শুভ জন্মাষ্টমী ও আমাদের করণীয়


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ ||

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
আজ থেকে ৫২৪৫ বছর পূর্বে শক্রপুরির দুর্ভেদ্য কারাগারে যে শিশুটি দেবকির কোল আলো করে এসেছিলেন তিনিই শ্রী শ্রী কৃষ্ণ। তার শৈশব, কৈশর কেটেছে নন্দালয়ে সেখান থেকে শক্রর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পৃথিবীর পঙ্কিলতাকে দূর করে মানুষ কে দিয়েছে সত্য ও সুন্দর পথের সন্ধান। তিনি অন্ত:জগতে মানবাত্মার উন্নতি সাধন এবং বহি:জগতে মানব সমাজের রাষ্ট্রীয় বা নৈতিক পরিবর্তন সাধনের পথ দেখিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ পূর্বে যে সকল অবতার রূপে অবতীর্ণ হয়ে ছিলেন তা দ্বারা এক একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে। নৃসিংহ অবতার রুপে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিলেন। অবতার কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল, নরক ইত্যাদি অত্যাচারি রাজাগণকেই বিনাশ করেননি বরং মানবিক দৃষ্টি কোন থেকে এক মহান কাজ সম্পন্ন করেছেন। তিনি কালীয় নাগ দমন করে গোকুলে সকলের উৎকন্ঠা দুর করেছেন। তিনি মথুরার উগ্রসেনকে পুনরায় রাজপদে অভিসিক্ত করেছেন। কংস ভয়ে যারা ভীত হয়ে পলায়ন করেছিলেন তাদেরকে আশ্বস্ত করে, নিজ নিজ পদে এবং দারকার কল্যান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে শ্রীকৃষ্ণ প্রথম রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের কল্যানকামী ভূমিকার ধারনার সৃষ্টি করেন। শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন কল্যান রাষ্ট্রের জনক। অর্থাৎ রাষ্ট্র জনগণের অন্ন, বস্ত্র, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দেবে এই ব্যবস্থাটি সর্বপ্রথম শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিক্ষা দেন। কুরুক্ষেত্রের মহাসমরের ঠিক পূর্বক্ষণে কুরুপান্ডবদের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ শান্তি-স্থাপনের জন্যে যে ভূমিকা পালন করেন সেই দৃষ্টিকোন থেকে শ্রীকৃষ্ণ কে আধুনিক কুটনৈতিক ব্যবস্থার পূর্বসুরি বলা য়ায়। সর্বোপরি রণক্ষেত্রের যুদ্ধ উন্মাদনার দ্বারপ্রান্তে-দাঁড়িয়ে মানুষের জন্যে তাঁর কৃপার নির্দশন অমূল্য রতœ শ্রী শ্রী গীতা উপহার দেন। শ্রীকৃষ্ণ শুধু অলোকিক এবং ঐশ্বরিক ক্ষমতাই প্রদর্শন করেননি, বরং স্বয়ং কর্ম করে জগতের নিকট এক সুমহান আদর্শ স্থাপন করেছেন।
শ্রীকৃষ্ণকে অন্তরে ধারণ করতে হয়। যিনি সকল কামনা বাসনা ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ অনন্য চিত্তে আত্মাসমর্পণ করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ ভক্ত। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ‘যিনি কাহাকে ও দ্বেষ করেন না; যিনি সকলের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন ও দয়াবান; যিনি মমতাবুদ্ধি ও অহঙ্কার বর্জ্জিত, যিনি সুখে দুঃখে সমভাবাপন্ন, সদা সন্তুষ্ট, সমাহিতচিত্ত, সংযতস্বাভাব, দৃড়বিশ্বাসী, যাহার মন বুদ্ধি আমাতে অর্পিত, ঈদৃশ মদ্ভক্ত আমার প্রিয়।’ শ্রীগীতা(১৮/১৪)
শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত হতে হলে অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণের যে মর্মবানী তা হৃদয়ে ধারন করতে হবে। শ্রী গীতায় ১৮ তম অধ্যায়ে শ্রী কৃষ্ণ পরিস্কার ঘোষণা করেছেন, ‘তুমি একমাত্র আমাতেই চিত্ত রাখেবে, আমাকে ভক্তি কর, আমাকে পূজা কর, আমাকে নমস্কার করো, আমি সত্য প্রতিঞ্জা পূর্বক বলেতেছি, তুমি আমাকেই পাইবে, কেননা তুমি আমার প্রিয়। (১৮/৬৫)।
আজকের যুগে মানুষের চরম অবনতির একমাত্র কারণ হলো শ্রীকৃষ্ণে অত্মসমর্পণ করার অভাব। মানুষের দৃঢ়তা নেই। ঈশ্বর ভক্তি নেই-নেই হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেম। হিংসা নিন্দা পরচর্চা পর ধনলোভ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আজকের পৃথিবী সামগ্রিকভাবে অশান্ত হয়ে উঠেছে। আসুরিক শক্তি এমনভাবে আজকের পৃথিবীকে গ্রাস করছে যে সাধু সজ্জন বা শান্তিকামী মানুষের জন্যে এ পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। মনুষ্যত্ববোধ, বিবেকবোধ এক কঠিন হয়ে পড়েছে। মনুষ্যত্ববোধ, বিবেকবোধ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি-সভ্যতা সমাজ থমকে দাঁড়িয়েছে, মানবতা বোধ বলতে কিছু নেই-মুষ্ঠিমেয় দুরাচার-কংস, জরাসন্ধ ও শিশু পালের উত্তরসুরি হয়ে সভ্য পৃথিবীকে তারা কলংকৃত করেছে।
ধর্মপ্রাণ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন শান্তিকামী মানুষের রক্ষার জন্যে দুরাচার দুষ্টদের ধ্বংসের জন্যে শ্রীভগবানের ঐম্বর্যময় মুক্তি জাগ্রত হোক, আসুরিক শক্তি পদানত হোক, সুন্দর, শান্ত ঐশ্বর্যযুক্ত পৃথিবী আবার সাধুসজ্জনের পদচারনায় মুখরিত হোক, শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমীর প্রক্কালে এই প্রত্যাশায়।

কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মণে
প্রণত: ক্লেশনাশায় গোবিন্দায় নমো নমো:।