ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে জেলায় আম চাষীদের মাথায় হাত!


প্রকাশিত : মে ৫, ২০১৯ ||

আসাদুজ্জামান সরদার: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে জেলার আম চাষীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরেই সাতক্ষীরার আম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ বছরও আশায় বুক বেঁধেছিলেন তারা। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে আম গাছের ডাল ভেঙেছে এবং অনেক আম ঝরে গেছে। এতে করে জেলার আম চাষীদের মাথায় হাত উঠেছে। অনেক চাষী জানিয়েছেন তাদের খরচ উঠবে না।
কৃষি বিভাগের দাবি, ফণীর কারণে যে আমগুলো থাকার কথা কিন্তু সেগুলো পড়ে গেছে। সে কারণে আম রপ্তানিতে কিছুটা প্রভাব ফেলবে। তারপরও এ বছর আম রপ্তানি হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্ততর জানায়, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এ লক্ষ্যে জেলার প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমির ৩ হাজার ৯৮৯টি বাগানে আম গাছ পরিচর্যা করা হচ্ছে।
এরমধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ১ হাজার ৫৪০টি বাগানে ১২ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন, কলারোয়ার ৬৫০ হেক্টর জমির ১ হাজার ৩৫০টি বাগানে ৬ হাজার ৩৫ মেট্রিক টন, তালায় ৭১৫ হেক্টর জমির ১ হাজার ৪৫০টি বাগানে ৭ হাজার ৬০ মেট্রিক টন, দেবহাটায় ৩৮০ হেক্টর জমির ৪৭৭টি বাগানে ৩ হাজার ৬৮৫ মেট্রিক টন, কালিগঞ্জে ৮২৫ হেক্টর জমির ১৪২টি বাগানে ৮ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন, আশাশুনিতে ১৪০ হেক্টর জমির ১৯০টি বাগানে ১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন ও শ্যামনগরে ১৬০ হেক্টর জমির ১৫০টি বাগানে ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
এদিকে, সাতক্ষীরা থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩১.৮৩ মেট্রিক টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৭ মেট্রিক টন নিরাপদ ও বালাইমুক্ত আম রপ্তানির পর চলতি মৌসুমেও আম রপ্তানির লক্ষ্যে জেলার ৫০০ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সাতক্ষীরা সদরের আম চাষী মকবুল হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র কারণে আমার ২০টি বাগানের প্রায় ২৫০ মণ ঝরে গেছে। দুইদিন আগে যে আম ১২শ’ টাকা মণ বিক্রি করেছি। সেই আম আজ ২০০ টাকা মণ বিক্রি করতে হয়েছে। ঝড়ে সবার আম পড়েছে এজন্য আম কেউ কিনতে চাচ্ছে না। বিক্রি করলেও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ পর থেকে পাকা আম বিক্রি শুরু হবে। এই মুহুর্তে ফণীর কারণে আম সব পড়ে গেছে। বাগন লীজ খরচ ও শ্রমিক খরব উঠবে না। এই ঝড়ে আম চাষীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।’
সাতক্ষীরা বড় বাজারের মানিক ফল ঘরের সত্ত্বাধীকারী মতিয়ার রহমান বলেন, ‘জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার বাজার দখল করেছে সাতক্ষীরার কাঁচা আম। প্রতিদিন এ জেলা থেকে ৩ থেকে ৪ ট্রাক আম রাজধানী ঢাকার বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রায় দুই সপ্তাহের ধরে বাজারে কাঁচা আম উঠতে শুরু করেছে। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার মণ কাঁচা আম তিনি ক্রয় করে ঢাকাতে পাঠান।
তিনি আরও বলেন, ‘ঝড়ের পড়া আম বিক্রি হয় না। আমের দাম নেই। এবার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন জানান, ‘ঘূর্ণিঝর ‘ফণী’র কারণে জেলের অনেক গাছের আম ঝরে পড়েছে। যে আমগুলো থাকার কথা ছিলো সেই আমগুলো পড়ে গেছে। তারপরও খুব একটা সমস্যা হবে না। ঝরে পড়ে যাওয়া আম দিয়ে আচার তৈরী করে বা বিক্রির করে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে সাতক্ষীরার অন্যন্য জেলার চেয়ে ১০/১৫ দিন আগে বাজারে উঠে। গত কয়েক বছর ধরে সাতক্ষীরার আম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ সাতক্ষীরার যখন আঘাত হানে তখন এর গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় ৫৮ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে সাতক্ষীরায় ৭ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ফণী এখন নি¤œ চাপে রূপান্তির হয়ে দেশের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থান করেছে।’
এদিকে, উপকুলীয় উপজেলা শ্যামনগরসহ কিছু কিছু এলাকায় বেলা বাড়ার সাথে সাথে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে মানুষ নিজ গৃহে ফিরতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। সেখানে আবহাওয়া এখন অনেকটা শান্ত রয়েছে। তবে সেখানকার আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে রাতে সুপেয় পানি ও শুকনা খাবারের অভাব দেখা দেয় বলে অনেকেই অভিযোগ করেন।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৬শ’ কাঁচা ঘর-বাড়ি আংশিক বিদ্ধস্ত হয়েছে। এছাড়া জেলায় ২ হাজার হেক্টর ফসলি জমির এবং শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৫ কিলোমিটার বেঁড়িবাধের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো জানান, দুর্যোগ কবলিত মানুষের মাঝে ইতিমধ্যে ২৭শ’ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩১৬ মেট্রিক টন চাল, ১১ লক্ষ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা, ১১৭ বান টিন, গৃণ নির্মাণে ৩ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা ও ৪০ পিস শাড়ি বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জেলায় ১৬০ টি আশ্রয় কেন্দ্রে এখনও দুর্যোগ কবলিত মানুষ অবস্থান করছেন। কৃষি বিভাগের কাছে আমের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানতে চেয়েছি। সেটা জানার পর সরকারের কৃষি ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে জানিয়ে দেব। গত কয়েক বছর সাতক্ষীরার আম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হছে। আশা করছি এবারও রপ্তানি হবে।