বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পুশ-ব্যাক করছে ভারত!


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৩, ২০১৭ ||

আসাদুজ্জামান সরদার: ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে সেখানে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের। গত কয়েকদিনে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৩৯ জন রোহিঙ্গাকে পাঠানো হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি ও পুলিশের কাছে আটক হওয়া ৩৯ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১২ নারী, ১০ পুরুষ ও ১৭ শিশু রয়েছেন। বুধবার (১১ অক্টোবর) সকালে সাতক্ষীরা সীমান্তের পদ্মশাখরা এলাকায় ভারত থেকে আসা ১৯ রোহিঙ্গা সদস্যকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি সদস্যরা। তাদের মধ্যে ১০টি শিশু, ছয় নারী ও তিন পুরুষ রয়েছেন।
আটককৃতরা হলেন, মরিয়ম বেগম, আসমা খাতুন, রাশিদা খাতুন, সুমাইয়া বেগম, গুলশান আরা খাতুন, জাইনুল বেগম, মো. আলাউদ্দিন, আব্দুর রহিম ও এনায়েত আলি। অবশিষ্ট ১০ জন শিশু তাদের বয়স সর্বোচ্চ ছয় বছর।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত পেরিয়ে যাতে কোন রোহিঙ্গা ভারতে অনুপ্রবেশ না করতে পারে সেজন্য সতর্ক অবস্থানে আছে সেদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। অপরদিকে ভারতে থাকা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে এ পাশে পাঠিয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভারত থেকে পুশ ব্যাকে বাংলাদেশে আসা মায়ানমারের রাখাঈন রাজ্যের মন্ডুপ জেলার হারিদং এলাকার রোহিঙ্গা আব্দুর রহিম জানান, ২০১৪ সালে মায়ানমারে সহিংসতা হলে আমরা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে ভারতে চলে যাই। সম্প্রতি নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার খবর শুনে ভারতের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী আমাদের বলেছে তোমরা এ দেশী না, তোমরা পরদেশী। তোমাদেরকে এদেশে ঠাঁই হবে না। তোমরা বাংলাদেশে চলে যাও।
তিনি আরও বলেন, আমি আমার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে ওখানে তিন বছর অবস্থান করেছি। সেখানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতাম। শুনেছি আমার বাবা মা বর্তমানে বাংলাদেশে চলে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ১০ অক্টোবর গভীর রাতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএস আমাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। এপাশে আসলে বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের আটক করে। আব্দুর রহিমের মত কথা অন্যরাও।
সাতক্ষীরা ৩৮ বিজিবি’র পদ্মশাখরা বিওপি কমান্ডার সুবেদার মোশাররফ হোসেন রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে জানান, তারা সবাই ভারত থেকে বিএসএফএর সহায়তায় বাংলাদেশে এসেছেন। এরআগে ২০১২ ও ২০১৪ সালে দুই দফায় তারা মিয়ানমার থেকে ভারতের দিল্লীতে যান। সেখানে তারা বসবাস করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং খাদ্য বস্ত্র ও চিকিৎসা দিচ্ছে এই খবর পেয়ে তারা দিল্লী থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছেন বলে জানিয়েছেন। তাদেরকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পরে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এরআগে গত ২২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৩ জন এবং ৩ অক্টোবর কলারোয়ার হিজলদি সীমান্ত থেকে আরও ৭ রোহিঙ্গা সদস্যকে আটক করে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।
সাতক্ষীরা কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু বলেন, গত কয়েকদিনে কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত থেকে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। শুনেছি এসব রোহিঙ্গাদের ভারত থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
সাতক্ষীরার ৩৮ বিজিবি’র হিজলদি বিওপির সুবেদার ওমর ফারুক সন্ধ্যায় জানান, গত সপ্তাহে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুই শিশুসহ সাত নারী-পুরুষ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছিল। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তারা মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে এ সেছিল। কাজের সন্ধানে তারা ভারতে যাওয়ার জন্য কলারোয়ায় আসে আমাদের হাতে আটক হয়। পরে তাদের কক্সবাজারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ভারত থেকে এদেশে রোহিঙ্গাদের পুশ করার বিষয়টি জেনেছি। এ বিষয়ে উপর থেকে আমাদের নির্দেশ এসেছে। সীমান্তে আমার কঠোর নজরদারি করছি। এখন আমি ডিউটিতে রয়েছি।
সাতক্ষীরা ৩৮ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরমান হোসেন আটক রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে জানান, তারা ২০১২ ও ২০১৪ সালে মায়ানমার ছেড়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের আশ্রয় গ্রহণ করে। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে নির্যাতীত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে এমন খবরে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এব্যাপারে সীমান্তে কঠোর নজরদাড়ি বাড়িয়েছে বিজিবি।
প্রসঙ্গত, গত (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে কলারোয়া ১৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে কলারোয়া থানা পুলিশ। এদের মধ্যে নারী ৪, পুরুষ ৪ ও শিশু ৫ জন। আটককৃত এই রোহিঙ্গারা মায়ানমারের রাখাঈন রাজ্যের মন্ডুপ জেলার নেমেরেনেই থানার শিকদাপাড়া গ্রামের অধিবাসী। ১৩ রোহিঙ্গা মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশু হলো: দিলদার বেগম(২১), নবী হোসেন (২৭), আব্দুল করিম (২৫), আমেনা বেগম (২০), শহিদুল ইসলাম (২৪), জিনু আক্তার (২০), সালমা খাতুন(২১), জমির হোসেন (১৮), শিশু আব্দুর রহমান (১১ মাস), মোহাম্মদ নূর(২), ছাবেকুন্নাহার (৩), নূর হাবিব (১৪ মাস), নূর হায়াত (৩)।
এদিকে ৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের হাতে আটক হওয়া সাত রোহিঙ্গারা হলেন, মিয়ানমারের মংন্ডুর শিকদার পাড়ার আব্দুর রশিদের ছেলে পারভেজ (২০), কাদের হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৭), তার স্ত্রী শুকতারা (১৯), সৈয়দ আহাদের ছেলে সেলিম আহমেদ (২৮), তার স্ত্রী আসমা খাতুম (২৩), ছেলে জাকির হোসেন (২) ও মেয়ে মরিয়ম (৮ মাস)।