ভাসান চরের ভাসানী


প্রকাশিত : নভেম্বর ২৭, ২০১৭ ||

জিএম এমদাদ
মাওলানা ভাসানীকে আমরা যতটা চিনি বা জানি আব্দুল হামিদ খানকে বোধ হয় ততটা জানি না। অথচ এটাই ভাসানীর পুরো নাম। তার এই পুরো নামটা আজো হয়তো অনেকে জানি না। কিন্তু কি আশ্চর্য ভাসানী নামে সারা বিশ্বে তিনি পরিচিত। তাই তার মৃত্যু বার্ষিকীতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। ভাসানীর জীবন বৈচিত্রে ভরা তাই কোথা থেকে শুরু করবো ভাবছি।
নব ইতিহাস স্রষ্টা, যুগের অগ্নিপুরুষ ঠিক নীতি অবিচল আপোষ বিহীন তুমি চির নির্ভীক। ভাসান চর থেকেই শুরু করি। আসামে যখন প্রথম মওলানা সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন তখন তিনি তার নিজস্ব আস্তানা গাড়েন ভাসানীর চরে। এই ভাসানীর চর থেকে ভাসানী নাম যুক্ত হয় তার সাথে। এই ভাসানীর চরে তিনি প্রথম একটি জুনিয়র মাদ্রাসা পত্তন করেন। তারপর তিনি চলে আসেন। শালমারায় সেখানে এসেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ শালমারা হাইস্কুল। যার নাম করেন প্রজাবন্ধু। এখানে থাকাকালীন অন্যান্য সেবামূলক কাজের পাশাপাশি বছরের দুই ঈদের নামাজ পড়াতেন এবং নামাজবাদ সমস্ত লোক এক জামাতে মাটিতে কলার পাতা পেতে তৃপ্তির সঙ্গে আহার করতেন। বিকেল বেলা হত লাঠি খেলা এবং ঘোড়ার দৌড়। তিনি নিজেও এ দুটো খেলা জানতেন। এ নিয়ে অনেকেও তার সমালোচনাও করতেন। তিনি তাদের বলতেন , ‘‘এরা সাধারণ গরীব মানুষ এদের জীবনে আনন্দ উৎসবের কোন সময় বা সুযোগ নেই। বছরের দুটো দিনও যদি এভাবে আনন্দ দেয়া যায় তবু এদের আত্মা একেবারে মরে যাবেনা। জানিনা এরকম গভীর দরদ ভরা উক্তি অন্য কোন নেতা করেছেন কি-না ? সকলে আমরা জানি, ভাসানী জীবনে কখনো নির্বাচন করেন নি। কিন্তু তা ঠিক নয় মওলানা ভাসানী জীবনে একবারই নির্বাচন করেছেন ১৯৭৩ সালে সেটাই তাঁর জীবনে প্রথম ও শেষ নির্বাচন। সর্ব ভারতীয় প্রথম নির্বাচনে আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদে ভাসানী বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী খান বাহাদুর আব্দুল লাতফের জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
ভাসানীর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। তিনি তার ৭২ বছর রাজনৈতিক জীবনে ২৭ বার জেল খেটেছেন এবং ৩১ বছর তিনি জেলে কাটিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে পৃথিবীতে এতো দীর্ঘদিন আর কোন নেতা সম্ভবত: জেল খাটেননি। একবার বৃটিশ হাই কমিশনার তার প্রকৃত বয়স জানতে চান। তিনি তখন বলেন, ‘‘তোমাদের সরকার প্রথম যখন আমাকে জেলে দেয়, তখন সেখানে আমার বয়স লিপিবদ্ধ আছে’’।
একবার খুলনার এক জনসভায় মওলানা ভাসানী বক্তৃতা শুরু করার অল্পক্ষণ পরেই এক দারোগা এসে বললেন, ‘‘হুজুর আপনাকে এখনই থানায় যেতে হবে।’’ তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, সভা করতে দেওয়া হবে না। তাই তিনি চট করে বললেন, ‘‘একটু মোনাজাত করে সভা শেষ করে দিচ্ছি। এই বলে মোনাজাত ধরলেন, ‘‘রাব্বানা আতিনা’’ বলে শুরু করে তার পুরো বক্তব্য মোনাজাতের মধ্য দিয়ে যখন শেষ করলেন। তখন অনেকে কেঁদে ফেলেছেন দেখা গেল দারোগা সাহেবও রুমাল বের করে চোখ মুছলেন। ভাসানী ছুটলেন থানার দিকে দারোগা সাহেব বললেন, ‘‘হুজুর আর থানায় যেতে হবে না আপনাকে।’’ আসাম থেকে আসার পর তিনিই প্রথম বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের পত্তন করেন। পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের মুসলিম টুকু বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়। সেই আওয়ামী লীগের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে তাই ভাসানীর অবদান কারও চেয়ে কম নয়। শুধু কি বাংলাদেশ ,পাকিস্তান আন্দোলনেরও তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের নেতা। ভাসানী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন না, সরকারি দলে থাকেন না এবং মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন না-এ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। একবার আমেরিকা থেকে এলেন এক সাংবাদিক তার সাথে দেখা করতে। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘‘আপনি মন্ত্রী হন না কি আপনি দেশ শাসন করতে পারবেন না। আর নির্বাচনে দাড়ান না কি ভোট পাবেন না সে ভয়ে, নাকি অন্য কিছু ?’’ ভাসানীর সংক্ষিপ্ত জবাব, আপনি সূদুর আমেরিকা থেকে এসেছেন। আপনি এদেশের শাসন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আপনাদের দেশের মন্ত্রীদের মতো আমাদের দেশের মন্ত্রীরা দেশ শাসন করে না। দেশ শাসন করে থানার দারোগা আর মহাকুমার এমডি ও সাহেবরা। আর নির্বাচনে না দাঁড়াবার কারণ হল যারাই নির্বাচনে দাঁড়াই তারাই পরে জনগণের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে লেগে যায়। আমি জনগণের সাথে থাকতে চাই-তাই নির্বাচন করি না, নির্বাচন করাই।’’ চীন সফরে গিয়ে একবার তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। সেখানে চৌ এন লাই তাকে দেখতে আসেন সাইকেল চড়ে। তার সাইকেলে আসার কারণ জানতে চাইলে চৌ-এন লাই মওলানাকে বলেন, ‘‘আজ ছুটির দিন। তাছাড়া আপনাকে দেখতে এসেছি আমি ব্যক্তিগত ভাবে। এটা কোন রাষ্টীয় কাজ নয়। সরকারী কাজ ছাড়া আমি সরকারী গাড়ী ব্যবহার করি না।’’ এ প্রসঙ্গে ভাসানীর খেদ উক্তি ছিল, ‘‘যদি আমাদের দেশে শুধু সরকারি গাড়ীর অপচয় রোধ করা যেত তা দিয়ে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা যেতো।’’
ভাসানীর জীবনে ২৪টি বাড়িতে বসবাস করেছেন এবং তিনি বিয়ে করেছেন তিনটি। প্রথম স্ত্রী বর্তমান জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার বীরনগরের জমিদার শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর প্রথমা কন্যা আলিমা খাতুন। দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন টাঙ্গাইলের দিঘলিয়া গ্রামের আব্দুর রহমান মীরের একমাত্র সন্তান আকলিমা খাতুন। অপরূপাসুন্দরী এই আকলিমা খাতুন বিয়ের ছয়মাস পরে মারা যান। তৃতীয় স্ত্রী বগুড়া জেলার আদমদীঘি থানার কাশেম উদ্দীন সরকারের দ্বিতীয় কন্যা উর্মিলা খাতুন। বিয়ের পর পিতৃপদও নাম পরিবর্তন করে নিজ নামের মর্যাদায় ‘‘হামিদা খান’’ থেকে হামিদা খানম নাম দেন। মওলানা ভাসানীর স্বাস্থ্য ও শেষের দিকে এসে খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাই তখনকার স্বাস্থ্য ও বয়সের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনেকে তাকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের পরামর্শের উত্তরে বলতেন, ‘‘আমি রাজনৈতিক থেকে অবসর গ্রহণ করতে চাই না। ফারাক্কা মিছিলে যদি আমার মৃত্যু ঘটে তবে আমি মনে করব এই মৃত্যু আমার সার্থক হয়েছে। তোমরা আমার লাশ মিছিলের সাথে বয়ে নিয়ে যেও।’’
ভাসানী একটা শতাব্দী। সাপ্তাহিক ‘‘গণশক্তি উদ্বোধন কালে তিনি বলেছিলেন, “আমি জীবনে ৪৯টি পত্রিকা উদ্বোধন করি। কিন্তু নিয়তি কি পরিহাস সব কটি পত্রিকা আমার বিরুদ্ধে লিখেছে।” সফেদ পাঞ্জাবী তালের টুপি সুতীর লুঙ্গি পরিহিত এমন একজন মানব দরদী সর্বত্যাগী নেতার সারাজীবনের সকল কার্যকলাপ কীর্তিকাহিনী নিয়ে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা জাতীয় মঙ্গল ও ইতিহাসের বৃহত্তর স্বার্থে হওয়া একান্ত প্রয়োজন। মওলানা ভাসানী শুধু বিশ্বের সকল নির্যাতিত নিপীড়িত শোষিত-বঞ্চিত ও অবহেলিত জনগণের মজলুম নেতাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাবাদের এক উজ্জ্বল জোতিষ্ক।
আজ তাই দেশের এহেন পরিস্থিতিতে আমরা যদি এই একটি মাত্র নেতাকে সফল হিসেবে নিয়ে তার সুষ্ঠু পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগাতে পারতাম তাহলে আমাদের দেশ আজ অন্য রকম হতো। কবির ভাষায় তাই বলতে হয়-“ভাসানীর সেই চর জাগে বাঙলার মাঠে ময়দানে-
জীবনের নিভু নিভু শামাদানে জ্বলে সে নাম-
সে নাম শুনে শুনে আজো আমরা মরে মরে বাঁচি।”