খোলা কলাম দরিদ্র কিশোরের মাথা থেতলে ভ্যান ছিনতাই: মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়


প্রকাশিত : জুলাই ৫, ২০১৯ ||

গাজী আবদুর রহিম
গত ২৮ জুন, শুক্রবার সাতক্ষীরার দরিদ্র কিশোর ভ্যানচালক শাহীনের (১৪) মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে ও মাথা ভ্যানের রডে ঠুকে মাথা থেতলে ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় সারা দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। এই ঘটনাটি ঘটে সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানার ধানদিয়া নামক স্থানে। কিশোর শাহীন পার্শ্ববর্তী যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক হায়দার আলী মোড়লের ছেলে।
উক্ত স্থানটি জনমানব শূন্য থাকার কারণে নাইমুল (২৪), আরশাদ পাড় ওরফে নুনু মিস্ত্রি (৬৫) ও আব্দুল ওহাব (৪৫) প্রমূখ পাষ- সন্ত্রাসীরা হত দরিদ্র কিশোরের মাথা থেতলে দিয়ে, তাকে পাট ক্ষেতের ধারে ফেলে রেখে ভ্যান ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ভ্যান দিতে রাজি হয়নি বলে সন্ত্রাসীরা এই কিশোরকে হত্যার চেষ্টা করে বলে জানায়, ঢামেক এ ভর্তি হওয়া গুরুতর অসুস্থ শাহীন। সাতক্ষীরা থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সময় একবার মুখ খুলে সে বলে ওঠে, ‘তোদের এত কোরে কলাম আর মারিস নে আমারে’। এই কথার মধ্য ফুটে উঠেছে একমুঠো ভাতের জন্য ভ্যান নিয়ে পথে নামা ছোট্ট এই বাচ্চাটা যখন মার সহ্য করতে পারছিলেন না, তখন হয় তো ভয়াবহ মানুষগুলোর কাছে মিনতি করেছিলেন। এই মিনতিই হয়তো লাখো মানুষের চোখের অশ্রু হয়ে বেরিয়ে এসেছে পরে।
শাহীন মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়া লেখা করছেন, অবসর সময়গুলোতে সংসারের টানাপোড়েন এড়াতে ও ছোট দুই বোনের পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য সম্বলহীন বাবার এনজিও থেকে টাকা ধার নিয়ে কেনা ভ্যান নিয়ে পথে নেমে পড়েন অল্প কিছু রোজগারের জন্য। এত ছোট মানুষ কিন্তু ভাবনার স্তরটা তার কতটা ঊর্দ্ধে। তার কথা শুনলে চোখ দিয়ে দুফোটা অশ্রু ফেলতে কার না মন আনচান করে। আর, করুণ পরিণতিতে বেড়ে ওঠা বাচ্চাটার ওপরেও ভয়াল সন্ত্রাসীদের এই ছোবল।
দেশের সামাজিক মূল্যবোধের কতটা অবক্ষয় হয়েছে ভাবতেও আবাক লাগে, পেটের দায়ে ভ্যান চালাতে আসা বাচ্চাটার কাছ থেকে তার সংসারের অবলম্বন ভ্যানগাড়িটা ছিনিয়ে নিতে, তাকে এভাবে মেরে রাস্তার পাশে ফেলে রাখার মত ঘটনা আগে কখনও ঘটতে দেখা যায়নি। ভ্যানটার দাম আনুমানিক পচিশ হাজার টাকা। পচিশ হাজার টাকার জন্য এই কিশোরকে হত্যার চেষ্টা। আহা রে বাংলাদেশ! এরআগে কখনও শুনিনি মাত্র পচিশ হাজার টাকার জন্য মানুষকে এভাবে নির্যাতন করতে। শাহীনের মত আর কোন দরিদ্র মানুষের ওপর যেন এমন নির্যাতন দেশে না হয়। এই ঘটনা দেখার পর কি কাজে যাওয়া ছেলেটার জন্য মার মনের অস্থিরতা শতগুন বেড়ে যাবে না?
এই ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার ফলে সাধারণ জনগণ এই করুণ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। সোস্যাল মিডিয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সংবাদটি দেখতে পেয়ে শাহীনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।
সোমবার সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের একটি টিম এ ঘটনায় জড়িত তিন আসামীকে গ্রেফতার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, কেশবপুর বাজিতপুর গ্রামের নাইমুল ইসলাম (২৪), সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার আলাইপুর গ্রামের আরশাদ পাড় (৬৫) ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গোবিন্দকাটি গ্রামের বাকের আলী (৪৫)। বুধবার দ্বিতীয় দফায় পুলিশ আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে, এদের মধ্য রয়েছে জাহাঙ্গীর (২৭), নোরিম মোড়ল (৭৮) ও আজগর হোসেন (২৬)। সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছে এই ছয় নরপশুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। আশা করি, প্রশাসন এই হতদরিদ্র কিশোরের ওপর অমানবিক নির্যাতনের সঠিক বিচার করে আসামীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। লেখক: সংবাদকমী