ফেলানী নৃশংসতার করুণ উদাহরণ, বন্ধুত্বের নয় বৈরীতার কালো নমুনা


প্রকাশিত : জানুয়ারি ৬, ২০১৮ ||

শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন
‘ফেলানী নয় কাঁটা তারের বেড়ায় ঝুলছে বাংলাদেশ।’ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা ফেলানী’র নিথর দেহটাকে দেখে লাখো কোটি মানুষ এ বাক্য মনের মাঝে বিনিময় করেছে এটাই সবার জানা। কিন্তু ইসরাইলী ফ্যাসিস্টদের মতো বিএসএফের নির্মমতার বিরুদ্ধে কেউ একটা ঢিল ছুড়েছে এমনটা কারো জানা নেই। সবাই জানে পৃথিবীতে একমাত্র দেশ ইসরাইল যারা প্রতিবেশীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হয় তা তারা জানে না। সা¤্রাজ্যবাদের বিশ্ব মোড়ল মার্কিনীরাও প্রতিবেশীদের সাথে এমনটা কখনও করে না। সময়ের আবর্তে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিএসএফ’র আচরণ ইসরাইলের ছোট ভায়ের মতোই হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত সীমান্ত মোড়লগিরী শুধু নয় নৃশংসতার হিটলার হয়ে উঠছে ভারতের এ বাহিনীটি। এবাহিনীর হত্যা খুন ও অত্যাচার দেখলে পাক হানাদার বা ইসরাইলী অত্যাচারকেই স্মরণ করে দেয় সবসময়। আজ ৭ জানুয়ারি, ২০১১ সালের এই দিনে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় বাংলাদেশের কিশোরী ফেলানী। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়ায় চার ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হয় ফেলানীর লাশ। ফেলানীর ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মৃত্যুর সাত বছর হয়ে গেলেও ফেলানী হত্যার ঘটনায় ন্যায় বিচার পায়নি তার পরিবার।

 

ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে পরপর দুবার ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম সাক্ষী দিয়ে এলেও অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। পরে ন্যায়বিচারের আশায় ভারতের মানবাধিকার সংগঠন মাসুম-এর (মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ) সহায়তায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট আবেদন দাখিল করেন ফেলানীর বাবা। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও দিনের কার্যতালিকায় না থাকায় শুনানি হয়নি। ফলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এখনো ঝুলে আছে ফেলানী হত্যার বিচারকাজ। কাঁটাতারের বেড়ায় দীর্ঘ চার ঘণ্টা লাশ ঝুলে থাকার ছবি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচার হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে বসে ভারত-বাংলাদেশসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ফলে ফেলানী হত্যার আড়াই বছর পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিশেষ আদালতে বিচারকাজ শুরু করে বিএসএফ। শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন বিএসএফের আদালত। আবারো সমালোচনার ঝড় উঠলে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন একই আদালত। ২০১৪ সালের ২ জুলাই পুনরায় অমিয় ঘোষের বেকসুর খালাসের রায় বহাল রাখেন আদালত। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার না পেয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মাসুমের সহযোগিতায় রিট আবেদন করেছি। ভারতের সর্বোচ্চ এ আদালতে ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’ ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েকে কাঁটাতারের বেড়ায় নির্মমভাবে হত্যা করেছে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ।

 

আমি ভারতের উচ্চ আদালতে তার ফাঁসি চাই।’ ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামের আইন সহায়তাকারী ও কুড়িগ্রাম আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘কাঁটাতারে ফেলানী হত্যার ছয় বছর হয়ে গেছে। ন্যায়বিচার না পেয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেছেন ফেলানীর বাবা। রিট আবেদনের ভিত্তিতে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ থাকলেও বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে আবারো পিছিয়ে গেছে বিচারিক কার্যক্রম। বিলম্ব হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করছি।’ আমরাও আব্রাহামের মতোই আশাবাদী। আমাদের প্রত্যাশা একদিন না একদিন এ নৃশংসতার বিচার পাবে ন্যায় বিচার প্রত্যাশী মানুষ। মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করেছে বিএসএফ। নিশ্চয় ভারত সরকারের এ বিষয়ে যথেষ্ঠ করার আছে। বিএসএফ যা করে তা নিশ্চয় ভারত সরকারের মর্যাদা বাড়ায় না। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যে অবদান ভারতবাসী রেখেছে তার জন্য বাংলাদেশ চীরকৃতজ্ঞ। স্বাধীনতা বিরোধী সরকারগুলো ছাড়া বিশ্বদরবারে ভারতকে কখনও বিরোধীতা করেনি বাংলাদেশ। যতভাবে পারা যায় বাংলাদেশ সবসময় ভারত সমর্থন করে গেছে। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপে তৎকালীন আইসিসি প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের লোটাস কামালকে অপমান করা থেকে শুরু করে। সীমান্তে যাবতীয় অত্যাচারে বাংলাদেশ জর্জরিত হয়েছে। সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারণে হোক আর যে কারণে হোক বাংলাদেশতো কখনও ভারতের ওপর খবরদারি বা ষড়যন্ত্রমুলক মনোভাব দেখায়নি তবে কেন বারবার বাংলাদেশ এধরণের আচরণ পাবে। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি ভারত। সে না দাঁড়াক শুধু একটাই চাওয়া ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে আর কোন ফেলানী যেন কাঁটাতারে ঝুলে না থাকে। তাতে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের মর্যাদা কোনদিন বাড়ে না। সারাবিশ্বে এধরনের আচরণে কেবল ভারত ছোট হয়েছে। সবাই জানে ভারতে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কতটা শক্তিশালী। ভারত সরকার র’এর মাধ্যমে নিশ্চয়ই জানে ভারতপারের গডফাদারদের মদদেই এদেশে বারবার খুচরা চোরাকারবারী বা জঙ্গী তৈরী হয়েছে।

 

সুতরাং এ অপকর্মের দায় কেন বাংলাদেশ একা নেবে? ভারতকেও নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার তার সাধ্য দিয়ে এ ধরনের জঙ্গিবাদকে রুখে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের সীমান্তপারের ভারতীয় একজন চোরাকারবারী বা জঙ্গী গডফাদারকে রুখে দিয়েছে এধরনের উদাহরণ আমাদের সামনে খুবই কম। সেরকম ঘটে থাকলে গণমাধ্যমের যে বিশ্বায়ন ঘটেছে সে কারণেই গোপন থাকতো না। বরং দুই দেশের জনগণ টের পেতো। দুই দেশের শান্তিকামী মানুষ মুখে বন্ধুত্ব নয় সত্যিকারের বন্ধুত্বের নমুনা দেখতে চায়।