বার বার এলাকা প্লাবিত হওয়ার কারণে জনভোগান্তির প্রেক্ষিতে প্রকল্প মেয়াদের শেষে ২০১৫-১৬ সালে ভাটির অংশ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রায় ৪ বছর বিলম্বের কারণে ভাটির অংশে আরও পলি জমে ড্রেজার দিয়ে খননের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে এক্সকেভেটর দিয়ে খননের উদ্যোগ নেয়া হলেও যথাসময়ে কাজটি শেষ না হওয়ায় একদিকে যেমন অববাহিকার জলাবদ্ধতা সম্পূর্ণভাবে দূরীভূত হয়নি তেমনি জনগণের ভোগান্তিও কমেনি।
প্রকল্পের শুরুতেই পাখিমারা বিলে টিআরএম চালু করার কথা থাকলেও প্রায় ৪ বছর পর ২০১৫ সালের জুলাই মাসে তা চালু করা হয়। এর জন্যে ১৯.৭৬ একর জমি স্থায়ীভাবে (অধ্যাদেশ-১৯৮২ অনুসারে) অধিগ্রহণ করা হয়। স্থায়ী অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে এলাকার কিছু জনগণ হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলে টিআরএম কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়। হাইকোর্টের স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার হলে ২০১৫ সালের ১১ জুলাই আংশিক সেকশনে ৭.৮১ (৩৯.৫২%) একর ভূমিতে পাউবো বাঁধ কেটে সংযোগ খাল চালু করার মাধ্যমে টিআরএম কার্যক্রম শুরু করলে সংযোগ খালের দুইপাশে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এই ভাঙ্গন রোধের জন্য বাঁধ নির্মান করা হলেও নি¤œমানের বাঁধের কারণে প্রায়ই বাধঁ ভেঙ্গে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তবে পাখিমারা বিলে টিআরএম চালু হওয়ায় গত ১ বছরে কপোতাক্ষ নদের বালিয়া হতে পাইকগাছার শিববাড়ী মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কপোতাক্ষ নদীর বুকে জমে থাকা পলি পরিকল্পনা অনুযায়ী খনন করে সম্পূর্ণভাবে অপসারণ না করায় কপোতাক্ষ অববাহিকায় এখনও জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ জনপদে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তি নিরসন হয়নি। পাশাপাশি পাখিমারা বিলের জোয়ারাধার বাস্তবায়নের জন্য ১০.২০ কিলোমিটার গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধটি (পেরিফেরিয়াল বাঁধ) যথাযথভাবে তৈরী না হওয়ার কারণে বাঁধ ভেঙ্গে বা জোয়ারের পানি উপচিয়ে মাঝে মধ্যে পাশের গ্রাম প্লাবিত হয়ে জনভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া বাঁধের অধিকাংশ আউটলেট পাইপগুলো সঠিকভাবে স্থাপন না করায় তা দিয়ে জোয়ারাধারের বাইরের পানি নিষ্কাশিত না হয়ে বরং জোয়ারাধারের পানি গ্রাম এলাকায় প্রবেশ করছে। এসব সমস্যার কারণে বর্ষা মৌসুমে এলাকার ফসলী জমি, মাছের ঘের, রাস্তা ও বাড়ি-ঘর প্লাবিত হচ্ছে।
আইডব্লিউএম এর সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুসারে পাখিমারা বিলের জোয়ারাধারের জন্য ১৫৬১.৯৬ একর জমি হুকুম দখল করা হয় এবং পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রতি বছর একর প্রতি ৪৩,১২৭.০০ টাকা ফসলের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। ২০১১ সালে প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হলেও প্রায় ৬ বছর পরও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে মাত্র ১ বছরের। পরের বছরের ক্ষতিপুরণ কবে দেয়া হবে তারও কোন পরিকল্পনা করা হয়নি। তবে জেলা প্রশাসক জানান, দ্বিতীয় বছরের জন্য জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকার বরাদ্দ মিলেছে। তবে অধিগ্রহণ করা জমির মামলা গুলো নিস্পত্তিতে পদ্ধতিগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ফসলের ক্ষতিপূরণ প্রদানের সমস্যাটি টিআরএম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আবার বিলে পলি ভরাটের বিপরীতে অসংখ্য নেট-পাটা দিয়ে বাধাগ্রস্থ করে টিআরএম এর সফলতা ব্যর্থ হওয়ারও আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টিআরএম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি যেমন সবচেয়ে বড় সমস্যা তেমনি সুষ্ঠুভাবে টিআরএম বিলে পলি ভরাট না হওয়াটাও একটা বড় সমস্যা। প্রকল্প কার্যক্রম ইতোমধ্যে প্রায় ৬ বছর অতিক্রান্ত  হলেও জমির মালিকরা ৬ বছরের পরিবর্তে শুধুমাত্র ১ বছরের জন্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছে। বাকী টাকা কখন, কিভাবে পাবে এ নিয়ে ইতোমধ্যে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিল ব্যবস্থাপনায় নেট-পাটা তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও কর্র্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে নেটপাটা বহাল রেখে টিআরএম ব্যবস্থাপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রকল্পভুক্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি টিআরএম ভুক্ত কৃষি জমির উপর শুধুমাত্র জমির মালিকদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল নয়। ভূমিহীন কৃষক, বিধবা বা দরিদ্র মহিলা, ভূমিহীন মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকাও এই বিলের উপর নির্ভরশীল। অথচ জোয়ারাধার প্রকল্পে সরকার জমির মালিকদের ফসলের ক্ষতিপূরণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলেও এসব মানুষের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। জোয়ারাধার বাস্তবায়নের ফলে এ সমস্ত দরিদ্র মানুষেরা জীবিকার প্রয়োজনে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে অভিবাসিত হচ্ছে। এছাড়া নকশা অনুযায়ী পেরিফেরিয়াল বাঁধ তৈরি না হওয়ায় অস্থায়ীভাবে হুকুম দখলকৃত জমির বাইরের ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক জমির উপর দিয়ে এই বাঁধ নির্মিত হয়েছে। পাখিমারা বিলের টিআরএম ভুক্ত সংযোগ খালের জন্য প্রকল্পের শুরুতে ১৯.৭৬ একর জমি স্থায়ীভাবে অধিগ্রহণ করে সংযোগ খাল খনন করা হলেও অধিগ্রহণের প্রায় ৬ বছর পরও জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো পরিশোধ না হওয়া, অস্থায়ী অধিগ্রহণের জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না হওয়া ও সুষ্ঠু বিল ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় টিআরএম প্রকল্প ও কপোতাক্ষ খনন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও এলাকার মানুষের মধ্যে শংকা তৈরী হচ্ছে।