অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে অতিরিক্ত কর্তন: ক্ষুব্ধ পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি


প্রকাশিত : জুলাই ১৩, ২০১৭ ||

নিয়াজ কওছার তুহিন: জুলাই মাসে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যখন বার্ষিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য অতিরিক্ত টাকা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। সারাদেশের প্রায় ২৬ হাজার ১০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার লাখ ৭৭ হাজার ৩২০ শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) পান। তাদের বেতন থেকে নতুন করে প্রতি হাজারে ৪০ টাকা বাড়তি কেটে রাখা হচ্ছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গত কয়েক দিন যাবত দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক-কর্মচারীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।
এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের গত জুন মাসের বেতন স্থগিত রয়েছে। জুলাই মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত জুন মাসের বেতন-ভাতার চেক ছাড় করা হয়নি। বছরের অন্যান্য সময়ে প্রতি মাসের বেতন পরবর্তী মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে পেয়ে থাকেন। কিন্তু কর্তন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বেতন-ভাতার বিল তৈরি করলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে বলে একটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিতে তাদের বেতন থেকে চাঁদা হিসেবে কেটে রাখা টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। গত ১৫ জুন এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। বর্তমানে কল্যাণ ট্রাস্টের চাঁদা বাবদ একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মূল বেতন থেকে ২ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হয়। তা বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে এবং অবসর সুবিধা বাবদ ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ দু’টি খাতে ৬ শতাংশের স্থলে ১০ শতাংশ টাকা কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।
এর ফলে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে শিক্ষক সংগঠনগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠনগুলো বলছে, নতুন গেজেটের কারণে তাদের বেতনের মোট ১০ শতাংশ টাকাই তারা ঘরে তুলতে পারছেন না। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনে নামাবেন বলে হুমকি দিয়েছেন তারা। এরই অংশ হিসেবে ১২ জুলাই বুধবার সারাদেশে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি আইনের আশ্রয় নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনগুলোও ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশের সকল বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা জাতীয়করণের একদফা দাবি নিয়ে মাঠে নামার কথা বলছে। কালিগঞ্জ, আশাশুনি, শ্যামনগর ও দেবহাটাসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষকদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এব্যাপারে ‘বেসরকারি শিক্ষক ফোরাম’ নামক একটি ফেসবুক পেইজে শিক্ষকবৃন্দ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছেন। তাদের মন্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে টাকা কর্তনের সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। অধিকাংশের মতে, তথাকথিত শিক্ষক নেতা ও আমলারা যৌথভাবে বেতন থেকে ১০ শতাংশ টাকা কেটে রাখার অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মাঠ পর্যায়ের একজন শিক্ষকের সঙ্গেও কথা বলা হয়নি। অপরদিকে, শিক্ষকদের ৮ম পে-স্কেলে অন্তর্ভূক্ত করা হলেও বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেয়া হচ্ছে না। দু’টি বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে হয়েছে ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা ছাড়াই। পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতার দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করে শিক্ষকদের ২৫ শতাংশ ও কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। আর নামমাত্র বাড়ি ভাড়া (১০০০ টাকা নির্দিষ্ট) ও মাত্র ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে যা চাহিদার তুলনায় নিত্যান্তই অপ্রতুল। এতকিছু না পাওয়ার যন্ত্রনায় যখন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা কাতর অবস্থায় সরকারের মুখের দিকে চাতক পাখির মতো সুখবরের প্রত্যাশায় দিন কাটাচ্ছেন তার মধ্যে আবার নতুন করে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বাড়তি কর্তনের ঘোষণা এসেছে। তাদের কাছে এটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই মনে হয়েছে। উন্নত জাতি গঠন এবং মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার চিন্তা করতে হলে শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে কখনই তা বাস্তবায়ন হবে না বলে মনে করেন তারা। এজন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষার ন্যায় সকল শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এমপিও ভুক্ত ও একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের যুগান্তকারী উদ্যোগ নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ।