চলে গেছে দিন তবু স্মৃতি রয়ে গেছে


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৯ ||

 

আজিজুল হক আরিফ: উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাফিজ-আল-আসাদ। বদলী জনিত কারণে দেবহাটা উপজেলাকে ছেড়ে গেলেন তিনি। কিন্তু রেখে গেছেন স্মৃতিবিজড়িত তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আর কাজগুলো। হাফিজ-আল-আসাদ ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি তারিখে দেবহাটায় যোগদান করেন। তিনি যোগদানের পর নিজস্ব রুচি আর সৃজনশীল ব্যক্তিত্বে দেবহাটায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। যার ফলে উপজেলাটি হয়ে উঠেছে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। চাকরি জীবনের শুরুতে ২০১১ সালে পটুয়াখালী জেলাতে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হাফিজ-আল-আসাদ। পর্যায়ক্রমে দেবহাটায় যোগদান করে বিভিন্ন স্থানে এনেছেন দৃশ্যমান পরিবর্তন। জেলা প্রশাসকের দিকনির্দেশনায় এবং তার ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারের স্বপ্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে কাজ করেছেন তিনি। উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নের বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ, উপজেলা পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় এবং নিজস্ব অর্থায়নে পরিবর্তন এনে সু-সজ্জিত করে গেছেন। ২০১৭ সালের পূর্বে দেবহাটা উপজেলার গেইট নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। সেটি বাস্তবে রূপ নিয়েছে তার হাতে। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অংশ ৯নং সেক্টরের অধীনে ছিল দেবহাটা। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখতে দেবহাটা উপজেলা পরিষদের পুকুরের পাশবর্তী স্থানে তৈরী করা হয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। উপজেলা পরিষদ চত্তরকে সৌন্দর্য্যমন্ডিত করতে এসএস পাইপ দিয়ে চমৎকার ফুলের বাগান তৈরী করা হয়েছে। শুধু ফুলের বাগান নয় সাথে তৈরী করা হয়েছে ঔষধি বাগান। উপজেলার ভূমি অফিসে সেবা গ্রহীতাদের বসার স্থান (কাছারি ঘর) নির্মান হয়েছে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। বর্তমানে সেবা গ্রহীতারা সেটি ব্যবহার করছে। সরকারের স্বপ্ন, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে ভ্যান, দোকান, ওজন মাপার মেশিন, সেলাই মেশিন, গরু-ছাগল প্রদান এবং আশ্রয়হীন ভিক্ষুকদেরকে ঘর নির্মান সম্পন্ন করা হয়েছে। ৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার পাকা গৃহ নির্মান করে দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য প্রথম পাকা সাইকেল ও মোটরসাইকেল সেড নির্মাণ হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা প্রদানের জন্য ডিজিটাল হাজিরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদে সেবা গ্রহীতাদের জন্য ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা পরিষদে শিশু পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। শিশুদের বিনোদন প্রদানের লক্ষ্যে যেখানে শিশুদের জন্য  ব্যালান্স, দোলনা, স্লিপারসহ ইত্যাদি রয়েছে। সরকারি কর্মজীবী নারীদের বাচ্চাদের জন্য উপজেলা পরিষদে ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে আধুনিকায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শ্রেণি কক্ষে মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি যোগ হয়েছে ডিজিটাল হাজিরার ব্যবস্থা। পাঠদান ও সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন এবং ৬০ প্রাথমিক বিদ্যলয়ে ১৯ ইঞ্চি মনিটর, ১৬জিবি পেনড্রাইভ প্রদান করা হয়েছে। এদিকে, প্রচীনতম দেবহাটার উপজেলা সীমানা নির্ধারণ পুষ্পকাটি টু বেজর আটিতে দেবহাটা উপজেলার সীমানা নির্ধারক পিলার, সখিপুর মোড়ে দেবহাটা উপজেলা পরিষদের অবস্থানের চিহ্ন নির্দেশক তথা ইনডিকেটর, ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার, মহিলাদের নামাজের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি দপ্তর ও উপজেলা চত্বরে সিসি ক্যামেরা এবং ইন্টারকম স্থাপন করতে সক্ষম হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সাথে সাথে দেবহাটা উপজেলার দর্শনীয় স্থান রুপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র এনে দিয়েছেন দৃশ্যমান উন্নয়ন। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দিকনির্দেশনায় রিসোর্ট সেন্টারের প্রশিক্ষণ কক্ষ সজ্জিতকরণ, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের জন্য মনোরম পরিবেশ, বিভিন্ন সৃষ্টিশীল ছবি ও হস্তশিল্পের সংযোজন, সীমানা প্রাচীর, গেইট, শিক্ষকদের জন্য গোলচত্তর স্থাপন, সাইকেল ও মোটরসাইকেল সেড নির্মাণ, নামাজের ঘর নির্মাণ, রাতে আলোকসজ্জা, সৌন্দয্যবর্ধক বিভিন্ন কর্মকান্ড, প্রাচীর ও দেয়ালে মহান ব্যক্তিদের বানী, ক্যাম্পাসে ফুলের বাগান ইত্যাদি তৈরী সম্পন্ন সহ অসংখ্য কর্মকান্ড বাস্তবায়ণ করেগেছেন তিনি। আশ্রায়ন প্রকল্পের আওতায় ঘর পাওয়ার উপযুক্ত ৯০টি পরিবারকে গৃহনির্মাণ, বিভিন্ন রাস্তা ও নির্মান কাজে অনিয়ম বন্ধ করতে নিজেই খোঁজ খবর নিতে তিনি। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করতে যেয়ে নিজেই ক্লাস নিতেন। অপরাধ দমনের লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার, ক্লিনিক, হাসপাতাল, ঔষধের দোকান, মৎস্য ডিপো, বেকারী, ফলের ফরমালিনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতেন ইউএনও হাফিজ-আল-আসাদ। তার নানামূািখ কর্মকান্ডে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে পারুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, সাবেক ইউএনও একজন কাজ প্রেমিক ছিলেন। তার কাছে যে কেউ গেলে তার কথা মন দিয়ে শুনতেন। তাদের কথা শুনে সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতেন। তিনি আরো বলেন, আমার ইউনিয়নের কদবেলতলা টু সুবর্ণাবাদ গামী পিচের রাস্তার দুপাশে প্যালাসাইডিং ঢালাই দেওয়ার সময় লোনা পানি ব্যবহার করছিল ঠিকাদারের লোক। এমন খবর জানতে পেরে আমি সেখানে যেয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করি। কিন্তু ব্যার্থ হয়ে ইউএনও স্যারকে খবর দিই। তিনি স্ব শরীরে হাজির হয়ে সেটি বন্ধ করে সঠিক ভাবে কাজ করার নির্দেশ দিলে সে মোতাবেক সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন খালগুলো খনন করে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা সচল করেছেন। শুধু তাই নয় তিনি প্রতিবছর ভিক্ষুকদের সাথে ইফতার করতেন এবং তাদের পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কাজ করেছেন। নিয়িমিত ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিসের কর্মকান্ড মনিটরিং করতেন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি উপজেলার প্রতিটি এলাকার সুবিধা অসুবিধা বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন। এপর্যন্ত অনেক নির্বাহী অফিসার দেবহাটায় এসেছেন। কিন্তু তারমত অত্যন্ত আন্তরিক, সৎ, হাস্যোজ্জ্বল, কর্মদক্ষ অফিসার কখনো আসেননি। তিনি ছিলেন সবার থেকে ব্যতিক্রম। তার কথা দেবহাটাবাসী মনে রাখবে সারাজীবন। ইউএনও মহোদয় সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও সমাধানের জন্য সপ্তাহের বুধবার গনশুনানি ও বৃহস্পতিবার আমাদের ইউএনও চালু করছিলেন। সেটি বন্ধ না হয় সে জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানিয়েছেন।