ভোমরা বন্দরে আবারো ষড়যন্ত্র!


প্রকাশিত : মার্চ ১৪, ২০১৯ ||

এম জিললুর রহমান: ভোমরা স্থলবন্দরের চলমান কার্যক্রম নিয়ে অবারো গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এ বন্দরে ব্যবসা করার চেষ্টা করলেও কতিপয় সুযোগ সন্ধানী নেতা ও সাবেক কয়েকজন সিএন্ডএফ নেতার ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে আমদানি ও রপ্তানি। ফলে বেকার হয়ে পড়ছে এখানকার হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। সরকার বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য রাজস্ব থেকে। বিএনপি জামায়াতের ছত্রছায়ায় থাকা এসব ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় বন্দরের চলমান গতিবিধিকে নিজেদের পকেটের স্বার্থে বিঘিœত করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন। সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিল মাত্র ১৬টি পণ্যের অনুমোদন নিয়ে যাত্রা শুরু করে ভোমরা স্থল বন্দর। তৎকালীন সময়ে স্থলবন্দরে রূপ দিতে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল স. ম আলাউদ্দীনের। কিন্তু বন্দরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য কু-চক্রী একটি মহল বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা স. ম আলাউদ্দীনকে ওই বছরের ১৯ জুন রাত ১০টা ২৩ মিনিটে শহরের নিজ পত্রিকা অফিসে গুলি করে হত্যা করে। এরপর বন্দরের সকল নিয়ন্ত্রণ আলিপুর বাহিনীর হাতে চলে যায়। তারা দায়িত্ব নিয়ে করতে থাকে বন্দরে নানা অনিয়ম। এসময় নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব বিভাগ তাদের কথা না শোনায় রাজস্ব কর্মকর্তার রুমে নারী ঢুকিয়ে দিয়ে ছবি তুলে ব্লাক মেইল করে নিজেদের মত ব্যবসা করতে থাকে। এক পর্যায়ে এসে সিএন্ডএফ এজেন্ট থেকে ও ব্যবসায়ীক জায়গায় তাদের সিটকে পড়তে হয়। অসে অন্যান্য নেতৃত্বের হাতে। শুরু হয় নতুন করে ব্যবসা বাণিজ্যের পথ। বিগত ২০১৩ সালে তৎকালিন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভোমরা বন্দরকে উন্নীত করণে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি তা ওয়ার হাউজ নির্মাণে বরাদ্দও দেন। নতুনভাবে গতি ফেরে বন্দরটিতে। আশার আলো জাগে শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এভাবে কয়েক বছর চলার পর প্রতিযোগিতা শুরু হয় সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বা সেক্রেটারি হওয়ার। এসব খায়েস মিটাতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা নয়, বরং শহরের কতিপয় রাজনীতিক ও প্রশাসনের দারস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় এখানকার নেতাদের। এরপর থেকে শুরু হয় ভোমরা বন্দরে ব্যবসায়ীদের ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার নামে ব্যাপক প্রস্তুতি। এসময় এত নিরাপত্তা দেয়া হয় যে, প্রার্থী ভোটার ও ব্যবসায়ীদের কেহ বন্দরের এ্যাসোসিয়েশন ভবনে প্রবেশ করতে পারেনা। আর সভাপতি সেক্রেটারির খায়েস মিটানো নেতারা বন্দরে নয় সাতক্ষীরা শহরের কতিপয় রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দরবারে ঘুরতে থাকে, নিজের ভাগ্য ফেরাতে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এভাবেই গঠিত হওয়া কয়েকটি কমিটির কারণে ব্যবসায়ীদের সাথে কর্মকর্তাদের দুরত্ব দিন দিন বাড়তেই আছে।
ভোমরা স্থল বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভাবনাময় এই বন্দরটি জন্মলগ্ন থেকেই বার বার হোচট খেতে খেতে বিশ্বয়করভাবে আজও স্বচল আছে কেবল মাত্র ঐশ্বরিক ইচ্ছায়। বন্দরটিতে প্রধান অন্তরায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বল্পতা, জমি অধিগ্রহনসহ সার্বিক উন্নয়নে দীর্ঘসূত্রিতা, দক্ষ জনবলের অভাব, কিপিং লাইসেন্স না পাওয়াসহ নানাবিধ সমস্যার মধ্যেও কেবলমাত্র কোলকাতা থেকে ভোমরা বন্দরের দূরত্ব সর্বাপেক্ষা কম হওয়ায় পঁচনশীল ও অতি পঁচনশীল পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে ভোমরা স্থল বন্দর আমদানীকারকদের কাছে প্রাধান্য বেশি। কেবল মাত্র ফল আমদানির মাধ্যমেই প্রতিমাসে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে ভোমরা শুল্ক স্টেশন। এভাবে এগিয়ে যাওয়াকে একটি মহল গত ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ থেকে আবারও শুরু করেছে ষড়যন্ত্রের নীল নকশা। এরই জেরধরে সহকারী কমিশনারসহ রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে অতি পঁচনশীল পণ্য আমদনীতে সরকার নির্ধারীত ১০ ভাগ ছাড়ও মানা হচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভোমরা স্থল বন্দরে প্রাপ্য সুযোগটুকুও ব্যবসায়ীদের না দিয়ে আরও কষাঘাতে রাখা হয়েছে। ফলে এখন দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক ফল আসলেও এরআগে এই বন্দর দিয়ে ১৩০ থেকে ১৫০ ট্রাক ফল আমদানি করা হয়েছে। আর আমদানি নির্ভর বন্দরটি এখন রাজস্ব ঘাটতির কবলে আছে।

এসব বিষয় নিয়ে রাতে কথা হয়, বন্দরের আমদানিকারক দিপংকর ঘোষের সাথে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাঁচা পণ্য আমদানিতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেটুকু ছাড় দেয়ার কথা সেটুকু ছাড় না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এবন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এবন্দরে পাথর ও ফল আমদানি বেশি হয় কিন্তু বিধি মোতাবেক ১০ভাগ ছাড় না দেয়ায় এবং এটির উপর কড়াকড়ি আরোপ করায় বন্দরের দৈন্যতা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, গাড়ির জ্যাম এত বেশি ছিল যে পন্য আনলোর্ড করতে বেশ সময় লাগার খোড়া অজুহাত এনে বলেন একারণেও ব্যবসায়ীরা অন্যত্র যাচ্ছে। তবে বিধিমোতাবেক ১০ ভাগ ছাড়কে অনিয়মের অভিযোগ এনে কতিপয় ব্যবসায়ীরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করেছে এমন প্রশ্নের বিপরীতে তিনি বলেন, ঘটনা শুনেছি, তবে কারা তা বলতে পারবো না।

এবিষয়ে রাতে ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের কাষ্টম বিষয়ক সম্পাদক আমীর হামজা বলেন, প্রতিদিন ভারতীয় পাড়ে ৬শ’ গাড়ি আসে যার অর্ধেক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই গাড়ি দীর্ঘ সময় অফেক্ষার কারণে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে জানিয়ে বলেন, ভোমরা পোর্টে আনলোর্ডের সিরিয়াল পাচ্ছে না যে কারণে অন্য পোর্টে চলে যাচ্ছে তারা। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অতি দ্রুতই পোর্ট আবারো ব্যবসা বান্ধব হয়ে উঠবে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে রাতে আরও কথা হয় বন্দরের যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমানের সাথে তিনি বলেন, যদিও ভোটের কারণে প্রচ- ব্যস্ততার মধ্যে আছি। বন্দরে যাওয়া আসা খুব কম হচ্ছে তারপরও ভোমরা এখন ব্যবসা মুখি নেই এমনটি জানিয়ে বলেন, অনেকদিন পর বন্দরের ব্যবসায়ীরা উজ্জিবীত হয়। এতে রাজস্বও বাড়তে থাকে। তিনি কাস্টমস কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করে বলেন, তাদের দুর্ব্যহারের কারণে ব্যবসায়ীরা অন্য বন্দরে চলে গেছে। একটু সুযোগ সুবিধা না থাকলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে চায় না। যে ট্রাকটি আমাদের বন্দরে ১৬ বা ২০ টন পণ্য আমদানি করে ঠিক সেই ট্রাকটি সিলেটের একটি বন্দর দিয়ে অর্ধেকের চেয়েও কম দেখিয়ে দেশে প্রবেশ করায় এবন্দর ছেড়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করে এবং কারুর নাম উল্লেখ না করে বলেন, এই বন্দরে যাদের ব্যবসা নেই তারাই অন্যদের ব্যবসার সুযোগ বন্ধ করতে এই ধরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তারা কারা সাতক্ষীরার সাংবাদিক ভাইরা জানে।


রাতে দৈনিক পত্রদূতকে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও ভোমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনারুল ইসলাম জানান, বন্দর এ্যাসোসিয়েশনের কতিপয় কয়েজন ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ভাগবাটোয়ারা করতে যেয়ে কর্মকর্তারা স্ট্যা- রিলিজ হয়েছে। এখন যারা এসেছে তারা শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে কাজ করায় ব্যবসায়ীরা এবন্দর থেকে চলে গেছে। বর্তমানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজের অভাবে বসে আছে। দিন কাটাচ্ছে বেকার হয়ে। প্রচন্ড ক্ষতির মখে ব্যবসায়ীরা। এসব বিষয় নিয়ে সত্য কথা বললে আমি আর বাড়িতে ঘুমাতে পারবো না বলেও মন্তব্য করেন আনারুল ইসলাম।
ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম জানান, দেশের সকল পোর্টে আমদানি রপ্তানি প্রায় শত ভাগ করেছে সরকার। এখানের ব্যবসায়ীরা এক একজন এক এক রকম পন্য আমদানি করে। কিছূ ব্যবসায়ী আছে যারা ফল আমদানি করে আসছে। এখানে ফলের ক্ষেত্রে ক্যারেট বা কাঠের বাক্সের জন্য দুই কেজির মত ছাড় ছিল। অন্য সব পন্য স্কেলিং হওয়ায় আর কোন পন্যে ছাড় না থাকায় ব্যবসায়ীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ১৮০ জন সিএন্ডএফ এজেন্ট এর মধ্যে ১৫/১৬ জন ফলের ব্যবসা করলে অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিহিংসার জায়গায় তৈরি হয়। এতে করে নিজেদের মধ্যে এবং দেশের অন্যান্য বন্দরের ব্যবসায়ীদের নানান ঝামেলার কারণে এখন একটু হ্রাস পেয়েছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি এটির সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে বন্দরের দায়িত্বশীল কিছু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, বন্দরের কতিপয় ব্যবসায়ীরাই এসব ষড়যন্ত্র অব্যহত রেখেছে। তারা এরআগেও এভাবে ষড়যন্ত্র করেছে। এমনকি ২০১৩ সালে বন্দরে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু হলে তৎকালিন পুলিশ সুপার দুই একজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষনা দিলে আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। এসব ষড়যন্ত্রে তারাই থাকতে পারে বলে মনে করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
তবে বন্দরের বর্তমান সহকারি কমিশনার নেয়ামুল হাসান রাতে অতিরিক্ত পন্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দৈনিক যতটা গাড়ি আসতো এখন ততটাই আসছে তবে আইটেম কমবেশি হতে পারে। পাশাপাশি একটু কমলেও তাতে বার্ষিক রাজস্ব আহরণের কোন সমস্যা হবেনা। কারণ অর্থ বছরের এখনও অনেক সময় হাতে আছে। এরমধ্যে রাজস্বর ঘাটতির অংশ উঠে আসবে।