খোলা কলাম ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৮ ||

সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা। বাংলা সনের সম্ভবত ১২ শতকের গোড়ার দিকে অথবা তারও আগে কোন এক বছর ভাদ্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ তারিখ হিন্দুধর্মালম্বীদের মনসা পূজাও বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে মেলা বসত। পলাশপোল গুড় পুকুর পাড়ে বটগাছের নীচে।
পরবর্তীতে সেই মেলা রূপ নেয় ঐতিহ্যবাহী হিসেবে মেলার নাম গুড়পুকুর আর পুকুরের নাম গুড়। এই নামের আদি কথা এখনও কেউ উদ্ধার করতে পারেননি। কেউ কেউ বলেন, পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে বট গাছের নিচে মনসা পূজা ও পূজা অর্চনা শেষে যে প্রসাদ বিতরণ করা হত তার অধিকাংশ বাতাসা। সেই বাতাসাগুলো কেউ বাড়িতে নিয়ে যেত আবার কেউ এই পুকুরে ফেলে যেত। তার জন্য পুকুরের পানি মিষ্টি লাগতো। অনেকের ধারণা পুকুরে পানি থাকতো না বেশি দিন। স্বপ্ন দর্শনে পুরোহিতকে জানালো যদি মনসা পূজা দেযা হয় তবে পুকুরের পানি শুকাবে না। স্বপ্ন দর্শন মোতাবেক কাজ করা হল। সেই থেকে পানি আর শুকালো না। বয়:জেষ্ঠ্যদের মুখে শোনা যায়, পুকুরের তলদেশ থেকে নাকি মিষ্টি পানি উঠতো বা পুকুরের পাড়ে প্রচুর খেজুর গাছ ছিল এবং রসও হত প্রচুর। খেঁজুর গাছের রস দিয়ে গুড় তৈরি বিক্রি করা হল। বিক্রিত টাক দিয়ে পুকুরটি স্থানীয় সবাই মিলে খনন করা হল। সেই থেকে নাম হল গুড় পুকুর। (তথ্য সূত্র বুড়ন)।
সে দিনের সেই মেলা আজ অনেক ঐতিহ্যবাহী হয়েছে গোটা দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের কাছে। মেলা অনুষ্ঠানের পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। কলম চারা, কাঠ মিস্ত্রি বা ফার্নিচারের কারখানা কুমোরপাড়ায় ছেলে বুড়ো সবাই কাজের তোড়ে তাদের চোখের ঘুম প্রায় বিদায়। সাতক্ষীরার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব পড়তো। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মূল মেলা শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে দোকানীরা তাদের পসরাা সাজিয়ে বসে মেলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায়।
জেলা প্রশাসন ও সাতক্ষীরা পৌরসভার সার্বিক তত্ত্বাবধানে মেলাটির কেন্দ্রস্থল পলাশপোল গ্রাম ও পলাশপোল স্কুল প্রাঙ্গণ। কিন্তু পরবর্তীতে মেলাটির বিস্তৃত হয় সাতক্ষীরা শহরে খুলনা রোড মোড় থেকে তুফান কোম্পানী ছাড়িয়ে ইটাগাছা নিউ মার্কেট থেকে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক। মেলায় দেশ বিদেশের বহু পর্যটনের আগমনে মুখরিত হয়ে থাকতো পুরো সাতক্ষীরা শহর।
ঐতিব্যবাহী গুড়পুকুর মেলায় কলম চারা, ফার্নিচার ছাড়াও শিশুদের বিভিন্ন খেলা সাংসারিক জিনিসপত্র যেমন ধামা, কুলা, টুকরি, বটি, দেলকো, শাবল, খোন্তা, দা, ছুরি, কোদাল, হাড়ি পাতিল, থালা, প্লেট, জগ, গ্লাস বাটি প্রভৃতি পাওয়া যেত। গৃহস্থালির মধ্যে খাট-পালঙ্ক, তোষক, চেয়ার টেবিল, আলমারি, আলনা শোকেস, অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে বাতাসা, আখ, লেবু, বাতাবী লেবু, রসবন্দি, বদে, চানাচুর, জিলাপী, কদমা, মুড়ি, রসগোল্লা মিষ্টি মিঠাই, হাওয়া মিঠাই, দানাদার, নাড়–, মুড়ির মোয়া, গুড়মুড়ি, ঘোল, খই, মুড়কিসহ হরেক রকম বাহারী নামের খাদ্য সামগ্রী পাওয়া যেত। মেলা প্রাঙ্গণে সারাক্ষণ মৌ মৌ গন্ধে ভরে থাকতো। ইলিশ মাছ আর বাদাবী লেবু না নিয়ে মেলায় আশা কোন দর্শনার্থী ঘরে ফিরে যেত না। মেলায় দুরদরান্ত থেকে আসা দর্শণার্থীদের জন্য ছিল যাত্রাপালা, সার্কাস, মৃত্যকুপ, মটর সাইকেল খেলা, পুতুল নাচ, বিভিন্ন লটারী, হাউজিং খেলা। আর যারা দুরের দর্শণার্থী বাড়ি ফিরে যেত পারতো না তাদের জন্য সাতক্ষীরা সিমেনা হলগুলো নাইট শো’র আয়োজন করত।
কালের পরিক্রমায় সাতক্ষীরা ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকরের মেলা তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। আর সেই মেলা সারা শহর বিস্তৃত নয়, শুধুমাত্র সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০০২ সারে মেলা চলাকালিন সতাক্ষীরা স্টেডিয়ামে সার্কাস প্রাঙ্গণ ও সাতক্ষীরা রকসী সিনেমা হলে বোমা হামলার পর প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। এই কয়েকশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। কিন্তু সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও সাতক্ষীরা পৌরসভার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আবার গুড়পুকুর মেলার হারানো ঐতিহ্য পরে পেতে শুরু করেছে। গত শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে এ বছরের মেলা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে শুরু হয়েছে। সবাই মেলার আসুন, মেলা দেখুন, মেলার হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনি সাতক্ষীরা ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরে মেলা। লেখক: এসএম হাবিবুল হাসান