আজ ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৯, ২০১৭ ||

কপিলমুনি (খুলনা) প্রতিনিধি: আজ ৯ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবস। কপিলমুনিবাসির কাছে ঐতিহাসিক দিন। অনেক আগে থেকে এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় বাংলাদেশের সব স্থানের চেয়ে এখানে নিরীহদের উপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল অনেক বেশি। ১৯৭১ সালের এই দিনে কপিলমুনির মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা দেশের অন্যতম এ রাজাকার ঘাঁটিতে আঘাত এনে এলাকাটি শত্রুমুক্ত করে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আধুনিক কপিলমুনির রূপকার স্বর্গীয় রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর সুরম্য অট্টালিকাতুল্য দোতলা বাড়িটি পাকবাহিনী আর তাদের দোসররা দখল করে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি তৈরী করে। এই বাড়ির একটি কক্ষে এলাকার সুন্দরী যুবতীদের ধর্ষণ করতো তারা, একটি কক্ষে গৃহপালিত পশু ধরে এনে রেখে রান্না করা হতো, অন্য একটি কক্ষে তারা রাত্রী যাপন করতো। ওই ভবন থেকেই তারা অত্র এলাকায় যুদ্ধ ও শোষণ করার নীল নকশা আঁকতো।
১৯৭১ সালের ২১ জুলাই এমএ গফুর ও শামছুল আরেফিন (লে.) এর নেতৃত্বে ১৮০ জনের মুক্তি বাহিনী কপিলমুনির রাজাকার ঘাঁটিতে হানা দেয়, যুদ্ধ চলে একটানা ২৪ ঘন্টা। এলাকাবাসির অসহযোগিতার কারণে এ আক্রমণে সফলতা আসেনি, সম্ভব হয়নি সেদিন পাকীদের পরাস্থ করা। এরপর ২য় দফায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় মুক্তিযোদ্ধারা।
৬ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১মিনিটে ১২টি ক্যাম্পের প্রায় ৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণে যুদ্ধ শুরু হয়। চারিদিক নিস্তব্দতা, মৃত্যু ভয়ে আতংকিত মানুষ ঘর ছেড়ে বনজঙ্গলে ও নিরাপদ স্থানে আশ্রায় নিচ্ছে। কোলাহলমুক্ত ভূতুড়ে পরিবেশ গোটা কপিলমুনিতে। শুরু হয় রাজাকার ঘাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাড়াশি আক্রমণ। কপিলমুনির পার্শ¦বর্তী প্রতাপকাটি কাঠের পুলের উপর মুক্তিবাহিনীকে রাজাকাররা চ্যালেঞ্জ করতেই মুক্তিবাহিনীর মেশিন গর্জে ওঠে। সেখানে ৮জন রাজাকার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এরপর মুক্তিবাহিনী কপিলমুনির নাথপাড়ায় ডিউটিরত পাকবাহিনীর অসংখ্য সদস্যকে গুলি করে মারতে সক্ষম হয়। কপোতাক্ষ নদীর ওপার অর্থাৎ সাতক্ষীরার কানাইদিয়া থেকে আরসিএলের আওয়াজ গোটা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। চতুর্দিক থেকে সাড়াশি আক্রমণ শুরু করে মুক্তি বাহিনী। দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর আনোয়ার হোসেন মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এসময় তোরাব আলীর পেটে গুলি লেগে আহত হন। ৭ ও ৮ তারিখ বিরতীহীনভাবে যুদ্ধ চলে, ৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। এরপর ১৫৫জন রাজাকার মুক্তি বাহিনীর কাছে আত্মসমার্পন করে। এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার নারী পুরুষ কপিলমুনিতে জড়ো হয়। এরপর কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের মাঠে জনতার আদালতের রায়ে ৭জন দুর্ধর্ষ রাজাকারকে ভয়ংকর শাস্তি দিয়ে মরা হয় এবং বাকিদের প্রকাশ্যে গুলি করে মারা হয়।
এদিকে এলাকাবাসির প্রশ্ন পাকবাহিনীর কবল থেকে গোটা কপিলমুনিবাসীকে মুক্ত করার এই দিনটি আসলেই কি ৯ডিসেম্বর? না কি ৭ ডিসেম্বর? তা নিয়ে প্রবীণদের কাছে থেকে গেছে মতভেদ, আর নবপ্রজন্মের কাছে রয়েছে জিজ্ঞাসা। এই মতভেদের অবসান ঘটাতে ২০১০ সালে কপিলমুনিতে দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হলেও আজ পর্যন্ত সঠিক তারিখ নিয়ে জিজ্ঞাসা থেকেই গেছে।