রাতে ফুলে ভরা শহিদ বেদি সকালে খালি: ফুল দিতে না পেরে হতাশ সাধারণ মানুষ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮ ||

এসএম শহীদুল ইসলাম: ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বেদিতে পিতার সাথে ফুল দিতে এসেছিলো ৬ বছরের শিশু তৃষা সাহা। একুশের প্রথম প্রহরে আসতে পারেনি সে। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি অনেক বায়না ধরেছিলো তৃষা। তাকে ফুল কিনে দিতে হবে, কপালে বাঁধার জন্য অমর একুশে লেখা কাপড়ের পটি কিনে দিতে হবে। মেয়ের বায়না রক্ষা করেছিলেন অজয় সাহা। গ্রামের বাড়িতে থাকার কারণে মধ্য রাতে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে শহরে আসেননি তিনি। তৃষা সাহা গ্রামে থাকলেও পড়ে শহরের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে। তাই সে শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের শহিদ মিনার বেদিতে ফুল দিয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বায়না ধরেছিলো। পিতার সাথে সে শহিদ মিনারে এসেছিলো বটে কিন্তু ফুল দেওয়া হয়নি। শহিদ মিনারে এসে দেখে কিছুই নেই শহিদ বেদিতে। একেবারে ধোয়ামুছা পরিস্কার করা একটি শহিদ মিনার। অথচ রাতে স্যাটালাইটের কল্যাণে টেলিভিশনে সে দেখেছিলো এই শহিদ বেদির অন্য রূপ। অন্য চেহারা। ফুলে ফুলে ভরা একটি শহিদ বেদি। হাজারো মানুষের ঢল। রাতের দৃশ্য দেখে অনেক স্বপ্ন জেগেছিলো তৃষার মনে। সেও ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। ছবি উঠাবে। মন খুলে গাইবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি…?’ কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হলো না। তাই মন খারাপ হয়ে গেছে। এক কোমর ডুকরে কাঁদতে পারলে তার দুঃখ কিছুটা হালকা হতো বলে মনে হয়। শুধু এ অবস্থা তৃষার একার নয়। তৃষার মতো অনেই এসে ফিরে গেছে হতাশ হয়ে। শহিদ বেদিতে ফুল দিতে না পেরে অনেক শিশু চোখ মুছতে মুছতে চলে গেছে।
আমিনুর রহমান নামে একজন ষাটোর্ধ প্রবীন শিক্ষক জানান, আগে একুশে ফেব্রুয়ারি সারাদিন সুবিধামতো সময়ে শহিদ বেদিতে ফুলের ডালা, মালা, স্তবক, বুকেট নিয়ে সর্বসাধারণ আসতো ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আসতো সকালে। এবছরও এসেছে তারা। কিন্তু অনেকই ফুল দিতে পারেনি। আগেও একদল পুলিশ শহিদ মিনারে দায়িত্ব পালন করতেন। আজও করেছেন। কিন্তু ফুলগুলো কিভাবে উধাও হয়েছে তা কেউ বলতে পারছে না। সকাল ৮টার আগেই দায়িত্বশীলদের সামনেই নাকি শহিদ বেদির ফুলগুলো ছিড়েছুটে একেবারে পরিস্কার করে নিয়ে গেছে কারা। তারা জুতা পায়ে শহিদ বেদিতে উঠলেও কেউ তাতে বাধা দেয়নি।
রাকিবুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী ও তার সহপাঠীরা জানায়, কয়েক বছর আগেও রাত ১২টা ১মিনিটে ফুল দেওয়ার আগে সমবেত কন্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হতো। নীরবতা পালন হতো। মোমবাতি প্রজ্জ্বল হতো। মাইকে শুনতে পেতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… সালাম সালাম হাজার সালাম… সহ দেশাত্মবোধক গান। এসব গানের সুর ও কথা মনে শোকের আবহ সৃষ্টি করতো। মনে জেগে উঠতো অন্যায় অসত্যের কাছে মাথা না করার প্রত্যয়। মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা… গানের সুরে জেগে ওঠে শিহরণ। কিন্তু এবছর এসবের কিছুই তো দেখলাম না। তবে কি আমরা পরিবর্তন হচ্ছি ? প্রশ্ন রাকিবুলের।