কালিগঞ্জে ছাত্রীদের বারবার যৌন হয়রানি করেও রেহাই পাচ্ছেন শিক্ষক শহিদুল!


প্রকাশিত : মে ১৩, ২০১৯ ||

বিশেষ প্রতিনিধি: কালিগঞ্জের পূর্বনলতা গ্রামের মৃত ইমান আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম (৩৯)। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্কুলে চাকরি করার সময় শিক্ষার্থীদের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয়াসহ যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠছে ছাত্রীদের পক্ষ থেকে। লম্পট ওই শিক্ষকের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসি মানববন্ধন, বিক্ষোভ, জুতা প্রদর্শন ও ঝাড়– মিছিল করলেও শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে বারবার দায়সারা তদন্ত করছেন এবং অন্য স্কুলে বদলী করে ঘটনার ইতি টানছেন। নতুন কর্মস্থলে যেয়ে কিছুদিনের মধ্যে ওই শিক্ষকের দ্বারা আবারও ঘটছে যৌন হয়রানির ঘটনা। বিতর্কিত শিক্ষক শহিদুল ইসলামের দ্বারা ছাত্রীদের একের পর এক যৌন হয়রানির ঘটনা উপজেলা জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে চলেছে।
সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ উপজেলার ৭৬ নং সন্ন্যাসীর চক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ ওঠে বহুলালোচিত শিক্ষক শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নিগৃহীত শিক্ষার্থীর অভিভাবকসহ আরও কিছু অভিভাবক মৌখিক অভিযোগ দেন প্রধান শিক্ষক শিবানী সরকার, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মুছা করিম ও ওই ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিদ্যালয়ের মা সমাবেশে যেয়ে অভিযোগের তদন্ত করে প্রাথমিক সত্যতা পান। তিনি অভিভাবকদের বিক্ষোভের মুখে অভিযুক্ত শিক্ষককে এক সপ্তাহের মধ্যে অন্যত্র বদলীর আশ^াস দেন। কিন্তু লম্পট শিক্ষক শহিদুল ইসলামের সাথে সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমানের রয়েছে অন্যরকম এক নিবিড় সম্পর্ক। এছাড়াও একজন শিক্ষক নেতার প্রচ্ছন্ন আশির্বাদ শহিদুলের সাথে থাকায় অভিভাবকদের কাছে দেয়া বদলীর আশ^াস দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। আশ^াসের ভিত্তিতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর লম্পট শিক্ষক শহিদুল ইসলামের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ছাত্রীর মা উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমানসহ অপর দুই সহকারী শিক্ষা অফিসার ওমর ফারুক ও একেএম মোস্তাফিজুর রহমানকে সম্পৃক্ত করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে রক্ষা করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে নলতা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু রহিমবক্স পাড় (৪৫)। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গত ২ মে সকালে সরেজমিন তদন্ত করেন। স্কুলের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও তদন্তকে প্রভাবিত করতে ওই দিন সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে অপতৎপরতা চালাতে থাকেন ওই রহিম বক্স পাড়। এসময় রহিম বক্স পাড় ও শিক্ষক শহিদুল ইসলাম অপ্রয়োজনীয় লোকজন জড়ো করে যৌন নিগ্রহের শিকার ছাত্রীর সম্মানহানী করার চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে ভুক্তভোগী ছাত্রীর মা জানান, বর্তমানে রহিম বক্স পাড় ও সহযোগীরা শহিদুল মাস্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। ঘটনার পর থেকে তার মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট থেকে কোন প্রতিকার না পেলে প্রয়োজনে আদালতে মামলা করবো।
স্কুল মাদারস ফোরামের সভাপতি আকলিমা পারভিন, সম্পাদক শাবানা খাতুন, ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশীদ, মোক্তার গাজী, আব্দুল আলিম, নূর ইসলাম, শিক্ষার্থী সাবিনা খাতুন, তোহরা খাতুনসহ কয়েকজন জানান, ইতোপূর্বে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির কারণে শহিদুল ইসলাম মৌতলা, কাশিবাটি, কাজলা, নলতা, শুইলপুর, সর্বশেষ সেন্ট্রাল সেহারা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আন্দোলন, ঝাঁটা ও জুতো পেটার মুখে বিতাড়িত হন। এসব ঘটনায় কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় এখানে এসেও তিনি পূর্বের মতো অপকর্ম করার লোভ সামলাতে পারেন নি। তাছাড়া নিজেকে বাঁচােেত এখন কাছে পেয়ে গেছেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা রহিম পাড়কে। ইজ্জত বাঁচাতে শহিদুল মাষ্টার ইতোমধ্যেই টাকা ছড়াচ্ছেন। সন্ন্যাসীর চক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার জন্য মোস্তাফিজুর রহমান ও রহিম পাড়কে দায়ী করে তারা অবিলম্বে লম্পট শহিদুলকে অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটি একজন সদস্য জানান, তদন্তে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী যৌন নিগ্রহের বিষয়টি জানিয়েছে। এমতাবস্থায় অভিযুক্ত শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে ওই স্কুলে রাখার সুযোগ নেই। তদন্তে যেটুকু পাওয়া গেছে সেভাবেই প্রতিবেদন দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষক শহিদুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, অহেতুক তার সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করছে একটি মহল। ঘটনা ধামাচাপা দিতে কোন টাকা খরচ বা কাউকে প্রভাবিত করার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আমি সন্নাসীর চক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকতে চাই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়ের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।