দৃষ্টিপাতের প্রকাশনা বাতিল


প্রকাশিত : এপ্রিল ১২, ২০১২ ||

পত্রদূত রিপোর্ট : কালিগঞ্জের ফতেপুরের ঘটনা নিয়ে পত্রিকার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার অভিযোগে দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সাতক্ষীরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মুহা: আনোয়ার হোসেন হাওলাদার এক আদেশে পত্রিকাটির ডিক্লারেশন বাতিলের আদেশ দেন।

সাতক্ষীরা জেলা ম্যাজিস্টেট স্বাক্ষরিত ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৯ মার্চ দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার ১১তম বর্ষের ১৬৭তম সংখ্যায় প্রথম পাতার ৫ম ও ৬ষ্ঠ কলামে “কালিগঞ্জে নাটকের মাধ্যমে মহানবী (স:) কে অসম্মান, তৌহিদী জনতার প্রতিরোধে নাটক অনুষ্ঠান ভন্ডুল” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের ফলে ১. স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ২. জনসাধারণের জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসহ নিরাপত্তাহানী ঘটেছে। ৩. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। ৪. বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। ৫. বাংলাদেশের সংগে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের হানি ঘটার আশংকা রয়েছে। ৬. সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়া হয়েছে। ৭. প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার বাধা সৃষ্টি করে ধর্মপ্রাণ মানুষদের উৎসাহিত ও প্ররোচিত করা হয়েছে এবং ৮. সর্বোপরি সাতক্ষীরা জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাতিলের আদেশে বলা হয়েছে, বর্ণিত বিষয়গুলো ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন (ঘোষণা ও নিবন্ধন) আইন ১৯৭৩ এর ২০(ঙ) (।) (।।) (।।। ) উপ ধারার পরিপন্থী। দৃষ্টিপাতের দেয়া ঘোষণাপত্রের সাথে উল্লিখিত বিষয়ের অসংগতির কথা উল্লেখ করে আদেশে আরো বলা হয়েছে, ২০০২ সালের ১৯ মে প্রদত্ত ডিক্লারেশন কেন বাতিল করা হবে না সে মর্মে তিন দিনের মধ্যে অনুচ্ছেদ ভিত্তিক কারণ দর্শানোর জন্য গত ৪ এপ্রিল নির্দেশ দেয়া হয়। দৃষ্টিপাতের পক্ষ থেকে জবাব দাখিল করা হয়। জবাব পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে বাতিলের আদেশে আরো বলা হয়, বর্ণিত ৮টি বিষয়ের উপর যে জবাব প্রদান করা হয়েছে, তা মূল বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং পত্রিকার অধিকারের কথা বলে প্রকাশিত সংবাদের বক্তব্যকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অপরদিকে “কালিগঞ্জে নাটকের মাধ্যমে মহানবী (স:) কে অসম্মান, তৌহিদী জনতার প্রতিরোধে নাটক অনুষ্ঠান ভন্ডুল” শিরোনামে যাচাই বাছাইহীন প্রচারিত সংবাদটির স্বপক্ষে কোন যুক্তিসংগত কারণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাতিলপত্রে আরো বলা হয়েছে, কালিগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৭ মার্চ ২০১২ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত পাঠ্য বইয়ের অর্ন্তভুক্ত আবুল মনসুর আহমেদের ‘হুযুরে কেবলা’ প্রবন্ধের নাট্যরূপ মঞ্চায়নকালে উপস্থিত দর্শকদের আপত্তিতে বন্ধ করে অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ হয়। ২৭ মার্চ তারিখে সংগঠিত কোন ঘটনা ২৮ মার্চ তারিখে প্রকাশ হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু ২৮ মার্চ প্রকাশ না করে প্রাপ্ত খবরটি যাচাই বাছাই না করে ২৯ মার্চ প্রকাশ করা হয়েছে। ২৯ মার্চে প্রকাশিত উক্ত সংবাদে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা:) সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় যে, “মুহম্মদ সে একজন নারী পাগল ও তার একাধিক নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল।” কিন্তু আবুল মনসুর আহমেদ রচিত ‘হুযুরে কেবলা’ নামক গল্পে এ জাতীয় কোন শব্দাবলী নেই। উক্ত গল্প অবলম্বনে নাটকের যে স্ক্রিপ্ট তৈরী করা হয়েছে তাতেও এ জাতীয় কোন শব্দ চয়ন করা হয়নি। এমনকি নাটকের ভিডিও চিত্রে এ জাতীয় সংলাপের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজেই উক্তরূপ সংবাদে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেয়া হয়েছে।

দৃষ্টিপাতের ডিক্লারেশন বাতিলের আদেশে আরো বলা হয়েছে, তাই ধারাবাহিকতায় কালিগঞ্জে উত্তেজিত জনতা গত ৩১ মার্চ ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করে। এছাড়া ৮টি পরিবারের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে সাধারণ নিরীহ মানুষের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধনসহ জনমনে তীব্র আতংকের সৃষ্টি করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। আদেশে আরো বলা হয়েছে, একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত হতে মাত্র এক কি.মি. দূরে কালিগঞ্জের বসন্তপুরের চাকদাহ গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭টি পরিবারের ঘরবাড়িতে ১ এপ্রিল লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। এ ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়, সরকার বিব্রত হয়েছে। প্রশাসন চরম অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। সর্বোপরি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘিœত হয়েছে।

আদেশে আরো বলা হয়েছে, এ সংবাদ প্রকাশের কারণে জেলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মক অবনতি হয়। সারা দেশব্যাপি এহেন নিন্দনীয় কাজের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ দেশব্যাপি বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে এ বিষয়ে আলোচিত সমালোচিত হয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে।

পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল পত্রে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, “কালিগঞ্জে নাটকের মাধ্যমে মহানবী (স:) কে অসম্মান, তৌহিদী জনতার প্রতিরোধে নাটক অনুষ্ঠান ভন্ডুল” শিরোনামে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করায় কারণ দর্শানো ৮টি অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের উক্ত ধারা উপধারা মতে দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার প্রমাণিকরণ বাতিল করা হলো।