স্ত্রীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে স্বামীরা


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭ ||
মাত্র তিন মাস আগে মিয়ানমারের মো. সেলিমের সঙ্গে বিয়ে হয় ইয়াসমিন আক্তারের (২০)। আরাকান প্রদেশের মংডু জেলার ঝিমখালী গ্রামে একটু একটু করে সুখের সংসার গড়ে তুলছিল ইয়াসমিন। কিন্তু স্বপ্নের সংসার সাজানোর আগেই তা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।  স্ত্রীকে হামলা-গুলি থেকে বাঁচাতে নৌকায় তুলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয় স্বামী সেলিম। আর নিজে অংশ নেয় প্রতিরোধ যুদ্ধে।

এই গৃহবধূ  বলেন, তিনদিন আগে রাত ১২টার দিকে আমার স্বামী ঝিমখালী ঘাট থেকে অন্যান্য নারীদের সঙ্গে আমাকে নৌকায় তুলে দেয়। আমাকে নৌকায় তুলে দিয়ে তিনি চলে গেছেন প্রতিরোধ যুদ্ধে। আগেও তিনি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। মাঝখানে ঝামেলা শুরু হওয়ায় আমাকে বাঁচাতে তিনি নৌকায় তুলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

শুধু ইয়াসমিন আক্তার নয়, একই অবস্থা নুর হাসিনা, সানজিদা খাতুন, মর্তুজা বেগমদেরও।  মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এসব নারীদের ঠাঁই হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী এলাকার পাহাড়ে। তারা সবাই স্বামীকে রেখে এসেছেন মিয়ানমারে। স্বামীরাও স্ত্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ করছেন।

শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) বালুখালী এলাকায় কথা হয় এসব রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে। সহিংসতাপূর্ণ মিয়ানমারে কেন স্বামীদের ফেলে এলেন, জানতে চাইলে চার নারীই জানান, তাদের স্বামীরা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আলেকিন-এ যোগ দিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে তারা অংশ নিচ্ছেন প্রতিরোধ যুদ্ধে।

এদের মধ্যে নুর হাসিনা (২৭) তার তিন ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন।  স্বামী মো. আলী তাদের নৌকায় তুলে দিয়ে চলে গেছেন প্রতিরোধ যুদ্ধে।

নুর হাসিনা বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে আক্রমণ করতে এসেছিল। আমরা গ্রামের নারী-পুরুষরা দা-কিরিচ নিয়ে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। অনেকের কাছে অস্ত্রও ছিল।  সেনাবাহিনী এসে আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়া শুরু করে। আমরাও নারায়ে তাকবির বলে দা-কিরিচ নিয়ে বলে হয়েছিলাম। পাল্টা গুলিও ছুঁড়েছিলাম।  কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছে এতে অস্ত্র-গুলি যে আমরা টিকতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছি। ওইদিন সেনাবাহিনী অনেককে কেটে ফেলেছে, তাদের গুলিতে মারা গেছে অনেকে।’
২৫ বছর বয়সী সানজিদা খাতুন জানান, একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছেন। স্বামী খায়রুল আমিন চলে গেছেন যুদ্ধে।  যাওয়ার আগে স্বামী বলে গেছেন-‘যুদ্ধে যাচ্ছি, বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’

বিয়ের মাত্র একবছর হলো মর্তুজা বেগম (২২) ও মো. রশিদের। অন্যদের মতো মর্তুজার স্বামীও তাকে রেখে চলে গেছেন যুদ্ধে।  মর্তুজা জানান, সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্রসস্ত্র ‍অনেক।  তাই তাদের সাথে আলেকিন টিকতে পারছে না। পাহাড়ে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের।

সেনাবাহিনীর গুলিতে চোখের সামনেই দুজনকে মরতে দেখেছেন বলে জানালেন মংডুর ভুচিদং থেকে আসা আবদুল্লাহ। গুলিতে আহত হয়েছেন তিনি নিজেও। ১৭ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, ‘আমাদের গ্রামে সেনাবাহিনী যখন এসেছিল দা-কিরিচ নিয়ে প্রতিরোধ করেছিলাম। আলেকিনের কোন সদস্য না থাকায় আমাদের কাছে কোন অস্ত্র ছিল না।  সেনাবাহিনী নির্বিচারে আমাদের গুলি করেছে। চোখের সামনে গুলিতে দুজনকে মরতে দেখেছি। আমার বাম হাতেও গুলি লেগেছে।  এ অবস্থায় পালিয়ে এসেছি।’

রাখাইন রাজ্যের তুমব্রুং জেলার ওয়ানচিবন গ্রাম থেকে এসেছেন মো. রশিদ (৪৫)।  তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে ৩০০ পরিবার ছিল। সবকিছু শেষ করে দিয়েছে সেনাবাহিনী। দুই মাস আগে সেনাবাহিনী গ্রামের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে দা-কিরিচ সব নিয়ে গেছে। এক টুকরো লোহাও রাখেনি। কয়েকদিন আগে এসে আবার হামলা চালায়। তারা আমার ফুফুকে ধর্ষণ করেছে।  আমার ফুফাতো ভাই বাধা দিলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমরা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছি। ’

গত মাসে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ক্যাম্পে দুর্বৃত্তদের হামলার পর সেখানে নতুন করে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। হত্যার শিকার ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ায় আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। সহায় সম্বল হারিয়ে তাদের প্রায় সবাই এক কাপড়ে প্রবেশ করেছেন এদেশে।