নবজাগরণে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ


প্রকাশিত : এপ্রিল ১৪, ২০১৯ ||

সুভাষ চৌধুরী
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। বাঙালির নবজাগরনের দিন। সেই ছেলে বেলায় ক্লাসরুমে শিক্ষকের মুখে শুনেছি ‘পুরাতন সব কিছু ঝেড়ে ফেলে, যতো সব বদ আর গোলমেলে, এসো মোরা করি বন্দনা চিত্তে, সারা বছর চলি যেনো হাসি আর নৃত্যে’। পহেলা বৈশাখে কলমবন্ধুদের কাছে পোস্টকার্ডে লাল নীল সবুজ কালিতে সুন্দর হস্তাক্ষরে একই কথা লিখে পোস্ট করেছি। কলমবন্ধুদের কাছ থেকেও পেয়েছি বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। পহেলা বৈশাখ আসতেই শিক্ষকদের সেই মুখের বাণী আজও বারবার মনে আসে। নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করি, গাওয়ার চেষ্টা করি। আজ প্রযুক্তির কল্যাণে নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন মোবাইল ফোন আর ফেইসবুকে বন্দী হয়ে পড়েছে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশে^র এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালির শুদ্ধ সংস্কৃতির আত্মপ্রকাশের দিন। এই দিনকে সামনে রেখে নানা আয়োজন বাঙ্গালির ঘরে ও বাইরে। যে সংস্কৃতি স¤্রাট আকবরের আমলে সৌরবর্ষ (বঙ্গাব্দ) ও চান্দ্রবর্ষকে (হিজরি) এককমাত্রায় নির্ধারনের সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশ বিবেচনায় পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ উদযাপনের দিন ধার্য করা হয়। সূর্যকে মানদন্ড ধরে সৌরবর্ষ অথবা ফসলীবর্ষ হিসেবে এটিকে চিহ্ণিত করা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজে এভাবেই যাত্রা শুরু পহেলা বৈশাখ নববর্ষের। শুরু হয়েছিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতা। আজও তা চলছে, চলবে অনাদিকাল ধরে।
আমাদের এই লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে নানা সময়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। একে সাম্প্রদায়িক কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলা আর পহেলা বৈশাখের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সংস্কৃতি বাঙ্গালি জাতি গোষ্ঠীকে দিয়েছে পরশ মণি। এই পহেলা বৈশাখে জঙ্গি হামলা হয়েছে। রমনা বটমূলে রক্ত ঝরেছে। যশোরে উদীচির অনুষ্ঠান হয়েছে রক্ত¯œাত। এরপর থেকে বলা যায় পহেলা বৈশাখ আরও তেজদীপ্ত হয়ে জাগরিত হয়েছে। বাঙালির জাতির আবহমান সংস্কৃতির সাথে মিলে মিশে গেছে। ‘আগুনের পরশ মনি ছোঁয়াও প্রাণে’র মতো আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সেই যে ধারা চলছে আবহমানকাল ধরে তা চলবেই। এবারও শুদ্ধ সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশে জাতি এক ও অভিন্ন পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই একে সাম্প্রদায়িক কিংবা অন্য কোনো কালিমা দিয়ে লেপন করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদীরা আমাদের বাংলা ভাষাকে ভয়ের চোখে দেখেছে। তারা বুঝেছে বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক শক্তির প্রণোদনা প্রজন্ম বহন করলে তাকে পরাভূত করা যাবে না। আর এ জন্যই বাংলা নববর্ষের নানা আয়োজনে আঘাত এসেছে বারবার। যেমনটি এসেছিল ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার ওপর। আজও বৈশাখ এলে ধর্মান্ধতার চিন্তা থেকে অনেকে বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করেন। বাঙ্গালির দীর্ঘ দিনের লালিত লোকজ উৎসবের সৌন্দর্যকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চান তারা। কিন্তু আমাদের ইতিহাস বলে বাঙ্গালি সংস্কৃতি বিনাশী কোনো ষড়যন্ত্র কখনও সফল হয়নি। আগামিতেও হবে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান আমলে এই ভূখন্ড থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রায় নিষিদ্ধ করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেদিন রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচারও বন্ধ ঘোষনা করেছিল পাকিস্তান সরকার। তবে এর প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিলেন ভাষা গবেষক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পল্লীকবি জসীমউদ্দিনসহ সমসাময়িক কালজয়ী প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিজনরা। তারা রুখে দিয়েছিলেন পাকিস্তানীদের এই অপতৎপরতা। সেদিনও আধিপত্যবাদীদের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। এরপরই ঢাকায় প্রতিষ্ঠা লাভ করলো সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ‘ছায়ানট’ সিদ্ধান্ত নিলো প্রতি বছর নববর্ষ অবগাহন হবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গান দিয়ে। সেই ধারা আজও চলছে। এখন সংবাদ মাধ্যমে, বেতার, টেলিভিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেসে আসছে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো, তাপস নিঃশ^াস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা, দুর হয়ে যাক যাক যাক’। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তাঁর ‘কান্ডারী হুশিয়ার কবিতায় লেখেন ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ, কান্ডারি! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ, হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারি ! বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র’।


মানবিক ও লোকজ সাংস্কৃতিক চেতনা দিয়েই আমরা বরণ করি বাংলা নববর্ষকে। আমাদের এই চেতনায় সংযুক্ত হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির জাতীয় সংগ্রাম। এই চেতনায় আমরা লাভ করেছি লাল সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ। রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। নববর্ষ উদযাপনে বাঙ্গালি আজও মেতে উঠবে। নতুন চেতনায় নতুন প্রেরণায় তারা জাগরিত হবেন। প্রতিবছরই একটি অর্থবহ বর্ষবরণের অপেক্ষায় থাকি আমরা । এবারও একই অপেক্ষায়। বাঙ্গালি তার এই চেতনা ধারন করে এগিয়ে যাবে। বাঙালি তার লোকজ সংস্কৃতিকে বারবার শক্তির প্রণোদনা হিসেবে দেখবে। কোনো অপশক্তি এই চেতনায় কুঠারাঘাত করতে পারবে না। কারণ বৈশাখের এই শক্তিতে বার বার ফিরে আসবে শুদ্ধ সংস্কৃতি। লেখক: সাতক্ষীরা করেসপনডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি