দেবহাটায় নজরুল হত্যা ঘটনায় ১৪ দিনেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ ||

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: দেবহাটার চাঞ্চল্যকর নজরুল হত্যাকাের ঘটনায় ১৪দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। গত ৩০ আগস্ট নজরুল কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ পরদিন অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। নিহতের পিতা ঘটনার ৪দিন পর দেবহাটা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম খোকনসহ জনকে আসামী করে আদালতে আরো একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, গত ৩০ অগাস্ট রাত ৮টার দিকে পরিবারের সাথে নজরুলের শেষ কথা হয়। কথার ঘন্টা দুয়েক পর সাদা প্রাইভেট কারে করে একটি লাশ লোর্ডশেডিং অবস্থায় অন্ধকারে সখিপুর হাসপাতালের স্ট্রেসারে রেখে পালিয়ে যায় অজ্ঞাত দুস্কৃতিকারিরা। এরপর দেবহাটা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম খোকনসহ স্থানীয়রা এসে একই এলাকার একটি আলোচিত মানুষকে কেউ চিনতে পারেনি। এরই মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের খবর পেয়ে দেবহাটা থানার পুলিশ সেখানে পৌছায়। রাতেই লাশের সুরতহাল সম্পন্ন করে ময়না তদন্তে পাঠায়। নিহতের পরিচয় জানতে ফেইসবুকে কয়েকটি পোস্ট দেন ভাইস চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম খোকন। তিনি ওই পোষ্টে লেখেনএই মৃত্য ব্যাক্তিকে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে তবে তার কোন পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে কোন ব্যক্তি এই মৃত ব্যাক্তিকে চিনতে পারেন তবে তাদের দেবহাটা থানায় ০১৭১৩৩৭৪১৪৬ যোগাযোগ করবেন

পরের পোস্টে লেখা হয়েছেনিজ হাতে ছবি তুললাম অথচ আমি চিনতে পারলাম না। সবাই তাকে চীট বা ইনফর্মা বলে থাকলেও আমি বলতে পারবো না। তবে অনেক নির্যাতন করে মারা হয়েছে। মৃত্যুর অনেক পরে লাশ টি হাসপিতালে আনা হয়েছে। মুখ টা অনেক ফুলে গিয়েছিল, মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল এরপরে আরও অনেকগুলো পোস্ট এসেছে দেবহাটা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের আইডি থেকে।

এরপর নিহতের পরিবারের সাথে মোবাইলে কথা হয় ওই জনপ্রতিনিধির। সেখানে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয় তোমরা থানায় এসো। আমি নিজে বাদী হয়ে ওমুক তমুকের নামে মামলা করে দিচ্ছি। এসব বক্তব্য নিহতের পরিবার রীতিমত রেকর্ড করে রেখেছে বলে জানাগেছে এবং বিভিন্নস্থানে হস্তান্তর করাও হয়েছে। নজরুলের হত্যাকাকে ঘিরে এই একটি পোস্টই ব্যস্ত ছিল ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে। কখন চিনতে পারেনি, কখনও চিনেছে তা চীট নজরুল, আবার কখনও নজরুল ভাই। আবার মোবাইলে ছেলেদের কে বলা হয়েছে তোমরা কি হত্যা করেছ না অন্য কেউ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের আগেই ভীষণ ব্যস্ত ছিল কেন? এসব নিয়েই রয়েছে নানা প্রশ্ন? কারো ঘাড়ে দায় চাপানোর পরিকল্পনা নিয়েই কি এই মিশন না অন্য কিছু। পরের আরও কিছু পোস্টে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে কে কে খুন করতে পারে নজরুলকে। উন্মাদ মাদকাসক্ত আর পাগলের প্রলাপের মত ফেইসবুক পোস্টেই রয়েছে রহস্যের জাল। যা ক্ষতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এদিকে নিহতের পরিচয় জানার পর তার পরিবার লাশটি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই মধ্যে চলতি মাসের তারিখে নিহতের পিতা মোক্তার মোড়ল বাদী হয়ে দেবহাটা আমলী আদালতে ৪জনকে আসামী করে :বিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এমামলায় ১নং আসামী করা হয় সেই ফেইসবুকে পোষ্ট প্রদানকারি জনপ্রতিনিধি দেবহাটা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম খোকন, পারুলিয়া চারাবটতলার আতিয়ার রহমানের ছেলে রবিউল ইসলাম রবি, পারুলিয়ার হাফিজুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম।

মামলা দায়ের করার সাথে সাথে উক্ত জনপ্রতিনিধি তার লোকজন নিয়ে ওইদিন রাতেই কুলিয়ার আশু মার্কেট  থেকে বহু লোকের সামনে নিহতের বড় ছেলে হাবিবুল্যাকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। তাৎক্ষণিক পুলিশের হস্তক্ষেপে তারা সে যাত্রা রেহাই পায়।

এদিকে অপর একাধিক সূত্র জানায়, পারুলিয়া এলাকার জনৈক ঘরজামাই এর ৩দফে ভারতীয় কাপড় থ্রি পিছ সোর্স নজরুলের সহয়তায় আটক করা হয়। চলতি বছরের ১৯ জুন তার আগে পরে প্রায় কোটি টাকার পণ্য আটককে ঘিরে প্রতিহিংসার মুখোমুখি ছিল নজরুল। এহত্যাকাের পেছনে তার হাত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখার দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বর্তমানে পুলিশের অজ্ঞাত হত্যা মামলার পর আদালতে দায়েরকৃত নিহতের পিতার মামলায় যে নাম বেরিয়ে এসেছে তাদেরকে এখনও পর্যন্ত পুলিশ কোন জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। বরং তারা বীরদর্পে এলাকায় থেকে হত্যাকাের মোটিভ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ইতোমধ্যে এই হতাকা পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ায় ফেইজ বুকে আরও একটি পোষ্ট এসেছে নজরুল হত্যাকান্ডের তদন্ত কি সাংবাদিকদের উপর। একজন মানুষ হত্যাকাের শিকার হওয়ার পর আরেক জনের গায়ের ¦ালায় কি প্রমানিত হয় তা পাঠকদের কাছেই প্রশ্ন থাকলো। বর্তমানে প্রভাবশালি কয়েকজন নিহতের পরিবারকে মামলা তুলে নিতে এবং অভিযুক্তদের এফিউডেফিটের মাধ্যমে অব্যাহতি দিতে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রগুলোর দাবি।

এদিকে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা দেবহাটা থানার এসআই ইয়ামিন জানান, এটি নিশ্চিত একটি হত্যাকা-, আমাদের কাছে অনেক তথ্য এসেছে। আমরা সেগুলির সত্য মিথ্যা অতি সংগোপনে ক্ষতিয়ে দেখছি। মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে দাবী করে তিনি বলেন, এটি একটি সেনসেটিভ ব্যাপার, তদন্তের স্বার্থে সবকিছু বলা যাবে না।

তবে অচিরেই বিষয়টি পরিস্কার হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতে একটি নালিশী অভিযোগ হয়েছে। আমরা কপি পেয়েছি। জিআর মামলার বিধান অনুযায়ী আদালতকে এমামলা সম্পর্কে সামগ্রীক বিষয়ে অবহিত করেছি। বিজ্ঞ আদালত এখনও কোন দিক নির্দেশনা আমাদেরকে দেননি। তবে আদালতে দায়েরকৃত নালিশী অভিযোগটি তদন্তে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এসব বিষয়ে কথা হয় দেবহাটা থানার ওসি তদন্ত শরিফুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, নিহতের ব্যক্তিগত সেলফোনের কয়েকটি নাম্বার ইতোমধ্যে সনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলোর কললিস্ট পাওয়ার চেষ্টায় আছি। ধীর গতিতে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তদন্তে অনেকটাই ঘটনার সার্বিক বিষয়ে পরিস্কারও হয়েছে। অতি দ্রুতই দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।