জেলা পরিষদের সংবাদ সম্মেলনে দাবি দুর্নীতির অভিযোগে সাঁটলিপিকার আটকের ঘটনা সাজানো নাটক


প্রকাশিত : জুন ১৩, ২০১৮ ||

পত্রদূত রিপোর্ট: শাহীজ্জামানকে গ্রেপ্তারে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে দাবি করে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেৃতৃত্বে ১৮ জন সদস্য ও কয়েকজক কর্মকর্তা-কর্মচারি মঙ্গলবার দুপুর দু’টোর দিকে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্যানেল মেয়র আমিনুল ইসলাম বাবু। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয় ১৯৯০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা পরিষদে একটানা ২৭ বছর চাকরির সুবাদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এসএম মাহাবুবর রহমান রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন। নিজের ছেলে মেহেদী হাসানসহ সাতজনকে সেখানে চাকরি করে দিয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। প্রতিবাদ করায় অনেকেই তার বলির পাঠা হয়েছেন। বর্তমানে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় অফিসের অনেকেই তার শত্রু হিসেবে পরিণত হন। সম্প্রতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ কক্সবাজারে ভ্রমণে যাওয়ার সময় একটি দুর্নীতির ঘটনায় হাতে নাতে ধরা পড়ে মাহাবুবর রহমান। তখন তাকে সতর্ক করা হলে তিনি নিজে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। একপর্যায়ে বিকেলে ইস্তফাপত্র দিয়ে রাতে কৌশলে তা প্রত্যাহার করে নিয়ে ছুটির আবেদনপত্র জমা দেন। এরপর তিনি ছুটিতে থাকাকালিন রাতে অফিসে এসে নৈশপ্রহরীর মাধ্যমে দরজার হ্যাজবোল্ড ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে ফেলেন। একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে তিনি নিয়মবহির্ভুতভাবে এক বছরের ছুটির আবেদন করে ছুটির দিন রাতে নৈশ প্রহরীকে দিয়ে দরজা খুলতে বাধ্য করে নিজের ফাইলপত্র সংশোধনের কাজ করে আসছিলেন। সম্প্রতি তা জানতে পেরে তার কক্ষের দরজায় নতুন তালা লাগিয়ে দিয়ে তার নামীয় সাইনবোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে মাহাবুবর রহমান তার বিরোধিতাকারি সহকর্মী ও কর্মচারিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এমনকি তিনি অফিসে না থাকলে ছেলেসহ স্বজনদের দিয়ে তাদেরকে একে একে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। বিশেষ করে যে দুর্নীতির ঘটনায় তিনি ধরা পড়ের সেটির তথ্য একেএম শাহীদুজ্জামান টুটুলের মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে ধারণা করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে থাকেন।
এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টাকা না পাওয়ার পরও গোপনীয় শাখার টাইপিস্ট শাহীদুজ্জামানকে এক লাখ টাকাসহ দুদুকের হাতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। দুদক গ্রেপ্তারের আগে বা পরে পরিষদ চেয়ারম্যানকে না জানিয়ে পুলিশ দিয়ে তড়িঘড়ি করে শাহীদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেছে। গাড়িতে থানায় নেয়ার আগে মেহেদি হাসান ও হাসান হাদী শাহিদুজ্জামানকে মারপিট করে। উক্ত অভিযানের সময় জেলা পরিষদের কোন সদস্য শাহিদুজ্জামানের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে দেখেননি। এমনকি টাকা দেখতে চাইলেও সেই মুহূর্ত্বে তারা দেখাতে পারেননি।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, হাসান হাদী নামের এক হলুদ সাংবাদিক এবং সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসএম মাহবুবুর রহমানের ছেলে জেলা পরিষদের কর্মচারি মেহেদী হাসান এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। তারাই ওই নাটক সাজিয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসএম মাহবুবুর রহমানের খুবই ঘনিষ্টজন ওই হলুদ সাংবাদিক হাসান হাদী।
সংবাদ সম্মেলনে তারা আরো বলেন, সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের অতীতের যেসব বদনাম রয়েছে তা থেকে কাটিয়ে উঠতে আমরা কাজ করছি। প্রতিটি কাজে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নানা ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে জেলা পরিষদের সকল উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড চেয়ারম্যান ও নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমেই বরাদ্দ হয়ে থাকে। ফলে কোন কর্মচারীর পক্ষে কোন ধরণের বৈধ-অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। এছাড়া জেলা পরিষদের চলতি অর্থ বছরের বরাদ্দের তালিকায় দেবনগর রোকেয়া মাধ্যামিক বিদ্যালয়ের নাম নেই। ফলে এ ধরণের সাজানো কাহিনী তৈরী করে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শাহীদুজ্জামানের নি:শর্ত মুক্তি দাবি, দুদক ও পুলিশকে কলুষিত করতে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। নইলে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী কার্যক্রম ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনকালে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহীর গাড়ি চালক ফিরোজ হোসেন জানান, দুদকের উপ-সহাকারি পরিচালক মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমসএম মাহাবুবর রহমানের খুব নিকট সম্পর্কের কারণে তাদের গাড়িতে করে ওই দুদক কর্মকর্তাকে খুলনায় পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এ সময় ল্যাপটপ, মাছ, টাকাসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়। মাহাবুবর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকে চার বছর যাবৎ তিনি এ সব কাজ করে আসছেন।
জানতে চাইলে শাহীদুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি গত পহেলা জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত চিত্তবিনোদনের ছুটিতে রয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে এসএম মাহাবুবর রহমানের ছেলে মেহেদী হাসান তাকে মোবাইল ফোনে অফিসে আসার জন্য অনুরোধ করেন। এরপর তাকে পরিকল্পিতভাবে ঘুষ কেলেঙ্কারীতে ফাঁসানো হয়েছে।
তবে ছুটিতে থাকা সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসএম মাহাবুবর রহমান জানান, যথাযথভাবে ওঁৎ পেতে শাহীদুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তাকে ও তার স্বজনদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। তদন্তে বাস্তব সত্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মারুফ আহম্মেদ জানান, ঘুষের টাকাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় দুদকের খুলনা বিভাগীয় সহকারি পরিচালক মহাতাবউদ্দিন বাদি হয়ে শাহীদুজ্জামানের নাম উল্লেখ করে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এর ৫(২) ধারায় মঙ্গলবার থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতকে মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।