‘৭ মার্চের ভাষণ ছিল অলিখিত, ভিত্তি ছিল বিশ্বাস’


প্রকাশিত : October 31, 2017 ||

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ অলিখিত ছিল বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ একটি নিরস্ত্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮ মিনিটের ওই ভাষণ ছিল অলিখিত। তিনি সারাজীবন যা বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই ওই ভাষণ দিয়েছিলেন।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’র স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান তো দূরের কথা, ১৯৬৯ সালে জিয়াউর রহমান নামে যে কোনও ব্যক্তি আছে, তা আমি তোফায়েল আহমেদও জানতাম না। একদিনের ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি। তিল তিল করে বঙ্গবন্ধু তার সারাটা জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। আজ যারা বলছেন জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় দেশ স্বাধীন হয়েছে, তারা অজ্ঞ। বিশ্বাসের সঙ্গে তারা প্রতারণা করেন। পাকিস্তান আজ একটি অকার্যকর দেশ।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তার সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নেননি। তার এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াইয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও শেখ মুজিবকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলো, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’’
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে অন্য কোনও ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি, অন্য কোনও ভাষণ এতবার বাজানো হয়নি। অথচ এই ভাষণ আমরা এক সময় ১৫ আগস্ট ও ৭ মার্চ বাজাতে পারিনি। বিএনপির শাসনামলে আমাদের তা বাজাতে দেওয়া হয়নি। মাইক কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর নেওয়া কৌশল প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণে ইয়াহিয়া খানকে বঙ্গবন্ধু চারটি শর্ত দিয়েছিলেন— মার্শাল ল’ তুলে নেওয়া, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং পাকিস্তান বাহিনীর চালানো বর্বরতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা। পাশাপাশি তিনি বাঙালি জাতিকে যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তার ভাষণে কখনও বলেননি, আমাদের স্বাধীন করতে হবে। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করা হবে। এটি ছিল কৌশল, যেন ইয়াইয়া খানরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী না বলতে পারে; পাকিস্তান ভাঙার দায় যেন বঙ্গবন্ধুর ঘাড়ে না দিতে পারে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, জিয়াউর রহমানের নয়। ‘চতুর’ শেখ মুজিবকে আগরতলা মামলায় ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল, জিয়াউর রহমানকে নয়। জিয়াউর রহমান যদি ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে না থেকে পাকিস্তান বা ঢাকায় থাকত, তাহলে তার নামই কেউ জানত না। কারণ তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তক, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান কাটা-ছেঁড়া করে তছনছ করেছেন।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্রনেতা হিসেবে পল্টন ময়দানের জনসভায় আমিও ঘোষণা দিয়েছিলাম, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। তাতে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল? মহান নেতার ঘোষণা না পাওয়া পর্যন্ত বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে নামেনি। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পরই শত্রুর মোকাবিলা করতে নিরস্ত্র জাতি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’
ইউনেস্কোর স্বীকৃতির প্রসঙ্গ টেনে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ বলেন, ‘ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ছিলো প্রত্যাশিত। আমরা বিশ্বাস করতাম, একদিন না একদিন এই ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। আজ ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি আমাদের সেই বিশ্বাসকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো— ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ।’