খোলা কলাম: টগবগে যুবক শহিনের মৃত্যু ও একজন চিকিৎসকের অপরাধী বানানোর চেষ্টা


প্রকাশিত : জুলাই ১, ২০১৮ ||

সামিউল মনির
গত ৩রা জুন তিন যুবক মটর সাইকেল নিয়ে কালিগঞ্জের অভিমুখে রওনা হয়। এসময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি প্রাইভেট কারের সাথে শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে মাত্র তিন কি. মি. দুরবর্তী সুন্দরবন ফিলিং স্টেশনের সামনে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘঠে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত তিন মটরসাইকেল আরোহীকে উদ্ধার করে। ইতোমধ্যে প্রাইভেট কারের মালিক শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সর আবাসিক মেডিকেল অফিস (আরএমও) ডাঃ আনিছ দুর্ঘটনার খবরে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মটর সাইকেলে চেপে ঘটনাস্থলে পৌছে।
কেননা তার স্ত্রী ফাহানা সুলতানা ঐ প্রাইভেট কারযোগে সাতক্ষীরা থেকে স্বামীর কর্মস্থলে ফিরছিল। এসময় ঐ প্রাইভেট কারটি সোহরাব মোড়ল নামের তাদের বেতনভুক্ত ড্রাইভার ড্রাইভ করছির বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শণার্থীরাও উপস্থিত সকলকে অবহিত করে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন জানায় মটর সাইকেল আরোহী তিন যুবক অত্যন্ত দ্রুত গতিতে হাসি-ঠাট্রা করতে করতে মটর সাইকেল ড্রাইভ করছিলেন। এসময় প্রাইভেট কার ও মটরসাইকেল দুইটি রাস্তার দুপাশ ঘেঁষেই বিপরীত দিক থেকে আসছিলো বলেও উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা কয়েকজন জানায় বয়সে বিশ বাইশ বছরের এসব তরুন দ্রুত গতিতে মটর সাইকেল চালাতে চালাতে হাসি-ঠাট্রা করার পাশাপাশি ‘ডস’ দিয়েও বাইক চালানোর পারদর্শীতার স্বাক্ষর রাখিছেলেন বলে তারা কয়েকজন প্রত্যক্ষ করেন। এক পর্যায়ে মটর সাইকেলটি প্রাইভেট কারের কাছাকাছি পৌছে রাস্তার বাম পাশ ছেড়ে কিচুটা মধ্যভাগে চলে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাইভেট কারের ডান পাশের সামনে সজোরে আঘাত করে ছিটকে পড়ে রাস্তার উপর।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্থানীয়দের পাশাপাশি ড্রাইভার সোহরাব মোড়ল এবং ডাঃ আনিসের স্ত্রী ফারহানা সুলতানাও গাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে আসেন। ইতিমধ্যে তার স্বামী ও প্রাইভেট মালিক, বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মীসহ স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে আহতদের উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তরন টগবগে শাহিনকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরাতে প্রেরন করা হয়। পরে খুলনা হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে কয়েকদিন কাটানোর পর বাবা-মায়ের কোল ছেড়ে চিরতরে চলে যায় সকলের প্রিয় শাহিন।
এঘটনার পরপরই কয়েকটি পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হয় যে ডাঃ আনিছ নিজেই আনাড়ী ড্রাইভার এবং সেই ড্রাইভ করছিলেন।
সংবাদ মাধ্যমে খবরটি অসার পর আমারও দারুন কষ্টের পাশাপাশি আনাড়ী ড্রাইভারের গুরুত্বপুর্ন এমন সড়কে গাড়ি চালানো নিয়ে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে ভুল ভাঙে সরেজিমনে ঘটনাস্থল, শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরির্দশনসহ কয়েক প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে কথা বলে। অনুসন্ধানে জানা যায় দুর্ঘটনাকালীন সময়ে ডা. আনিছ শ্যামনগর হাসপাতালে কর্তব্যরত ছিল। তার ড্রাইভার সোহরাব মোড়ল ডাঃ ফারহানা সুলতানাকে নিয়ে শ্যামনগরে ফিরছিলেন। এঘটনার বাইরে যে ইই মুহুর্তে আমি অপর একটি বিষয়ের উপর একটু আলোকপাত করতে চাই।
যেমন এখান থেকে ৬/৭ দিন আগে ’ঈদ উদযাপন ও দুর্ঘটনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদ’েন ‘সময় টেলিভিশনে’ সম্প্রচার হয়। মটর সাইকেল দুর্ঘটনার উপর ঐ সচিত্র প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার শিকার কয়েকজন স্বল্প বয়সী তরুন সরল স্বীকারোক্তি দেয় যে তাদের অসতর্কতার কারনে ঐসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছিল। তবে সবসময় যে মটর সাইকেল চালকদের অসতর্কতায় দুর্ঘটনা ঘটে এমন নয়। অনেক আনাড়ী ড্রাইভারের কারনে প্রায় প্রতিদিন এমন অনেক শাহিনের অকাল প্রয়ান হচ্ছে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে অন্য জায়গায়। যেমন গাড়িতে অবস্থান না করার পরও কেন একনজনকে ড্রাইভার সাঁজিয়ে তাকে অভিযুক্ত করা হবে। সম্প্রতি শাহিনের মুত্যর পর মামলাও হয়েছে। মামলার আসামী ‘টার্গেট’ ডাঃ আনিছ। অথচ যে কিনা ঘটনার সময় গাড়িতে ছিনা। তাকে এই মামলায় জড়ানো কতটা ঠিক আর কতটা বেঠিক হলো সে বিচারের দাবি পাঠকের। তবে সচেতন পাঠক সমাজসহ সর্বমহলে অমার কিছু বলার জন্য এ লেখা।
অপরাধীকে অপরাধী আর নিরাপরাধীকে নিরাপরাধী বলার মানসিকতা থেকে আমরা এত দ্রুত কেন দুরে সরে যাচ্ছি জানিনা। যতদুর জানি মানুষ গাছের বাকল আর লতাপাতা পরার অভ্যাস থেকে সভ্য হয়ে প্যান্ট শার্ট পরে আধুনিক সভ্যতায় পদার্পন করেছে। তারপরও এত নিচু মানসিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে কি আমাদের (মানুষের) সর্বোচ্চ বিচারালয় ‘নিজের বিবেক’কে প্রতিনিয়ত কাঠগড়ায় দাড় করাচ্ছি না?
আরও সবার মত আমিও চাই অপরাধীর বিচার হোক। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার নায্য বিচার পাক। শুধু কমে যাওযা নয় বরং বন্ধ হোক এমন নির্মম সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু তাই বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কারও ক্ষতির অপচেষ্টা কোন ধরনের মানসিকতার পরিচয় বহন করে?
তথসুত্রে জানা গেছে শ্যামনগর উপজেলার মোট জনসংখ্যা তিন লাখেরও বেশী কিছু। কিন্তু সীমান্ত সংলগ্ন পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জ, আশাশুনি এবং কয়রার বেদকাশিসহ আশপাশের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ৩৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও মাত্র ৬ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে সরকারি এ হাসপাতাল। যার মধ্যে একজন কিনা আবার ইউনানী বিভাগের।
এছাড়া ইউএইচএন্ড এফটিও, আর এমও ডাঃ আনিছ, ডাঃ মালহা খানম, ওমর ফারুক ও ডাঃ রেদোযান রাইছুল ইসলাম নামের পাঁচজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল।
শুনলে অবাক হতে হবে যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সেবা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মাত্র একজন (ডাঃ আনিছ) সার্জারীর চিকিৎসক রয়েছে।
মাঝেমধ্যে সরেজমিনে যেয়ে দেখা গেছে বাকি ৩/৪ চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে রোগীর যে ভিড়, তার থেকে ঢের বেশী রোগী অপেক্ষমান ডা. আনিছের চেম্বারের সামনে। তাই তারা নারী বা শিশু কিংবা বৃদ্ধ বা মধ্য বয়সী যেই হোক।
মাঝেমধ্যে অপারেশন থিয়েটারে থাকার দরুন রোগীদের অপেক্ষা করতেও দেখা মিলেছে অসংখ্যাবার।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে দালালী করছি। কিন্তু না। এটাই সত্যি।
সম্প্রতি ঐ র্দুঘটনা এবং অতি সম্প্রতি সবার প্রিয় শাহিনের মুত্যর পর হাসপাতালের যে চিত্র দেখা গেছে তাতে স্পষ্ট ধারনা মিলেছে স্বল্প সংখ্যাক চিকিৎসক থাকলেও তাদের মধ্যে অজানা আতংক বিরাজ করছে। কাজে মনোনিবেশ করতে পারছে মনে হলো না। একজন নিরাপরাধী সহকর্মীর এমন হয়রানীমুলক পরিবেশ সত্যিই সকলকে আচ্ছন্ন করেছে বলে আমার অন্তত মনে হয়েছে।
রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত অসংখ্যা দুর্ঘটনা ঘটছে। যার কোনটাই আমাদের কাম্য নয়। কিন্তু তদন্তের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে তার পোশাগত মানসিকতা ক্ষেত্রকে দুর্বল করে দেয়া কি কারও জন্য সঠিক পরিনাম বয়ে নিয়ে আসবে?
যে চিকিৎসক দিনে ৪০/৫০ জন রোগীর সেবা দেন এবং ৫/৭ টি অপারেশন করেন, আরএমও হিসেবে অন্তত দৈনিক বর্তি পঞ্চাশ থেকে সাট জহন রোগীর খোঁজ খবর নেিত ব্যস্ত থাকেন তাকে এমনকরে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়ার পরিনাম কি আমাদের ভেবে দেখা উচিত নয়?
যদি তদন্তে সে অপরাধী (ড্রাইভিং করছিল) প্রমান মেলে তবে তাকে উর্ব্ধতন কতৃপক্ষ কেন সরিয়ে নিয়ে সেবাপ্রাথীদের সঠিক সেবার মান নিশ্চিত করছে না।
আমি তো মনে করি এমনভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসক সংকটে ভুগতে থাকা শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সেবার মান আরও কমে যাবে দ্রুত সময়ে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে।
দেড় দশকের কাছাকাছি সময় ধরে অগ্রজ কিছু শ্রোদ্ধেয় বক্তির দিক নির্দেশনায় টুকটাক লেখালেখির সাথে আমি জড়িত। সে সুত্রে শাহিন দুর্ঘটনার পর থেকে শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবসহ কয়েকটি স্থানে অল্পবিস্তর যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পত্র-পত্রিকা পড়ে মনে হয়েছে এক পক্ষ আনিছকে ঘাতক বানাতে ব্যস্ত। আর অপর পক্ষ তাকে নিরাপরাধী প্রমানে তৎপর।
আমার প্রশ্ন ‘সবাই তো সংবাদকর্মী’ তাহলে কেন তাদের ভিতরে দুই পক্ষ চলে আসলো? সবাই কেন এক হয়ে শাহিনের ঘাতকের চিহ্নিত করা থেকে আইনের সর্বোচ্চ সাজার ব্যবস্থার বিষয়ে একমত হতে পারলো না ?
আসল বিষয়টি কোথায় তা খুঁজেও বের করা দরকার।
কয়েকদিন আগেও ‘সাংবাদকর্মী নামধারী’ কিছু ব্যক্তির স্পষ্ট কথোপকথনে শুনেছি ‘সুযোগ এসেছে এবার আনিছের থেকে কিছু ফাঁসানো যাবে’।
এই যদি হয় সাংবাদিকদের নীতি নৈতিকতা তবে চল্লিশ দিনের কাজ করে কিংবা ভ্যান বা রিক্সা চালিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করে, তারাও কি এসব (!) সাংবাদিক নামধারী প্রথিতযশা ব্যক্তির তুলনায় শ্রেয় মানুষ হিসেবে সমাজে জায়গা পেতে পারে না?
আমরা জানি কিছুদিন আগেও উপজেলা প্রশাসনের শিক্ষা বিভাগের এক অফিসারেরর সিকট থেকে সাংবাদিক নামধারী সমাজের সবচেয়ে (!) শ্রেয় শ্রেনীর একদল মানুষ পঁচিশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় ‘জুঁজু’র ভয় দেখিয়ে।
আমার লেখা শেষ করার আগে বলবো ইতিমধ্যে শাহিনের মৃত্যু নিয়ে মামলা হয়েছে, আদালত ও পুলিশ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তারপরও এক শ্রেনীর ‘‘ক’ বলম সর্বস্ব সাংবাদিক যাদের সাংবাদিকতার একটি পরিচয়পত্র না নাথলে চল্লিশ দিনের কাজ করে বা ভ্যান/রিক্সা চালিয়ে খাইতে হতো তাদের এত ছটফটানি কেন?
সবশেষে বলতে চাই কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা জানিনা। তবে চাই ঘটনার সুষ্ঠুতদন্ত ও বিচার হোক।
তবে একইসাথে চিকিৎসক সংকটে ভোগা এ জনপদের মানুষের চিকিৎসা সেবা বিঘিœত না হোক সে দাবি আম জনতা হিসেবে আমারও।