শেষ হলো জাতিসংঘ বিতর্ক, আলোচনায় যুদ্ধ-গণহত্যা-জলবায়ুর প্রাধান্য


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ||

 

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা, কোরীয় উপদ্বীপে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগকে প্রাধান্য দিয়ে সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) শেষ হলো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২ তম অধিবেশনের বিতর্ক পর্ব। গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের আলোচনা শুরু হয়।

সাধারণ পরিষদের বিতর্ক পর্ব

চীনা বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১১ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র এবং তিন পর্যবেক্ষক-ফিলিস্তিন, হোলি সি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সবাই সাধারণ অধিবেশনের বিতর্ক পর্বে কথা বলেছেন। বক্তাদের বেশিরভাগই অভিবাসন, সাম্প্রদায়িকতা, জেনোফোবিয়া (ভিনদেশীদের নিয়ে আতঙ্ক), অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বেকারত্ব, লৈঙ্গিক সমতা, সাইবার সিকিউরিটি, অবৈধ মাদক ও মানব পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ সংঘটন, আফ্রিকা, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মধ্যপ্রাচ্যের হটস্পট এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সপ্তাহব্যাপী ওই বিতর্কে প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলো। প্রায় প্রত্যেক বক্তাই মেক্সিকোর ভূমিকম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, টেক্সাস ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সমবেদনা জানিয়ে তাদের বক্তব্য শুরু করেন।

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে উত্তেজনা

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা শুরু হয়। দুই দেশ একে অপরকে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে কিমকে ‘শেষ হুঁশিয়ারি’ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়াকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভাষণে ট্রাম্প উত্তর কোরীয় নেতাকে ‘আত্মঘাতী অভিযানে’ থাকা ‘রকেট ম্যান’ হিসেবেও ব্যঙ্গ করেন তিনি। এর প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে কিম বলেন, ‘ট্রাম্পের মন্তব্য আমাকে ভীত বা থামানোর পরিবর্তে অনুধাবন করিয়েছে, যে পথ আমি নিয়েছি তা সঠিক এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে এই পথই অনুসরণ করতে হবে।’ ট্রাম্পকে মানসিকভাবে বিকৃত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সাধারণ অধিবেশনের বিতর্ক পর্বে এ ধরনেসর হুমকি-ধামকি নিয়ে উদ্বেগ জানান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।

শনিবার আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিমন কোভেনি বলেন ‘উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘আজ আমার পর এখানে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি বক্তব্য রাখবেন। আমি তাকে চলতি সপ্তাহের উসকানিমূলক ভাষা ও উত্তেজনার তীব্রতা কমানোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এ সংঘাত বিশ্বের জন্য প্রয়োজনীয় নয় এবং আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

তার এ বক্তব্যকে উপস্থিতদের অনেকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান। তবে বক্তব্য দিতে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো সবাইকে সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের হুমকি ‘জাতিসংঘের বিশুদ্ধতাকে কলুষিত করবে’।

ট্রাম্পকে মানসিকভাবে বিকৃত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কেবল উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গেই নয় সাধারণ অধিবেশনের প্রথম ভাষণে ইরানের সঙ্গে ছয় শক্তিধর দেশের পারমাণবিক চুক্তিরও বিরোধিতা করেছেন ট্রাম্প। এ চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত থাকাকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বাজে সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘খোলাখুলিভাবে বলতে গেলে এ চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লজ্জার এবং আমি মনে করি না আপনারা এর শেষ দেখতে পাবেন।’

জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গ

‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের একেবারে সন্মুখযুদ্ধ থেকে আমি সোজাসুজি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।’ সাধারণ অধিবেশনের বিতর্কপর্বে এভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের দিকে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন ডমিনিকার প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিট।

সাধারণ অধিবেশন থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল কেউ যেন একক আবহাওয়া পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত না করে। তবে সে পরামর্শে এড়িয়ে গিয়ে রুজভেল্ট বলেন, ‘আমি আমার রক্তাক্ত জাতিকে রেখে আপনাদের সঙ্গে যোগ দিতে এসেছি….কারণ এগুলো সেই মুহূর্ত যার জন্য জাতিসংঘের অস্তিত্ব আছে!’

বিশ্ব যখন ডুবছে তখন জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার মানে হলো এ নিয়ে গড়িমসি করা; যে সত্যকে আমরা মাত্র পার করেছি তা অস্বীকার করা! এটা আমার দেশের মানুষের সঙ্গে উপহাস করার শামিল যারা কিনা আকস্মিক ভূমিধস ও আসন্ন হারিকেনের ভয়ে খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। আমরা,একটি দেশ হিসেবে এবং একটি অঞ্চল হিসেবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করিনি! আমরা এটাকে উসকে দিইনি! যুদ্ধ আমাদের কাছে এসেছে!”

মিয়ানমার প্রসঙ্গ

সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাক্রিশনান শনিবার সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়া নেশনস (আসিয়ান) এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ সংকটকে ‘একটি জটিল আন্তঃসাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসেবে দেখছে যার গভীর ঐতিহাসিক উৎসমূল রয়েছে। স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপনের অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে আসিয়ান। ক্ষতিগ্রস্ত সকল সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে সিঙ্গাপুর আসিয়ানের সঙ্গে কাজ করবে।”

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। তাদের দাবি, বিশ্বের মনযোগ আকর্ষণের জন্য রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুদেরকে আতঙ্কিত করে তাদেরকে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।

সোমবার সাধারণ পরিষদের বিতর্ক পর্বের শেষ দিনে মিয়ানমারে নিয়োজিত জাতিসংঘের দূত হাউ দো সুয়ান এমন দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ওখানে কোনও জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে না; গণহত্যা হচ্ছে না।’

সুয়ানের দাবি, তার দেশের ব্যাপারে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের প্রধান মুখপাত্র স্টিফ্যান ডুজারিক সোমবার সকালে জানান, গত এক মাসে ৪ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়েছে।