চুকনগরে মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজ বাপ-বেটার অনিয়ম দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি হুমকির মুখে


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ ||

 

গাজী আব্দুল কুদ্দুস চুকনগর শহীদ ফ্লাইট লেঃ মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজে বাপবেটার শাসন চলছে। বাপ কলেজের সভাপতি এবং পুত্র ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ায় তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে ওই কলেজের শিক্ষক,কর্মচারীসহ হাজারও শিক্ষার্থী। তাদের অবৈধ শাসনে শিক্ষক, কর্মচারী, ছাত্রছাত্রী এলাকাবাসি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে এলাকার শতাধিক আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীর স্বাক্ষরিত একাধিক অভিযোগপত্র জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক, এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের একাধিক দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে।  

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ডুমুরিয়া কেশবপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হিজেলডাঙ্গা গ্রামে শহীদ ফ্লাইট লেঃ মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই কলেজটিকে ঘিরে নানা ঘটনার জন্ম হয়েছে। দূনীতি, অর্থ আতœসাৎ, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারীতা শিক্ষক কর্মচারী লাঞ্চনার এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন শহীদ বীর সেনানীর নামে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কলেজটি তার অতীত গৌরব ফিরে পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের পর আবার মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজকে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারী একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রে যুক্ত হয় গনিত বিভাগের প্রভাষক মোঃ ওবায়দুর রহমান, ব্যবস্থাপনা বিভাগের কামরুজ্জামান জীব বিজ্ঞান বিভাগের দীনেশ দেবনাথ। এই চক্রটি কেশবপুরের বর্তমান সংসদ সদস্যের কাছে বিভিন্ন তথ্য গোপন করে ২০১৪ সালে যুদ্ধাপরাধী মামলার মূত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী মাওঃ সাখাওয়াত হোসেনের আপন খালাত ভাই বিএনপির নেতা মোঃ সামছুর রহমানকে মাসুদ মেমোরিয়াল কজেলের সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। সময় সভাপতি সামছুর রহমান তার পুত্র গনিত বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুর রহমানকে কলেজের হিসাব কমিটির প্রধান, ভাইপো কামরুজ্জামানকে বিএম শাখার ইনচার্জ এবং তাদের আজ্ঞাবহ দীনেশ দেবনাথকে কৃষি ডিপে¬¬¬ামা শাখার ইনচার্জ হিসাবে মনোনীত করেন। এছাড়াও সামছুর রহমান সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর কলেজটির নিয়ন্ত্রণ আবারও কার্যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপস্থীদের হাতে চলে যায়।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ পরাজিত হলে এই কামরুজ্জামান, তার চাচাদের নেতৃত্বে মঙ্গলকোট বাজারে আওয়ামীলীগ নেতা বর্তমান গর্ভনিং বডির সদস্য বাবু আশুতোষ হালদারের দোকানে অগ্নিসংযোগ করে বিপুল পরিমান অর্থ সম্পদ লুটপাটসহ সংখ্যালঘুদের বাড়ি ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। কামরুজ্জামান এম পাশ না করেই চাকুরিতে যোগদান করেন যা সম্পূর্ণ অবৈধ। সামছুর রহমানের প্রথম মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন কেশবপুরের জামাতের রোকন ভূগোল বিভাগের শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলামকে। কিন্তু ক্ষমতার অদৃশ্য সুতার টান দিতে থাকেন সভাপতি তার পুত্র ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওবাইদুর রহমান ভাইপো কামরুজ্জামানকে দিয়ে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আনোয়ারুল ইসলামকে পুতুল অধ্যক্ষ বানিয়ে ওবাইদুরকামরুজ্জাম্নাদিনেশ চক্র কলেজের লাখ লাখ টাকা লোপট করেছে বলে অভিযোগে উলে¬ করা হয়েছে। এই চক্রটি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ভুল বুঝিয়ে বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়ে সামছুর রহমানকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনরায় সভাপতি মনোনীত করেন। সভাপতি হয়েই সামছুর রহমান কোন প্রকার বিলম্ব না করেই তার নিজের প্রস্তাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলামকে হটিয়ে জ্যৈষ্ঠতার শর্ত পূরণ করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তার ছেলে গনিত বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ দেন। নিয়োগ দিয়েই বাপবেটা মিলে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন।

এলাকার প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে এএসএইচকে সাদেক আওয়ামীলীগের প্রার্থী হলে কলেজের সভাপতি সামছুর রহমান আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক বাউশলা ঋষিপাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করে ভোটারদের তার খালাত ভাই মাওঃ সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করান। এরপর ২০১৪ সালের জানুয়ারীর নির্বাচনে প্রয়াত শিক্ষামন্ত্রীর আসনে তার স্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক এমপি আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হলে সামছুর রহমানগং প্রকাশ্যে তার বিরোধীতা করেন। এছাড়া তিনি উপজেলা নির্বাচনে জামাতের প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে গণসংযোগ করেন। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তি কিভাবে দক্ষিণ বঙ্গের বিশাল প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হলেন এবং কিভাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর আস্থাভাজন হলেন সেটাই দলের তৃণমূল নেতা কর্মীদের জিজ্ঞাসা। 

অভিযোগে রয়েছে, বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এন,টি,আর,সিএর বিধান উপেক্ষা করে মার্কেটিং, পরিসংখ্যান গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ে ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর ২৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সভাপতি তার ছেলে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া সদ্য নিয়োগ পাওয়া ডিগ্রি শাখার শিক্ষকদের অভিযোগ, সভাপতি তার পুত্র ডিগ্রী শাখার নিয়োগকৃত শিক্ষকদের কাছে তাদের খরচ এমপিও বাবদ শিক্ষক প্রতি পাঁচ লক্ষ টাকা করে দাবি করেছেন। তবে সভাপতি শিক্ষক নিয়োগে অর্থ বাণিজ্যের ঘটনাটি অস্বীকার করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের শিক্ষকদের অভিযোগ, দুর্নীতির কারণে ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ হারানোর পর ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতি বাবার জোরে ওবাইদুর রহমান পুনরায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিযুক্ত হওয়ার পর কলেজে হাজির হয়েছেন মাত্র ১০ দিন। নিজে গনিতের শিক্ষক হয়েও শ্রেণী কক্ষে যান না বললেই চলে। সেই সাথে সভাপতির ভাইপোও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক কামরুজ্জামানও তার পুত্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। সভাপতি তার ছেলেকে কলেজের দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করতে গত ১৪ জানুয়ারী রাতে কলেজে রহস্যজনক চুরির নাটক সাজিয়েছেন বলে অভিযোগ। থানায় অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী অজ্ঞাত চোররা কলেজের হিসাব সংক্রান্ত সকল হিসাব পত্র ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। বর্তমান মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজ এলাকার নেশাখোর মাস্তানদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতি সভাপতি তার পুত্র যোগসাজসে কলেজ কাম্পাসের সবুজ বেষ্টনি ধ্বংস করে প্রায় ত্রিশটি ছোট বড় শিশুসহ ভিন্ন গাছ কেটে নিয়েছেন। গাছ বিক্রির অর্থ দিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে বালি ভরাট শহীদ মিনার নির্মাণের নাম করে সভাপতি তার পুত্র ব্যাপক আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান বলেন,এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আপনারা সরেজমিনে আসেন। তাহলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন।