তিন কারণে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম


প্রকাশিত : October 30, 2017 ||

আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করলেও দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে ৫৫ টাকা কেজি দরের দেশি পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। অথচ দু’দিন আগেও বাজারে পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতিকেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। অবশ্য কোরবানির ঈদের আগে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হতো ৩২ থেকে ৩৫ টাকায়। হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বাজার বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষক ও ব্যবসায়ীরা।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমত পেঁয়াজের ভরা সিজন শেষ। এ সময়ে এসে ব্যবসায়ী ও গৃহস্থ উভয়পক্ষেরই পেঁয়াজের মজুদ প্রায় শেষের পথে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এই সময়ে জমিতে নতুন রোপন করা পেঁয়াজ সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে জমিতেই পচে গেছে। আবার রোপনের জন্য নতুন করে বীজ তৈরি করতে হয়েছে। এতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। মজুদ কমেছে। তৃতীয় কারণ হচ্ছে, বন্যায় পচে যাওয়া পেঁয়াজের ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা পেঁয়াজ এখনও বাজারে আসেনি। এ কারণে সৃষ্ট সংকট এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন নিম্নমুখী। ভারতভিত্তিক পণ্যের দাম মনিটরিং ওয়েবসাইট ‘এজিমার্কনেট’-এর তথ্যমতে, চলতি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩২ টাকা। আর চলতি অক্টোবর মাসে এর দাম হয়েছে ৩০ টাকা। গত আগস্টে এই পেঁয়াজের দাম ছিল ২৮ টাকা। এ ছাড়া চীন ও তুরস্কেও পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী বলে জানা গেছে।

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিকেজি দেশি পেয়াজ ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি বন্যায় পচে যাওয়াসহ আমদানি-পরবর্তী বাজারজাত সমস্যার কারণে পেঁয়াজের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট কাটাতে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে বাজারে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ভারত থেকে সড়কপথে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারজাত করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন। তাই বর্তমান বাজারে যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে, তা মূলত ১৫/২০ দিন আগে আনা। সে অনুযায়ী তখন ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ছিল মাত্র ২৬ টাকা।

এসব কারণের পরে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে কাজ করেছে এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেটের অতি-মুনাফার লোভ। দেশে উৎপাদনের কমতি দেখে অনেক আমদানিকারক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও প্রধান রফতানিকারক দেশ ভারত বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি করছে প্রতিকেজি ৩০ থেকে ৩১ টাকায়। সেই পেঁয়াজ দেশে বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিনগুণ দামে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ থেকে ২৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ১৯ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন হয়। চাহিদার বাকি চার থেকে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করা হয়। মূলত এ আমদানিকৃত ৪/৫ লাখ টন পেঁয়াজই বাজারের ওপর প্রভাব ফেলে।

দেশে বর্তমানে তাহেরপুরি, বারি পেঁয়াজ-১ (তাহেরপুরি), বারি পেঁয়াজ-২ (রবি মৌসুম), বারি পেঁয়াজ-৩ (খরিপ মৌসুম), স্থানীয় জাত ও ফরিদপুরি জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। ফলে বছরজুড়েই কোনও না কোনও জাতের পেঁয়াজের উৎপাদন হয়। এ কারণে নির্দিষ্ট কোনও মৌসুমে এসে পেঁয়াজের সরবরাহ কমার সম্ভাবনা কম।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুন্সী শফিউল হক জানিয়েছেন, ‘বৃষ্টিতে দেশের ভেতরে অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে নতুন পেঁয়াজ ওঠার সময় হয়ে গেছে। নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলেই দাম কমে যাবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই।’

রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আরিফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। দেশে বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। চাহিদা তো আর কমেনি। চাহিদা মতো পেঁয়াজের সরবরাহ নেই। তাই দাম বেড়েছে। এটা তো স্বাভাবিক নিয়ম বলে জানান আরিফুল হক।’

পেঁয়াজ আমদানিকারক মোস্তফা খালেক জানান, ‘সরকারের বাজার পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও বাজার মনিটরিংয়ের গাফিলতি এই সময়ে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ। সরকারের লোকজন ঠিকমতো বাজার, আবহাওয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতি মনিটরিং করলে এ সমস্যার সৃষ্টিই হতো না। এ সময়ে পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়ে ঠিক, কিন্তু তা এতটা নয়।’