শীতের শুটকি মৌসুমে মাছ ধরতে সুন্দরবনের দুবলার চরে যেতে পাইকগাছার জেলে পল্লীতে ব্যাপক প্রস্তুতি


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা: শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য পাইকগাছার জেলে পল্লী গুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। নতুন নৌকা ও ট্রলার তৈরি এবং পুরাতন নৌকা মেরামত, জাল বুনা ও জাল শুকানোর ধুম পড়েছে। জেলে পল্লীর নারী-পুরুষরা সুন্দরবনের দুবলার চরে যাওয়ার জন্য কর্মব্যস্ত দিন কাঁটাচ্ছে। সুন্দরবন ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্য বিরাজ করছে সারা বছরের জীবিকা অর্জনের খুঁশির আমেজ।
পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া, হিতামপুর, মাহমুদকাটী, নোয়াকাটি, কপিলমুনি, কাটিপাড়া, রাড়–লী, শাহাপাড়া, বাঁকা সহ বিভিন্ন গ্রামের জেলে পল্লীর প্রায় ২৫০ শত নৌকা বা ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। নতুন নৌকা বা ট্রালার তৈরি, পুরাতন ট্রলারগুলো সংস্কার, জালবুনা, নৌকায় রং করা, জালে গাবকুটে তার রস লাগানো সহ সমুদ্রে যাওয়ার বিভিন্ন কাজ কর্ম নিয়ে জেলে পল্লীর নারী-পুরুষরা ব্যস্ত দিন কাঁটাচ্ছে। উপজেলার বোয়ালিয়া মালো পাড়ার সুকুমার বিশ্বাস, সিতেরাম, তাপস বিশ্বাস, কেনা বিশ্বাস, জয়দেব, সুজন, বাঁকা দয়াল মন্ডল, প্রদীপ বিশ্বাসের নতুন নৌকা তৈরি ও পুরাতন নৌকা মেরামত চলছে কপোতাক্ষ নদের বোয়ালিয়া খেয়াঘাটের পাশে। বোয়ালিয়া মালোপাড়ার সুকুমার বিশ্বাস ও তাপস বিশ্বাস জানায়, নতুন নৌকা তৈরি করতে খরচ পড়ছে প্রায় ১ লাখ টাকা। ৫৬ ফুট লম্বা ৯ ফুট চওড়া একটি নৌকা তৈরি করতে ২৫০ সেফটি লাগে। সব কাট দিয়ে নৌকা তৈরি হয় না। এলাকায় পাওয়া যায় এমন চম্বল, বাবলা খৈই কাঠ দিয়ে তারা নৌকা তৈরি করছে। প্রতি সেফটি খৈ, বাবলা ও চম্বল কাঠ ৩ শত টাকা থেকে ৫ শত টাকা দরে ক্রয় করেছে। নৌকা বা ট্রালার তৈরি করতে বিভিন্নস্থান থেকে মিস্ত্রী আনতে হয়। সাতক্ষীরা জেলার, দওগাহপুর গ্রামে নৌকার মিস্ত্রী শাহ আলম, রবিউল সহ এলাকার মিস্ত্রী দিয়ে পুরাতন ট্রলার মেরামত করা হচ্ছে। নৌকা তৈরীতে মিস্ত্রীদের থাকা খাওয়া বাদে প্রতিটি নতুন নৌকা তৈরী বাবদ মুজরি ৩০হাজার টাকা। নৌকা বা ট্রালার তৈরির পর তাতে রং করতে প্রায় ১২টিন আলকাতরা লাগে। পুরাতন নৌকা মেরামত করতে ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। নৌকা বা ট্রালার তৈরি পর ইঞ্জিন বসাতে ৬০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিটি মাছ ধরার জাল তৈরি করতে তাদের খরচ হচ্ছে ১লাখ টাকা। সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য প্রতি নৌকায় ২টি জাল লাগে। প্রতি নৌকায় জাল ধরার জন্য ৪/৬ জন কর্মচারীর প্রয়োজন হয়। তাদের থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে ৭/৮ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য নৌকা প্রতি ৫/৬ মাসে সব কিছু মিলে খরচ পড়ে প্রায় ৪/৫ লাখ টাকা। তারা আরো জানায়, এলাকার বিভিন্ন মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ১ লাখ টাকায় মহাজনদের ৬ মাসে ২০ হাজার টাকা সুদ দিতে হবে। জেলেরা বিভিন্ন মহাজনের অধীনে থেকে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। মহাজনরা জেলেদের পাসপার্মিট করে রাখে। দুবলার চরে রওনা দেওয়ার আগে মংলা থেকে পাসপার্মিট নিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। এ বছর মংলা হয়ে বলেশ্বর নদী দিয়ে দুবলার চরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে করে পাইকগাছার জেলেদের প্রায় ৩ দিন বাড়তি সময় লাগবে এবং খরচ বেড়ে যাবে দ্বিগুন। সমুদ্রে যাওয়া জন্য বন বিভাগ থেকে পাশ পারিমিট নেয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সব কিছু ঠিক থাকলে পূজা শেষে জেলেরা মাছ ধরার জন্য সুন্দরবনের দুবলার চরের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। তবে সূত্রে জানাগেছে, বন সু-রক্ষার জন্য বনের ১৩টি চর নিয়ে জেলেরা যে মৎস্য পল্লী তৈরি করে তা এ বছর সীমিত করা হতে পারে বলে জানা গেছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও মো. সাঈদ আলী জানান, বঙ্গোপসাগর উপকূলে মাছ ধরার মৌসুম শুর হতে যাচ্ছে। উর্দ্ধতন কতৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে আমরা সে মত সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বোয়ালিয়া জেলে পল্লীর অশোক বিশ্বাস ও বিশ্বজিৎ জানায়, এবার দুর্গাপূজার পর উপজেলার সকল নৌকা মাছ ধরার জন্য রওনা দিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে বাসা বেঁধে অবস্থান নিবে। জীবিকার জন্য প্রতি বছর বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বনদস্যু ও জলদস্যুদের সাথে জেলেদের জীবন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। মাছ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে ভয়ংকর, বিক্ষুদ্ধ উত্তাল ঢেউয়ের সংগে যুদ্ধ করে জেলেদের জাল ফেলে মাছ ধরতে হয়। জেলেপল্লী মানুষের আয়ের উৎস্য সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের নেশা ও পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতো বিপদের সংগে লড়াই করে জীবিকা অর্জনের জন্য জেলে পল্লীর নারী-পুরুষ সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নিয়ে জেলে পল্লীগুলোতে চলছে প্রস্তুতির মহাকর্মযজ্ঞ।