ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলার কুল চাষীরা


প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৯, ২০১৯ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: বিপনন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে সাতক্ষীরায় কুল চাষীরা ন্যায মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে চলতি বছরে জেলাতে ১০ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হ্রাস পেয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে জেলাতে কুল চাষ হলেও বিদেশে রপ্তানি করতে না পারায় কুল চাষের সম্ভবনা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছে চাষীরা। তাদের দাবী আমের মত কুল বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে এ খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমানে রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে। তবে সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাস জানান, কুল রপ্তানির বিষয়ে সরকার চেষ্টা করছে। চাষীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
বহু বছর ধরে ব্যক্তি পর্যায়ে জেলাতে কুল চাষ হয়ে থাকলেও মূলত ২০০০ সালের পর থেকে এ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষ শুরু হয়। ফসলটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠায় কুল চাষীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এছাড়া পরিবেশ বিপর্য়য়ের কারণে জেলাতে ধান, পাট ও আখের আবাদ হ্রাস পেয়ে কুলের আবাদ বাড়তে থাকে। খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় চাষীরা কুল চাষে ঝুকতে থাকে।
চলতি বছরে জেলাতে কুলের আবাদ না বাড়লেও ফলন বেশি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর জেলাতে কুলের বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষীদের দাবী জেলার চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমানে কুল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে বিক্রি হচ্ছে। অন্য যে কোন জেলার তুলতায় সাতক্ষীরার কুল বেশি সুস্বাদু বলে সারাদেশে এর কদর বাড়ছে। কিন্তু ন্যায দাম পাওয়া নিয়ে সংঙ্কয় রয়েছে কুলচাষীরা। তাদের দাবী যথাযথ সংরক্ষণ ও বিপননের অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমানে কুল নষ্ট হয়ে যায়। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি কুল চাষ হয়। তবে সাতক্ষীরা, রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহে ভালো ও উন্নত জাতের কুল চাষ হয়।
জেলার নামকরণে গাণিতিকভাবে যে সাতটি জিনিস প্রসিদ্ধ তার মধ্যে কুল একটি অন্যতম ফল। জেলার প্রসিদ্ধ সাতটি জিনিস হলো, কুল, ওল, আম, ঘোল, সন্দেশ, মাদুর ও গাছের কলম।
চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকহারে কুল চাষ করা হয়েছে। এবার উৎপাদনও বাম্পার হয়েছে বলে জানান চাষীরা। স্বল্পসময়ের অধিক লাভজনক এ ফসলটি চাষে কৃষকদের মধ্যে খুবই আগ্রহ বাড়িয়েছে বলে জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সাতক্ষীরার বাউ, নারকেল, গাব, বিলেতি ও আপেলকুলসহ বিভিন্ন প্রকার কুলের সুনাম রয়েছে। স্বল্পখরচ ও ঝুঁকি কম থাকায় জেলার বেকার যুবসমাজ ও চাষিদের একটি বিরাট অংশ এ কুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কুল চাষ করে এ জেলার অনেকেই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে দূর করেছে বেকারত্ব, সৃষ্টি করেছে নতুন কর্মসংস্থানের।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ জেলাতে ৬৪২ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৯০ হেক্টর জমিতে, কলারোয়া উপজেলায় ৩১৬ হেক্টর জমিতে, তালা উপজেলায় ১৬০ হেক্টর জমিতে, দেবহাটা উপজেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে, কালিগঞ্জ উপজেলায় ২১ হেক্টর জমিতে, আশাশুনি উপজেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে, শ্যামনগর উপজেলায় ২৫ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হয়েছে।
এবছর জেলাতে আবাদকৃত কুলের উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৭০৭৮ মে:টন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪০৫ মে:টন, কলারোয়া উপজেলায় ৩১৬০ মে:টন, তালা উপজেলায় ৩০৪০মে:টন, দেবহাটা উপজেলায় ৪৫ মে:টন, কালিগঞ্জ উপজেলায় ১১০ মে:টন, আশাশুনি উপজেলায় ৮৮ মে:টন এবং শ্যামনগর উপজেলায় ২৩০ মে:টন ।
২০১৬-১৭ মৌসুমে জেলাতে কুলের আবাদ হয়ে ছিল ৬৫২ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে জেলাতে ১০ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হ্রাস পেয়েছে। ২০১৫-১৬ মৌসুমে জেলাতে কুলের আবাদ হয়ে ছিল ৪৯০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়ে ছিল ৩ হাজার ৪৩০ মে.টন বিভিন্ন প্রজাতের কুল। ২০১৪-১৫ মৌসুমে জেলাতে কুলের আবাদ হয়ে ছিল ৪৮৫ হেক্টর জমিতে যার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১২২ মে.টন কুল।
তালা উপজেলার দাদপুর গ্রামের কুলচাষি মুনছুর আলী জানান, পরীক্ষামূলভাবে প্রথমে এক বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন। পরিক্ষামূলক হলেও সে বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে তার অর্ধলক্ষাধীকটাকা লাভ হয়। কৃষক আইয়ুব হোসেন আরো জানান, ফসলটি লাভজনক হওয়ায় অন্যান্য ফসল উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন প্রজাতের কুল চাষ করছেন তিনি। এতে তার প্রতি মৌসুমে সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা লাভ হয়।
একই উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি গ্রামের আব্দুল গফুর, রফিকুল ইসলামের সাথে কথা হয়। তারা জানান, অন্য ফসলের চেয়ে কুল চাষে লাভ বেশি। কিন্তু বিদেশে রপ্তানি করতে না পারলে তারা কুলের ন্যায্য মূল থেকে বঞ্চিত হবে।
প্রতিদিন জেলা বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী কুলের হাট বসছে। মিঠাবাড়ির আমজাদ হোসেন। তিনি একজন আড়ত দার। তিনি জানালেন, প্রতিদিন তার আড়তে ৮০ থেকে একশ মণ কুল ক্রয় বিক্রয় হয়। ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০ টাকা পর্যন্ত পাইকারী দামে কুল কেনা বেচা হয়। সাতক্ষীরা, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারী বিক্রেতারা তার আড়ত থেকে কুল ক্রয় করেন। তার দাবী জেলাতে প্রতিবছর কোটি টাকার কুল কেনা বেচা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাস জানান, সাতক্ষীরার মাটি কুল চাষের জন্য উপযোগী। স্বল্পখরচে অধিক লাভজনক এ ফসলটি চাষে এ জেলার কৃষকদের মধ্যে খুবই আগ্রহ বাড়ছে। তিনি আরো জানান, চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৬শ’২৪ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রজাতের কুল উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে কলারোয়া ও তালা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি কুল চাষ হয়েছে। আগামী বছর কুল চাষ এ জেলায় আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আরো জানান।