অবহেলিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আফসার আলীর করুণ মৃত্যু ও কিছু স্মৃতিকথা


প্রকাশিত : অক্টোবর ১৩, ২০১৭ ||

সরদার কাজেম আলী
আমার বেশ কাছের বন্ধু ছিল আফসার আলী। বয়সে আমার একটু বড় ছিল। ওর পিতা করিম বকশ (পন্ডিত) প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আফসার ছিল ওনার হাটানো ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ম্যাট্রিক পাশ করেছিল। খুব কম কথা বলত। প্রয়োজন ছাড়া তো বলতোই না এবং কোন রাজনীতি করতো না। আমি স্কুল জীবন থেকে রাজনীতি করি। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি আমার স্কুলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আফসার কখন যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে তা আমি জানতেও পরিনি। আমি মে মাসের শেষে অথবা জুনের প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। ভাদিয়ালি হাকিমপুর মুক্তিফৌজ ওপারেশন ক্যাম্পে (ভারত) ভর্তি হওয়ার পর আমাকে যে ক্যাম্পে থাকতে দেওয়া হয় সেই ক্যাম্পেই আমার পাশের বিছানায় আফসার আগেই ছিল। ও রাতে ডিউটি করে ক্যাম্পে ফিরলেই আমার সাথে দেখা হয়। দুজন একসাথে থাকতে পারায় আমার খুবই ভালো লাগল এবং শক্তিবোধ করতে থাকি। যুদ্ধের বাকি পুরো সময়টা একসাথেই ছিলাম। ও আমার ১০-১৫ দিন আগে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। ও লেখাপড়া জানা ও স্মার্ট হওয়ার কারনে গ্রুপ কমান্ডারের দায়িত্ব পায়। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শফিকউল্লাহ স্যার ও ক্যাপ্টেন মাহবুব স্যার ওকে খুব ভালোবাসত। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গরিব আফসার জন মুজুরী খেটে দিনাতিপাত করতো। অনেককেই অস্ত্রের অসৎ ব্যবহার করতে দেখা যায় কিন্তু ও ছিল ব্যতিক্রম এবং খুব সৎ মানুষ ছিল। ১৯৭১-১৯৯০ সাল পর্যন্ত আমাদের ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম ১৪ জন আফসারসহ। আমি যখন জেলা সাংগঠনিক কমান্ডার ছিলাম (মুক্তিযোদ্ধা সংসদ) তখন আমরা ১৪ জন ভোটার ছিলাম। এখন ২৫ জন পার হয়ে গেছে। ১ জন ভারতে থাকে, ৫ জন মারা গেছে আর বাকি থাকলো ৮ জন। কিন্তু এখন বোধ হয় সরকারি তালিকায় আছে ২৫ জন। অথচ আগের ১৪ জনের মধ্যে ৪ জনের এখনো তালিকা হয়নি। আফসার তালিকায় নাম তোলার জন্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নিত। ও সর্বশেষ তালা উপজেলায় যাচাই বাছাই এ কাগজপত্র সহ অংশগ্রহণ করেছিল। তাছাড়া কতিপয় দালালকে নাকি বেশ কিছু টাকা পয়সাও দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও তালিকা হয়নি। ও খুবই বিষন্ন মনে থাকতো। ও সাতক্ষীরা ঋ-শিল্পী (বিদেশি সংস্থা)-তে নাইট গার্ডের চাকরি করতো। ওর এক ছেলে নানার বাড়ী থেকে মাদ্রসায় লেখাপড়া করতো। গত জামাত-বিএনপি’র ধ্বংসাত্মক তান্ডবের সময় ওই ছেলেকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং সাতক্ষীরা কারাগারে বন্ধী করলে আমি একদিন বললাম, আফসার তোর ছেলে তো জেলে, তুই কাছাকাছি ঋÑশিল্পী-তে থাকিস। আমি জেলার সাহেবকে বলে দিলে তোর খরচ হবে না। তুই ছেলের সাথে দেখা করতে পারবি, এই কথা শোনার সাথে সাথে ও ভীষণ রেগে গিয়ে আমাকে বললো, তুই কী ভেবেছিস? আমি ওই রাজাকার ছেলের সাথে দেখা করব? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এটা তুই ভুলে গেলি? আমি রসিকতা করে বললাম, তুই আমি তো ভূয়া। সরকারি তালিকায় নাম নেই। কীসের মুক্তিযোদ্ধা? ও তার জবাবে বলে, তুই-আমি সরকারের কাছে ভূয়া কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষ তো জানে আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আফসার যে যন্ত্রণা ও দু:খ নিয়ে অবহেলায় মারা গেল তার দায়ভার কে বহন করবে?
লেখক : সরদার কাজেম আলী, (৮৮৪ ভারতীয় তালিকা)