সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: চিংড়িতে জেলি পুশ-জনস্বাস্থ্য ও রপ্তানি খাত
সম্পাদকীয়/
প্রসঙ্গ: চিংড়িতে জেলি পুশÑজনস্বাস্থ্য ও রপ্তানি খাত
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য আড়ত ও বাজারে চিংড়িতে জেলি এবং ক্ষতিকর অপদ্রব্য পুশ করে ওজন বাড়ানোর যে ‘মহোৎসব’ চলছে, তা কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক জালিয়াতি নয়; বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি এবং দেশের সম্ভাবনাময় মৎস্য খাতের বিরুদ্ধে এক ধরনের আত্মঘাতী অপরাধ। দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির শরীরে জেলি, স্টার্চ ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
ভুক্তভোগী ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যাচ্ছে, বাজার থেকে কেনা চিংড়ি রান্নার সময় ভেতর থেকে কৃত্রিম সাদা জেলি বের হচ্ছে। এই নৈরাজ্য কেবল আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা, কাদাকাটি, দরগাপুর বা সদরেই সীমাবদ্ধ নেইÑঅভিযোগ রয়েছে, এই জালিয়াতি আজ পুরো সাতক্ষীরা জেলা জুড়েই এক সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
মৎস্য ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়িতে ব্যবহৃত এই নি¤œমানের রাসায়নিক ও জেলি মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিষের মতো। এসব অপদ্রব্য শরীরে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীতে জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা এর ফলে পুষ্টিহীনতাসহ নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে পারে।
এই অনৈতিক কর্মকা-ের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের অর্থনীতিতেও। দেশের ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি রপ্তানি খাতের যে সুনাম আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েছে, কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর লোভের কারণে তা আজ চরম হুমকির মুখে। বিদেশি ক্রেতারা আমাদের চিংড়ির গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। যদি অনতিবিলম্বে এই জেলি পুশ সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলা না যায়, তবে দেশের চিংড়ি রপ্তানি বাণিজ্যে এমন ধস নামবে, যা কাটিয়ে ওঠা সুদূরপরাহত হতে পারে। এর ফলে লাখ লাখ মৎস্য চাষি ও সাধারণ ব্যবসায়ী চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ের চাষি ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে বারবার এ বিষয়ে অবহিত করা সত্ত্বেও দৃশ্যমান ও স্থায়ী কোনো প্রতিকার মিলছে না। মাঝে মধ্যে যে দু-একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়, তা মূলত সাময়িক। নিয়মিত ও কঠোর তদারকির অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বারবার। প্রশাসনের কিছু অংশের নীরব ভূমিকা নিয়ে যে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর থেকে অভিযান অব্যাহত রাখার গৎবাঁধা যে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই ক্ষীণ। সম্ভাবনাময় এই মৎস্য শিল্প এবং জননিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে কেবল ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের’ অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যৌথভাবে নিয়মিত ও আকস্মিক চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। জেলি পুশের আড়ত ও হোতাদের চিহ্নিত করে কেবল জরিমানা নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী চিংড়ি শিল্পকে বাঁচাতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।









