খোলা কলাম একই ক্লাবে ৩ কমিটি! এ দায় কার? প্রসঙ্গ: দেবহাটা প্লেসক্লাব


প্রকাশিত : August 11, 2019 ||

অধ্যাপক রাজু আহমেদ
সাতক্ষীরা জেলার ভিতরে দেবহাটা একটি ছোট উপজেলা আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে এখানে অন্য উপজেলার মতো তেমন কোন বড় রকমের সমস্যা দেখা যায় না। এ উপজেলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড অনেকটা পারুলিয়া কেন্দ্রিক। এটি অস্বীকার করার কোন জো নেই যে পারুলিয়াকে বাদ দিয়ে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতিশীল হওয়া সম্ভব না, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক কর্মকান্ডও গতিশীল হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে অনেকে এ কথা অকপটে স্বীকার করে যে, পারুলিয়া হলো দেবহাটার রাজধানী। কেননা দেবহাটায় উপজেলার অফিস ও থানা হওয়ায় বিশেষ কোন প্রয়োজন ছাড়া কুলিয়া, পারুলিয়া, সখীপুর, নওয়াপাড়া এমনকি খোদ দেবহাটার মানুষই দেবহাটা সদরে তেমন যায় না।
সব উপজেলায় সংবাদ কর্মীদের জন্য একটা ক্লাব থাকে। যার নাম থাকে প্রেসক্লাব। যদিও এখন সময়ের প্রয়োজনে অন্য নামে সংবাদ কর্মীরা সংগঠন করে থাকে। এর মূল কারণ হলো নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বড় মারাত্মক। কারণ যোগ্যতা থাক, বা না থাক কেউ আর এখন কর্মী থাকতে চায় না। সবাই নেতা হতে চায়। নেতা হতে পারলে আর পায় কে। কারণ নেতার মর্যাদা অনেক। অন্তত: সামনের চেয়ারটা তো পাওয়া যায়। আর বর্তমান সময়ে একবার কোনভাবে নেতা হতে পারলেই বিশাল ব্যাপার। নেতা হওয়ার বদৌলতে টুপাইস কামাইও করা সহজ হয়।
আর এই হাওয়াটা ছিল রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ার ব্যাপারে। বর্তমানে সব জায়গায় এই হাওয়া বইতে শুরু করেছে। একবার মসজিদ কমিটির সভাপতি-সম্পাদক হতে পারলে তাই এই পদ পদবী ছাড়তে চায় না অতি সহজে, মুসল্লিরা অপমান অপদস্ত না করা পর্যন্ত পদ ছাড়েই না। এমন প্রমান দেওয়া যাবে ভূরি ভূরি। যেখানে কোন স্বার্থ থাকে না বিনা স্বার্থে কাজ করতে হয়। সেখানে এই অবস্থা তাহলে অন্য জায়গায় কি অবস্থা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।
দেবহাটা প্লেসক্লাব মরহুম আব্দুল করিম, মরহুম আব্দুল আজিজ, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাবকে দিয়ে গুটি কয়েক সংবাদ কর্মীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে আমি যতদূর জানি। আমি একজন সংবাদ কর্মী হিসাবে আজ ২০ বছর কাজ করছি। আমার জানা মতে এরপরে আসেন আবু তালেব মোল্যা, সম-সাময়িক রিয়াজুল ইসলাম, আক্তার হোসেন ডাবলু, আমি, বন্ধুবর আব্দুল কাদের মহিউদ্দীন, আব্দুল খালেক, এমএ তালেব, এর পরে আসে আরকে বাপ্পা, সুমন বাবু, রবিউল ইসলাম।
পারুলিয়া খেজুরবাড়ীয়া নিবাসী আব্দুল করিম ভাইয়ের মৃত্যুর পরে ওহাব ভাই ও আবু তালেব মোল্যা, রিয়াজুল ইসলাম, আক্তার হোসেন ডাবলু। আর পরবর্তীতে অনেকে যারা সংবাদ কর্মী হিসেবে আসে তারা অনেকটা ব্যক্তি বিশেষের প্রয়োজনে। শিক্ষা দীক্ষা তেমন না থাকলেও করিৎকর্মা ছিল রিয়াজুল। সে অনেকটা তার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিতদের বাড়ি বাড়ি যেয়ে সংবাদ কর্মীর খাতায় নাম লেখায় দলে ভারি করার জন্য এবং সে এক সময় আব্দুল ওহাব, আবু তালেব মোল্যা, আক্তার হোসেন ডাবলু এদের সঙ্গ ত্যাগ করে অন্য একটি বলয়ের সঙ্গে মেশে। প্রেসক্লাবের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার ব্যপারে গড়ি মশি করায় সময়ের প্রয়োজনে এক সময় দেবহাটা উপজেলা প্রেসক্লাব গঠিত হয়। যা সভাপতি আমি ও সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল। কয়েক বছর যেতে না যেতেই সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুলের স্বেচ্ছাচারিতা এবং জবাব দিহিতার সমস্যা দেখা দেয়ায় এবং উপজেলা প্রেসক্লাবকে তার ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় তাকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সর্বসম্মতি ক্রমে অব্যহতি দেয়া হয়। উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সভায় সর্বসম্মতি ক্রমে আব্দুল কাদের মহিউদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনিত করা হয়। ইতোমধ্যে দেবহাটা প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে চলে আসে আবু তালেব মোল্যা, আব্দুল ওহাব, আক্তার হোসেন ডাবলু।
ঘটনাক্রমে দেবহাটা প্রেসক্লাবের আব্দুল ওহাব, আবু তালেব মোল্যা, আক্তার হোসেন ডাবলু, আরকে বাপ্পা, সুমন বাবু এবং উপজেলা প্রেসক্লাবের আমি, আব্দুল কাদের মহিউদ্দীন, এমএ তালেব, ইউসুফ বিপ্লব, আনছার আলীসহ অনেকে প্রেসক্লাবের একটি কমিটি করার জন্য পারুলিয়াস্থ ফেয়ার মিশন কার্যালয়ে বসা হয়। আলোচনান্তে সিদ্ধান্ত হয় প্রেসক্লাবের একটাই কমিটি থাকবে। উপজেলা প্রেসক্লাব বিলুপ্ত হবে। প্রথম দুই বছর আবু তালেব মোল্যা সভাপতি থাকবে এবং পরের দুই বছর আমি সভাপতি থাকবো।
দিন যতই এগুলো বোঝা গেল এটাও চালাকি ছিল এবং ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। এটা ছিল ব্যক্তি বিশেষের চালাকি অর্থাৎ স্বার্থ উদ্ধার হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্তের জায়গাতেই থাকলো। এটা আর বাস্তবায়ন হলো না। এদিকে রিয়াজুল গিয়ে উঠলো একইভাবে কুলিয়া আঞ্চলিক প্রেসক্লাবে অতীতের মতো একই পদ্ধতিতে।
সম্প্রতি স্থানীয় পত্রিকায় দেখলাম দেবহাটা প্রেসক্লাবের নতুন কমিটির আত্মপ্রকাশ পত্রিকায় শিরোনাম দেবহাটা প্রেসক্লাবের আর একটি নতুন কমিটি গঠন। যার সভাপতি সুজন, সাধারণ সম্পাদক মুকুল। এর কয়েক মাস আগে দেখেছিলাম আর একটি কমিটি হতে যার সভাপতি লিটু, সাধারণ সম্পাদক আরকে বাপ্পা। আর আগে থেকেই তো আছেন সভাপতি আব্দুল ওহাব, সাধারণ সম্পাদক শাওন তার আগে আক্তার হোসেন ডাবলু। পুরাতন থেকে ওহাব ভাইকে নিয়ে অন্যদের বাদ দিয়ে প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি হয়। যার সভাপতি আব্দুল ওহাব, সাধারণ সম্পাদক শাওন। এভাবে কিছুটা ফিল্মি স্টাইলে প্রেসক্লাবের তালা ভেঙে এক রকম চর দখলের মতো প্রেসক্লাব দখল করে চলতে থাকে। যদিও বিভিন্ন কর্র্নার থেকে আমার ডাক পড়ে কিন্তু আমি এই কাদা ছোড়াছুড়িতে যাইনি। এখন বর্তমানে দেবহাটা প্রেসক্লাবের একই সময়ে তিনটি কমিটি বিদ্যমান। সচেতন মানুষ একই প্রেসক্লাবের তিনটি কমিটির কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে তা তারাই জানে।
একই অনুষ্ঠানে এরা পরিচয় দেয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সম্পাদক হিসেবে সামনের চেয়ার পাওয়ার জন্য। সম্পতি একটি অনুষ্ঠানে এমনি ঘটেছে। বর্তমান সময়ে আবার কিছু কিছু নামমাত্র শিক্ষিতরা ঢুকে পড়েছে দলভারি করার জন্য। বলতে হয় ঢুকানো হয়েছে দল ভারি করার জন্য।
প্রত্যেকটা কমিটির কার্যকালের একটা মেয়াদ থাকে কিন্তু দেবহাটা প্রেসক্লাবের কমিটির কোন সময় কাল নেই। নেই কোন মেয়াদ। এ যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ। একপদ সারা জীবন একজন আকড়ে থাকাটা কতটা অসম্মানের, কতটা অসস্তির তা আসা করি ইতিমধ্যেই অনেকে কম বেশি বুঝতে পেরেছেন।
দেবহাটা প্রেসক্লাবের কমিটি নিয়ে এই যে, হ-য-ব-র-ল অবস্থা এর দায় আমরা যারা দেবহাটায় সংবাদ কর্মী হিসেবে কর্মরত আছি কেউ অস্বীকার করতে পারব না। উচিত হবে সকল সংবাদকর্মীরা এক জায়গায় বসে একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরী করে এ সমস্যার সমাধাণ করা। মনে রাখতে হবে এখন আর সে দিন নেই যে, প্রেসক্লাব বলতে ব্যক্তি আমিই সব। আমিই প্রেসক্লাব।
বলতে শুনি সংবাদপত্র সমাজের দর্পন আর সংবাদকর্মী জাতীর বিবেক। দেবহাটা সংবাদ কর্মীদের বিগেক যদি কাজ করত তাহলে এক প্রেসক্লাবের একই সময়ে তিনটি কমিটি বিদ্যমান থাকতে পারতো না। বিবেক দিয়ে চিন্তা করতে হবে কমিটিতে যাদের নাম ধাম আসছে তাদের সম্মান বাড়ছে না কমছে। দেবহাটায় কর্মরত সংবাদ কর্মীদের সম্পর্কে জেলাবাসীর নিকট কী বার্তা যাচ্ছে। জেলায় সিনিয়র সাংবাদিক যারা আছেন তারা আমাদের সম্পের্কে কী ধারনা পোষণ করবেন।
পত্রিকায় দেখলাম ছবিসহ তিন কমিটি সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ে ভিন্নি ভিন্ন দিনে একই প্রেসক্লাবের ব্যানারে ফুলের শুভেচ্ছা জানাতে। একথা ভুললে হবেনা যে, সরকারি কর্মকর্তারা কিন্তু বিসিএস ক্যাডার। তাঁরা কিন্তু সব বোঝেন। কেন এতো ফটো সেশন। কেন এতো ফুলের শুভেচ্ছার ছবিসহ সংবাদ। মনে রাখতে হবে দেবহাটার সাংবাদিকদের সম্পর্কে কিন্তু ভালো বার্তা যাচ্ছে না। এভাবে ভালো বার্তা তাদের কাছে পৌছানো সম্ভবও না। লেখক: অধ্যাপক, সংবাদ কর্মী