রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

লবণাক্ততার আগ্রাসন ও দুর্যোগ: উপকূলে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ণ
লবণাক্ততার আগ্রাসন ও দুর্যোগ: উপকূলে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর

মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর) প্রতিনিধি: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে একসময় মাটির তৈরি দেওয়াল আর খড়ের ছাউনির ঘরই ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান আশ্রয়। কৃষি-নির্ভর এই জনপদে যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে এই মাটির ঘরেই বাস করত। তবে ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র পর থেকে মাটির ঘর নির্মাণ এ অঞ্চলে নেই বললেই চলে। আইলার পর বুলবুল, আম্পান, ইয়াসের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলের মাটি ও মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়ে গেছে। জলোচ্ছ্বাসের লোনা পানি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় সংকুচিত হয়েছে কৃষিজমি, আর তাতেই হারিয়ে যেতে বসেছে উপকূলের চিরচেনা এই মাটির ঘর।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলের বেলে-দোঁয়াশ ও এঁটেল মাটি মিশিয়ে ম- তৈরি করা হতো। এরপর হাতের সুনিপুণ কারুকাজে মাটির ‘চাফ’ (দলা) কেটে ধাপে ধাপে তৈরি হতো ঘরের মজবুত দেওয়াল। কিন্তু ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির দেওয়াল ধসে আসবাবপত্র নষ্ট হওয়া এবং শিশুসহ মানুষ চাপা পড়ার ঘটনার পর থেকে এই ঘরের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমতে থাকে। এর ওপর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাটির সংকট। চিংড়ি ঘেরের কারণে লোনা পানি ঢুকে টপ-সয়েলের (মাটির উপরিভাগ) বুনট নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে ঘর তৈরির উপযোগী আঠালো মাটি এখন আর পাওয়াই যায় না।

উপকূলের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্বকালিনগর গ্রামে এখনো কোনোমতে টিকে আছে একটি মাটির ঘর। ঘরের কারিগর কৃষক শ্যামাপদ বৈদ্য বলেন, “এখন আর মাটির ঘর চোখেই পড়ে না। অথচ ২০-২৫ বছর আগে পৌষ থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত মাটির দেওয়াল তৈরির কাজে আমাকে দিন-রাত ব্যস্ত থাকতে হতো। এই ঘরগুলোতে খরচ কম, আরাম বেশি। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হলেও ভেতরে সহজে টের পাওয়া যেত না। এখনকার বেড়ার ঘরে সামান্য বাতাসেই বুক কাঁপে। আগেকার মাটির উঁচু ঘর চোর-ডাকাতদের থেকেও নিরাপদ ছিল।”

শ্যামাপদ বৈদ্যের স্ত্রী কৃষ্ণা রানী বৈদ্য বলেন, “আইলার আগে আমাদের তিনটি মাটির ঘর ছিল, সব ভেঙে গেছে। এবার খরচ ও পরিশ্রম কমাতে শুধু গোয়ালঘরটা আবার মাটি দিয়েই তৈরি করছি। বছরে একবার গোবর-মাটি দিয়ে লেপে দিলেই এক বছর চলে যায়।”

স্থানীয় শিক্ষক মনোজিৎ কর্মকার বলেন, “আগে গ্রামে প্রায় সব ঘরই ছিল মাটির। মানুষ তখন শান্তিতে থাকত, রোগবালাই কম ছিল। মাটির ঘর তৈরির জন্য গ্রামে কিছু লোকায়ত জ্ঞানসম্পন্ন প্রবীণ মানুষ ছিলেন। বছরের শুরুতে পৌষ-মাঘ মাসে কৃষিজমির বিশেষ মাটি তুলে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নেওয়া হতো। মাটি পেটানো, শুকানো আর ধাপে ধাপে দেওয়াল তুলতে তিন-চার মাস সময় লেগে যেত।” তিনি আফসোস করে বলেন, মাটির ঘরের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসের ব্যবহারও এখন বিলুপ্তির পথে।

বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার নীরব বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “উপকূলে মাটির ঘর ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ঐতিহ্য। একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে থাকার ঘর, গোয়াল ঘর, খড় রাখার ঘরÑসবই মাটির তৈরি হতো। এগুলো ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে থাকার প্রতীক। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভস্থ এবং উপরিভাগের পানি ও মাটি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে পড়েছে, যা মাটির স্বাভাবিক আঠালো বুনট নষ্ট করে দিয়েছে। মাটি ও পানির সংকটে এ অঞ্চলের কুমারদের পেশাও বদলে যাচ্ছে।”

শাহিন ইসলাম আরও বলেন, উপকূলে লবণ পানির এই আগ্রাসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রুখতে না পারলে শুধু মাটির ঘরই নয়, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকেও টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Ads small one

আইলার ১৬ বছর: লোনা পানি আর স্বজন হারানোর ক্ষত আজও শুকায়নি উপকূলে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ
আইলার ১৬ বছর: লোনা পানি আর স্বজন হারানোর ক্ষত আজও শুকায়নি উপকূলে

নাজমুল শাহাদাৎ (জাকির): আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছিল শতাব্দীর অন্যতম প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১৬টি বছর পার হয়ে গেলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির জীর্ণ বেড়িবাঁধ আর লোনা পানির গ্রাসে থাকা লাখো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। লোনা পানির আগ্রাসন, সুপেয় পানির তীব্র সংকট আর স্বজন হারানোর ক্ষত নিয়ে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন উপকূলীয় এই জনপদের বাসিন্দারা।

২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার প্রভাবে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই ল-ভ- হয়ে গিয়েছিল সাতক্ষীরার উপকূল। ভেসে গিয়েছিল মানুষ, গবাদিপশু আর ঘরবাড়ি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সে সময় সাতক্ষীরায় ৭৩ জন নিহত, দুই শতাধিক আহত এবং প্রায় ৬ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। ১৬ বছর পর সরকারি নথির সেই পরিসংখ্যানের হিসাব মিললেও, উপকূলের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব চিত্রটা বদলায়নি একটুও।

শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার ৯ নম্বর সোরা গ্রামের মাজেদ শেখের পরিবারের কাছে আইলার স্মৃতি আজও এক জীবন্ত নরক। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে নৌকাডুবিতে তিনি তিন মেয়ে ও গর্ভবতী পুত্রবধূসহ পরিবারের ছয়জনকে হারান। চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, দুজনের খোঁজ আর কোনোদিন মেলেনি। স্বজন হারানোর সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মাজেদ শেখ ও তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন। একটি জীর্ণ খড়ের কুঁড়েঘরে কাটছে তাঁদের জীবন। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতর পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। পুনর্বাসন আর স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের সরকারি-বেসরকারি শত প্রতিশ্রুতি থমকে গেছে তাঁদের মাত্র এক ফুট উঁচু, তালপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি ব্যবহারের একমাত্র টয়লেটের কাছেই।

একই এলাকার সালমা খাতুনের গল্পটি আরও মর্মস্পর্শী। জলোচ্ছ্বাস শুরু হলে পরিবারের ১৯ জনকে নিয়ে নৌকায় উঠেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মাঝনদীতে প্রচ- স্রোতে নৌকাটি উল্টে গেলে মুহূর্তেই প্রাণ হারান পরিবারের ১১ জন। প্রচ- স্রোতের মধ্যে পিঠে বড় মেয়ে আর কোলে দুধের শিশুকে নিয়ে টানা তিন ঘণ্টা পানিতে ভেসেছিলেন সালমা। বড় মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও তাঁর চোখের সামনে লোনা পানি আর ঠান্ডায় নিথর হয়ে যায় কোলের শিশুটি। ১৬ বছর পরও মে মাস এলেই সেই নদী, স্রোত আর সন্তানের শেষ মুহূর্তের আকুতি তাড়া করে ফেরে সালমাকে।

আইলা-পরবর্তী দিনগুলোর স্মৃতি আজও এই জনপদের মানুষকে শিউরে তোলে। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল লাশ। অনেকের শরীর এতটাই পচে গিয়েছিল যে শেষ গোসলটুকু পর্যন্ত করানো সম্ভব হয়নি। বস্তায় ভরে, বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কাদার ভেতরেই দাফন করা হয়েছিল অনেককে।

১৬ বছর পার হলেও এই জনপদের মানুষ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। স্থানীয় সংকটের পাশাপাশি এখন বড় হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। লবণপানির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতিতে নষ্ট হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, কমেছে কর্মসংস্থান এবং তীব্র আকার ধারণ করেছে সুপেয় পানির সংকট।

প্রতি বছরই টেকসই বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকার বাজেট ও বরাদ্দ থাকলেও উপকূলের মানুষের ভাগ্য বদলানোর মতো স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হয়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, উপকূলজুড়ে জলবায়ু সহনশীল ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, দীর্ঘ সময় পর এবার গাবুরাতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ মাঠপর্যায়ে চলমান রয়েছে। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা এই ধীরগতির উন্নয়ন উপকূলের মানুষের লোনা পানির আতঙ্ক পুরোপুরি দূর করতে পারছে না। আইলার দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও মাজেদ শেখের নিখোঁজ সন্তানদের শেষ দাফনটুকু করতে না পারার আফসোস কিংবা সালমা খাতুনদের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আজও মুছতে পারেনি কোনো উদ্যোগ। উপকূলাবাসীর একটাই দাবি—ত্রাণ বা অনুদান নয়, তাঁরা বাঁচতে চান একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে।

আশাশুনি সদরে ভিজিএফের চাল বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ
আশাশুনি সদরে ভিজিএফের চাল বিতরণ

 

আশাশুনি প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাতক্ষীরার আশাশুনি সদর ইউনিয়নে অসহায় পরিবারের মাঝে ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়েছে। আজ রবিবার সকাল ১১টায় ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে এই চাল বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার দাশ এবং সদর ইউপি চেয়ারম্যান এস এম হোসেনুজ্জামান হোসেনের উপস্থিতিতে ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের তালিকাভুক্ত ৬৯৪ জন সুবিধাভোগীর মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে পৃথক পৃথক স্থানে মোট ৬ মেট্রিক টন ৯৪০ কেজি চাল বিতরণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।

দুর্যোগ সচেতনতায় তালায় ঐতিহ্যবাহী পটগান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ
দুর্যোগ সচেতনতায় তালায় ঐতিহ্যবাহী পটগান

তালা প্রতিনিধি: দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকিহ্রাস বিষয়ে গ্রামীণ জনপদের মানুষকে সচেতন করতে সাতক্ষীরার তালায় ৪টি ঐতিহ্যবাহী ‘পটগান’ পরিবেশন করা হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড কনসার্নের আয়োজনে উপজেলার খলিলনগর ও তালা সদর ইউনিয়নে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
উন্নয়ন সংস্থা ‘সুশীলন’-এর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ উজির হোসেনের পরিচালনায় ১৪ থেকে ২০ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গোনালী এফবিসিবি চার্চ, আটারই হোপ চার্চ, মুড়াকলিয়া এমকে হাইস্কুল মাঠ এবং মাছিয়াড়া গ্রামের দাসপাড়ায় এই পটগানগুলো অনুষ্ঠিত হয়। খুলনার সুশীলন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শিল্পী লিজা পারভীন, সাথী বিশ্বাস, লাবনী রায়, শেখর বৈরাগী ও পবিত্র রায়সহ অন্যান্যরা এই পরিবেশনায় অংশ নেন।