বনবিবি: সুন্দরবনের লোকজ কিংবদন্তি


প্রকাশিত : September 12, 2019 ||

মোঃ জাহিদুর রহমান:
“আঠারো ভাটির মাঝে আমি সবার মা
মা বলি ডাকিলে বিপদ রবে না
বিপদে পড়িয়া যে মা বলি ডাকিবে
রক্ষা করিবেন মাতা বিপদ না রহিবে।”
-এমন বিশ্বাসকে ধারণ করে বনবিবির সন্তানেরা ‘আঠারো ভাটির দেশ’ সুন্দরবন অঞ্চলে নিয়ত প্রকৃতির সাথে সংগ্রামমূখর হয়ে পাড়ি দিচ্ছে জীবনের কন্টকাকীর্ণ পথ। সুন্দরবন বা বাদাবনকে ঘিরে জড়িয়ে আছে এতদাঞ্চলের বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা। বনের কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ, মধু ও মোম আহরণ, চিংড়ি পোনা ও মাছ ধরা ইত্যাদি পেশায় যুক্ত অসংখ্য মানুষ শ্বাপদসংকুল অরণ্যে বিশ্বাসের ভেলায় চড়ে, মনে সাহস যুগিয়ে কর্মে ব্রতী হয়। আর সুন্দরবনের এইসব পেশাজীবীদের সাহস সঞ্চারক অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ‘বনবিবি’। মানুষের বিশ্বাস এই যে, তাঁকে সন্তুষ্ট রাখলে বনে কোনো বিপদ থাকে না। জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘের ভয় থেকে শুরু হয় বনবিবির আরাধনা।
প্রাচীনকাল থেকে সুন্দরবন অঞ্চল ‘আঠারো ভাটির দেশ’ নামে পরিচিত। আঠারো ভাটি নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা মত। যেমন- অনন্য আঠারোটি ছোট-বড় নদী এই বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে, সেই সংখ্যাকে ভিত্তি করে আঠারো ভাটির দেশ বলা হয়েছে। আবার মোগল শাসনামলে মগ দস্যুদের আক্রমণে বিপর্যস্ত ছিলো এখানকার শ্রমজীবী মানুষেরা। তাই তাদের জন্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন ছিলো। নিরাপত্তা বেষ্টিত এ রকম আঠারোটি নিরাপদ জায়গাকে তারা আঠারো ভাটি বলতো। অথবা কোনো নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বা প্রসিদ্ধ স্থান হতে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত সুন্দরবনকে আঠারো ভাটির দেশ বলা হতো। (যেখানে ১ ভাটি= নির্দিষ্ট পরিমাণ সময়)।
সুন্দরবনের পেশাজীবী মানুষের আরাধ্য কে এই বনবিবি, কী তাঁর পরিচয়? বনবিবির পরিচয় সংবলিত দু’টি পুঁথি সাহিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। একটির লেখক মুনশি মহম্মদ খাতের অন্যটির মহম্মদ মুনশি। ‘জহুরানামা’ শিরোনামের পুঁথি দু’টিতে বনবিবির আবির্ভাব, তাঁর অলৌকিকত্ব এবং মাহাত্ম্য বিষয়ে বর্ণনা আছে। আছে বনবিবি ও তাঁর ভাই শা’ জঙ্গলী’র জন্মবৃত্তান্ত , তাঁদের আঠারো ভাটিতে আগমন, দক্ষিণা রায়ের মা নারায়নী দেবীর সাথে যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে আঠারো ভাটির অধীশ্বর হওয়ার বর্ণনা। বনবিবির জস্মবৃত্তান্তে দেখা যায়, মক্কার এবরাহিম ফকির ও গোলাল বিবি হলেন যথাক্রমে বনবিবির বাবা ও মা। বনবিবি ও তাঁর ভাই শা’ জঙ্গলী আঠারো ভাটির দেশে এসেছেন আল্লা’র নির্দেশে তাঁদের ‘জহুরা জাহের’ বা মাহাত্ম্য প্রকাশ করতে। সুন্দরবন তথা আঠারো ভাটির অধীশ্বর তখন দক্ষিণা রায়। বনবিবির পথনির্দেশক ভাঙড় শাহ বাদাবনের পথ, দক্ষিণা রায়ের পরিচয় এবং মোম, মধু, কাঠ, লবণ প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদের বর্ণনা দিয়ে বনবিবিকে বলছেনÑ
“ভাঙড় কহেন মাগো শোনো দেল দিয়া
এই তো ভাটির দেশে পৌঁছিলে আসিয়া
এখানে দক্ষিণা রায় ভাটির ঈশ্বর
নানা শিষ্য কৈল সেই বনের ভিতর।
নুন, মোম, খাড়ি-জড়ি বহুত এয়ছাই
হাট মধু বসাইছে কত ঠাঁই ঠাঁই।”
সুন্দরবনের পরিচয় বর্ণনা করে পুঁথিতে আরো বলা হয়েছেÑ
“দন্ডবক্ষ যদি মৈত পুত্র রাজ্য পেল
দক্ষিণা রাজার নাম প্রকাশ হইল
অত্যাচার করে খায় মানুষ ধরিয়া”
সর্বোপরি দক্ষিণা রায়কে বাঘের মতো হিং¯্র, মানুষখেকো, রাক্ষস,অত্যাচারী এবং স্বঘোষিত ঈশ্বর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই দক্ষিণা রায়ের কবল থেকে মানুষদেরকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বনবিবি ও শা’জঙ্গলী বাদাবনে প্রবেশ করেন। কিন্তুু রাজা দক্ষিণা রায় তার রাজ্যে মুসলমানি প্রভাব ও উপস্থিতি সহ্য করতে নারাজ। শা’জঙ্গলী আল্লা’র শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে আযান দিলেন। দক্ষিণা রায়ের গুপ্তচর সনাতন আযান শুনে সে খবর রাজার কাছে পৌঁছে দিলো। দক্ষিণা রায় যুদ্ধের আয়োজন করলো। দক্ষিণা রায়ের মা নারায়ণী ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ভূত ও ৩৬ কোটি ডাকিনীসহ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো, অন্যদিকে বনবিবি-শা’জঙ্গলী অর্থাৎ ভাই-বোন মিলে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। দক্ষিণা রায় পরাজিত হলো। বনবিবি দক্ষিণা রায় ও নারায়ণীকে ক্ষমা করে দেন।‘বনবিবি আঠারো ভাটি দখল করলেন। হিন্দু প্রভাব খর্ব করে মুসলমানি প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলো’। (বনবিবি-শশাঙ্ক শেখর দাস, ২০০৪ : ৪৯)।
বনবিবির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। বাঘরূপী দক্ষিণা রায়ের হিং¯্রতা থেকে মানুষ মুক্ত হলো। বাঘ বশীভূত হলো। বাঘ হয়ে উঠলো বনবিবির বাহন। বনবিবির ম্মরণে, তাঁর আরাধনায় এখন বাঘ সন্তুষ্ট থাকে। আবার বাদাবনের জলে কুমিরের প্রসঙ্গও এসে পড়ে। বনবিবির আশীর্বাদপুষ্ট কুমিরের দেবতা হলেন বরখান গাজী। নৌকা যাত্রায় ৫ পীরের নাম নিলে পলে বিপদ থাকে না। এই ৫ পীরের অন্যতম হলেন বরখান গাজী।
“ পোড়াগাজী গয়েশদ্দি, তার বেটা সমসদ্দি
পুত্র তার সাই সেকান্দর
তার বেটা বরখান গাজি,
খোদাবন্ধু মুলুকের কাজি
কলিযুগে তার অবসর
বাদশাই ছিড়ি লবঙ্গে,
কেবল ভাই কালুর সঙ্গে
নিজ নামে হইল ফকির।”
এখানে ৫ পীরের পরিচয় রয়েছে । তারা হলেন যথাক্রমেÑগিয়াসউদ্দীন, তৎপুত্র সামসউদ্দীন এবং সামসউদ্দীনের পুত্র সিকান্দার এবং সিকান্দার পুত্র বরখান ও কালু।
বনবিবির পূজা ও আরাধনার সূত্রপাত কিভাবে হলো সে বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে পুঁথি সাহিত্যের কাহিনিতে। ধোনাই মোনাই নামে দুই ভাই ‘সপ্তডিঙ্গা’ সাজিয়ে মোম, মধু ও কাঠ আহরণের জন্য সুন্দরবনে গমন করে। সেখানে মোম মধু পাওয়ার আশায় স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তাদের ভাইপো দুখেকে কেদোখালির বনে বাঘের জন্য রেখে আসে। বাঘ দুখেকে খাওয়ার জন্য তেড়ে আস্লে সে মা বনবিবিকে স্মরণ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তখন বনবিবি দুখের মায়ের রূপ ধরে তার সামনে হাজির হয়। বাঘ স্থান ত্যাগ করে। দুখে দু’চোখ মেলে আশ্চর্য হয়ে বলছেÑ
“কহে এ তাজ্জব কথা তিন ভাটির পথে
মা আমার কেমনে আসিল এখানেতে।”
বনবিবির কৃপায় দুখে বাদাবন খেকে অনেক মোম মধু নিয়ে বাড়ি ফেরে এবং অনেক ধন-সম্পত্তির মালিক হয়। ইছামতি ও গৌড়েশ্বর নদীর মোহনায় বরনহাটিতে দুখের বাড়ি ছিলো। দুখের মাধ্যমেই বনবিবির পূজা ও হাজত প্রচলন হয়েছিলো। দুখের মা বুড়ি দুখেকে বনবিবির হাজত-খয়রাত দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেনÑ
“বুড়ি বলে বাছা তুমি যাহার কৃপাতে
প্রাণদান পেয়ে বেঁচে আইলে ঘরেতে
গলায় কুড়ালী বেধে মেঙ্গে সাত গাঁয়
হাজত খয়রাত তার করহ ত্বরায়।”
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদের বিভিন্ন ন্থানে রয়েছে বনবিবির থান। ২৪ পরগণা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ থানার শ্রীশকাটি, সন্দেশখালি থানার গন্ডামারি ও রায়পুর, হাসনাবাদ থানার মুক্তার চক, পূর্বের ঘেরি, পশ্চিম ঘেরি এবং বাংলাদেশের খুলনা জেলার বেদকাশি, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার হরিনগর, কালিঞ্চি, কলবাড়ি,বাদঘাটা প্রভৃতি স্থানে বনবিবির মূর্তি রয়েছে, যেখানে বনবিবির পূজা দেওয়া হয়। হাসনাবাদ থানার ভেবিয়াতেএবং বাংলাদেশের দেবহাটা ও শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীতে রয়েছে বনবিবিতলা। শ্যামনগরের কলবাড়ি এবং ২৪ পরগণার ভুরকুন্ডাতে বনবিবির মেলা অনুষ্ঠিত হয়।‘বর্তমানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বন পেশাজীবীরা এই সংস্কৃতিটা কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে। মুশকিল আসানকারী পীর দেবতার কাছে মানুষের মতো জাতিগত ভেদাভেদ নেই। তাই হিন্দুরা বনবিবির হাজত পূজা দিয়ে আল্লা আল্লা বলে বাতাসা কদমা হরিলুটের মতো ছড়িয়ে দিতে আদৌ কুণ্ঠাবোধ করে না’(ভোরের কাগজ, ২১.১০.২০০৫)।
বনবিবি ও তার আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনেক লোকবিশ্বাস, তন্ত্র-মন্ত্র, কিংবদন্তী, লোকছড়া ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে। লোকবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছেÑ‘জঙ্গলে ঝাল পোড়ানো যায় নাÑ দেবী রুষ্ট হয়’,‘জঙ্গলে কাপড় চোপড় নিংড়াতে নেইÑ নিংড়ালে জঙ্গলের মধ্যে গলা শুকিয়ে যায়’,‘জঙ্গলে মাতৃনাম জপ করতে হয়’,‘ কেউ জঙ্গলে গেলে তার স্ত্রী সকালে সিঁদুর পরতে পারে না’,‘বনবিবির সেবক হিসেবে জঙ্গলে নখ-চুল কাটা যায় না’ ইত্যাদি।
সুন্দরবনের পেশাজীবীরা সাধারণত দলবেধে জঙ্গলে গমন বরেন। অনেক ক্ষেত্রে দলে একজন গুণিন থাকে। গুণিন কে ‘বনবিবির বরপুত্র’ বলা হয়। গুণিন জঙ্গলের মাটিতে পা রেখে প্রথমে বনবিবির উদ্দেশে প্রণাম করেন। তারপর একটি হাত গাছে এবং অন্য হাতটি মাটিতে রেখে বনবিবিকে সাক্ষী করে বাঘ তাড়ানো ও জঙ্গলবন্ধের মন্ত্র পড়েন। শুক্রবারে মন্ত্র খাটে না , তাই এদিন জঙ্গলে ওঠা যায় না। জঙ্গলবন্ধের একটি মন্ত্র নি¤œরূপÑ
“বনবিবি, ফুলবিবি, দুলাবিবি, মাই বিবি, ফতেমা বিবি
আমার মাল ছাড়া যদি যাও অন্য ঠাঁই
আর কি জানাই তোমারে ধর্মের দোহাই।
আমার মালে উপরি বন্ধ,
ফাঁপরি বন্ধ, দৈত্য-দানব বন্ধ॥
আমার যে দেখাবি ভয়
সর্ব অঙ্গ পোড়াব যাত্র কয় কথায়”।
হিন্দু সমাজে রোগ- শোক ও দুর্যোগের দেবী শীতলা, সর্পদেবী মনসা, সন্তানের দেবী ষষ্ঠী, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের দেবী লক্ষী, বিপদ তারিনী দূর্গা এবং জলদেবী গঙ্গা পূজিত হন। এ সকল দেব- দেবীর অপেক্ষা বনবিবি ক্ষমতা রাখেন এবং তাদের অতিক্রম করে পূজিত হন। বনবিবির ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে চালু রয়েছে নানা কিংবদন্তী। যেমনÑ‘বৃষ্টি দেবেন বনবিবি’,‘মনস্কামনা পূরণের দেবী বনবিবি’,‘জলে-জঙ্গলে মায়ের মতো পরিত্রাতার ভূমিকায় বনবিবি’,‘ব্যাধি নিরাময়ের দেবী বনবিবি’ এবং‘মা বনবিবি চির আশির্বাদিকা’ ইত্যাদি।
বনবিবি ভক্ত বৎসল ও দয়াবতী। তিনি সুশ্রী ও লাবণ্যময়ী। চিত্র বা মূর্তিতে তাকে হরিদ্রা, মুকুট এবং গলায় হার, বনফুলের মালা পরিহিত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি লাঠি ও ত্রিশূল বহন করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে টিকলির সাথে একটি টুপি পরিহিত এবং চুল বিনুনি অবস্থায় দেখা যায়। তিনি ঘাগড়া ও পাজামা বা শাড়ি এবং জুতা পরিধান করেন।
সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ হলো ভীতিময় ও বিপদসংকুল যেটা শ্রমজীবী মানুষের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। জঙ্গল, কুমির আর বাঘের সাথে সংগ্রামশীল মানুষ তাই প্রাণের তাগিদে বনবিবিকে তাদের লৌকিক দেবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একদিকে বনকেন্দ্রিক সাধারণ জনগোষ্ঠি এইসব সংস্কার ও সংস্কৃতিকে বহমানতার পরিমন্ডলে লালন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশ-সমাজ- রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম ধর্মের বিজয় ও উত্থান, ক্ষমা ও ঔদার্য, মানবিকতা ও সুশাসন ইত্যাদি বিষয়গুলি লোকসাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে বনবিবিকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করেছে। পৃথিবীতে ঐতিহ্যে-বৈচিত্রে-সৌন্দর্যে সুন্দরবন যেমন উজ্জ্বল, তেমনি সুন্দরবনের লৌকিক অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে বনবিবি অনন্য, ভিন্নমাত্রায় বিভূষিত ও ঐশ্বর্যমন্ডিত।
লেখক ঃ মোঃ জাহিদুর রহমান, পরিচালক, শ্যামনগর সাহিত্য কেন্দ্র, সাতক্ষীরা।