অবৈধ ভিওআইপি ও ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের মাধ্যেমে শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন কালিগঞ্জের নলতার দুই সহোদর


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭ ||

পত্রদূত ডেস্ক: কালিগঞ্জের নলতা হাসপাতালের বিপরীতে দোতলায় সরদার মার্কেটের সামনে রয়েছে নিউজ ৭১ নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সাইনবোর্ড। আদৌ সেখানে হয়না কোন অনলাইন পত্রিকার কার্যক্রম। অথচ সেখানে রয়েছে অনেক ল্যাপটপ ও কম্পিউটার। সেখানে কর্মরত কর্মচারীরা বলছেন, অনলাইন পত্রিকার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আবেদন করা হয়েছে। এখনও চালু হয়নি এটি। তবে সেখানকার দুটি রুমের সামনে তালা মেরে ভিতরে চলছে দিন-রাত গোপন কার্যক্রম। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে রযেছে তাদের এ রকম অনেক অফিস। এ সমস্ত অফিসের আড়ালে জামসেদ ও জাহাঙ্গির দুই সহোদর অবৈধভাবে ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিং, ভিওআইপি ও হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যেমে তারা শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
জানা গেছে, জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের অজপাড়া গাঁয়ের বাগনলতা গ্রামের নুর ইসলাম গাজীর দুই ছেলে জামশেদ (৩২) ও জাহাঙ্গীর (২৮)। অভাব অনটনে বেড়ে উঠেছে তারা। অভাবের কারণে নুর ইসলাম গাজী তার দুই ছেলেকে বেশীদুর লেখা পড়া শেখাতে না পরলেও তারা নিজেদেরকে অনেক শিক্ষিত বলে দাবি করেন। সংসারের অভাব অনটন মেটাতে ২০০৬ সালে বিদেশে পাড়ি জমায় জামসেদ। সেখানে তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। পরে বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে জামসেদকে ২০১২ সালে সেদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জামসেদকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। দেশে ফিরে জামসেদ তার ছোট ভাই জাহাঙ্গিরের মাধ্যমে পেয়ে যায় আলাউদ্দীনের চেরাগ। জাহাঙ্গীর তার মামা আলতাফ হোসেনের বাড়ি সখিপুর থেকে অবৈধ ভিওআইপি ও হুন্ডি ব্যবসার দক্ষতা অর্জন করে। এক সময় সে তার মামা আলতাফ হোসেনের কয়েক লক্ষ টাকা গায়েব করে দেয়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে হুন্ডিসহ একাউন্ট হ্যাকিং এর ব্যবসা শুরু করে রাতারাতি তারা শত কোটি টাকার মালিক বনে যায়। জামসেদের ভাই শিবির কর্মী জাহাঙ্গীর তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান রাখার কারণে সে অবৈধ ভিওআইপি ও ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিং করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ২০১৩ সালের একাধিক সহিংসতার মামলায় জেলও খেটেছেন এই জামশেদ।
স্থানীয়রা জানান, জামশেদ ও জাহাঙ্গীরের পৈত্রিক বাড়ি নলতার ইন্দ্রনগর গ্রামে। সেখানে তাদের রয়েছে বিলাসবহুল দোতলা ভবন। এরপর ২০১৪ সালে বাগনলতা গ্রামে সদর উদ্দীন কারীগরের ছেলে শরপ উদ্দীনের কাছ থেকে ১৪ শতক জমি কিনে সেখানেই অত্যাধুনিক ৫তলা আলীশান বাড়ি তৈরি করেছেন জামশেদ। এই বাড়িতে রয়েছে ১২টি এসি ও ২৪টি বৈদ্যুতিক মিটার। বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টিত মারবেল পাথরের তৈরি সি, সি ক্যামেরার আওতায় থাকা এই বাড়িটির পাঁচ তলায় কী কার্যক্রম পরিচালিত হয় তা কেউ জানতে পারেন না। সেখানেও একটি বিলাসবহুল অফিস রয়েছে। রয়েছে তার একটি দামী ব্রান্ডের গাড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ি ও অফিস। জামশেদের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম এলাকায় নিজেকে সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিলেও আসলে সে বেশীদুর লেকা পড়া জানে না। সে একজন ধুরন্ধর একাউন্ট হ্যাকার ও ডিজিটাল হুন্ডি ব্যবসায় পারদর্শী আন্তর্জাতিক প্রতারক। এলাকাবাসি এই প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় এনে তাদের যথাযথ বিচারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
জামশেদের এক সময়ের সহকর্মী রাজমিস্ত্রী আশরাফুল ইসলাম জানান, জামশেদ ও জাহাঙ্গির আগে তাদের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতো। এখন তারা হঠাৎ করেই কোটি কোটি টাকার মালিক। কাউকে তারা এখন পরোয়া করেনা। তারা এখন কোটি কোটি টাকার গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
জামশেদ ও জাহাঙ্গিরের অফিসের এক সময়ের কর্মচারী রাকিবুল ইসলাম জানান, আমি দীর্ঘ ৩/৪ বছর যাবত তাদের সাতক্ষীরা, খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের অফিসে কাজ করেছি। তারা অবৈধভাবে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিং, ভিওআইপি ও হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে অবৈধভাবে শতশত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তাদের এ সমস্ত কার্যক্রম আমি জানতে পেরে চাকরি ছেড়ে দেই। এরপর তারা আমাকে নানা ভাবে টাকার জোরে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলও খাটিয়েছে। তিনি আরো জানান, তারা বিভিন্ন মেয়েদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে তাদের সাথে ব্লাকমেইলও করে থাকেন।
জামশেদের চাচা রফিকুল ইসলাম জানান, আমি ১৯৯৫ ও ২০০৭ সালে দুই দফায় মালেশিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে যেয়ে অনেক টাকা পয়সা আমার বড় ভাই নুর ইসলামের কাছে পাঠাই। সে আমার লক্ষ লক্ষ টাকা মেরে দিয়েছে। এমনকি আমাকে ভিটেবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি এখন পথে পথে ঘুরে বেড়াই। তিনি আরো বলেন, তারা অবৈধভাবে ব্যবসা করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
স্থানীয় সাংবাদিক লাভলু আক্তার জানান, আমি জামশেদ ও জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি, ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের নিউজটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় করার পর থেকে তারা আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন। বর্তমানে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এব্যাপারে তিনি থানায় জিডি করেছেন বলে জানিয়েছেন।
সাপ্তাহিক মুক্তস্বাধীন পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম জানান, আমার পত্রিকায় এই নিউজটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। আমি এই এলাকার শতশত মানুষের কাছ থেকে জানতে পেরেছি জামশেদ ও জাহাঙ্গির অবৈধ ভিওআইপি, ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিং ও হুন্ডির ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
নলতা ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান জানান, জামশেদ এক সময় তার বাবার কর্মচারী ছিলেন। হঠাৎ করেই তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তবে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি তারা বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা বণিজ্য করে থাকেন। তাদের আমার ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে একটি বিলাসবহুল বাড়িও রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জামশেদ বলেন, আমি কোন অবৈধ ভি.ও.আই.পি ও ব্যাংক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের সাথে জড়িত নই। আমি মৎস্য ঘেরের ব্যবসা করি। তিনি আরো জানান, আমার বাড়ি নির্মাণ করতে ব্যংক থেকে এক কোটি টাকা লোন নিয়েছি।