মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচরণ: ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ ||

মো. হাসানুল ইসলাম
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্থপতি বিশ্বের অন্যতম অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাঁড়া দিয়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পাক হানাদার বাহিনী সাতক্ষীরায় আসলে আমরা পরিবারসহ পশ্চিমবঙ্গে চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানাধীন কাটিয়ায় আব্বার মামার বাড়িতে স্বপরিবারে আশ্রয় গ্রহণ করি। সেখানে মাহমুদপুরের জুলফিকার সিদ্দিকের সাথে আমার পরিচয় হয়। দু’জন যুক্তি করে বশিরহাট আকাশবাণী ভবন মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কেন্দ্রে যেয়ে নাম লিপিবদ্ধ করি। ভর্তি কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন আর্মি খায়রুজ্জামান বাচ্চু ভাই। তিনি আমাদের টাকী যেতে নির্দেশ দিলেন। আমরা টাকী চিনি না, সেজন্য সেখানে থেকে যাই। পরের দিন আমি ও জুলফিকার অন্যান্য ছেলেদের সাথে টাকী চলে যাই। ক্যাম্পটি (ণড়ঁঃয ঈধসঢ়) ইউথ ক্যাম্প বলে পরিচিত ছিল। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন শ্রদ্ধেয় ক্যাপ্টেন শাহাজান মাস্টার, হিরেন গোলদার, আফজল হোসেন, আলী আকবর প্রমূখ। সেখানে এক ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হই। শত শত ছেলে কয়েকটি তাবুতে স্কুলের বারান্দা, পরিত্যক্ত বাড়িতে কোন রকম থাকতে হতো। খাওয়া দাওয়ার ভীষণ কষ্ট ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সেখানে কিছুদিন থাকার পর আমাকে মেডিকেল প্রশিক্ষণার্থী (এম.সি) হিসেবে বাছাই করে অন্যান্যদের সাথে ভারতীয় ক্যাপ্টেন এ.পি. সিপাহর পিপা ক্যাম্পে পাঠান হয় এবং জুলফিকার অন্যত্র চলে যায়। পিপা ক্যাম্পে প্রায় দেড় মাস অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে মেডিকেল ও হালকা সামরিক প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ৮নং সেক্টর হেডকোয়াটার কল্যাণীতে পাঠান হয়। ৮নং সেক্টর হেড কোয়াটারের নিকট ভারতীয় সেনাক্যাম্পে বিভিন্ন হালকা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শেষ করে হাকিমপুর অপারেশন ক্যাম্পে পাঠান হয়। আমার সঙ্গে রফিক মাষ্টার, আমিরুল, জুলফিকার, তপন দা, বমেন দা, নারায়ণ ভদ্র, দিনেশ, পবিত্র, প্রভাত আরোও অনেকে ছিল। আমরা কল্যাণী হতে হাকিমপুর পৌছাই তখন রাত্র গভীর মিত্র বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছিল এবং ঐ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
পরের দিন সকালে মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আতিয়ার ভাই ও প্রখ্যাত আনসার কমান্ডার মরহুম এলাহী বক্স সরদারের সাথে দেখা হয়। তাঁরা আমাদের সাবধানে থাকতে বলেন। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন বীর বিক্রম আমাদের সম্মুখ ভাগে যাওয়ার জন্য ইপিআর সুবেদার মালেক সাহেবকে নির্দেশ দেন সুবেদার মালেক, সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুব সাহেবকে বলেন স্যার এরা সম্মুখ যুদ্ধে টিকে থাকতে
পারবে না এদের দ্বারা আমাদের অস্ত্র গোলা বারুদ সম্মুখভাগে নিতে হবে। উভয়পক্ষের প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে আমরা মিত্র বাহিনীর সাথে ভাদলী কাকডাঙ্গার দিকে যেতে থাকি এই যুদ্ধে কলারোয়ার আমজাদের গায়ে গুলি লাগে ভাগ্যক্রমে চিকিৎসায় সে বেঁচে যায় এখনও সে জীবিত আছে। একদিন আমরা মুক্তিযোদ্ধারা হাকিমপুর সোনাই নদী পার হয়ে সম্মুখভাগে যাওয়ার জন্য নৌকার অপেক্ষা করছিলাম। নৌকায় উঠার সময় মিত্রবাহিনীর একজন জওয়ান এসে বললো মুক্তি ভাইরা তোমরা অপেক্ষা কর আমরা আগে যাব। আমরা নৌকা থেকে নেমে যাই। মিত্র বাহিনীর জওয়ানরা নৌকা উঠে নদীর মাঝখানে আসলে একটি পাকিস্তানী গোলা নৌকার পার্শ্বে পড়ে। এতে মিত্র বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান শহীদ ও আহত হন। এই নৌকায় আমরা থাকলে অবশ্যই মারা পড়তাম। আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গিয়েছিলাম। হাকিমপুরে গেরিলা গ্রুপ কমান্ডার শাহাদাত ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন আমাদের তিনি রফিক, আমিরুল জুলফিকার ও আমাকে আমাদের নিজ এলাকায় নিয়ে আসেন এবং আমাকে ভাড়–খালীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত গেরিলা কমান্ডার সামছুর রহমান ঢালীর গ্রুপে পাঠিয়ে দেন। সামছুর ভাই পূর্ব পরিচিতি ঘোনা হাইস্কুুলে একত্রে পড়তাম। আমরা ১৩ জন সামছু ভাইয়ের দলে ছিলাম যথা- সামছুর রহমান ঢালী কমান্ডার, আব্দার রহমান ২য় কমান্ডার, মফিজ উদ্দিন তৃতীয় কমান্ডার মতিয়ার, ফজলু, হাসান, আব্দুল্যা, মজিবর, কাসেম সরদার, কাসেম, রশিদ, আসাদুল ও মুসা আমিন মোট- ১৩ জন।
ভাড়–খালী খালের পশ্চিম পার্শ্বে আমাদের অবস্থান ছিল এবং খালের পূর্ব ঘোলা ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মাহমুদপুর, গাংনী ও ভোমরায় পাক হানাদারদের শক্ত ঘাটি ছিল। আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাজুক অবস্থায় ছিলাম। পাক বাহিনীর সংগে আমাদের প্রায়ই খন্ড যুদ্ধ লেগেই থাকত।
শাহাদাৎ ভাইয়ের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা কামরুজ্জামান বাবু, সোনা ভাই মালেক, আব্দুল্লাহ, আশু ও অরুনদা সাতক্ষীরা পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিলে পাক বাহিনীর মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে যায়। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণের মধ্যে পাক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে।
৬ ডিসেম্বর আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা বুহ্যতে সতর্ক দায়িত্ব পালন করছিলাম। রাত্রে পাকিস্তানী বাহিনীর যানবাহন যাওয়া আসা করছিল ও গাড়ীর আলো আমাদের ব্যাংকারে এসে পড়ছিল এবং বিক্ষিপ্ত গুলির আওয়াজ শুনছিলাম ও আমরা পাল্টাগুলি করছিলাম। পাকবাহিনীর আর্টিলারির গোলা আমাদের উপর দিয়ে ভারতের দিকে মারতে থাকে। ইতোমধ্যে ইপিআর হাবিলদার চান মিয়ার একটি দল আমাদের সংগে এসে যোগ দেয়। হাবিলদার চান মিয়া আমাদের বলেন, ‘সাবধানে থাকতে হবে কিছু একটা ঘটবে’। আমরা সমস্ত রাত্র জেগে থাকি। ভোর হওয়ার সংগে সংগে জানতে পারি পাকিস্তানী বাহিনী ঘোলা, মাহমুদপুর, গাংনী ও ভোমরা হতে রাত্রে পালিয়ে গেছে। আমরা অস্ত্রসহ দ্রুত মাহমুদপুরের দিকে রওনা দেই। মাহমুদপুরে আসলে প্রথমে সামছুদ্দিন গাজী আমাদের দিকে দ্রুত ছুটে আসে এবং চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে পাকবাহিনী মাহমুদ থেকে পালাইয়া গিয়াছে। মুক্তিযোদ্ধারা ও মিত্র বাহিনীর জওয়ানরা ভোমরার দিক থেকে সাতক্ষীরায় দ্রুত আসতে থাকে। আনন্দে আমরা যখন মাহমুদপুরে পৌঁছাইলে তখন ইপিআর ও মিত্র বাহিনীর বাঙালী সৈন্যরা আমাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে এই ‘মুক্তি তোমরা ওখানে দাঁড়ায়ে থাক নইলে মারা পড়ে যাবে’। আমরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি তারা এসে মাইন ডিটেকক্টর দিয়ে এন্টি পারসনাল মাইন অপসারণ করে। আমার ও মুজিবরের দুপায়ের মাঝ থেকে ২টি মাইন অপসারণ করে। নেহায়েত আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন। ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকাররা সাতক্ষীরা হতে যশোর ও খুলনার দিকে পালাতে থাকে এবং সাতক্ষীরা আল্লাহর রহমতে হানাদার মুক্ত হয়। আমরা তাদের পিছনে ধাওয়া করতে থাকি। পাকিস্তান বাহিনী পালিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকাল, বিনেরপোতা, পাটকেলঘাটা ব্রীজ উড়িয়ে দেয়। ক্যাপটেন মাহবুব উদ্দীনের নেতৃত্ব সকল মুক্তিযোদ্ধারা খান সেনাদের পিছনে ধাওয়া করে প্রথমে চুকনগর পরে কেশবপুর হয়ে মনিরামপুরে উপস্থিত হয়। ঐ সময় খুলনা শিরোমনি এলাকায় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনীর প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল। মনিরামপুরে কুখ্যাত জল্লাদ মেহের আলী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে। মনিরামপুরে কয়েকদিন থাকার পর ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দিনের সাথে ঝিনাইদহে পৌছাই। তিনি সেখান থেকে আমাদেরকে বিদায় জানান, আমরা সাতক্ষীরা চলে আসি। লেখক: সদর উপজেলা কমান্ডার