বাড়িতে যেভাবে কাটছে মুক্তামনির দিন


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৬, ২০১৭ ||

মো. আসাদুজ্জামান সরদার: ‘ওখানে (ঢাকায়) তো বন্দিঘরের মধ্যেই দিন কাটতো। আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষই ছিল অচেনা। আর এখানে (বাড়িতে) সবাই চেনাজানা। ঢাকার দিনগুলোর গল্প করে করেই সময় কাটছে। হাতটা আবার ফুলে গেছে। মাঝে মাঝে যন্ত্রণাও করে। তবু ভালো আছি।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দক্ষিণ কামারবায়সা গ্রামে মুক্তামনিদের বাড়িতে গিলে সে মুক্তামনি হড়বড় বলে কথাগুলো বলে। এ প্রতিবেদক যখন মুক্তামনির পাশে গিয়ে বসেন, তখন সে হাতে মেহেদি দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত। ডান হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় মুখ দিয়ে টিউব চেপে বাম হাতে মেহেদি লাগাচ্ছিল মুক্তামনি। কাজটা তখন প্রায় শেষপর্যায়েই ছিল। তাই তা যমজ বোন হিরামনিকে দেখিয়ে বলে, ‘দেখ, তোর চেয়ে আমার হাতে মেহেদির আল্পনা আরও সুন্দর হয়েছে।’

মুক্তামনিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কিছু দিন আগে তার ডান হাতে অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার চপল চোখে-মুখে ভারমুক্তির একটা অনুভব ছড়িয়ে রয়েছে। ঢাকার জীবনের ধকল দুই দিনে সে খানিকটা কাটিয়ে উঠেছে। ফিরে পেয়েছে মনের জোরও।

 

এ বছরের ১২ জুলাই রক্তনালীর টিউমারে আক্রান্ত মুক্তামনিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এরপর প্রায় পাঁচ মাস পর গত শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার দিকে বাবা-মার সঙ্গে সে নিজ বাড়িতে ফেরে।

মুক্তামনি জানায়, গত দুই দিনে পোষা শালিকের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে তার। অনেক গল্প করেছে দাদি, নানি, বোন ও বান্ধবীদের সঙ্গে। টিভিতে কার্টুনও শুরু হলে তাও দেখে নিচ্ছে এসবের ফাঁকে।

মুক্তামনি বলে, ‘হাত সাজাতে আমার খুব ভালো লাগে। আব্বু মেহেদি কিনে এনে দিয়েছেন। আল্পনা দেখে দেখে বাম হাতে মেহেদি লাগিয়েছি, তাও মুখ দিয়ে টিউব চেপে। আর সে (হিরামনি) অন্য কে একজনকে দিয়ে হাতে মেহেদি লাগিয়েছে।’

মনের আনন্দে মুক্তামনি বলে চলে, ‘ঢাকায় থাকার কারণে শালিকের সঙ্গে অনেক দিন কথা হয়নি। গত দুই দিনে ওর সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে। দাদি, নানি ও বান্ধবীদের কাছে ক্রিকেটার মুশফিক ভাইয়ের গল্প, স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যারের গল্প, আরও অনেক গল্প করেছি।’

সে আরও বলে, ‘ডাক্তার আঙ্কেলরা বলেছিলেন, তাদের যেন মাঝে মাঝেই ফোন দিই। ডাক্তার আঙ্কেলরা তো সবসময় ব্যস্ত থাকেন, তাই ওনাদের ফোন করছি না। তবে ওনারা ফোন দেন, তখন কথা হয়। জানেন, ডাক্তার আঙ্কেলদের কথা বাড়িতে আসার পর থেকে খুব মনে পড়ছে।’

এ প্রতিবেদককে আঙ্কেল সম্বোধন করে মুক্তামনি বলে, ‘আমি যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠি, আমার জন্য সবাইকে এই দোয়া করতে বলবেন।’

মুক্তামনির বাবা মো. ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ও (মুক্তামনি) হাতে মেহেদি লাগাতে খুব পছন্দ করে। আমার মুদি দোকানে মেহেদি রাখি। কিন্তু গত প্রায় ছয় মাস বাড়িতে না থাকার কারণে দোকানে খুব একটা জিনিসিপত্র নেই। গতকাল (শনিবার) থেকে আমাকে বারবার মেহেদি কিনে দিতে বলছিল। তাই আজ (রবিবার) সকালে মেহেদি কিনে এনে দিয়েছি। সে নিজে নিজে মুখ দিয়ে টিউব চেপে বাম হাতে মেহেদি লাগিয়েছে।’

ইব্রাহিম হোসেন আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মুক্তাকে ঘরের বাহিরে বের করতে পারিনি। তার জন্য হুইল চেয়ার কেনা হবে। এরপর হুইল চেয়ারে বসিয়ে তাকে বাহিরে বের করবো।’

মুক্তামনির মা আসমা খাতুন বলেন, ‘আর বলবেন না, ছয় মাস বাড়িতে ছিলাম না। ঘরবাড়ির অবস্থা সব একেবার অগোছালো হয়ে আছে। গত দুই দিন ধরে কাজ করেও শেষ করতে পারছি না। এরপর বাড়িতে মেহমানরা আসছেন, তাদের জন্যও রান্নাবান্না করতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তামনির ছোটবেলা থেকেই সাজগোজ করার খুব শখ। সব সময় পরিপাটি হয়ে থাকতে ভালোবাসে। মেহেদি দিয়ে হাত সাজানো ওর খুবই প্রিয়। নিজের হাত নিজে সাজাতে বেশি পছন্দ করে। অন্য কেউ সাজিয়ে দিয়ে ওর পছন্দ হয় না।’