সুন্দরবনকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে দেদারছে আসছে ভারতীয় রোগাক্রান্ত গরু রুট পরিস্কার করতে ত্রিশ লাখ টাকার মিশনে এক হুন্ডি ব্যবসায়ী


প্রকাশিত : জুন ১৩, ২০১৯ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: ভারতীয় অংশের কালিতলার আশরাফ আলী, যোগেশগঞ্জের কার্তিক ও অমল আর চিংড়ীখালীর হাসানুররা ভারতীয় রোগাক্রান্ত গরু পৌছে দিচ্ছে কচুখালীর বিপরীত অংশ ঝেটামুখোর চরাঞ্চলে। ভারতীয় সুন্দরবন সংলগ্ন ঐ অংশ থেকে সুবিধামত সময়ে ভারতীয় সহযোগীদের রেখে যাওয়া গরুর চালান নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশের সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে লোকালয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে সেসব গরু।
মাঝেমধ্যে বিজিবির অভিযানে গুটি কয়েক চালান আটক হলেও বিস্তৃত সুন্দরবনকে ব্যবহার করে প্রতিদিনই আনা হচ্ছে এমন অসংখ্যা চালান। তবে যে শুধু রোগাক্রান্ত গরু আর আনা হচ্ছে তেমনটি নয়। বরং গরুর এসব চালানের সাথে সাথে প্রচুর পরিমানে মাদকদ্রব্য, এমনকি অস্ত্র আসছে প্রতিনিয়ত।
ভারতীয় অংশে আশরাফ, কার্তিক, অমল, হাসানুর ও শমসেরনগরের রাম প্রসাদের মত বাংলাদেশের অন্তর্গত সুন্দরবন প্রান্তের যাবতীয় বিষয়াদি তদারকি করছে আব্দুল্লাহ। শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি গ্রামের আকবর তরফদারের ছেলে এ আব্দুল্লাহ ইতিপুর্বে গরুর চালানের সাথে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আসার সময় কোষ্টগার্ডের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস করেন। তার বিরুদ্ধে অর্ধ ডজন মামলায়ও রয়েছে। পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় কর্মরত জেলে বাউয়ালীসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে ভারতীয় ঐ পাচার চক্রের পাশাপাশি এদেশীয় আব্দুল্লাহ গং-দের ‘গডফাদার’ হিসেবে মুল ভূমিকা পালন করছে ছোট মানা নামের এক ব্যক্তি। যে কিনা ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত গরু আব্দুল্লাহ এবং তার সহযোগীদের সহায়তায় বেঁচাবিক্রির পর কমিশনের টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতীয় গরু মালিকদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
রমজাননগর ও সোরা গ্রামের আবুল হোসেন ও মাসুদ আলীসহ কয়েকজন জানায় আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে রোগাক্রান্ত গরু এনে মানিকখালী গ্রামের মাহতাবসহ অন্যদের মাধ্যমে গ্রাম্য ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে। এ কাজের জন্য বাংলাদেশী মুদ্রায় আব্দুল্লাহকে গরু পিছু আট হাজার পর্যন্ত টাকা দেয়া হয়ে থাকে।
এদিকে টেংরাখালী গ্রামের সাবেক এক ইউপি সদস্য জানায় আব্দুল্লাহ এবং তার স্থানীয় কয়েক সহযোগী সুন্দরবনকে গরু পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে গড়ে তুলেছে। মাঝেমধ্যে রিভারাইন বিজিবিসহ আইন প্রয়োগকারী কয়েকটি সংস্থার অভিযানে দু’চারটি চালান আটক হলেও আব্দুল্লাহ তার ‘গডফাদার’ ছোট মানার আশির্বাদে প্রতিনিয়ত ভিন্ন ভিন্ন পথে দিব্যি একের পর এক ভারতীয় রোগাক্রান্ত গরুর চালান ও মাদকদ্রব্যসহ অস্ত্র নিয়ে আসছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করে জানিয়েছে সামনের কোরবানীর বাজারকে ‘টার্গেট’ করে ছোট মানা তার ভারতীয় গরু আনা ও বেঁচাবিক্রি নির্বিঘœ করতে মোট ত্রিশ লাখ টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। সব পক্ষকে ম্যানেজ করতে ছোট মানা প্রয়োজনে আরও বেশী টাকা খরচ করতে সম্মত বলে তার কয়েক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহকর্মীর দাবি।
তবে সাম্প্রদিতক সময়ে রিভারাইন বিজিবির জোর টহলের কারনে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে পুরো রুট এখন পর্যন্ত ‘ক্লিয়ার’ করতে না পারলেও আপাতত আব্দুল্লাহ ও তার কয়েক সহযোগীর মাধ্যমে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে শমসেরনগর, ঝোড়খালী, যোগেশগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু আনা কার্যক্রম ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ ঐ চক্রটি। ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের নিযুক্ত এজেন্টরা ভারতীয় সুন্দরবনের নির্দিষ্ট অংশে গরু রেখে যাওযার পর আব্দুল্লাহ ও তার সহগোযীরা সেসব গরু নিয়ে বাংলাদেশী সুন্দরবনের ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছে দিচ্ছে এসব গরু।
পরানপুর গ্রামের আতাউর ও রবিউলসহ কয়েকজনের দাবি ভারত থেকে আব্দুল্লাহ ও তার সহযোগীরা গরু আনে কিনা সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। কিন্তু সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে যেসব গরু নিয়ে আসা হচ্ছে সেসব গরু দারুনভাবে রোগাক্রান্ত। অনেক গরু দীর্ঘদিন না খেয়ে বনের মধ্যে বন্দী অবস্থায় পাচারের অপেক্ষায় থাকার কারনে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার পুর্ব মুহুর্তে পাচার চক্রের সদস্যরা তা জবাই করে স্থানীয়দের মধ্যে স্বল্পমুল্যে বিক্রি করে।
স্থানীয়রা আরও জানায় আব্দুল্লাহ ও তার সহযোগীদের হাত হয়ে ভারত থেকে আসা গরুর চালান মানিকখালীর মাহতাব আলীর হাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা শ্যামনগর ও কালিগঞ্জসহ সাতক্ষীরার বিভিন্ন অংশে। শুরুতে সুন্দরবনের বিভিন্ন রুট ঘুরে গরুসমুহ সোরা ও মানিকখালী বিলসহ আশপাশের এলাকা এবং এসব এলাকার স্থানীয়দের বাড়িতে একটি দুইটি করে গরু তারা কয়েক দিনের জন্য রেখে দেয় নির্দিষ্ট অংকের বিনিময়ে। পরবর্তীতে ক্রেতা মিললে আব্দুল্লাহ গং এসব গরু বিক্রি করে ছোট মানার মাধ্যমে ভারতীয় মালিকের কাছে সমুদয় টাকা পাঠিয়ে দেয়।
এদিকে জানা গেছে স্থানীয় এক ব্যক্তি পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে এসব গরু পাচার চক্রের সদস্যদের নিকট থেকে গরুপিছু এক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলা যায়নি।
এদিকে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে গুরু পাচারের বিষয়ে জানতে চাইতে চাইলে মুটোফোনে আব্দুল্লাহ জানায় সুন্দরবনের ভিতর থেকে চুরি চাপটামি করে কেউ কেউ কিছু কিছু গরু নিয়ে আসছে। তবে তিনি নিজে এসব কর্মককান্ডের সাথে জড়িত নয় দাবি করে জানায় বার/চৌদ্দ দিন আগে হাসান ও সাতক্ষীরার হারুন নামের দুই ব্যক্তি তাকে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে কিছু গরু পাচার করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেন নি। এক পর্যায়ে ছোট মানার সাথে তার সখ্যতার বিষয়ে আব্দুল্লাহ জানায় ছোট মানা খাটাল মালিক। তাই গরু কেনা বেচার জন্য তার সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়।
এদিকে একই বিষয়ে ভারতীয় গরু পাচার চক্রের গডফাদারখ্যাত ছোট মানার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বলেন, এখন গরু আসছে না। আমি খাটাল ব্যবসায়ী। খাটাল বন্ধ থাকায় এখন আমি গরু আনছি না। তবে চুরি চাপটামি করে গরু আনার মধ্যে আমি নেই।
তবে এই ছোট মানার বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে খাটাল ব্যবসার আড়ালে ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের হাতে কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচারের অজ¯্র অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ঐদিন ছোট মানা জানান ত্রিশ লাখ টাকা এক জায়গায় করা লাগবে, তারপর তো মিশনে নামার প্রশ্ন। এসব কথা অবান্তর এবং একেক জন একেক সময় তার বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার করে থাকে।