অনাবৃষ্টির আকাশ: ব্যাহত আমন চাষ


প্রকাশিত : জুলাই ১১, ২০১৯ ||

এসএম শহীদুল ইসলাম: ষড়ঋতুর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায়ের পথে আষাঢ় মাস। শ্রাবণের আগমনী বার্তার অপেক্ষায় প্রকৃতি। জেলায় এবার আষাঢ়েও ঝরেনি কাক্সিক্ষত বৃষ্টি। দুই এক দিন ছিটে-ফোটা বৃষ্টি হলেও তা কৃষি ও কৃষকের কোনো কাজে লাগেনি। আষাঢ়-শ্রাবণের সন্ধিক্ষণে অনাবৃষ্টির আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকলেও ঝরছে না কাক্সিক্ষত বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে রোদ আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি কৃষকের কোনো কাজে আসছে না বলে জানান কৃষকরা। এতে সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ জনপদের কৃষকরা বৃষ্টির অভাবে আমনের চারা লাগাতে পারছেন না। পানির অভাবে কৃষকেরা পাট জাগ দিতেও বিপাকে পড়ছেন।
সদর উপজেলার আলিপুর, ভোমরা, শিবপুর, আগরদাড়ি, ঝাউডাঙ্গা, বল¬ী, ব্রহ্মরাজপুর, লাবসাসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পানির অভাবে জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না কৃষকেরা। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে জমিতে পানি দিয়ে আমনের চারা রোপণ করছেন।
এলাকার কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পানির অভাবে আমনের আবাদ ও পাট জাগ দিতে কষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা আমন চাষাবাদে শ্যালোমেশিন ব্যবহার করছেন। অনেকেই বৈদ্যুতিক মটরপাম্প ব্যবহার করছেন। অনেকেই আবার বোরো ধান উঠার সাথে সাথে মটরপাম্পও ঘরে এনে রেখেছেন। মটরপাম্পগুলো বাড়িতে থাকায় সেগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমন আবাদ ও পাট জাগ দেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। কৃষকরা আরও জানান, কাক্সিক্ষত বৃষ্টি না হওয়ায় এবার পাটের বৃদ্ধি ও ফলন আশানুরূপ হয়নি।
ভরা বর্ষাতেও বৃষ্টি না হওয়ায় নদ-নদী, খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ওই পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাঁরা আমনের জমি আবাদ করেছেন, তাঁরা সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন। তাঁরা কোথাও পানি পাচ্ছেন না। এতে আগাম লাগানো ধানক্ষেতগুলো পানির অভাবে বিবর্ণ হয়ে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা ফসল বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। সেই সঙ্গে কৃষি বিভাগের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলার ৭টি উপজেলায় একই অবস্থা বিরাজ করছে। জেলার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা, তালা, কলারোয়া ও সদরের ৭৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় আমন চাষে কোমরবেঁধে মাঠে নামার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু অনাবৃষ্টি কৃষকদের সে আশায় ছাঁই ঢেলে দিয়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চমান পর্যবেক্ষক জুলফিকার আলী রিপন বলেন, চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত গতবারের তুলনা আগাম শুরু হলেও তা পরিমাণে কম। তিনি আরও বলেন, গত এপ্রিল মাসে জেলায় বৃষ্টিপাতেরর পরিমাণ ছিল ৫৬ মিলিমিটার। মে মাসে ছিল ১০৪ মিলিমিটার, জুন মাসে ২৩৭ মিলিমিটার এবং জুলাই মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতেরর পরিমাণ ছিল ২৫ মিলিমিটার।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন বলেন, দেশের অনেক জায়গায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত হলেও সাতক্ষীরায় কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা রোপা আমন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। বীজতলা পর্যন্ত তৈরি করতে পারছেন না। পানির অভাবে অনেকস্থানে ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তাদের সেচযন্ত্র চালু করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জেলায় প্রায় চার হাজার সেচযন্ত্র চালু করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত মৌসুমে জেলায় মোট ৮৭ হাজার ৯০ হেক্টরে রোপা আমন আবাদ করা হয়। এ বছর প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৯৫৭ হেক্টর। এর মধ্যে সদর উপজেলায় আবাদ হয় ১৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া কলারোয়ায় ১১ হাজার ৬০০, তালায় ৮ হাজার ৩৯০, দেবহাটায় ৫ হাজার ২৮০, কালীগঞ্জে ১৭ হাজার ৩০, আশাশুনিতে ৯ হাজার ২৪০ ও শ্যামনগরে ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টরে আবাদ হয়েছিল।