বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ¯্রােত, মিয়ানমারের পরিণতি


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭ ||

সুভাষ চৌধুরী
এখনও জ্বলছে রাখাইন। এখনও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ¯্রােত থামছে না কিছুতেই। এখানে বিপন্ন মানবতা, এখানে বিধ্বস্ত বিবেক। ১৯৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনী এমনই নির্যাতন আর গনহত্যা চালিয়েছিল বাঙ্গালীদের ওপর। তারা ৩০ লাখ বাঙ্গালি সন্তানকে হত্যা করেছিল। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে উচ্ছেদ করেছিল চারকোটি মানুষকে। মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করেছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। মিয়ানমার তার থেকে পিছিয়ে নেই। যেনো সমান তালে চলছে তাদের নির্যাতন। বাড়িঘরে জ্বলছে আগুন। প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা নারী শিশুর মৃত্যু হচ্ছে বেঘোরে। বাতাসে ভাসছে তাদের আর্তনাদ। নাফ নদীতে রোহিঙ্গার লাশ। পথেঘাটে তাদের দেহ। আর নারীদের ওপর চলছে সে দেশের সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর পাশবিক নির্যাতন। এখানে বিবেক দংশিত। মানবতা বিপন্ন।
কি কারণ এর পেছনে। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল অস্ত্রের মুখে বাঙ্গালিকে দমন করে তাদের উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু পারেনি। বরং প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল দাউ দাউ করে। বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধরেছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে। ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা, উন্মুক্ত আকাশে উড়েছিল লাল সবুজ পতাকা। মিয়ানমারকে হয়তো সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে। কারণ মিয়ানমার সব সময়ই সামরিক জান্তাদের করায়ত্বে। যেমনটি ছিল পাকিস্তান। ভেঙে টুকরো হয়েছিল। এখনও ভাঙছে পাকিস্তান, সেই পরিণতির দিকেই কি যাচ্ছে মিয়ানমার।
জাতিসংঘের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বলছে। বিশ্বের দেশে দেশে এর প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর স্থল মাইন বসিয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে নিরাপদে দেশত্যাগ করতে না পারে সেই ব্যবস্থাই করেছে তারা।
মিয়ানমার সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না। মিয়ানমারের নেতা অং সান সুচির অনুরোধে এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এই রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ সব অধিকার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। অথচ এখন সব রোহিঙ্গাকে নির্যাতনের মুখে বিতাড়নের পর তাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারের বিষয় বাদ রেখে শুধু রাখাইন রাজ্যের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে চাইছে মিয়ানমার সরকার। প্রকৃতপক্ষে কফি আনান কমিশনের পুরো রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধান হবে না।
দেশ বিদেশের গণমাধ্যম বলছে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা যেসব এলাকায় বাস করেন তার নিচে রয়েছে প্রচুর গ্যাসসহ খনিজ সম্পদ। এই বিপুল গ্যাস ভান্ডারের কথা আগে জানা ছিল না মিয়ানমারের। সম্প্রতি মিয়ানমার তা জানার পর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন শুরু করেছে। তাদের ওপর চলছে নির্মম গনহত্যা। সেই সাথে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ¯্রােত। যতদুর জানা যায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা। আর এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে চীন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের এতো আগ্রহ। ২০০৪ সালে রাখাইনে প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টি উন্মোচিত হয়ে পড়লে এগিয়ে আসে চীন। রাখাইনের অফসোর ফিল্ড থেকে চীনের রাজধানী বেইজিং পর্যন্ত গ্যাসের পাইপ লাইন বসায় চীন। একই সাথে দেশটি তেলের পাইপ লাইনও বসিয়েছে। এতে ধারনা করা হচ্ছে যে যেহেতু চীন সেখানে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে সে কারণেই সেখানে ভাগ বসাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনা নেই, তাদের ভাবনা রোহিঙ্গা বিতাড়িত হলে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদে ভাগ বসানো। কারণ চীন সেখানে আগেভাগে বসে গেছে।
মিয়ানমারে এখন যা ঘটছে তা রুয়ান্ডার গণহত্যার শামিল। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সেদেশে জাতিগত দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে বাঙ্গালি এবং তারা ধর্মগতভাবে মুসলমান। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক জাতিগত বিদ্বেষের সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্ম। তারা মিয়ানমারের বৌদ্ধদের ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে। একটু গভীরে গেলে বুঝা যাবে যে মিয়ানমারে এ ধরণের জাতিগত দাঙ্গা নিয়ে বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশ ছাড়া কেউ কথা বলছে না। এমনকি ভারতও না। মিয়ানমারে এই নির্যাতন এখন হচ্ছে একটি নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকারের মাধ্যমে। সামরিক সরকারের সাথে এক অগনতান্ত্রিক সমঝোতার মাধ্যমে সেদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের সময় ভারত আমাদের প্রতি সব সহায়তাা ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিষ্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে মিয়ানমারে এবারের এই ঘটনার পর ভারত কোনো প্রতিবাদী ভাষা ব্যবহার করছে না।
রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় সংকট। বলা যায় এই সংকট বৈশ্বিক। এই সংকটের জন্য দায়ী যে মিয়ানমার সরকার, তাদেরকেই তার সমাধান করতে হবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ বিষয়টি অভিযোগ আকারে তুলেছে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য আশ্রয় ও চিকিৎসা দিচ্ছে। এমনতিইে বাংলাদেশে আগে থেকে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তার ওপর এই নতুন চাপ বাংলাদেশকে বড় ধরণের সংকটে ফেলে দিয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পাঁচ মাস পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার বৃটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিছুদিন পর আরাকান মুসলমানদের একাংশের নেতা হন কাসেম রাজা। তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী। তিনি তৎকালিন পাকিস্তান সরকারের সহায়তা চেয়ে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। জেনারেল আইয়ুব খানের সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে। ফলে আরাকান মুসলমানরা শক্তিহীন হয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালের ২ মার্চ সামরিক জান্তা জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিদেশি হিসাবে চিহ্ণিত করে রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়ন শুরু করে। দীর্ঘ ৫৪ বছরের সামরিক শাসনের পর ২০১৬ সালের নির্বাচনে অং সান সুচির নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয় মিয়ানমারে। কিন্তু এ সরকারও সামরিক সরকারের নীতি অনুসরন করে রোহিঙ্গাদের বিদেশি আখ্যায়িত করে বিতাড়ন নির্যাতন শুরু করেছে আরও জোরালোভাবে।
আমরা আর নির্যাতন দেখতে চাই না। গনহত্যা ধর্ষন নিপীড়ন বাড়িঘরে আগুন দেখতে চাইনা। জাতিগত দাঙ্গা বাধিয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন দেখতে চাইনা। আশা করি মিয়ানমারের সামরিক বেসামরিক সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সেই সাথে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি হবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে, তাদের নাগরিকত্ব ও অবাধ চলাচলসহ সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। তাদেরকে বাধ্য করতে হবে রোহিঙ্গাদের আবাস নিশ্চিত করতে হবে । তাদের সব অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তা না হলে পরিনতি খারাপ হবে মিয়ানমারের। না হলে মিয়ানমারকে অপেক্ষা করতে হবে নতুন কোনো ভৌগলিক ঐতিহাসিক অনিবার্য পরিণতির। ১৯৭১ এ যে পরিণতি হয়েছে পাকিস্তানের। লেখক: সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি