একগুচ্ছ ভাবনা


প্রকাশিত : এপ্রিল ১২, ২০১৮ ||

 

না ছি ম   হা সা ন

২০ মার্চ ২০১৮ তে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) ভবন ঢাকায় অনুষ্ঠেয় সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড-এর ২৩তম বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগদান উপলক্ষে ১৯ মার্চ ২০১৮ সাতক্ষীরা ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম বেলা ঠিক ১০.৩০টায়। ঢাকায় পৌঁছলাম সন্ধে ৬.৪০ টায়। উঠলাম শ্যামলিতে। পরদিন যথারীতি বেলা ১১টায় উক্ত বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত থেকে তা শেষ করলাম বেলা ১২.৪০ টায়।

৮০’র দশকে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা লাভের পর দিনে দিনে তার ঈর্ষণীয় ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা সংশ্লিষ্ট সকল মহলেই সুবিদিত। গুণগত পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা ও বিপণনে মিলটি ছিল শীর্ষস্থানীয়। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমায় বোধ, বিবেকহীন মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড এর বর্তমান অবস্থা এখন এতটাই খারাপ, রুগ্ন যে প্রতিষ্ঠানটির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই। বলা যায়, অস্তিত্ব সংকটে পড়ে চরম দুর্দিন অতিক্রম করছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বস্ত্রখাতের সাতক্ষীরাস্থ এই মিলটি। অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে এর সকল সাধারণ কর্মকর্তা/কর্মচারী ও শ্রমিকবৃন্দ। যে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড এক সময় ছিল রাষ্ট্রের লোভনীয় সম্পদÑযার আয় থেকে প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে অন্যান্য মিলকে সে নিজেই এখন কোটি কোটি টাকার লোকসানবাহী এক প্রতিষ্ঠান, বিশাল এক দায় (খরধনরষরঃু) বৈ আর কিছু নয়।

সোনালী ব্যাংক লিমিটেড প্রিন্সিপাল অফিস, সাতক্ষীরায় যোগদান করার পর কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড আর্টিকেলস্ অব অ্যাসোসিয়েশনস-এর ১২১ ধারা বলে ২০১৬ তে প্রথম যখন সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড-এর কোম্পানি বোর্ডের পরিচালক নিযুক্ত হলাম তখন জেনেছিলাম যে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস সরকারের আর্থিক কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই চলছে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে। কিন্তু এ পদ্ধতিতে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলের ব্যবসায়িক/আর্থিক দূরাবস্থার কোনো প্রতিবিধান বা উন্নতি না হওয়ায় বিটিএমসি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এখন তা চলছে ভাড়া পদ্ধতিতে। আফসোস এই যে, রমরমা ব্যবসা-সফল সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলটিকে এখন ভাড়া দেওয়া হয়েছে বেসরকারি এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে।

সার্ভিস চার্জের পর ভাড়া পদ্ধতিতেও সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলের অবস্থার যদি গুণগত কোনো পরিবর্তন না হয় তাহলে  চচচ’র (চঁনষরপ চৎরাধঃব চধৎঃহবৎংযরঢ়) ভিত্তিতে তা পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে বিটিএমসি। যা অবশ্য ব্যাপক সময়সাপেক্ষ একটি ব্যাপার। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় যে, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেডের বর্তমান যে কোম্পানি বোর্ড তা নিছক এক আনুষ্ঠানিক কাঠামো মাত্র। যা প্রথমে আমি কোম্পানির ২২তম বার্ষিক সাধারণ সভায় বুঝে উঠতে পারিনি। সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস্ লিমিটেড পরিচালনায়, তার একান্ত ভালোমন্দে ৭ সদস্যবিশিষ্ট বোর্ডের নেই কোনো নির্বাহী ক্ষমতা। নেই কোনো নিজস্ব দর্শন, ভাবনা, প্রস্তাবনা উপস্থাপন বা বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বাধীনতা। যা এহেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। অতপর যে বিষয়টি এখানে অতি পরিস্কার তা হলো বিটিএমসি, মন্ত্রণালয় তথা সরকারই  সুটেমির জন্য শেষ কথা, শেষ ভরসা। এখন দেখার বিষয় টিকে থাকার সংগ্রামে সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড অনাগত দিনে আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না কি তার বিউগলে বেঁজে উঠবে অনন্ত যাত্রার মর্মান্তিক করুণ সুর। আমরা অপেক্ষায় রইলাম ।

 

 

 

২.

এবার ভিন্ন প্রসঙ্গ। পরদিন ২১ মার্চ ২০১৮ শ্যামলির বাসায় সকাল থেকেই একা। সারাদিনই একাকী অলস সময় কাটানো। এ যেন খানিকটা স্বেচ্ছা নির্বাসন অথবা নিজেই নিজকে অন্তরীণ রাখার মতো। আর এরই সুবাদে মনের আকাশে জীবনঘনিষ্ঠ নানামুখী ভাবনার এলোমেলো উকিঝুঁকি/আনাগোনা। শুরু থেকে নানা স্তরে বিভাজিত ছোট্ট একখন্ড এ জীবন উঠে এলো মনের বিশাল পর্দায়/ক্যানভাসে। শুয়ে, বসে, হেঁটে চলে অনুভব করলাম ফেলে আসা জীবনের প্রতিটি স্তরের সুখ, দু:খ, আনন্দ-বেদনা, ভালোলাগা, মন্দ লাগা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, বঞ্চনার নানা উপাখ্যান। একটা সময় অব্দি মনে হয়েছে সৌরভে, গৌরবে, প্রাপ্তিতে জীবন অসাধারণ ছন্দময়, কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে শুরু হলো নানা পরিবর্তন, ছন্দপতন। চলমান জীবনে ২৯ জুলাই ২০০৯ এর ভোররাতে অত্যন্ত আকষ্মিকভাবে প্রাণাধিকপ্রিয় আব্বা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এরপর ১৪ জুন ২০১৬ সন্ধেয় হারালাম পরম মমতাময়ী মাকে। জীবনের শ্রেষ্ঠ দু’টি সম্পদ হারানোর কষ্ট ব্যথা আজও সমানে বয়ে বেড়াচ্ছি নীরবে, নিভৃতে, অন্তরে অন্তরে। যেন হৃদয়ে সৃষ্ট ক্ষত আমৃত্যু আর উপশম হবার নয়।

সুধীপাঠক, বাবা-মাকে হারানোর মধ্যবর্তী সময়ে আগস্ট ২০১০ এ আমার সহধর্মিণী পলি ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ায় ধারণ করতে হয়েছে আরও এক নিদারুণ কষ্ট। যেন তা মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো। লেফট ব্রেস্ট-এ একটা টিউমার কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই  গধষরমহধহঃ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি ।

অসুখের শুরু থেকে দেশেই পলির সর্বোচ্চ চিকিৎসা চলছে। এ যাবৎ একরকম ভালো আছে। কিন্তু যেমনটি কথায় আছে ‘গরংভড়ৎঃঁহব হবাবৎ পড়সবং ধষড়হব; ডযবহ রঃ পড়সবং, পড়সবং রহ নধঃঃধষরড়হং’। এখন পলির জীবনে অন্য এক দরজায় নতুন করে কড়া নাড়ছে ভিন্ন আর এক সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে খরাবৎ ঈৎরংরং। দেশে চঊঞ ঈঞ ঝঈঅঘ সহ নানা টেস্টে লিভারের সম্ভাব্য সমস্যাটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঈৎড়ংং ঈযবপশরহম-এর জন্য তাকে এখন পাঠাতে হচ্ছে মুম্বাই এর ঞধঃধ গবসড়ৎরধষ  ঐড়ংঢ়রঃধষ। জানিনা, শেষ অব্দি ললাটের লিখন কি?

১৯৮৯’র ৭ ডিসেম্বর পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও আয়োজনে পরস্পর যুগলবন্দি হওয়ার মধ্য দিয়ে পলি তার চিন্তা ভাবনা ও নিজস্ব স্বকীয়তায় তখন থেকেই আমার সব কিছুকেই আপন করে নিয়েছে। পরিবারের সবার সাথেই তৈরি হয়েছে তার অদ্ভূত সুন্দর এক মেল-বন্ধন। দীর্ঘ এ সময়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে সে তার সংসার ও একান্তভুবন। নিজের ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়া, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়া না হওয়া নিয়ে কখনও বিন্দুমাত্র কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই তার। আপাত অবস্থানে সে সব সময় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, সšুÍষ্ট থেকেছে। আমার যেটুকু আয়- উপার্জন তা দিয়ে সে যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়েছে। এজন্য আমাকে কোনোদিন এতটুকুন বিব্রত হতে হয়নি। হতে হয়নি কখনও কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি। পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে এতটা সময় পার হয়েছে আমাদের। পলির মধ্যে আমি আমার প্রয়াত মায়ের মধ্যকার একটি অসাধারণ মহৎ গুণ লক্ষ্য করেছি। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূল অবস্থায় অবিচলিত থেকে পরম ধৈর্য্য ও মানসিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলা। মহৎ এ গুণটি নি:সন্দেহে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার ও আমাদের অন্য সবার জন্য ভরসার এক অনন্য জায়গা। তা না হলে কঠিন এ বাস্তবতায় বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম, চেষ্টার উৎসমূলই-বা  আর কি  হতে পারে (?) পূর্ণ বিকশিত জীবন যখন উপভোগ করার সময় তখন নতুন করে কোনো কষ্ট, বেদনা আবারও তাকে স্পর্শ করুক, তাকে নীলকণ্ঠ করুক, এটি আর চাই না। পলির জন্য রইলো আমার হৃদয় নিংড়ানো নিষ্কলুষ ভালোলাগা ও ভালোবাসা যা কোনো দিনই নি:শেষ হবার নয়। কারণ আজ আমি যেখানে, ধারাবাহিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে ও সূচকে যা কিছু আমার প্রাপ্তি, অর্জন, গৌরবের তার পিছনে রয়েছে আমার অসম্ভব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিচক্ষণ বাবা, মা, ভাই-বোন, সন্তানাদি (২ কন্যা ও ১ পুত্র) সহ পলির অসামান্য অবদান, ত্যাগ ও তিতিক্ষা ।

সর্বোপরি,বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ-এর (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) ২১ অনুচ্ছেদ মতে আমরা  প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। কিন্তু এটি এখন এক আপ্তবাক্য ছাড়া আর কিছু নয়। কর্মজীবনে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, কূটনীতি, নোংরামি ও নানাবিধ বৈষম্যজনিত কারণে যথাসময়ে কাক্সিক্ষত পদোন্নতি না হওয়াসহ কর্মজীবনের আর আর কষ্ট, বঞ্চনার কাহিনী লেখার ইচ্ছা রইলো অন্য কোনো দিন, অন্য কোনো সময়। লেখক: নাছিম হাসান, মুনজিতপুর, সাতক্ষীরা