হারুনূর রশিদের ছোটগল্প নীলা

নীলা আমার আত্মা, আমার চেতনা, আমার প্রেরণা, আমার সুখ, আমার দুঃখ, আমার হাসি, আমার কান্না, আমার আলো, আমার আধার, আমার সমস্ত অস্তিত্ব। নীলা বিহিন আমি অর্থহীন। আামার জাগতিক, পারলৌকিক সকল চিন্তায়, কল্পনায়, আবেগে নীলা। কল্পকথার কাহিনীর মত অসম্ভব রূপবতি নীলা আমার দুঃসময়ের সঙ্গী। সুখের সারথী। আমার বর্তমান, আমার অতীত। এই যে এখন আমি হোস্টেলের ছাদের এক কোনে টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কলম চালাচ্ছি, তার প্রেরণা দাত্রীও নীলা। আমার সামনে-পিছনে, উপরে, নীচে বাতাসের কণায় নীলার অস্তিত্ব বিদ্যমান। সমস্ত পৃথিবীটাই যেন নীলার ছোয়ায় নীলাময় হয়ে আছে।

কলম চালাতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চোখে অঝোরে পানি ঝরছে। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে লেখার কাগজ। মাঝে মাঝে অস্পষ্ট স্পর্শ অনুভব করছি। নীলা, নীলা, নীলা, সমস্ত আকাশ কেন এত নীল? তাহলে কি নীলা আকাশের ঐ বিশাল নীলের মাঝে বিদ্যমান? জানি না। বাতাসের বেগে চোখের পানি গালবেয়ে ফোটা ফোটা হয়ে উড়ে গেল কয়েক ফোটা। এই চোখের পানি কি নীলার শুকনো কবরের মাটিতে পড়ে ওকে শান্ত করবে না?

বাতাসে কিসের এত গন্ধ ভেসে আসছে? নীলা ফূলের গন্ধ কি? নীলা নামের কোন ফুল আছে কি? নিশ্চয় আছে। হয়ত এত দিন কোন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী এই ফুলের প্রজাতি আবিস্কার করতে পারেনি। আমি পেরেছি। হ্যা,ঁ এটা নীলা ফূলেরই গন্ধ। ভবিষ্যৎ উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীরাও হয়ত গোলাপ,জবা ফুলের মত নীলা ফূল নিয়ে আলোচনা করবে।

নীলা এখন অনেক দুরে, কোটি কোটি, হাজার হাজার কোটি মাইল দূরে। সমস্ত জীবন, তার পরের, তারও পরের জীবন এবং আরও অনেক জীবন ধরেও যদি সেকেন্ডে এক লক্ষ মাইল বেগে চলে এমন কোন গাড়িতে চড়ে তার কাছে যেতে চাই, তবুও পারব না। পারব না তাকে ছুতে। তার কোমল পরীশ্রেষ্ট সুন্দরীর হাতের কবজি স্পর্শ করতে পারব না। অথচ সে আমার চার পাশ অহরহ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার প্রতিটি নিশ্বাসে, রক্তের প্রতিটি কণায়, হৃদ পিন্ডের সঞ্চালনের সাথে, শরীরে প্রবেশ করে আমার অন্তরকে ব্যাথায় ককড়িয়ে দিচ্ছে। আমি বার বার বিশ্রাম নিতে চাচ্ছি। লেখা বন্ধ করে দূরে, অনেক দূরে, অন্য কোথাও পালাতে চাচ্ছি। ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আসছে। কিন্তু পারছিনা। কোথায় পালাব? কত দিন পালিয়ে থাকব? পৃথিবীর এমন কোন নিরাপদ আশ্রয় আমার জন্য নেই যেখানে নিশ্চিন্তে পালিয়ে থাকতে পারি। আমি জানি, আমি পালিয়ে থাকতে পারব না। পুলিশ খুনের দায়ে আমাকে গ্রেফতার করবেই করবে। আজ না হোক, কাল, কাল না হোক পরশু, না হয় তার পরের দিন, না হয় তারও পরের দিন, তবুও আমি জানি পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করবেই করবে। খুন যে আমি করেছি, সত্য প্রমানিত হলে মৃত্যু দন্ড হবে আমার। খুব সম্বব বেশী দিন পালিয়ে থাকতে পারব না আমি। আমার  হোস্টেলে প্রায় প্রায় বিভিন্ন বয়সের স্মার্ট টাইপের লোকজন আসছে। এরা গোয়েন্দা বিভাগের লোক না হয়ে পারে না। কি করে যে এরা খুনির গন্ধ নাকে পায়, বুঝিনা। অথচ দুই জন রাষ্টপতি এদেশে খুন হয়েছেন, এখবর কি তারা পায়নি?

আজও দুপুরে ঘুমিয়ে আছি। আমার বন্ধু কবির আমাকে ডেকে তুলল। সাথে কদম ছাট চুল ওয়ালা এক ভদ্র লোক। আমার সাথে পরিচিত হতে এসেছেন। ব্যাটা সাহিত্যিক। আমিও সাহিত্য চর্চা করি শুনে আমার সাথে ভাব জমাতে চান। আমি ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যেয়ে হাত মুখ ধুলাম। ফিরে এসে দেখি কবির নেই। লোকটি আমার ডায়রি ওল্টাচ্ছে। আমার বুকের ভিতর ধক করে উঠল। সাহিত্যিক হলে ডায়রি ওল্টাবে কেন? সামনেই কয়েকটা লেখা পড়ে আছে টেবিলে। কয়েকটা চমৎকার বিদেশী বইও আছে। সেগুলো ওল্টাতে পারত? আমি নিজেকে সামলে নিলাম। নিশ্চয় গোয়েন্দা। খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। আামাকে দেখেই গোপের তলে সামান্য হেসে বললেন, আপনিতো চমৎকার লেখেন। লেখা পড়েই ভাবলাম একটু সাক্ষাত করি। কবির আপনার বন্ধু, আমিও তেমন।

আমি ভাবছি, ব্যাটা বলে কি? আমার লেখা পড়ে ভক্ত হয়ে গেল? কোথায় পেল আমার লেখা? বইয়ের দোকানে? অসম্ভব! আমার কোন লেখাই এখনও প্রকাশ পায়নি। আমি হলাম গিয়ে সেই বাথরুমের সিঙ্গারের মত পাতি লেখক। এখানে ওখানে এক পাতা করে লেখা পাঠাই। দু’একটা প্রেমের গল্প, কবিতা লিখি। এতেই যা চেনে দু’একজন। এতটুকু লেখা পড়েই  ভক্ত হয়ে কেউ সক্ষাত করতে আসবে ভাবতে পারিনি।

লোকটার কথা শুনে আরও সতর্ক হলাম। জীবনে যার বই প্রকাশ হয়নি এই ভদ্রলোক তারও বই পড়ে ফেলেছেন। ভক্তও হয়েছেন। আমার সামনে উপবিস্ট আমার সাক্ষাত প্রার্থী। কত বড় চিজরে বাবা!

আমি বললাম, তো কোথায় পেলেন আমার বই? আমার তো কোন বই প্রকাশ হয়নি। লোকটা একটু ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললেন না মানে কবিরের কাছে শুনলাম আপনি লেখেন টেখেন আর কি!

এতেই আমার বই পড়ে ফেললেন? আপনিতো আচ্ছা চিজ দেখছি। আপনার তো পুলিশে দেওয়া উচিত। লোকটি আর বসলেন না। কবিরকে খুজতে চলে গেলেন। সমস্ত বিকাল আর দেখা গেল না। পরে কবির বলল, ওনার  সাথে কোন বন্ধুত্ব নেই তার। তিনিই কবিরকে পেয়ে ম্যানেজ করে হোস্টলে এসেছেন আমার খোজে। আমি নিশ্চিত হলাম, মুক্ত আলো বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমার শেষ হয়ে আসছে খুব শীগ্রই আমি ধরা পড়ে যাব। বার বার আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমি পালিয়ে থাকতে পারবো না। আর তাই তো আমি লিখতে বসেছি অতীতের কাটা তারের বেড়ায় আবদ্ধ আামার জীবন কথা, যা খুবলে খুবলে খাচেছ আমার জীবনকে প্রতিটি মুহুর্ত। যে কাহিনী আমার লিখতে হাত কাপছে। চোখে অঝোর পানি ঝরছে। চোখের পানিতে জামার কলার ভিজে গেছে। কাগজেও পড়েছে দু’এক ফোটা। চোখের এই পানির ফোটা নীলার কবরে কি পড়ছে বাতাসে ভেসে ভেসে? জানিনা, নীলা, নীলা, তুমি কোথায় গো সোনা? তোমারই কাহিনী লিখতে যে আমার হৃদয় খুন হচ্ছে রক্ত ঝবছে। নীলা, নীলা সোনা আমার নীলা-নীলা-নীলু গো-আমার! তুমি কোথায় সোনা?

আমার জন্ম সাতক্ষীরা জেলায়। উনিশত পয়ষট্রিতে। পহেলা জুলাই। আমার বাবা ছিলেন একজন স্কুল মাষ্টার এবং আদর্শ কৃষক। দরিদ্র পিড়ীত বাংলাদেশের একটি গ্রামে একজন স্কুল মাষ্টার আধুনির্ক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতেন, চমৎকার ফসল ফলাতেন। অশিক্ষিত কৃষকদের মাঝে কৃষি বিষয়ে জ্ঞান দিতেন। বাবা কৃষি কাজে সফলতা পেয়েছিলেন বেশ ক’বার। শ্রেষ্ট আদর্শ কৃষক হবার গৌরব অর্জন করেন এবং কয়েকটা সোনার মডেলও পান। মাঝে মাঝে সে গুলো বাক্স থেকে বের করে মা-বাবা দেখতেন আর আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসতেন, বলতেন তোমাকেও কোন না কোন বিষয়ে মেডেল পেতেই হবে। তোমাকেও কোন না কোন বিষয়ে শ্রেষ্ট হতেই হবে। বাবা, আমি কি প্রেমের  ক্ষেত্রে শ্রেষ্ট হয়নি? আদর্শ প্রেমিকের গৌরব কি আর্জন করতে পারিনি? আমি শ্রেষ্ট প্রেমিক হিসেবে কি একটা মেডেল পেতে পারি না? বাবা এই প্রশ্নের উত্তর আজ কে দেবে?

বাবার নাম ছিল মোহাম্মদ আজারউদ্দীন বি,এ,বি,টি। আমার ছোট চাচার নাম ছিল মোহাম্মদ আবিদ হোসেন বি,এ। যতদূর পরে জেনেছি তিনি ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বেকার ছিলেন এবং বেকার অবস্থায় বিয়ে করেন। তার বিয়েতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা আমার জানা নেই। এই বেকার দম্পতির ঘরেই ১৯৭১ সালে নীলার জন্ম হয়। আমার আবছা মনে আছে সামান্য কিছু ঘটনা। চাচীর প্রচণ্ড ব্যাথা শুরু হল। চার দিক ছোটা ছুটি শুরু করছে সবাই। একজন মহিলা সম্ভবত ধাই তিনি বার বার পান মুখে দিয়ে পানের চিপ ফেলতে আসছেন বাইরে। আমি বারান্দার এক কোনে দাড়িয়ে লোকজনের ছোটা ছুটি দেখছি। মাঝে মাঝে চাচীর গোঙ্গানীর শব্দ ভেসে আসছে কানে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বাবা বাড়ি ছিলেন না, কিছু পরে আসলেন। সাথে সাথে আমি বাবার কাছে গেলাম। বললাম, চাচী কাদছে ভীষণ। সবাই ঘরে নিয়ে গেছে। বাবা বললেন, তুমি চুপ কর। আমি চুপ করলাম। বাবা জামা গায়ে দিয়েই ডাক্তার বাড়িতে ছুটলেন। ডাক্তার এলেন তখন বিকাল প্রায় চারটা। সামন্য ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। সন্ধার দিকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন চাচীর ঘর থেকে। একটা বাচ্চার কান্না ভেসে এল সবার কানে। কান্নাও যে আনন্দ ও স্বস্তি বয়ে আনতে পারে সেই ছোট অবস্থায় বুঝলাম।

নীলার জন্মের পর পরই পৃথিবীতে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল বাতাস। সেই হালকা শীতের মধ্যেও গাছের পাতা একটু নড়ে উঠেছিল। কিছু পরে বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে একঝাক পাখি উড়ে গিয়েছিল উত্তর দিকে। বয়স্ক মহিলারা এসব দেখে মন্তব্য করেছিল, শুভ লক্ষণ। মেয়েটি হবে লক্ষী, জগৎ শ্রেষ্ঠা, যেমন রুপবতী তেমন গুনবতী ও সৌভাগ্যবর্তী হবে। শুনে বাবা হাসলেন। আমাকে বললেন, যা চাচীকে দেখে আয়। তোর মাকে আমার কাছে আসতে বল। আমি তাই করলাম।

নীলার জন্মের পরের দিন দুটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। প্রথমটা আমাদের পারিবারিক, দ্বিতীয়টা  জাতীয় পর্যায়ের কিংবা আর্ন্তজাতিক পর্যায়ের ঘটনা। পারিবারিক ঘটনাটি এমন, আমাদের একটা পোষা গর্ভবতী গাভী ছিল। সে তার নির্দিষ্ট সময়ের আঠার দিন আগে বাচ্চা দিয়ে বসল। গ্রামের সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে দুটো বিষয় ভাবতে লাগল। কিভাবে এটা সম্ভব? আঠার দিন আগে বাচ্চা প্রসবের ঘটনা ্এই প্রথম। কেউ কেউ বলল, সঠিক হিসাব হয়ত জানে না। বাবা জোর দিয়েই বললেন, তার হিসাব ঠিক আছে। এই ঘটনাকে তারা সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে মন্তব্য করল। একই সাথে দুটো প্রজাতির দুটো ব্চ্চাা দান। একটায় পারিবারিক প্রশান্তি। অন্যটা পুষ্টি আর আর্থিক নিশ্চয়তার প্রতীক। বাবা গ্রামের মানুষের মতামতকে অবৈজ্ঞানিক বলে

মন্তব্য করলেন।

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে। ছাত্ররা বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিল। পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করল। সারা দেশে উত্তাল হাওয়া বইতে লাগল। শাসক গোষ্ঠী ভড়কে গেল। শেখ মুজিবর রহমানের সাথে ইয়াহিয়া খান টালবাহানা শুরু করে দিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের দাবিকে মেনে নিতে পারল না। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা বাধ্য হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করল। নেতাদের ঘোষণার অপেক্ষা করল না। এই দুটি ঘটনা ঘটল নীলা জন্মাবার ঠিক পরের দিন। তাহলে নীলা কি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দৃষ্টা হয়ে জন্ম নিয়েছিল? তার জন্মের মধ্যেই কি সৃস্টিকর্তার কোন ইঙ্গিত ছিল?

১৯৭১ সালের ১০ই মার্চ আমার বয়স পাঁচ বছর আট মাস নয়দিন পূর্ণ হল। নিয়ম অনুসারে পাঁচ বছর বয়স হলেই স্কুলে ভর্তি হবার কথা। আমি ভর্তি হতে পারিনি। সত্তরের নির্বাচন আর সাইক্লোন সমস্ত পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। তাই বাবার হাত ধরে আমি ১০ই মার্চ ভর্তি হতে গেলাম স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে। এর আগে আমি যে বই পড়তে শিখিনি তা না। বাবা বাডিতে এক মাষ্টার রেখেছিলেন। তিনি আমার অক্ষর জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। ছবির বই দেখে ছবি আঁকা শেখাতেন। ছবি সম্পর্কে হাত নেড়ে নেড়ে বিজ্ঞ পন্ডিতের মত কক্তৃতা দিতেন। পাহাড় সম্পর্কে ধারণা পেলাম সেই ছোট থেকেই। পরে জেনেছিলাম, আমার সেই শিক্ষক ছবি বিশেষজ্ঞ। এই শিক্ষকের আর একটি মুগ্ধ করার মত গুন ছিল। সেটা হল, শুর করে করে নামতা পড়ানো। বেশ ছন্দের মত মনে হত। মনে হত কোন মধু সুধা আমার শরীরে প্রবেশ করছে। আর আমি আনন্দিত হয়ে সেই মধুর স্বাধ নিচ্ছি। বাড়িতে পড়ে পড়ে আমি মোটমুটি সেই বয়সের উপযোগী হয়ে উঠলাম।

প্রথম দিন আমার সাথে যাদের পরিচয় হল, আমি শুর করে নামতা পড়ে আর ছবি,পাহাড় সম্পর্কে গল্প করে ওদের তাক লাগিয়ে দিলাম। স্কুলের স্যার প্রথম দিনেই আমার নাম দিলেন লিটন পন্ডিত এ্যাবাউট ছবি এন্ড নামতা। স্কুল ছুটির আগেই বাড়ি ফিরলাম। মা যতœ করে খাওয়ালেন। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে সঞ্জু মিয়া, বাড়ি ফিরলি যে তাড়াতাড়ী? আমি বললাম, বাবা স্কুলের চেয়ে বাড়িতে ভাল পড়তে পারব। স্কুল ঘর ভীষণ নোংড়া। বাবা বললেন ঠিক আছে, তাই হবে। আমি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করলাম।

বাড়িতে আমার পদচারনা ছিল কিছুটা নির্লুপ্ত টাইপের। নিজের ঘরে অনেক সময় বসে কটিয়ে দিতাম। ছবির বই নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াচাড়া করতাম। নামতা লিখতাম। ছবির বইতে ছাপা পাহাড়ের ছবিটা আঁকতে চেষ্টা করতাম। ডেকে না দিলে খেতে যেতাম না। মা-বাবা ব্যস্ত থাকতেন চাচী আর নীলাকে নিয়ে। আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আমার সেই ছবি বিশেষজ্ঞ শিক্ষক। চাচা সারাদিন কোথায় যেন থাকতেন চাকরীর ধান্দায়। তাকে নিয়ে বাবা মাঝে মাঝে বকাবকি করতেন।

এর মধ্যে শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া নাটক জামিয়ে ফেললেন। হঠাৎ ঢাকায় নির্বিচারে গনহত্যা চালিয়ে বসল পাকিস্তানিরা। মুক্তিকামীরাও স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বসলেন। শুরু হল যুদ্ধ। সমস্ত মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘঠতে লাগল সব অসভাবিক ঘটনা। দলে দলে মানুষ যে যার সুবিধা মত দলে যোগ দিতে লাগল। বাবা মৌন মুক্তি যোদ্ধা হলেন। চাচা হলেন শ্রেণী শত্র“ খতম আন্দোলনের সমর্থক। মাঝে মাঝে বাবা আর চাচার মধ্যে উত্তপ্ত কথা কাটা কাটি হত। বাবা বলতেন শ্রেণী শত্র“ খতমের নামে তোরা ত ডাকাতি করছিস। চাচা বলতেন, বাঁশের লাটি আর খোন্তা-কোদাল, দু’একটা পাখি মারা বন্দুক দিয়ে তোমরা দেশ স্বাধীন করতে পারবেনা। বাবার দৃষ্টিতে শ্রেণী শত্র“ খতমকারীরা স্রে¬ফ ডাকাত । আদর্শহীন একদল সংঘবদ্ধ খুনী। চাচা বলতেন, তোমরা তো স্রে¬ফ মুজিবের চামচা। সে পাকিস্তানের জেলখানায় বসে পোলাও-বিরাণী খাচ্ছে, আর তোমরা খালে-বিলে, বনে জঙ্গলে লাঠি সোটা নিয়ে যুদ্ধ করছ এবং স্বেচ্ছায় নিজেরা বলছ শহীদ হচ্ছে। সেতো জেল থেকে বেরিয়ে নানা চমৎকার বক্তৃতা দিয়ে তোমাদের মন ভোলাবে। বাবা আর কিছু বলতেন না। দেখতে দেখতে গ্রাম প্রায় লোকজন শূন্য হয়ে গেল। বাবা তার কিছু প্রতিবেশি নিয়ে আমাদের বাড়িতে সারা রাত গল্প গুজব করতেন। গোপনে বিভিন্ন ক্যাম্পে খবরা খবর পৌছে দিতেন। চাচা প্রায় বাড়ি আসতেন না। ছোট বাচ্চা মেয়ে নীলার জন্যও কোন দিন আসতেন না। চাচি কেঁদে কেটে অস্তির হতেন। হঠাৎ একদিন রাতে বাড়ি ফিরলেন। সাথে একটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল। এক বস্তা ভর্তি গহনা ঘাটি এবং নগদ টাকা। চাচার চোখ দুটা লাল টকটক করছে। বাবা সাহস করে বললেন, কিরে আবেদ এগুলো কোথায় পেলি? চাচা কিছু বললেন না। হাত মুখ ধুতে লাগলেন। চাচী ফুপিয়ে ফূপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমার মাও অবাক হলেন। বাবা বললেন, এগুলো কোথায় পেলি? চাচা বললেন, এগুলো এখন আমার সম্পদ। বাবায় চাচায় বেশ কথা কাটা কাটি হল। এক সময় আমরা সবাই শুনতে পেলাম চাচা বললেন দেখ বড় ভাই হয়েছ বলে সব কিছুতে নাক গলিও না। এখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের সময় কোন নিয়ম কানুন থাকে না। তুমি আমাকে কিছু করতে বাধ্য কর না। আমি একটু পরেই চলে যাব। আর ফিরব না। চাচা তার কথা রাখলেন। সেদিন রাতে সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন। এক পলকের জন্য নীলাকে দেখলেননা। মা-চাচি-বাবা আমি কাঁদছি অঝোরে। নীলা কাঁদছে ট্যা- ট্যা করে। ওর কান্নার মধ্যে ও কি কোন ইঙ্গিত ছিল? সেই যে চাচা গেলেন, আর এলেন না! যুদ্ধ শেষ হলেও তিনি এলেন না। বাবা বহু খোজা খুজি করলেন।

 

 

দুই-২

 

আজ হোস্টেলের ছাদে বসে আমি যে কাহিনী লিখছি, সে কাহিনী সর্ব নাশা দুর্দান্ত ঝড়ের প্রকোপে সর্ব শ্রান্ত  প্রকৃতির কাহিনী। তার সূত্র পাত ঘটে উনিশত আটত্তর সালের বসন্তের আগমনের প্রথম দিকে। আমার বয়স তখন প্রায় তের ছুই ছুই। তের বছর বয়সে কি বসন্তের আগমন উপলব্দি করা যায়?

আমি সে দিন স্কুলে মন বসাতে পারছিলাম না। বার বার বাইরে মন চলে যাচ্ছিল। স্যার ক্লাসে কি পড়াচ্ছেন বুঝতে পারছিনা। খড়কুটোর মত নিরস মনে হতে লাগল। সেই দিন আমার জীবনের সর্বনাশার যে বীজ শরীরে প্রবেশ করেছিল তা থেকে চারা গজাতে শুরু করল। শরীর,মন,চঞ্চল হয়ে উঠল। মনকে আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। শরীরের আশ্চার্য পরিবর্তনে ভয় পেয়ে গেলাম। বিষয়টা নিয়ে কারোর সাথে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করলাম। কিন্তু বিশ্বস্ত কাউকে পেলাম না। এভাবে ঘোরের মধ্যে কাটল বেশ কয়েক সপ্তাহ। এর পর একদিন ক্লাসের মধ্যে দেখলাম আমার এক বন্ধু একটা সাপ্তাহিক বিনোদন পত্রিকা দেখছে। তাতে অসম্ভব সুন্দরী সব মেয়েদের ছবি, নানা ভঙ্গিতে ছাপান। বন্ধুর নাম তুষার। লম্বা দোহারা গড়ন। হালকা নরম গোপ নাকের নীচে উঠার আয়োজন করছে। আমার সাথে দারুন ভাব। ছাত্র হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণীর। ওর আই, কিউ, খুব উন্নত নয় আমার মত। আমি দেখতে চাইলাম। খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে পত্রিকা দেখাল। মুগ্ধের মত দেখলাম। সমস্ত শরীর চঞ্চল হয়ে উঠল। আমার শারীরিক পরিবর্তন এবং চঞ্চলতা বাবার চোখ এড়াল না। বাবা তার পরিচিত এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন বাবার একটা ঔষধ আনার উছিলায়। ডাক্তার আংকেলের বয়স পঞ্চাশ ছুই ছুই ভাব। টেকো মাথা। কাধের উপরে হালকা কিছু চুল। হিসাব কষলাম, এরকম একটা টেকোমাথার চুল টাকাতে নাপিতেরা কত নেয়?

ডাক্তার আমাকে বাবার ঔষাধটা দিলেন। তার পর আমার সাথে কথা বলা শুরু করলেন। ঐ বয়সের শারীরিক সমস্যার অহেতুক ভয় দুর করার যাবতীয় পরামর্শ দিলেন। বাজে চিন্তা মাথায় আনতে নিষেধ করলেন। কিছু ঔষধ পত্রও দিলেন। সৎ থাকতে পরামর্শ দিলেন। ভাল বন্ধুর সাথে মিশতে বললেন। আমি বাধ্য ছেলের মত আংকেলের সমস্ত উপদেশ মেনে নিলাম। আংকেল আরও বললেন, তোমাদের এই যে বয়ঃসন্ধিকালের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তোমরা আমাদের মত পরামর্শক পাচ্ছ। কিন্তু আমাদের সময় এসব কথা কাউকে বলাও যেত না। লোকে নীচু চোখে দেখত। আতংকিত ভাব জাগিয়ে দিত। তিনি আরও বললেন স্কুলের পাঠ্য বিষয়ে এই সব বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা উচিত। আমি আর বসতে চাইলাম না। বিদায় নিলাম বুড়ো ডাক্তার, পরামর্শক আংকেলের কাছ থেকে।

ডাক্তার আংকেলের কোন উপদেশ কাজে লাগতে পারলাম না। গোপনে সিনেমা হলে যেতে শুরু করলাম। নারীর স্পর্শ পেতে ইচ্ছা হতে লাগল। সিনেমা দেখে প্রেম করার স্টাইল, অজশ্র স্টাইল মনে আসতে লাগল। প্রেম,প্রেম,প্রেম! তখন যেন প্রেমই আমার সমস্ত আতœার খোরাক। স্কুলের সমস্ত মেয়েকেই আমি প্রেমিকা হিসাবে পেতে চাইতাম। প্রচন্ড প্রেম তেষ্টায় জীবন যায় যায় অবস্থা। আমার ভাব সাব দেখে এক বন্ধু বলল, বাবাকে বলে বিয়ে করে ফেল। প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম। রৌদ্রের উত্তাপের সাথে সাথে আমার শরীর উত্তপ্ত হতে লাগল। অসম্ভব প্রেম তেষ্টায় কাতর হতে থাকলাম। অথচ কাউকে ভালবাসতে পারছিলাম না। প্রত্যেক মেয়েরই নিজস্ব একটা রুপ আছে, সৌন্দার্য আছে, প্রত্যেক মেয়েকেই প্রেমিকা হিসাবে পেতে ইচ্ছা হত। রুপ সৌন্দর্য সম্পর্কে তখন আমার কোন ধারনা ছিল না। বাজারে বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে রুপ সৌন্দার্য সম্পর্কে বই খুজতে শুরু করলাম। বিখ্যাত কিছু সাহিত্যিতদের নারী ও সৌন্দর্য বিষয়ক বই পত্র পড়লাম। প্রেম ও নারীর সম্পর্ক, প্রেমের সাথে রুপ ও সৌন্দর্যের সম্পর্ক বিষয়ে প্রচুর বই পড়লাম। নারীর আকর্ষণ কিসে? প্রেমের মূলমন্ত্র কি? এত সব বুঝতে বুঝতে আমার বয়স তের পার হয়ে গেল। এসব বিষয়ে তখন বন্ধুদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা হত। নারীর সৌন্দর্য কিসে এনিয়ে বিস্তর বিতর্ক চলত। কেউ নারীর সৌন্দর্য হিসেবে কোকড়ানো চুল, চোখ, ঠোট,মুখ হাসিকে বোঝাত। আমি একমত হতে পারতাম না। এর কিছু দিন পর বুক স্টল থেকে ‘নারীর শ্রেষ্ট সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতীক’ বই টি কিনে পড়তে শুরু করলাম।

রাত্রে শুয়ে শুয়ে অজশ্র স্বপ্ন দেখতাম। রাজ্যের সব মেয়ে এসে ভীড় করতে লাগল আমার চোখের সামনে। সবারই চোখের মাদকতা আমাকে আকর্ষণ করত। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই যেন কিছু একটার অভাব। দুর্বিসহ যন্ত্রনায় জীবন ধ্বংস হয়ে যাবার মত অবস্থা। লেখা পড়া সিকেয় উঠতে লাগল। ক্লাস টিচার বাবার কাছে নোটিশ পাঠালেন যে, ছেলের লেখাপড়ার মান নিম্নগামী। বাবা আমার ভাবসাব দেখে একটা কড়া ধমক লাগালেন একদিন। কিরে ব্যাটা সঞ্জু? লেখাপড়া করিস না? আমি ভড়কে গেলাম। বললাম, করিতো বাবা। বাবা বললেন, বেশ, তাই কর। আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম। বুঝতে পারলাম, আমি লেখাপড়া থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। নারীর রুপ, সৌন্দর্য আর প্রেম নিয়ে ভাবতে থাকলে লেখাপড়া সত্যিই সিকেয় উঠবে। মন প্রান বড় কষ্টে বইয়ের কালো অক্ষরের দিকে নিবন্ধ করলাম। খুব অল্প দিনেই আমি নারীর রুপ সৌন্দর্য ও আকর্ষনের বিষয় সম্পর্কে ছোট খাট একজন বিশেজ্ঞ হয়ে গেলাম। দেখলাম শুধু আকর্ষণীয় উচ্চতা, ফর্সা ধব ধবে রুপ, ঠোটের হাসি, চোখের চাউনিই নারীর আসল সৌন্দর্য নয়। পরীর মত সুন্দর নারীদের আরও একটা,বৈশিষ্ট্য থাকতেই  হবে। সেটা হল ‘ছলনা’। ‘ছলনা’ নারীর সৌনর্যের আর একটা স্বর্গীয় রুপ। যে নারীর মধ্যে ‘ছলনা’ নেই, সে সত্যিকার রুপবতী নয়। কিছু কামনা, বাসনা, প্রত্যাশিত প্রাপ্তির মধ্যে ‘ছলনা’ প্রেমকে সত্যিই দৃঢ় করে। পরীর মত শ্রেষ্ট সুন্দরী হতে হলে অবশ্যই ‘ছলনা’ শব্দ টি যুক্ত থাকতে হবে। আমি তখন বসন্তের প্রথম ধ্ক্কাা কাটিয়ে উঠেছি। মেয়েদের মধ্য আমার প্রবল চাহিদা। আমার দৈহিক উচ্চতা, শারীরিক গড়ন, চুলের ছাট, পোশাক, কথা বলার ধরণ, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় উপস্থিত যুক্তি খন্ডন, ফুটবল, ক্রিকেট খেলা, সবটাই মেয়েরা আকর্ষণ করত। আমি যেটাই করতাম, সেটাই শ্রেষ্ট হত তাদের কাছে।

উনিশত আশি সালের প্রথম মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের এক দিন, শেষ রাতের দিকে একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটা ছিল এই রকম, আমি পাহাড়ের উপরে উঠছি, পাহাড়ের উপরে সবুজ গাছ পালা দেখছি, প্রকৃতির রুপ সুধা পান করছি। নীল আকাশ, হালকা  বাতাস, চুলগুলো পিছনে উড়ে যাচ্ছে। নীচে ঝর্ণার স্রোত ধারা। নেচে নেচে পানি নেমে যাচ্ছে দূরে। ছোট নালা, সাদা পানির স্রোতে পূর্ণ। হঠাৎ দেখলাম, একটা বুনো হাতি আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমার মধ্যে উত্তেজনা ভয় কোনটাই হল না। হাতিটি আমার কাছা কাছি এল। শুড় দিয়ে আমার জামায় ঘষতে লাগল। আমি হাসছি। কোন উত্তেজনা নেই। মনে হল যেন বুনো হাতির সাথে মানুষের বুঝি এটাই স্বাভাবিক সম্পর্ক। কিছু পরে হাতিটি আমাকে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। আমি তখনও হাতিটির দিকে তাকিয়ে তার শুড় উচু করে চলে যাওয়া দেখছি। দেখতে দেখতে চোখ চলে গেল ঝর্ণার নীল পানিতে। স্বচ্ছ পানির স্রোত, দেখতে মধুময় লাগল। হঠাৎ কানে ভেসে এল একটা হাসির শব্দ। খিল খিল করে হাসা। কাচের চুড়ির ঝনঝনে শব্দের মত উচ্ছল প্রানবন্ত। কানে ছন্দের মত আছড়ে পড়তে লাগল। আমার দৃষ্টি উদাস হল। দেখলাম, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার নীচে ঝর্ণার পানিতে একটা মেয়ে। বয়স বড়জোর আট কি নয়। গায়ে লাল ফ্রক, মুখ চাঁদের মত গোল। থুতনিটা সামান্য লম্ব। মাথায় একরাশি চুল। পিঠের উপর ছড়ানো। ঠিক যেন ছোট পরী। হয়ত পরীর বাচ্ছা। শুধু ছবির পরীদের মত ডানা নেই। শুধু হাসছে আর দু’হাতে পানি ছড়াচ্ছে। জামা ভিজাচ্ছে। আর কেউ আছে কিনা চারপাশে ভাল করে লক্ষ করলাম। কাউকে পেলাম না। একটু পরে ঝর্ণার পানিতে সাতার কাটতে শুরু করল। লালফ্রক আর লাল পাজামা পানিতে ভিজে শরীরের সাথে আটকে গেছে। হাসের মত ডুবছে আর উঠছে। একটু নীচে নেমে গেলাম। আরও কাছাকাছি। আরও কাছে, আমি তন্ময় হয়ে মেয়েটিকে দেখছি। চেহারায় দুষ্টামির আভাস। চোখ ফেরাতে পারলাম না। এক দৃষ্টিতে লাল পরীকে দেখছি। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোট কামড়াচ্ছি। চোখের তারা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। কাটুক সাতার লাল পরী পানিতে, আমি তাকাচ্ছি আর ঐ দৃশ্যের সৌন্দর্য সুধা পান করছি। থর থর করে কাপছি আমি। কেন আমার এমন হচ্ছে? কিছু পরে মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। একি দেখলাম আমি! এতো সাক্ষাত পরী। আমাকে দেখে আশ্চার্য হল না। বরং দাঁত দিয়ে নীচের ঠোট চেপে ধরে চোখ সামান্য বড় করে একটা আদুরে দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। আমিও দেখছি। দু’জনে চোখ ফেরাতে পারছিনা। ভাবলাম এই কি আমার কল্পকথার রাজকন্যা? যার খোজে আমি অহর্নিশ ব্যস্ত? আমি হাসছি। মেয়েটিও হাসছে। আমি কাছে এগিয়ে যাচ্ছি। সেও রহস্যময়ী ভঙ্গীতে দূরে সরে যাচ্ছে। এক তীব্র হতাশায় হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠল। সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেল।

তিন- ৩

১৯৮১ সালের ১লা জুলাই আমার বয়স হল ষোল। এই সময় একটা ব্যাপার ঘটল। নিদ্রায়, অনিদ্রায় আমি যে নারীকে খুজতাম, তাকে পেয়ে গেলাম। একদিন স্কুলে থেকে ফিরে ছাদে উঠলাম। ফ্রেস বাতাস নিয়ে ফুসফুসকে শক্তিশালী করছি। হঠাৎ দেখি কুসুম কালারের সকার্ড পরা একটা মেয়ে। পায়ে কেডস। জিনসের প্যান্ট। হাতে বেসলেট। চুলগুলো এলোমেলো। মুক্তোর মত দাত বের করে হাসছে। দুষ্টামীতে ভরা হাসি।  শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আহ্-রে! এই তো সেই মেয়ে! এর সব রুপই আছে। সব সৌন্দর্যে পূর্ণ। চেহারায় দুষ্টামীর ভাব। আমি যত তাকাচ্ছি,  তত পাকা পরিচিত প্রেমিকার মত করে হাসতে লাগল। চোখের তারায় কামনা আর আহবানের ঝিলিক। আমি স্থির থাকতে পারলাম না। ভাবলাম এইতো সেদিনের নীলা, আজ এই সেই। ও তো গোটা পৃথিবীর সৌন্দর্য পিপাসু পুরুষদের ঠন্ডা করে দিতে পারবে। নিজের সাথে বহু ধস্তা ধস্তি করলাম। বোঝালাম। পারলাম না। বৃষ্টিকে কি আটকানো যায়? আমি নীলার প্রেমে পড়ে গেলাম। আমাদের সেই দিনের ছোট নীলা আমার সমস্ত কামনায় আগুন ধরিয়ে পূর্ণ নারীতে পরিণত হল। চারদিকের সমস্ত নারী আমার পাছে ফিকে হয়ে গেল। আমার প্রেমে নীলা যেন গলে গলে পড়তে লাগল। ওর তখন বয়স আর কত হবে? বড় জোর দশ।

যুদ্ধের পর খোজ খবর নিয়ে বাবা নিশ্চিন্ত হলেন চাচা বেচে নেই। নীলা ও চাচীর অভিভাবক হলেন আমার বাবা। এই সুযোগে নতুন চাঁদের মত আমাদের প্রেম বড় হতে লাগল। নীলাকে আমি ছবি আঁকা শেখাতাম,কবিতা আবৃতি বুঝিয়ে দিতাম। এই সব অতিরিক্ত কাজ করতাম নীলাকে কাছে পাবার জন্য কঠিন কঠিন প্রশ্ন করতাম। নীলা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকত। না পারার অপরাধে ওর গাল টিপে দিতাম। মা-বাবা মনে করতেন শাস্তি দিচ্ছি। নীলা ভাবত, মধুর পরশ পাচ্ছি।

আমার প্রতি নীলার প্রচন্ড টান ছিল। সময়ে অসময়ে পড়া দেখিয়ে দিতে বলত। আমি মাথার চুল ধরে হালকা টান দিতাম। ও হাসত। দাঁত গুলো যেন মুক্তার মত ঝিকমিক করছে। হাসলে গালে টোল পড়ে।

দিন দিন আমরা দু’জন ভালবাসার সাগরে ডুবে গেলাম। নীলা গভীর রাত পর্যন্ত পড়া শুরু করল। আমিও পড়তাম। একঘরে। এই পড়ার সুযোগে আমার একটা হাত নীলার হাত ছুয়ে ফেলত। নীলা আলত করে হাতটা এগিয়ে দিত। আমি হাত ম্যাসেজ করে দিতম। বুকে তখন কম্পন শুরু হত। পড়ার শব্দ হত আরও উচ্চ। সবাই ভাবত আমরা পড়ার সাগরে ডুবে আছি।

এক সময় রাত গভীর হত। আমরা দু’জনে লোভনীয় আনন্দে ডুবে যেতাম। আমি ঠোটে, কানের লতিতে, গলায় আদর একে দিতাম। ও শিউরিয়ে শিউরিয়ে উঠত। এক সময় আমার আঠা থেকে নিজেকে মুক্ত করে ও চাচীর ঘরে শুতে যেত। আমি যন্ত্রনায় ছটফট করতাম সারারাত। আমার কামনা, বাসনা তীব্র হতে লাগল। যন্ত্রনায় ছটফট করতাম। নীলার তীব্র ঝাঝালো রুপ আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কয়লা করে দিত। নীলা স্কুলে যাবার সময় পরত কেডস, জিনসের প্যান্ট আর টি শার্ট। বইয়ের ব্যাগ পীঠে ঝুলিয়ে যখন হাটত, তখন মনে হত স্বর্গের অপস্বরী। ছেলেরা হা করে তাকিয়ে থাকত ওর দিকে। স্কুলের স্যারেরা পর্যন্ত বোকা বনে যেত ওর তীব্র রুপের ঝাঝে। অল্প বয়সেই ঔ পাকা যুবতী মেয়েদের মত হাসত। ছুরির মত ধারাল হাসি সবারই বুক চিরে ফেলত। আর কসাইয়ের মত দিব্যি হেসে কথা বলত ও।

স্কুলের গেটে, রাস্তায় হু-হু করে নীলার ভক্ত বাড়তে লাগল। ফুলের ষ্টিক প্রায় প্রতিদিনই পেত ও। মাঝে মাঝে স্টিকের মধ্যে চিঠিও পেতে শুরু করল। সবই আমাকে দেখাত। আর আমার বুকের ভিতর ধক ধক করে উঠত। ভাবতাম এই বুঝি কেউ আমার নীলাকে ছিনিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র করছে। ও গুলো যতো দেখতাম ততই আমি বলতাম, নীলা সোনা আমি তোমাকে ভালবাসি। নীলা তখন খিল খিল করে হাসত। বুঝতাম ও খুব মজা পাচ্ছে। আমাদের প্রেম গভীর হবার সাথে সাথে বিচিত্র সব সখও মাথায় আসতে লাগল। দু’জনে মিলে ছাদের উপর গড়ে তুললাম বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান। এ কাজে বাবার উৎসাহ ছিল প্রচুর। বহুদুর থেকে তিনিও ফূলের চারা এনে দিতেন। মা-চাচী দু’জন ব্যস্ত থাকতেন সংসার গোছানোয় আমরা ব্যস্ত থাকতাম বাগানের যতেœ।

নীলার সয়স যত বাড়তে লাগল। বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলার অভ্যাসও বেড়ে যেতে লাগল। একদিনের একটা ঘটনার কথা বলি, সে দিন ছিল মঙ্গলবার। শ্রাবন মাস। ঝর ঝর বৃষ্টি ঝরছে। নীলা বাবাকে চা তৈরী করে দিল। ঔ এক কাপ নিল। আমি শুনলাম নীলা বলছে, জানেন চাচাজি, আজ একটা অদ্ভত ব্যাপার ঘটবে। রাত দুটোয়। বাগানে একটা বিরল প্রজাতির ফূলের চারা আছে। রাত দু’টোয় ফুল ফোটে। পনের মিনিট পরেই ঝরে যায়। কত মর্মান্ত্রিক ব্যাপার, তাইনা চাচাজি? বাবা মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ, খুবই দুঃখজনক। মাত্র পনের মিনিটের আয়ূ। নীলা সাথে সাথে আবদার ধরল আজ কিন্তু সাথে থাকবেন চাচাজি। আমি আর আপনি দেখব, কখন ফুল ফোটে। ঠিক দুটোয় কিনা! বাবা সাথে সাথে বললেন না মা, আমি যেতে পারব না। আমার আবার ঠন্ডা লাগলে সমস্যা হবে। নীলা ততই জোর ধরে। শেষটায় বাবা বললেন, তোমরা দেখগে মা। কাল আমার সাথে গল্প করলেই আমার দেখা হবে। নীলা কপট রাগ দেখাল। আমি হাসলাম। নীলা ঠিক রাত একটা আটান্ন মিনিটে আমাকে ডেকে তুলল। শিগগিরি চল ছাদে। আমি বললাম, এই বৃষ্টির মধ্যে? বলল, আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে। দু’জনে ছাদে উঠে গেলাম। একটি ছাতার নীচে আমরা দু’জন। ঝুমবৃষ্টি হচ্ছে। সিড়ির দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে মাথা থেকে ছাতা ফেলে দিল। আমরা ভিজতে থাকলাম। বৃষ্টির রিনি ঝিনি শব্দে মন চঞ্চল হয়ে উঠল। আমি ওর ঠোটের নোনতা স্বাদ নিলাম। পরম আবেশে ও আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর ভেজা শরীরে হাত বোলাতে লাগলাম। শরীরের উত্তাপ বৃষ্টির পানি যেন ঠান্ডা করতে পারছিল না। ওর ঘাড়ের নরম চুলে, থুতনিতে অসংখ্য দুষ্টামির ছাপ মেরে দিলাম। ঠিক পনের মিনিট পরে নীচে নেমে গেলাম। ঘরে ঢুকে টিউব লাইটের আলোয় ঠিক জলপরীর মত দেখাল ওকে। আমাদের সমস্ত সুখের মাঝেও নীলার মধ্যে মাঝে মাঝে দুঃখবোধ জেগে উঠত। তখন ওর কাছে সব কিছুই মিথ্যে হয়ে যেত। হাতের কাছে যা কিছু থাকত ছুড়ে ফেলে দিত। আমাকেও ওর অসহ্য মনে হত। সাময়িত। তারপর আমার বুকের মধ্যে মাথা রেখে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাদত। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দুঃখ ভোলাতে চেষ্টা করতাম। একসময় বাচ্চা মেয়েদের মত ঘুমিয়ে পড়ত। নীলার এই দুঃখটা ওর বাবাকে নিয়ে বাবা বেচে আছে কি মরে গেছে তা সে জানেনা। এই দুঃখবোধ তীব্র হত ছাব্বিশে মার্চ ও ষোলই ডিসেম্বর। বছরের এই দুই দিনে ওকে সামলানো খুব কঠিন হত। এই দুদিনে আমাদের বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থা হত। যখন খুব ছোট ছিল বাবা ওকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। সারা দিন চিড়িয়াখানা, পার্ক, ইত্যাদি সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। অজস্র লজেন্স, চকলেট খেতে দিতেন। ওকে হাসাবার জন্য বাবা মাঝে মাঝে জুকারদের মত ব্যবহার করতেন। জামা-কাপড় আর খেলনার দোকানে নিয়ে যেতেন। ওর পছন্দ মত খেলনা, প্যান্ট, ফ্রক, কেডস, চুলে বাধা গাডার, ফিতা যা যা ওর পছন্দ হত সব কিনে দিতেন। সন্ধায় যখন বাড়ি ফিরত নীলার মনে কোন দুঃখ থাকত না। হেসে হেসে কেনা জিনিস দেখাত। বাবা রাতে ওকে কেনা জামা কাপড় পড়তে বলতেন। ও পরত আর বেনী দুলিয়ে হেসে হেসে ঘর ভরিয়ে দিত। আমরা খুশি হতাম। নতুন জামা প্যান্ট আর কেডস পরে টিউব লাইটের আলোয় যখন হেটে বেড়াত মনে হত একটা বাচ্চাপরী হেটে বেড়াচ্ছে।

বড় হবার সাথে সাথে ওর দুঃখবোধটা আরও বেড়ে গেল। তখন আর শুধু কেনা কাটা করেই ওর কষ্ট ভোলান যেত না। মুখ ভীষণ গম্ভীর করে থাকত। কাঁদত। মুখে বালিশ গুজে দিয়ে শুয়ে থাকত। মা-বাবা ও চাচী কেও ওর ঐ ভাব কাটাতে পারত না। সবাই চলে গেলে আমি খুব আদর করে ডাকতাম, এই সোনা, শোন না—সোনা, মাথায় হালকা ঝাকি দিতাম। ও নীচের ঠোট দাঁতে চেপে ধরে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করত। আমি থুতনি ধরে মুখটা উচু করে বলতাম, নীলা সোনাগো, তুমি কষ্টে থাকলে আমার হৃদয় ছিড়ে যায়। এটা কি জাননা? ও ঝর ঝর করে কেদে দিত। ওর ফর্সা গাল বেয়ে চোখের পানি যখন নামত, মনে হত মুক্তার দানা ঝরে ঝরে পড়ছে। দেখতে ভাল লাগত। চোখের পানি মুছে দেয়ার সুযোগে একটু আদর করতাম। আস্তে বলতাম, চল বেড়িয়ে আসি, ভাল লাগবে।

আধ ঘন্টার মধ্যে আমরা তৈরী হয়ে নিতাম। চার দিকে আনন্দ উৎসব। আমরা আনন্দ উৎসবে যোগ দিতাম না। আমার নীলা সোনাকে নিয়ে যেতাম নির্জন পার্কে। গাছের ছায়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতাম। গাছ, আকাশ দেখে দেখে সময় কাটাতে চেষ্টা করতাম। একসময় ক্লান্ত হতাম। ও বলত, আইচক্রীম খাব। কিনে দিতাম। আমি খেতাম বাদম। মাঝে মাঝ আজগোবী কথা বলত। যেমন, জান- সোনা, আমিও মরে যাব। বাবার মত চলে যাব। আর আসব না। দুঃখভরা হাসি দিত। আমি ভয় পেয়ে যেতাম। ওকে বুকে টেনে নিতাম। সাথে সাথে আদর করতাম। ওর ঘাড়ের নরম চুলগুলোতে আঙ্গুল বুলাতাম। পরম আনন্দে ও ডুবে থাকত কিছুক্ষণ। আমি বলতাম, নীলা হাসবে না? আমার কোলে মাথা রেখে চোখ বুঝে বলত, না। হাসতে ভাল লাগছে না। আমি তখন বানিয়ে বানিয়ে নানা রকম হাসির গল্প করতাম। ও খিল খিল করে হেসে উঠত। সাথে সাথে মনে হত পার্কের ঐ ফুলগাছ, মেহগনি গাছ, ও মাটি সবাই আনন্দে ঝনঝন করছে। আস্তে করে দাবির সুরে বলত, সিনেমা দেখব। সিনেমা হলে ঢুকতাম, প্রেমের রসে করুন পরিনতির বই বেশী সময় দেখতে পারতাম না। ও মন খারাপ করত। টেনে হল থেকে বের করে আনতাম। হোটেল থেকে কিছু খেয়ে নিতাম। ও বলত, খুব কষ্ট লাগছে। কেন? বলত, নায়িকার সাথে নায়কের এমন ব্যবহার দেখেও কষ্ট লাগবে না? আমি বলতাম, কষ্টের কি আছে। আমি তো তোমার সাথে অমন ব্যবহার করছিনা। ও হাসত। পার্কে ফিরে খেতাম চুইংগাম, দামী চকলেট। এক সময় নীলা বলত, গা গুলিয়ে যাচ্ছে। বমি বমি লাগছে। বলতে বলতেই বমি করে দিত। টিউবওয়েলের পানি দিয়ে ওর মুখে পানি ছিটিয়ে দিতাম। কিছু সময় পার্কের বেঞ্চে আমার উরুর উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে নিত। আমি ওর পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলে হাত বুলিয়ে দিতাম। পার্কের মানুষগুলো কৌতুহল নিয়ে আমাদের দিকে তাকাত। সন্ধ্যার দিকে ওর জন্য থ্রি পিস, কিছু প্রসাধনী, মা-বাবা-চাচীর জন্য মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরতাম। ও এসেই ঘুমিয়ে পড়ত। সে দিন আর দেখা হত না।

আমাদের এই ভালবাসার লুকোচুরির খেলা বেশী দিন গোপন রাখতে পারিনী। আমরা ধরা পড়ে গেলাম। অথচ সেদিন খারাপ লাগার মত কিছু করিনি। সে দিনের ঘটনা না লিখলে নীলার সোনার ভালবাসার কাহিনী সম্পূর্ণ হবে না। সে দিন ছিল শুক্রবার। সম্ভবত ভাদ্রমাস। রাতে প্রচন্ড জ্যোস্না হবার কথা। বাতাসে জ্যেৎস্না গলে গলে পড়বে। নারকেল গাছের পাতায় জ্যোৎস্না পড়ে চিক্ চিক্ করবে। এদৃশ্য আমার ভাল লাগে। যখনই প্রচন্ড জ্যোৎস্না হয় আমি একা একা ছাদে উঠে ঘন্টার পর ঘন্টা ফুলের টবের পাশে বসে থাকি মাদুর পেতে। সেদিনও ছিলাম। আমি একদৃষ্টিতে পূর্ব দিকে তাকিয়ে আছি। লাল টকটকে চাঁদ সবে উঠেছে। চারদিকে আলো ঝরে পড়ছে। আমি একদৃষ্টিতে দেখছি। হঠাৎ পিছন দিকে পায়ের শব্দ পেলাম। তাকালাম না। একটু পর পিছন থেকে নীলা দু’হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। আমার পিঠে ওর শরীরের আতিরিক্ত অপরিহার্স মাংসের চাপ অনুভব করলাম। মুহুর্তে গায়ে বিদ্যুৎ বয়ে গেল। বাম হাতে আমার মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আদর করতে লাগল। ওর গরম নিশ্বাস আমাকে উতালা করে তুলল। আমার মুখের নোনতা স্বাদ নিতে লাগল ও। ওর শরীর থেকে প্রসাধনীর গন্ধ ভেসে আসল নাকে। কড়া মিষ্টি গন্ধ। আমি ওকে আরও কাছে নিতে চাইলাম। ও বাধা দিল। মুখে সামান্য উউম-উউম, আদর আর আবেগমাখা শব্দ হতে লাগল। আমি বাধা দিলাম না। আমি স্বর্গের সুখ অনুভব করলাম। ও আমাকে স্বর্গসুখ দিচ্ছে। ওর মুখের নোনতা লালায় আমার ঠোঁট জ্বলে যেতে লাগল। ঠোট ছেড়ে মুখে, কপালে, গলায়, ঘাড়ের নরম চুলে চুমো খেতে লাগল। ঠিক এই সময় পিছনে মায়ের কড়া গলা শুনতে পেলাম, কে ওখানে? সাথে সাথে মনে হল নীলা আমার পিঠের উপর মরে পড়ে আছ। আমি বুদ্ধিমান। আমার আই,কিউ ও ভাল। আমি চোখ বুঝে বললাম, প্রচন্ড মাথা  ধরেছে। একটু মাথা টিপে দিচ্ছে। সাথে সাথে ওর দু’হাত আমার মাথার চুলের মধ্যে খেলা করতে লাগল। বিলি কেটে দিতে লাগল। তবুও মাকে বুঝানো গেল না। আমরা মায়ের ঘোর সন্দেহের মধ্যে পড়লাম। দু’জনের অবাধ চলাফেরয় নিষেধাজ্ঞ দিলেন।

আমাদের উপর মায়ের গোয়েন্দাগিরি শুরু হল। নীলা পনের দিন আর আমার সামনে আসল না। আমিও খোজার চেষ্টা করলাম না। নীলা ওর মায়ের ঘরে পড়তে শুরু করল, আমি আমার ঘরে। বাড়িতে কেহ কিছুই জানল না। দুদিন পর আমি অসহ্য হয়ে উঠলাম। বুঝলাম শরীরটা এবার সত্যিই কয়লা হয়ে যাবে। বার বার সুযোগ খুজতে লাগলাম। খাতা, বই, ষ্টাপলার, গজপিন, আলপিন এই সব চাইতাম। যাতে নীলা আমার কাছে আসার সুযোগ পায়। আমার চাহিদার কথা বলা মাত্রই মা এসে হাজির হতেন। আমার মুখ বিরক্তিতে ভার হত। ভাবতাম এই বয়সে ছেলের উপর এত গোয়েন্দা গিরি কেন? মা দীর্ঘরাত জেগে থাকতেন। যত সময় নিশ্চিত না হতেন যে, আমরা ঘুমিয়েছি ততসময়। জিদ করে আরও রাত জাগা শুরু করলাম। যাতে মায়ের জেগে থেকে গোয়েন্দা গিরির স্বাদ মিটে যায়। হলনা, উনি যেন ঘুমিয়ে থেকেও দু’চোখ খোলা রাখতেন। ঘুমিয়েছেন কিনা জানার জন্য পেনন্সিল মেঝেতে ফেলে দিতাম। সাথে সাথে জেগে উঠতেন। আমার ঘরে ছুটে আসতেন। বলতেন, কি পড়লরে সঞ্জু? আমি বলতাম, কই কিছুই নাতো। আনমনে বলতেন, শুনলঅমতো কিসের একটা শব্দ! তার পর চলে যেতেন। মায়ের খোজা খুজিকে বাবা-চাচী ভাবতেন আমাদের জন্য তার দরদ গলে গলে পড়ছে। আমি ভাবতাম আমাদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে।

আমার নীলা আমার সামনে হেটে যাচ্ছে, হাসছে, বই পড়ছে অথচ আমি কাছে পাচ্ছিনা। অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট করতাম। দু’দিন আদর করতে না পেরে, আদর না পেয়ে জান কয়লা হয়ে উঠল। এই দুদিনে বুঝলাম, নীলা রুপের রানী হয়েছে। ও গোটা পৃথিবী ঠান্ডা করে দিতে পারবে। ওর রুপ শিখা দপদপ করছে। সেই শিখায় আমি জ্বলে পুড়ে খ্াক হয়ে যাচ্ছি। আমি সুযোগ খুজতে থাকলাম। একটা সুযোগ পেয়েও গেলাম। গোয়েন্দাগিরির তৃতীয় দিন। মা নামাজ কামাই দিতেন না। মাগরিবের নামাজে বসলেন সেদি। আমি ঘর থেকে বের হলাম না। নীলা ছাদ থেকে কাপড় চোপড় উঠারে বলে জোরে জোরে বলল এবং দ্রুত উঠে গেল। আমিও উঠে গেলাম। তিন দিন বিচ্ছেদে আমরা কাতর হয়ে পড়েছিলাম। আমাকে সিড়ির দিকে আসতে দেখে ও দাড়িয়ে গেল। দ্রুত কাছে টেনে নিলাম। ঠোটে,মুখে,গলায় যেখানে সুযোগ পেলাম আদর করলাম। ওইটুকু সময়ে যেটুকু পারলাম করলাম।

মায়ের গোয়েন্দাগিরি বেশীদিন টিকলনা। বয়সের চাপে অতিরিক্ত চিন্তায় মায়ের হাই প্রেসার দেখা দিল। ডাক্তার দেখালাম। বললেন, নিয়মিত অষুধ না খেলে স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। ফেরার সম্ভবনা কম। মা-শান্ত হয়ে গেলেন। এক মাস পর অনিয়মে মায়ের স্ট্রোক হল। হাস পাতালে মা মারা গেলেন। বাবা নীলা-চাচী-খুব কাদলেন। আমি কাঁদলাম না। মায়ের মৃত্যু আমাকে সাময়িক কষ্ট দিলেনও আনন্দিত হয়ে ছিলাম বেশী।

মায়ের মৃত্যুর পর সংসারটা অন্যরকম মনে হত। চাচী সারা দিন সংসার দেখা শুনা করতেন। বাবা বাইরের কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফিরতেন। খবরের কাগজের হেড লাইন এক নজরে দেখে শুয়ে পড়তেন। বাবার নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর চেষ্টা করত নীলা। বাবা যত সময় বাড়ী থাকতেন, নীলা সব সময় আঠার মত লেগে থাকত। বাবার কোন কষ্ট  হতে দিত না নীলা। আমরা পেয়ে গেলাম মধু খাওয়ার চমৎকার সুযোগ।

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশী ভাবতে লাগলেন। বাবা চাইতেন আমি কৃষি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে গ্রামের কৃষকদের সেবা করি। আমি চাইতাম মেডিকেল সায়েন্সে ডিপে¬ামা করে পাহাড়ী দরিদ্র উপজাতীদের সেবা করি।

ছন্দের মত চলতে লাগলাম আমরা। রুটিন ব্রেক হত না। যে যার মত চলছি। এর মধ্যে সকল হিসাব নিকাশ ভুল প্রমাণিত হল। যে চাচাকে ভাবতাম মারা গেছেন। তিনি এক দিন রাত দশটায় দুটো সুটকেস নিয়ে হাজির হলেন। কোট প্যান্ট টাই পরা চমৎকার এক সুপুরুষ। এটা ঘটল ঊনিশত তিরাশিতে। চাচা যেন এতদিন পর আরও যুবক হয়েছেন। একাত্তরে যে বেকার ল্যাদলেদে যুবককে দেখতাম এযেন সেই নয়। চাচী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাবাও আমি আনন্দে নেচে উঠলাম। শুধু নীলা কিছু বুঝতে পরলনা ছবি ছাড়া ও ওর বাবাকে ভাল করে দেখেইনি। চাচা নীলাকে জড়িয়ে ধরে অজশ্র কাদলেন। আদর করলেন। মার জন্য দুঃখ করলেন। এতদিন পর চাচা যেন কেঁদে কেঁদে ফ্রেস হলেন। নীলাতো চাচাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেল। আমাকে নীলাকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে চাচা কাঁদলেন। কিছু সময় আমরা যোরের মধ্যে কাটালাম। চাচা খাওয়া দাওয়া করলেন এবং বাবার সাথে একান্ত আলোচনায় বসলেন।

চার- ৪

তিন দিন পরে চাচা সম্পর্কে যেটা জানলাম, সেটা হল এই রকম—- চাচা একাত্তরে নকশালী লিডার হয়ে অনেক খুন খারাবী করেছেন। লূট-পাট করেছেন। সঙ্গীদের কাউকে ভাগ দেননি। সম্পদ নিজের বলে মনে করলেন। নিজের লোক তখন শত্র“ হয়ে গেল। তিনি আতœ গোপন করলেন। দেশ স্বাধীন হলেও শত্র“ কমল না। তিনি কিছুদিন চিটাগাং এর দিকে ছিলেন। পাহাড়েও কিছু দিন কাটিয়েদেন। দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটল । তিনি এই পরিবর্তনের সুযোগে সাদা জীবনে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেন। ঢাকায় ফিরলেন। উত্তরায় ভাড়া বাসায় একা একা থাকতে শুরু কলরেন, ব্যবসা পাতি শুরু করলেন। নিজেকে মুক্তি যোদ্ধা বলে পরিচয় দিলেন। প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে গেল। এখন তার অনেক ব্যবসা। বৈধ অবৈধ মিলে কয়েক কোটি টাকার মালিক। গুলশান, মতিঝিল, উত্তরায় মোট আটখানা প্রাসাদতুল্য বাড়ি। এসব এলাকায় তার নাম বললে যে কোন রিক্সা, ট্যাক্সি ওয়ালা দেখিয়ে দেবে। তবে আবিদ হোসেন নামে তাকে কেউ চিনবে না। বলতে হবে বীরমুক্তিযোদ্ধা সাকিব হোসেন। এখন ঢাকায় তিনি নীলা ও নীলার মাকে নিয়ে যেতে চান। বাবা রাজি হলে তিনি এবং আমিও যেতে পারি।

সবশুনে বাবা হাসলেন। বললেন খুন খারাবী করে বড়লোক হয়েছিস। ছিলি নকশালী, হলি মুক্তিযোদ্ধা নামছিল আবেদ হোসেন, পাল্টে হলি কিনা সাকিব হোসেন। এখন বলছিস আমাদের সবাইকে সেখানে যেতে হবে। অসম্ভব! চাচার মুখটা অনেক মলিন হয়ে গেল। অবশেষে বাবাকে হার মানতে হল। দীর্ঘ দিন পর চাচী তার স্বামীকে পেলেন। নীলা তার বাবাকে পেল, এখন তাদের কেন আটকাতে হবে? বাবা অমত করলেন না।

আমার নীলা সোনাকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন আমার কসাই চাচা তিরাশিতে। সেদিন ছিল রবিবার। শনিবার বিকালে নীলাকে মার্কেটে নিয়ে গেলাম। ওর জন্য কিছু জামা কাপড়, রেডিমেড সোনার গহনা কিনলাম।  দু’জনে কিছু সময় নির্জনে কাটালাম। কেউ কোন কথা বলতে পারলাম না। নীলার দিকে চাইতেও পারলাম না। বাড়ি ফিরে আসলাম। রাতে খাওয়া দাওয়া করলাম। বাবা-চাচা-চাচী ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি একা একা ছাদে উঠে গেলাম। সমস্ত নীল আকাশ মনে হল কালো মেঘে ঢাকা। অসংখ্যা উজ্বল তারকারাজিকে মনে হতে লাগল বিষন্ন। মনে হতে লাগল আমার সামনে কেবল অন্ধকার। গাছের সেই সৌন্দার্য চোখে পড়ল না। নীরব মনে হল সব। ফুলবাগানটায় ঘুরলাম। চোখ জ্বলতে লাগল।

রবিবার সকালে আমার কেনা গহনা শাড়ি পরে নীলা পূর্ণপরী হয়ে বসল। আমি ভাবলাম, যে ভাবে সেজেছে নীলা গোটা পৃথিবী আজ থ হয়ে যাবে। আমার মনে ভয় ঢুকে গেল। এই নীলাকে আমি ফিরে পাবতো? ঢাকার মানুষ একে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেত? মনে মনে বললাম, হায় আল্ল¬াহ্ গোটা ঢাকা শহরের সমস্ত পুরুষদের তুমি অন্ধ করে দাও। কেউ যেন আমার নীলাকে না দেখে। যে দেখবে সেই পাগল হয়ে যাবে। নীলাকে বিদায় করে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল। একটা মাথা ব্যাথার ট্যাবলেট খেলাম। চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম। সন্ধ্যার পর ঘুম ভাঙ্গল। ঘুম চোখে উঠলাম। বাথরুমে যেয়ে হাত মুখু ধুলাম। পড়ার টেবিলে খবরের কাগজ রাখা। দেখলাম। এই প্রথম বুঝলাম, নীলা ছাড়া আমার অস্তিত্ব অর্থহীন। শরীরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নীলাকে আমি ভূলতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। আমার স্বপ্নে, অনিদ্রায় নীলা বার বার এসে দাড়াতে লাগল। আস্তে আস্তে নীলার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করলাম। খাট পড়ে আছে খালি। বালিশগুলো সাজানো। বিছানা চাদর তুলে রাখা। খাটে হাত বুলাতে লাগলাম। কিছু পরে নীলার শয়ন খাটে শুয়ে পড়লাম। নীলার শরীরে একটা চমৎকার গন্ধ ছিল।  গন্ধটা খুজতে লাগলাম। যে বালিশ মাথায় দিয়ে আমার সোনা ঘুমাতো সেটি বুকে চেপে ধরে স্বাদ নিতে লাগলাম। কিছু সময় এভাবে কাটালাম। খাট থেকে উঠলাম। নীলার পড়ার টেবিলে বসলাম। ওর পড়ার বই গুলোতে হাত বুলালাম। বই খুলে কিছু পড়তে চেষ্টা করলাম। আজে বাজে কিছু কাগজ ছিড়ে ফেললাম। ছোট বেলায় ব্যবহার করা ছবি আকার পেন্সিলগুলো দেখলাম সাজানো। কয়েকটি ছবিও দেখলাম। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম সেদিকে। নীলাকে ভূলে থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম। কোন স্বৃতি যাতে মনে না পড়ে তার জন্য ছবি পেন্সিল গুলো নষ্ট করে ফেললাম। এরপর আলমারির দিকে নজর গেল। দেখলাম কিছু নীল রঙের জিন্সের প্যান্ট, স্কুলের ব্যাগ, কিছু প্রসাধনী, কেডস্ পড়ে রয়েছে। পারলাম না আমি। আমার অস্তিত্ব থেকে নীলাকে সরাতে পালাম না। সমস্ত ঘর খানাতেই নীলার ছোয়ায় নীলাময় হয়ে আছে। ঠিক করলাম এখন থেকে নীলার ঘরেই আমি পড়ব, শোব। ঘর থেকে বেরিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে ছাদে উঠলাম। অন্ধকার! আকাশে উজ্জ্বল তারাগুলো এক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে। বাতাসে আমার চুল গুলো বার বার চোখের উপর পড়ছে। ভাবলাম, এই বাতাসে কি আমার নীলার শরীরের গন্ধ ভেসে আসবে না? কোন নীলাবার্তা কি আসবে না? আস্তে আস্তে ফুলগাছগুলোকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আদর করলাম। গাদাফুলের ডগাটা নিয়ে আমার মুখে চোখে গলায় বুলিয়ে দিলাম। আহ, কি স্বাদ! ঠিক যেন নীলার শরীরের গন্ধ। কিছু সময় চোখ বুজে স্বাদ নিলাম।

রাতে বাবা আমি খেতে বসলাম। বাবার মনও ভালছিলনা। স্নেহ আর ঘৃর্ণা একসাথে মিশে আছে বাবার  মুখে। আমি কিছুই বললাম না। বাবাই প্রথম বললেন মন খারাপ লাগছে? আমি বললাম, না। বাবা আমার কথায় আস্বস্ত হতে পারলেন না। আবার বললেন, তেলে জলে মেশে না। তোর চাচা এখন কোটি পতি। আমি গরীব। আর মিশবে না। পৃথিবীতে মানুষ মানুষে একটাই পার্থক্য, যার আছে, আর যার নেই। রক্তের সম্পর্ক অর্থের কাছে মিথ্যে। আমি কিছুই বললাম না। বাবা আবার বললেন, তুই হোস্টেলে চলে যা। ওখানে তোর পড়ালেখা ভাল হবে। স্বাস্থ্যের প্রতিও যতœ নিতে পারবি। মন ভাল লাগবে। আমি বাবার কথা শুনেও শুনলাম না। দ্রুত খেয়ে উঠে গেলাম। বাবার সাথে কোন কথা না বলেই শুতে গেলাম রাত দশটায়। ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নটা এই রকম- নীলা সমুদ্রের তীরে হাটছে। পায়ে সাদা কেডস্, কালো জিন্সের প্যান্ট, লাল রঙের হাফহাতা গেঞ্জি, চোখে কালো সান গ্ল¬াস, চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া, হাতে একটা কালো বেল্টের ঘড়ি। আমি দূর থেকে ডাকছি, নীলা হাসছে মিটি মিটি। সে হাসির ছুরি আমার অন্তর কেটে ফালা ফালা করে দিচ্ছে। আমি ডাকছি। নীলা আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। আমি দেখছি, বাতাস ওর দিকে ছুটে চলেছে। সমুদ্রের স্রোত ওকে ছুতে চেষ্টা করছে। অবাক হয়ে সমস্ত প্রকৃতি ওকে দেখছে। আমি ডাকছি তো ডাকছি। নীলা সোনা ছুটেই চলেছে। ডাকতে ডাকতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পিপাসা অনুভব করলাম। একগ্ল¬াস ঠান্ডা পানি খেলাম। মনের ভিতর ভয় ঢুকে গেল। আমার সোনা সত্যিই কি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে দুরে, বহু দূরে…? যেখানে আমার নীলা সোনার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়? বাকী রাত আর ঘুম হলো না।

বাবার কড়া তাগিদেই পরের সপ্তাহে হোস্টেলে উঠলাম। দুইশ আট নম্বরে ছিট পেলাম। দু’জনের থাকার ব্যবস্থা। আমার রুমমেট একজন গিটার বাদক। কলেজ ক্যাম্পাসে তার সুখ্যাতিও আছে। বান্ধবীর সংখ্যাও প্রচুর। সারা দিন কেউ না কেউ তার ভক্ত হয়ে আসে। আমিও হালকা টাইপের একজন কবি। কবি হিসাবে পরিচিতিও আছে। কলেজে একবার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে পুরুস্কার ও পেয়েছিলাম। দু’জনে চমৎকার মানিয়ে নিলাম। দু’জনে শিল্প সাহিত্য সংগীত নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতাম। ও বানিজ্য বিভাগের ছাত্র-আমি বিজ্ঞান বিভাগের।

হোস্টেলের হৈ হুল্লু¬ড়ের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দিলাম। টেবিল টেনিস, দাবা, তাস খেলায় মেতে উঠলাম। ব্যাময়াগারে বেশ কিছু সময় কাটাতে লাগলাম স্বাস্থ্য টিক রাখার জন্য। বিতর্ক করতাম। কবিতা সংগীত চর্চাতেও মন দিলাম। পড়াশুনাতেও প্রচুর উন্নতি হতে লাগল। পরীক্ষাতে ফাষ্ট হতে লাগলাম। নীলার কথা বেশ কিছু দিন জোরাল ভাবে মনে এলনা। তবে অন্তরে তীব্র ব্যাথা অনুভব করতাম। এরমধ্যে বাবা বাড়ি থেকে চিঠি পাঠালেন। মা-মুলিধরনের কিছু উপদেশ ছিল চিঠিতে। কিছু টাকা, সাথে নিলার পাঠানো একটা চিঠি। চিঠিটা আমার কাছেই লেখা। নীল রং এর খাম। উপরে দরদ করে লেখা “সঞ্জুকে”। বাবা বোধ হয় খোলেননি। খুললে আমার ভালবাসা কয়লা হয়ে যেত এতক্ষণ।

আমি চিঠিটা খুললাম। পড়লাম। চিঠির সারবস্তু এরকম- ঢাকায় বাবার সাথে আটখানা বাড়িই ঘুরে ফিরে দেখেছে। খুব মজা পেয়েছে। এত চমৎকার বাড়ী তাদের! কয়েকটা স্বুলও দেখা হয়েছে। সব চেয়ে নামী স্বুলে ভর্তি হয়েছে। সেখানে টেনিস কোর্ট আছে। মেয়েদের ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন খেলা হয় নিয়মিত। ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য হয়েছে। সুইমিং পুল আছে। সেখানে ছেলে মেয়েরা একসাথে সাতার কাটে। আমার মাথা ঝিম ঝিম করে উঠল। আমার পরীসোনা একগাদা ছেলেদের সাথে সুইমিং পুলে সাতার কাটবে? জলপরীর মত আমার সোনা ডুবেডুবে সাতার কাটবে? হায় আল্ল¬াহ! ঐ বোকা ছেলেরা কি সাতার কাটবে? না হা করে আমার নীলা সোনাকে সাতারের পোশাকে দেখবে? ওরাতো সাতারের কথা ভুলেই যাবে। শেষে আমার সোনা লিখেছে, তুমি ছাড়া আমার জীবনের সব কিছুই অর্থহীন। যত দ্রুত সম্বব ঢাকায় এস। চিঠিটা বন্ধ করলাম। বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে বেশ করে পানি দিলাম। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভাবলাগল। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। ঘুমুতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। চোখের সামনে ভেসে উঠল সুইমিং পুল। সেখানে নীলা সাতার কাটছে। সাতারের পোশাকে ওকে সবায় দেখছে। ও হেসে হেসে জলপরীর মত এগিয়ে যাচ্ছে।

মাথার মধ্যে অজস্র আজে বাজে ভাবনা ঢুকে পড়ল। যেমন- নীলা আজ স্কুল সাতার প্রতিযোগিতায় চাম্পিয়ান হয়েছে। এবার বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেবে। পেপারে ওর সাতারের পোশাকে ছবি ছাপা হয়েছে। শুধু ওর সাতারের পোশাকে ছবি ছাপানোর জন্য ঐ পত্রিকার বিক্রি সংখ্যা বেড়ে গেল দ্বিগুন। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোট কামড়াতে লাগলাম। আবার ভাবালাম, নীলা খুব ভাল টেনিস খেলে। স্কুল প্রতিযোগিতায় চা¤িায়ান। জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। গ্যালারি ভর্তি দর্শক। সবায় নীলাকে সাপোর্ট করছে। ওর সাফল্যে গ্যালারি হাঁসি আর হাত তালিতে ভরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ও রহস্যময়ী হাসি দিয়ে গ্যালারীর দিকে তাকাচ্ছে। হায় দর্শক, খেলার কি দেখবে? সবাই হা করে নীলার দপদপে রুপ সৌন্দর্য দেখছে। খেলার পোশাকে চমৎকার লাগছে। আর ভাবতে পারলাম না। না জানি আমার নীলা সোনা এবার ফিল্মেও নামবে! ঢালিউড থেকে বলিউড, সেখান থেকে হলিউড। আরও কত কি সব নামি দামি হবে যে আমার সোনা! চোখ খুললাম। আজে বাজে ভাবনা গুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করলাম। একটা সিডেটিভ ট্যাবলেট ও একগ্ল¬াস ঠান্ডা পানি খেলাম।

পরের দিন সকাল আটটা পনেরই ঘুম থেকে উঠলাম। নাস্তা আর প্রচুর পানি খেলাম। প্রায় ন’টায় কলেজে গেলাম। কলেজের ভীড় আমাকে উতালা করে তুলল। চারদিকে কত আলো কিন্তু আমি কিছুই দেখতে পেলাম না। যে দিকে তাকাই কেবলই অন্ধকার, সব ফাঁকা। কদমগাছের তলায় বসে পড়লাম। অন্য ছেলেরা ক্লাস থেকে বের হয়ে আসছে। আবার ঢুকছে। আমি বেলা দশটা আটত্রিশ মিনিট পর্যন্ত বসে থাকলাম। মাটিতে ভেসে উঠা কদমকগাছের উপর বসে ভাবতে লাগলাম। নীলা কি করছে এখন? স্কুল টাইম। স্কুলে গেছে কি? কোন ড্রেসটা পরেছে? চুলে শ্যাম্পু করেছে কি? মাজায় বেল্ট পরেছে, না কি? কার সাথে স্কুলে গেল? গাড়ীর ড্রাইভার নিশ্চয় আছে। ড্রাইভার কি একা নীলাকে নিয়ে যায়? তাহলে তো সব ভেস্তে যাবে। আমার সোনার রুপ সৌন্দর্য তাহলে তো একা ঐ ড্রাইভারই দেখে নিচ্ছে। আদরের সুবাদে পিঠে একটু হাতও বুলিয়ে দিতে পারে। পড়ার উপদেশ দিয়ে দু’আঙ্গুল দিয়ে গালও টিপে দিতে পারে। শালার ড্রাইভাররা সব খচ্চর। সুযোগ সন্ধানী। এরা সব পারে। আর ভাবতে পারলাম না। উঠে পড়লাম। বন্ধুদের চেচামেচি শুনতে পেলাম। বাঃ! একেবারে আমার কাছে বসে আছে সবায়। অথচ আমি বুূঝতেই পারিনি। ভাবী কবি হিসাবে ওরা আমাকে ঠাট্রা করতে শুরু করল। আমি ভাবলাম, কবিতা না ছাই লিখব। ও সব চুলোয় দেব। শালার ফালতু কবিতা! কবি, কবিতার নাম, সারমমর্, ভাষা, ছন্দ, তাল, ছত্র সব যদি নীলা হত!

বেলা বারটার দিকে হোস্টেলে আসলাম বন্ধুদের আঠা ছাড়িয়ে। কিছুটা বিবর্ষ হয়ে পড়লাম। এ-কয়দিন মনের সাথে বেশ লড়াই করেছি। ব্যাস্ত থেকেছি। কিন্তু আর পারছিনা। নীলাকে না দেখে থাকতে পারছিনা। হৃদয়, মন হাহাকার করে উঠতে লাগল। নীলাই যেন একমত্র সম্বল। যা আমাকে সজীব করবে। কলেজের অনেক মেয়েকেই নীলার আসনে বসাতে চাইলাম। পারলাম না। আমার নীলা পৃথিবীতে একা। ওর মত পরী শ্রেষ্ঠা আর একটিও নেই। ও যত দুষ্টু, তার মত আর কেউ নেই। ক-জন দিতে পারবে ওর মত হাসি? মুক্তো ঝরবে, ঝকঝকে দাত বের হবে, চোখের তারা উজ্জ্বল হবে, ঐ জল ভেজা চোখ, কার এমন আছে? তার মতো ভালবাসাতে পারও তো চাই। ঠিক করলাম ঢাকায় যাব। আমার সোনাকে না দেখে থাকতে পারব না। আমার সোনাকে সবাই দেখবে, আদর করবে, ভালবাসবে, আর আমি পারবনা? তা হয় না। আমার সোনাকে ঢাকার খচ্চর টাইপ মানুষের কাছে ছেড়ে দিতে পারি না। বাবাকে হালকা নোটিশ দিয়ে পরের দিন রওনা দিলাম ঢাকায়।

পাঁচ-৫

গাবতলী বাসষ্ট্যান্ডে ভোর চারটা ছত্রিশ মিনিটে গাড়ী পার্ক করল। তখন ছিল ভাদ্র মাস। বৃষ্টির কোন ধরাবাধা নিয়ম ছিলনা। এই রৌদ্র, এই বৃষ্টি, এমন অবস্থা। সেদিন বৃষ্টি শুরু হল, ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির বড় বড় ফোটা ইলেকট্রিক লাইটের আলোয় মুক্তার মত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বৃষ্টির প্রতিটা ফোটা যেন নীলার হাসির মত। আমি উসখুস করতে লাগলাম। বৃষ্টির মধ্যে হেটে হেটে যাব বলে বের হলাম। হেলপার বললেন, আরে ভাই, এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাচ্ছেন? কাক ভেজা হয়ে যাবেনত। আমি হাসলাম। বললাম, ভিজতে আমার ভালই লাগে। যে অন্ধ আবেগ আর ভালবাসার টানে আমি ঢাকায় পৌছালাম তা কি বৃষ্টির মত শীতল বস্তু আটকাতে পারে? যদি সমস্ত ঢাকা শহর অগ্নিকুন্ড হয়ে যেত? আর তার মধ্য দিয়েই যদি হাটতে হত? আমি তবুও থামতাম না। আগুনে পুড়তে পুড়তে আমি নীলার ঘরের দরজায় কড়া নাড়তাম। আর এ তো শান্ত শীতল বৃষ্টি।

আমার নীলা কি এই বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেয়েছিল? বৃষ্টির ছন্দ কি আমার আগমন বার্তা পৌছিয়ে দিয়েছিল? জানিনা পেয়েছিল কি না। তবে আমি পিচের উপর হাটতে হাটতে বৃষ্টি ভেজা নীলা ফূলের গন্ধ পেয়েছিলাম। সমস্ত ঢাকা শহর যেন নীলা ফুলের গন্ধে ভরপুর। দু’হাতে নীলা যে ভাবে আমাকে জাপটে ধরত ঠান্ডা বৃষ্টির পানিকে মনে হয়েছিল জাপটে ধরা নীলার  সেই হাত। আনন্দে হাটতে হাটতে সকাল আটটায় উত্তরায় পাঁচ বাই চার সড়ক ধরে নকশী নামের বাড়ীর গেটে পৌছলাম। প্রকান্ড বাড়ি। দুই তলা। বাড়ির নাম, “নকশী”। একটি নিয়ন বাতি জ্বলজ্বল করছে। সমস্ত বাড়িটা ঝলমলে । গেটের উপর তরুলতা ফুলের গাছ। লতার মত বেয়ে উঠেছে। গেটের কাছে যেয়ে নাম ফলক দেখলাম। বীর মুক্তি যোদ্ধা মোহাম্মদ ছাকিব হাসান। বাড়ি নং পাঁচ বাই এক, উত্তরা, ঢাকা। ডান পাশে কলিংবেল বোর্ড।

পৃথিবীতে কত রকমের আশ্চার্য ঘটনা ঘটে। আমার চাচার বাসায় সেই রকম একটা আশ্চার্য ঘটনা সে দিন ঘটল।

আমাকে দেখে চাচী আবেগ সামলাতে পারলেন না। শাড়ির আচল দিয়ে ভেজা মাথা-মুখ মুছিয়ে দিলেন। অনেক সময় বুকে চেপে ধরলেন। বুঝতে পারলাম চাচী কাঁদছেন। আমারও চোখে পানি এসে গেল। চাচা আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। চাচার চোখের তারা চকচক করতে লাগল। কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন। না পেরে দ্রুত সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন। ডাকতে লাগলেন নীলা মা-নীলা দেখে যা কে এসেছে। আমাদের বংশের আলো, প্রদীপ, সিগগির ওঠ। চাচার চেচামেচিতে নীলা ঘুম জড়ানো চোখে আশ্চার্য মানুষটিকে দেখতে নেমে এল। আমাকে দেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। চাচা-চাচীর মত কোন উচ্ছ্বাস নেই। কোন আবেগ নেই। শুধু একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। মনে হল আমাকে কত কাল দেখেনি। চোখের তারা স্থির। মাথার চুল এলোমেলো। পরনে হালকা খয়েরী রংঙের স্কাট। আমি দেখতে লাগলাম আমার মানস প্রিয়াকে। যাকে একটু দেখার জন্য ছুটে আসা। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলাম না। সেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। স্থির। নিশ্চল। দু’জনই বিহ্বল। মনে হল, আমাদের এই দেখা দেখির লগন শেষ হবে না কোন দিন। কিছুক্ষণ পর আমার নীলা সোনার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে গালবেয়ে টপ টপ করে পড়তে লাগল। হাত উঠিয়ে পানি মোছানোর দরকার বোধ করল না।একটু পরে ঠোটে মৃদ হাসি ফুটে উঠল। এই জল ভেজা চোখ, গাল বেয়ে  ঝরে পড়া পানি, ঠোটে মৃদ হাসি, এক সাথে এত রূপ আর ক’জনের আছে? আমার সোনা কিছু না বলে আস্তে আস্তে উুপরে  উঠে গেল। প্রকৃতি যাকে এত রূপ এক সাঙ্গে দিয়েছে তার কথা বলার কি দরকার?

বেডরুমের স্মৃতি আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমি বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখি, এরই মধ্যে নীলা নিজেকে তৈরী করে নিয়েছে। নীল বঙের একটা শাড়ী পরেছে। চুল ব্রাস করেছে। কানে লাল-নীল পাথরের দু’টো দুল। শাড়ীর আচল মেঝে বরাবর নেমে গেছে। ডান হাতে অনেকগুলো কাচের চুড়ি, টুন টুন করে আওয়াজ তুলে বিছানা তৈরী করছে।

আমি বললাম, নীলা কেমন আছ?

বলল, ভাল, এতদিন পরে মনে পড়ল?

আমি বললাম, এতদিন পরে মনে পড়বে কেন? সব সময়ই তো মনে পড়ে।

নীলা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, সব সময় না ছাই, চাচা কেমন আছেন, তাই বল। একটা খবর দিলেতো গাড়ী পাঠাতে পারতাম। আমি বললাম, খবর দেবার সময় পেলাম কোথায়? তোমার চিঠি পড়ে আমার মাথা খারাপ হবার উপক্রম হল। ভাবলাম, আমার সম্পদ কেউ চুরি করবে হয়ত! তাই পাহারা দিতে এলাম। বাবাকে হালকা নোনিশ দিয়েছি মাত্র।

নীলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা স্বর্গীয় পরী আমাকে দেখছে। আস্তে আস্তে নীলার একটা হাত ধরলাম। ও কেঁপে উঠল। মনে হল যেন, বৃষ্টিতে ও ভিজে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। চোখের তারা জ্বলজ্বল করছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বুকের ভিতর টেনে নিলাম। আদর করলাম। অনেক সময় জড়িয়ে থাকলাম দু’জন। একসময় নীলা বলল, ঠিক আছে আর না। এবার একটু বিশ্রাম কর। সারারাত জার্নি করে এসেছ। তার উপর আবার ভিজেছ, অসুখ বিশুখ বেধে যেতে পারে। তখন আমার দায়িত্ব বেড়ে যাবে। আমি বললাম, তাহলেতো বেঁচে যাই। তোমার ছোয়ায় ছোয়ায় মরে যাব। রাগীভাবে নীলা বলল, ছিঃ- এসব কি বল, বলত? তুমি শোও। আমি চা-আনতে যাচ্ছি। চা না কপি খাবে বলত? আমি বললাম, তোমার হাতের চা, কপি, পরটা সব খাব, নিয়ে এস। আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চাচী এসে চা দিয়ে গেলেন। চাচা বাইরে বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে আমার ঘরে এলেন। বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। কিছু সময় অন্যান্য গল্প করলেন। বিশ্রাম নিতে বললেন। চা খেয়ে আমি শুয়ে পড়লাম। নীলা আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। ক্লান্তি মাখা ঘুম ঘুম আবেশে বুঝতে পারলাম, একটা অপূর্ব রূপবর্তী নারী আমার মুখের উপর ঝুকে আমাকে দেখছে। তার মাথার এলো চুল আমার মুখের উপর ঝুলে পড়েছে। হালকা শুড়সুড়ি লাগছে। কাচের চুড়ির টুন টুন শব্দ শুনতে পাচ্ছি। একটা পরী মাখা গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। আমার মাথার চুল টেনে দিচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে যাচ্ছি। আবার শুনতে পাচ্ছি। আমাকে বলছে, এ্যাই, এ্যাই দুষ্ট শোন, শুনছ, আমি ডাকছি, তুমি এই কয়দিন আমাকে না দেখে কি ভাবে থাকলে? এ্যাই শোন, আমি আর কিছু মনে করতে পারলাম না। ঘুম ভাঙ্গল দুপুর দুইটা বেজে একচলি¬শ মিনিটে। হাত ঘড়িটা দেখে আবার কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকলাম। বাইরের কোলাহল কানে ভেসে আসতে লাগল। বাইরে ঝলমলে রোদ, চার দিকে শুমনো খট খটা অবস্থা। ভোরের বৃষ্টির কোন চিহ্ন নেই। মানব জীবনকি এই রকম। এই ভাল, এই মন্দ। আরও কিছু ভাবতে যাচ্ছিলাম, ঠিক এমন সময় চাচী এলেন ঘরে। বললেন, এ্যাই সঞ্জু, ওঠ খাবি না? কত বেলা হয়েছে জানিস?

আমি বললাম, জানি চাচীজান?

চাচী বললেন ,বলতো একটা আন্দাজ করে শুনি, দেখি তোর আন্দাজ কেমন?

আমি বললাম, দুইটা সাতচলি¬শ মিনিট, কত সেকেন্ড সেটা বলতে পারছিনা।

চাচী বললেন, ঠিক আছে। তোর ধারনা ক্ষমতা ভাল, তোর বাবার মত। ওঠ খাবি চল।

আমি উঠলাম। বাথরুমে যেয়ে হাত মুখ ধুলাম। লূুকিং গ্লাসে দেখলাম, চোখ লাল হয়ে আছে। শরীর বেশ ঝরঝরে। ভিজে যাওয়ার কারনে জর-জারী হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই।

এই প্রথম ঘর বাড়ির চাকচিক্যময় জৌলুস লক্ষ করলাম। আধুনিকতার ছোয়া আছে। লাইব্রেরী, একুইরিয়াম, টিভিরুম, টেনিস কোর্ট সবই আছে। একটা ছোট খাট বেহেস্ত খানা। সেই বেহেস্তের পরী নীলা। কবুতরের মত উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। নেই শুধু চাকর-বাকর। হাটতে হাটতে ডাইনিং টেবিলে গেলাম। নীলা বসে আছে আমার জন্য। আমাকে দেখে মিটি মিটি হাসছে, ঠিক যেন বেহেস্তের পরী টাইপের কোন এক মেয়ে। চোখ নামানো যায় না। চাচী বললেন, নে খাবি তো কিছু। ক্ষিধে লাগেনি তোর? আমি বললাম মনে মনে, ক্ষিধে আমার লেগেছে চাচী জান, তবে তা ভাত মাংসের নয়। রূপের ক্ষিধে। প্রেমের ক্ষিধে। তা না হলে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আসি?

খেতে বসলাম। একটা এলাহী ব্যাপার। খাশীর মাংস দিয়ে পোলাও রান্না। এরই মধ্যে বগুড়ার দই আনিয়েছেন। আমি আর নীলা খাচ্ছি, চাচী পাতে বেড়ে দিয়ে আনন্দ পাচ্ছেন। তিনটা কুড়ি মিনিটে খাওয়া শেষ করলাম।

নীলাদের নকশী নামক ছোট খাট বেহেস্তের মত বাড়ীতে আমি দশ দিন ছিলাম। এই দশ দিনের মধ্যে যা যা ঘটেছিল তার  সবটা এখন আর আমার মনে নেই। তবে দশ দিনের সমস্ত ঘটনার সার বস্তু এই রকম…..।

…..নীলা স্কুলে যাওয়া বন্দ করে দিল। সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে চাচা যেতেন ব্যবসা দেখা শুনা করতে। আমি আর নীলা বেরিয়ে পড়তাম গাড়িতে করে। চিড়িয়া খানা, সংসদ ভবন, চান্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বুড়িগঙ্গা লেক, এয়ার পোর্ট ঘুরে বেড়াতাম। প্রকৃতির উম্মুক্ত কবুতরের মত আমরা দু’জন উড়ে বেড়াতাম। সারা দিন বাকম বাকম করে ক্লান্ত হয়ে বিকালে বাসায় ফিরতাম। খাওয়া দাওয়া সেরে রেষ্ট নিতাম।  সন্ধ্যায় চাচী আমাকে ঢাকা শহরের সব চেয়ে নামী মিষ্টির দোকানে নিয়ে যেতেন। মিষ্টি খাওয়াতেন। ফিরতাম রাত আটটার দিকে। কোন কোন দিন এই সময় চাচা বাসায় ফিরতেন। কোন কোন দিন রাত এগার,বারটাও বেজে যেত। আমরা খেয়ে নিতাম। চাচী ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়তেন। আমি আর নীলা ছাদে উঠে রাতের ঢাকা শহর দেখতাম। আমরা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম ব্যস্তময় শহরের দিকে। রাস্তায় অহরহ গাড়ি আলো ফেলে ছুটে চলেছে। রঙিন আলোর ঝলকানি। আকাশে তাকাতাম। অন্ধকার মনে হত। অনেক সময় তাকানোর পর জোনাকের মত তারা দেখা যেত। চাঁদের আলো ম্ল¬ান মনে হত। আমি আর নীলা তারা গুনতে চেষ্টা করতাম। এক সময় আমার কোলে মাথা রেখে তারা গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়ত। একহাজার, এক হাজার এক,দুই তারা—— আমি আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। চাঁদের আলোয় ওর আশ্চর্য ফর্সা মুখটা অনেক্ষণ ধরে দেখতাম। এক সময় ওর ঘুমন্ত শরীর কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দিতাম। চাচার সাথে খুব কম দেখা হত। সকালে আমি যখন উঠতাম, দেখতাম চাচা বাইরে, আর চাচী ভাত বেড়ে বসে আছেন। সকালে নাস্তা করে আবার আমাদের উড়ে বেড়ান। আমাদের বেপরোয়া চাল চলন চাচীর চোখ এড়াল না। নীলার উড় উড় ভাব। আমার ভালবাসায় ভরা চোখের তারা। যখন তখন আমাকে নিয়ে নীলার অতিরিক্ত আগ্রহ। ছাদে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করা। তারা গোনা। এ সবই চাচী জানকে সন্দেহ বাতিক গ্রন্থ করে তুলল। পঞ্চম দিন রাতে আমরা খাচ্ছি। চাচীজান কিছুটা বিমর্ষ হয়ে বললেন। সঞ্জু, তোর বয়স কতরে? আমি বললাম, আঠারো। চাচী বললেন, নীলার কত জানিস? আমি কিছু বললাম না। চাচী বললেন, ওর এখন বার। এই বয়সে তোরা দু’জন কত কাছা কাছি চলে যাচ্ছিস, জানিস? এই বয়সটা গলে যাওয়ার বয়স। একটু সাবধান হ। নইলে সবাই কষ্ট পাবি। তোর কোন কষ্ট হোক আমি চাইনা। আবার নীলার কোন কষ্ট হোক তাও চাইনা। আমি আর খেতে পারলাম না। হাত ধুয়ে উঠে চলে গেলাম বেডরুমে। নীলার মুখ গম্ভীর। আমি কিছু না বলে ব্যাগ গোছাতে লাগলাম। রাতের বাসেই বাড়ি ফিরব। নীলা ঝর ঝর করে ঁেকদে উঠল। সোনা গো তুমি আমাকে একা রেখে যেওনা। আমি এই শহরে একা থাকতে পারবনা। বললাম, নীলা তোমার কোন কষ্ট হবে না। এই ব্যস্তময় শহরে আমাকে ভূলে থাকার সব কিছুই তুমি পাবে। এই সময় চাচী জান ছুটে আসলেন আমার ঘরে। আমার গোছগাছ দেখে অবাক হলেন কিছুটা। তার পর বললেন, রাগ করিসনা সঞ্জু, তোকে আমি যেতে দেব না। তুইতো আমাদের বংশের আলো। আমার কথায় কষ্ট নিতে নেই, বাবা। তোকে ছাড়া আমার খুব কষ্ট হয়, তাকি জানিস? জানিস তুই? তোর মাথাটা আমি সারারাত কোলে করে বসে থাকতে চাই। জানিস তা? চাচিজান ঁেকদে ফেললেন। বললেন, আমি তোর চাচার সাথে তোদের ব্যাপারে কথা বলব। এখন ফ্রেস হয়ে আনন্দ কর। টিভি দ্যাখ, টেনিস খ্যাল, মন ভাল হবে। ভাবলাম, মন ভাল হবে না-ছাই হবে। টিভিতে কি নীলার মত মেয়েদের দেখা যাবে? আমার মনের ভাষা বুঝবে? আমার সাথে দুষ্টামি করবে? ছাই করবে। সেদিনও আমরা দু’জন ছাদে উঠলাম। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে আটকে ধরতে চেষ্টা করলাম। ওর কড়া সেন্টে আমার বুক ভরে তুলতে লাগল। ও বার বার বলতে লাগল, জান, ওগো সোনা আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তুমি আমাকে ছেড়ে পালাবে না। বল, পালাবে না? আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। আদর করতে করতে বললাম, না নীলা, আমি তোমাকে অন্য কোথাও রাখব না। সারা জীবন আমার বুকের মধ্যে তোমাকে চেপে রাখব। আদর করব, ভালবাসব, ভালবাসতে বাসতে আমরা জীবন নিঃশেষ করে দেব। তবুও কারও কথা আমরা মানব না। নীলা সেদিন সারা রাত আমার বুকের মধ্যে ওর মুখ গুজে দিয়ে শুয়েছিল। সেদিন ঘরে শুতে যাইনি। ছাদে শুয়েছিলাম। শিশিরে আমাদের শরীর ভিজে গিয়েছিল। রাতে চাচী আমাদের খুজতে এসেছিলন কিনা কে জানে?

ষষ্ট দিন সকালে ব্যতিক্রম ঘটল। চাচাজান, আমি,নীলা একত্রে নাস্তা করতে বসলাম। চাচার মুখটা হাসি খুশি কি ভারী বুঝা গেলনা। তবে মাঝে মাঝে হাসি ফোটাতে লাগলেন। একসময় বললেন, সঞ্জুকে তো আমি কোথাও নিয়ে যেতে পারিনি। আজ নিয়ে যাব। শুধু সঞ্জুকে নিয়ে সারা দিন কাটাব। কত দিন একা একা থেকেছি। চাচী বললেন, কোথায় নিয়ে বেরুবে? চাচা বললেন, যাব কোথাও দু’বাপ বেটায়। আমার কি যাওয়ার জায়গার অভাব আছে? চাচী শুধু বললেন, অঁ। নীলা ওর বাবার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ও আর খেতে পারলনা। মাংস রান্নাটা খুব বাজে হয়েছে বলে চাচীকে বকাঝকা করতে করতে হাত মুখ ধুয়ে উঠে গেল। এ নীরব অভিমান আর প্রতিবাদ আমার অন্তরকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল।

সকাল নয়টায় আমি আর চাচা রওনা হলাম। এয়ার কন্ডিশনড পাজেরো গাড়ী। ড্রাইভার গাড়ি স্টাট দিলেন। লোকজনের ভিড় আর অসংখ্য রিক্সার মাঝদিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল। বিশ মিনিট পরে গাড়ি যেখানে এসে থামল, সেই জায়গার নাম গাজীপুর। একটা কটন মিলেন সামনে।

চাচার নির্দেশমত আমি গাড়ি থেকে নামলাম। কর্মচারীরা ছুটা ছুটি করতে লাগল। আমাকে বিশেষ মেহমান ভাবতে লাগল। চাচা মিলের কর্মকর্তা শ্রেণীর সকলকে ডাকলেন। তাদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সব শেষে ছোট একটা বক্তৃতা দিলেন যার সারমর্ম এই রকম— আমি তার বড় ভাইয়ের ছেলে। তবে তার কাছে আমি নিজের সন্তানের মত। আমি এক মাত্র বংশধর। ভবিষ্যতে মার্কিনমুল্লুকে পড়া শুনার উদ্দেশ্য রওনা হব এবং ফিরে এসে এই সব ব্যবসা দেখা শুনা করব। কর্মকর্তাদের মুহু মুহু হাতে তালি আর দীর্ঘায়ূ কামনায় আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। আমাদের অন্য যায়গায় যেতে হবে এই কথা বলে সভা শেষ করলেন। একাউন্টট্যন্টের সাথে কিছু জরুরি চেক ট্যান্সফর করার ব্যাপারে আলোচনা করলেন।  কিছু ক্ষণ পর ম্যানেজার সাহেব আসলেন। তার সাথেও চাচা আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বললেন। সালাম জানিয়ে তারা দু’জনেই বিদায় হলেন। আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন সমস্ত দিন চাচা আমাকে নিয়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে বেড়ালেন এবং একই রকম বক্তৃতা দিলেন। ঢাকা শহবে তার আটটা বাড়ির গল্প শুনেছিলাম। গত পাঁচ দিনে নিলা বা চাচি সে সম্পর্কে কোন কথা বলেনি। এমনকি কৈতুহলি হয়েও নীলা বলেনি যে সাভারের বাড়িটা এমন, জয়দেবপুরেরটা এমন কিংবা গুলশান বনানীর শফিং মলটা এমন। চাচাই সেই কাজটি করলেন। সব শেষে একটা সেমিনারে  হাজির হলাম। চাচা সেখানে প্রধান অথিতী। সরকারী প্রতিনিধি ও শিল্পপতিদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংক্রান্ত আলোচনা। আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এক সময় চাচা গাড়ি করে বাড়ি ফিরতে বললেন। আর বললেন, তার ফিরতে একটু দেরি হবে। হঠাৎ করেই একদল জাপানী প্রতিনিধদের সাথে সভার আয়োজন।

বাসায় ফিরে আর এক যন্ত্রনায় পড়লাম। নীলা আমাকে জেকে ধরল, বলল, কোথায় কোথায় গেলে? আমি সমস্ত দিনের হিসাব মহারনীর কাছে দাখিল করলাম। তিনি বিশ্বাস করলেন না। মুখ ভার করে জানালা দিয়ে বাহিরে একটা ফেরিওয়ালার দিকে চেয়ে থাকল। আমি একটু আদর করে ডেকে একটা মিথ্যে বলে ওকে হাঁসাতে চেষ্টা করলাম ও খিল খিল করে হাঁসতে লাগল। মনে হল যেন সমস্ত বাড়িটা খুশিতে ঝলমল করছে। গোসল করে খেয়ে একটু রেষ্ট নিয়ে চাচির সাথে আরেকদফা বেড়াতে বের হলাম। গাড়ি থাকলে বেড়াতে কত সুবিধা!

বেড়ানো সময় সাধারণত চাচি থাকতেন না। এই অভিভাবকহীন স্বাধীন বেড়ানোতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। নীলা বোধ হয় ভাবতে লাগল, আমি আর নীলা ছাড়া আমাদের পাশে আর কেউ নেই। গাড়ি ছুটে চলেছে চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে। আমার বাম পাশে নীলা ডান পাশে চাচি। গাড়ির পিছনের ছিটে আমরা বসা। এর মধ্যে নীলা ডান পায়ের হাটু দিয়ে আমার হাটুটে ঘষতে লাগল। চোখ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আর হাটু চলে এল আমার দিকে- ভাবা যায়! এমন দুর্দন্ত প্রেমিকা যার আছে সেই জানে এই সব মেয়েদের দাপাদাপি সামলানো কত কঠিন কাজ। আমি চাচির সাথে কথা বলতে বলতে বাম হাতটা আমার বাম কানের লতিতে ঘষতে লাগলাম। হাতে নীলার উড়ান্ত চুলের স্পর্শ্ব পেলাম এই স্পশ্বের সুখ অনুভব করলাম শুধু আমরা দু’জন। চন্দ্রিমা উদ্যান যাবার কথা থাকলেও আমরা শের-এ বাংলা নগর হয়ে সংসদ ভবন এলাকায় এসে নামলাম। চমৎকার! সমনে কত লোক অথচ কেউ কাউকে চিনি না। ড্রাইভার গাড়িতে বসে। আমরা তিন জন হাটতে লাগলাম। লুই অ্যাই ক্যান কে ধন্যবাদ দিলাম। আমরা হাটছি এর মধ্যে নীলা আমার একটা হাত ধরে ফেলল। কাছা কাছি চলতে চলতে আমি প্রায় ওর পায়ে জড়িয়ে পড়ে গেলাম। সাথে সাথে চাচি ডান হাতটা ধরে রক্ষা করলেন। চাচি নিজেকে সামলাতে পারলেন না, নীলার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেল, এভাবে হামলে পড়ছিস কেন? একটু ভদ্র, সভ্য হ বেহায়া হয়ে গেছিস দিন দিন। প্রেমে কি দুনিয়ায় আর কেউ পড়ে না। লোকজন মানবি না? নীলার সাদা ফর্সাা আশ্বর্য মুখটা মুহুর্তে মলিন হয়ে গেল। আমি যে খুশি হলাম তা না। আমার অন্তরের উচ্ছ্বাস মরে কাট হয়ে গেল। বেড়ানোর আর কোন ইচ্ছা থাকল না। দ্রুত বাসায় ফিরে আসলাম।

সে দিন রাত আটটার সময় চাচা জান বাসায় ফিরলেন খাওয়া দাওয়া সারলেন। আমি তখন নীলার রিডিং রুমে বসে ম্যাগাজিন দেখছিলাম। ম্যাগাজিনের নাম উরংঢ়ষধু ড়ভ ভষড়বিৎ.নানা রকম সব ফুলের বর্ণনা দেওয়া তাতে। নীলার কোন ফুল পছন্দ, কোন ফুল কত দিন পর পর ফোটে আর ঝরে যায় এই নিয়ে আলোচনা করছিলাম আমরা। দেখলাম, এব্যাপারে নীলা মাঝারী ধরনের একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন। চিন দেশের একটা ফুলের বর্ণনা দিচ্ছিল হাত নেড়ে নেড়ে। এমন সময় চাচি জান আমাদের মাঝে হাজির হলেন। মুখটা খুব খুশি খুশি মনে হলো না। তবে যে খুব মরা মরা তাওনা। এই দুটির মাঝা মাঝি অবস্থায়। এর কি নাম বাংলা অভিধানে আছে মনে পড়ছে না। আমাকে বললেন সঞ্জু ছাদে যা তোর চাচা তোর জন্য অপেক্ষা করছে। কথা বলবে। সেদিন ছাদে চাচা আমার সম্পর্কে বললেন,— শোন সঞ্জু, তুমি আমাদের বংশের এক মাত্র আলো। আমি তোমাকে ভীষণ ভালবাসি, স্নেহ করি। আমি চায় তুমি জীবনে অনেক বড় হও, প্রতিষ্টিত হও। আমাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল কর। আমি কত বড় হয়েছি সেটা নিজের চোখে দেখেছো। আগামী দশ বছরের একটা প্লান আছে আমার। সেই অনুযায়ী আমি ঢাকা সিটি করর্পোরেশন এর মেয়র সহ মুন্ত্রি পর্যায় চলে যাব। কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই আমি চাই তুমিও বড় হও। ফালতু আবেগ বাদ দিয়ে লেখা পড়া করে মানুষ হও। তুমি ইচ্ছা করলে পৃথিবীর যে কোন উন্নত দেশে যেয়ে পড়া শুনা করতে পার। সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। আমার যে অর্থ সম্পদ আছে সাভাবিক ভাবেও তুমি তার একটা অংশ পাবে। তার পরও আমি দু’টো কটন মিল এবং সাভারের বাড়িটা তোমার নামে লিখে দিচ্ছি। বাড়িটা কতটুকু জমির উপর তৈরী তা জান? মাত্র এগার একর। কটন মিল দু’টোর খরচ বাদ দিয়ে বাৎসরিক আয় কত টাকা জান? কোটি টাকার উর্দ্ধে। বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় দু’টি কটন মিল আছে। সেই দু’টিই আমার। আজ থেকে তুমি তার মালিক। তবুও তুমি নীলাকে চেয়েও না সঞ্জু। তিনি আরও বললেন– শোন সঞ্জু, আমার নিখোজ জীবনে নীলা নীলার মা তোমার বাবার কাছে নিরাপদ ছিল। আমি ভুলিনি তা। আমিও নিশ্চিত ছিলাম যে, তারা তোমার বাবার কাছে নিরাপদ আছে। এই সুযোগে আমি ব্যবসায়ি হয়েছি, রথি- মহারতি টাইপের একজন মানুষ হয়েছি। তাই তো চেয়েছিলাম তোমার বাবাকে ঢাকায় এনে সুখে রাখি। একজন মুক্তি যোদ্ধা, ঢাকায় তার পরিচিতি হোক। তার নামে স্কুল, কলেজ বানিয়ে দিই। দু’একটা দেশি-বিদেশী সেমিনারে বক্তৃতা দিক। তার দর্শন তুলে ধরুক। তা তিনি করলেন না। উল্টো আমাকে খুনি, চোর, নকশাল টকশল বলে ঘৃণা করলেন। তা করুকগে ঘৃণা। আমাকে ঘৃণা করার একজনই আছেন তিনি তোমার বাবা। পৃথিবীর আর কেউ আমাকে ঘৃণা করার মত নেই। ঢাকায় এখন আমি স্বনামে প্রতিষ্ঠিত। যে প্রতিষ্ঠার জন্য আমি এত সংগ্রাম করলাম, মিথ্যার আশ্রায় নিলাম, খুন টুন ও করলাম। আজ কি করে সে প্রতিষ্ঠার অপমৃত্যু ঘটাবো নীলাকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে? আমি যদি গ্রামের সেই ল্যাদ লিদে বেকার বিএ পাস আবিদ হাসান থাকতাম, নীলা যদি তার মেয়ে হত, আমি আপত্তি করতাম না। কিন্তু এখন নীলা একজন মুক্তি যোদ্ধার মেয়ে, তার বিয়েও হতে হবে রাজ রাণীর মত। সবাই যখন জানবে তোমার মত একজনের সাথে মেযে বিয়ে দিচ্ছি, তখন এলিট সুচাইটিতে আমার মুখ কালি হয়ে যাবে। দোহাই সঞ্জু আমার এত বড় ক্ষতি করো না। তুমি আমাদের বংশের একমাত্র আলো, আমি চাই না সেই আলো এত তাড়া তাড়ি নিভে যাক, বরং সেই আলো আরো উজ্জ্বল হোক আমি সাহায্য করব।

এর পর নীলার ভবিষ্যত সম্পর্কে যা বললেন, তা হুবহু তুলে ধরলাম- নীলার জন্য ছেলেকে হতে হবে শ্রেষ্ট রুপবান, শ্রেষ্ট মেধাবী, শ্রেষ্ট ফ্যামিলি এবং ধনী। এক কথায় ক্লাস ওয়ান টাইপ ছেলে, যে ছেলে জীবনে কোন পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি, সেই রকম। কারণ নীলাও শ্রেষ্ট রূপবতী। লেখাপড়াও চমৎকার। স্কুলের রেকড বলছে- ও ফাষ্ট হবে। নীলার যখন বিয়ে হবে তখন এক এলাহি ব্যাপার ঘটবে। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হবে এক বৎসর আগে। সেই দিন থেকে ঢাকার শহরের সব শ্রেণীর মানুষকে খাওয়ানো হবে। ঢাকা শহরের ম্যাপ ধরে কয়েকটা সেকশানে ভাগ করা হবে। প্রথমে খাবে এতিম ফকির তার পর খাবে রিক্সাওয়ারা, ট্রেক্সী ওয়ালা, বাস চালক। এর পর খাবে ব্যবসায়ীরা, এখানে ও পুজি ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস করা হবে। এর পর চাকুরীজিবীদের ও এভাবে খাওয়ানো হবে। এখানেও শ্রেণীবিন্যাস করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরীজিবীদের একদিন, এরপর দ্বিতীয়। সব শেসে প্রথম শ্রেণী কর্মচারীদের। এরপরের পর্বে খাওয়ানো হবে রাজনিতী বিদদের।  এখানে প্রথমে খাওয়ানো হবে ফিল্ড লেভেলের নেতা কর্মিদের। পরে খাওয়ানো হবে, পাতি নেতা ও মাঝারী ধরণের নেতাদের। সব শেষে খাওয়ানো হবে এমপি, মন্ত্রিদের। তবে প্রধান মন্ত্রিও রাষ্ট্রপতিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। শুধু কি তাই? নীলার এই বিয়ের খাওয়ানো পর্ব থেকে পাতি মাস্তান, বড় মাস্তান, গড ফাদার, পকেট মার, ভাসমান পতিতা, লাইসেন্স ধারী পতিতা কেহই বাদ পড়বে না। তবে এসব ক্লাসিফিকিসনের জন্য ভাল কোন দেশীও পরিসংখ্যান কোম্পানীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। কেউ যাতে বাদ না পড়ে। সব শেষে ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটা মহাসড়কে এবং এয়ারপোর্টে একটি করে উন্নত মানের হোটেল বসানো হবে। যাতে ঢাকা শহরে আগমণ ও বহিরগমনকারী কেউ খওয়া থেকে বাদ না পড়ে। ঐ এক বৎসর ঢাকা শহবে লোড শেডিং থাকবে না। এ জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রি ও বিদ্যুৎ সচিবদের নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হবে।

পুরা ঢাকা শহরকে আধুনীক সাজে সাজানো হবে। এজন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। আবেদন করার সুযোগ সীমাবদ্ধ থাকবে শুধুমাত্র- জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, লণ্ডন, ও ফ্রান্সদের জন্য। তবে চীনকেও বিশেষ বিবেচনায় আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে। কারণ ওরাও আজকাল ভাল সাজগোজ বোঝে। নীলার বিয়ের পোশাক, গহনা সব কিছুই আন্তজাতিক ভাবে যাচাই বাচাই করে কেনা হবে। যাচাই বাচই কমিটি সচিবদের মধ্য থেকে করা হবে। এ সব ব্যাপারে বিদেশী কিছু নাম করা কম্পানীকে অফার করা হবে। এমন কি কাজল দানিটাও আনা হবে জার্মান থেকে।

চাচার এই ভাষণ শুনার পর আমি থ হয়ে গেলাম। সে দিন রাতে আর ঘুম হলো না। সারা রাত ছাদে দাড়িয়ে কাটিয়ে দিলাম। আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল ঢাকা শহরের সুসর্জিত ঝিলমিল ছবি। বধু বেসে নীলা দাড়িয়ে। রূপ ঝলমল করছে। চোখে জার্মান কাজল কোম্পানীর কাজল আর হরিণীর চঞ্চলতা। ঠোটে দুষ্টামির হাসি। চোখে খুশির কান্না, যেন পান্না হয়ে ঝরছে গাল বেয়ে। আলোয় ঝলমল করছে ওর সমস্ত শরীর, সমস্ত নারী বৈশিষ্ট্য। আমি আর কল্পনা করতে পারলাম না। কাক ডাকা ভোরে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

প্রিয় পাঠক, যিনি আমাকে ভীষণ ভালবাসেন,উন্নতি, প্রতিষ্টা কামনা করেন। তিনি আমাকে, আমার ভালবাসাকে কি করে হত্য করতে পারেন? আর তিনিও বা কি করে ভাবতে পারলেন যে, দু’টো কটোন মিল আর সাভারের এগার একর জমির উপর তৈরী বাড়িটার লোভে আমি আমার সোনা রানীকে অন্যের হাতে তুলে দেব? অন্য একজন টাকা ওয়ালা, ক্ষমতা ওয়ালা, লোমশ বুদ্ধিজিবী টাইপ পুরুষ আমার সোনাকে খুবলে খুবলে খাবে। আমি এ অন্যায় করতে পারি না।

মুহুর্তে অনুভব করলাম, আমি নীলাকে ছাড়া বাঁচব না। নীলা আমার প্রাণ, মণ, দেহ সব।  আমার সমস্ত অস্তিত্ব। আমি যে হাত দিয়ে ওর শরীরে আদর করেছি, সেই হাত এখনও নীলাময় হয়ে আছে। আমার সমস্ত শরীরে নীলার আদরের চিহ্ন। আমার ঠোট, চোখ, কপাল, গলা সবই নীলার আদর সোহাগে ভরা। আমি কি করে তাকে ভূলব? আমার সামনে আমার নীলা সোনা অন্য একজনের বৌ হবে, আদর করবে। হয় না, হতে পারে না। নীলার অঙ্গ সৌন্দার্য শুধু আমার জন্য। ঐ রূপ, যৌবনের শিখায়, রূপের দাপাদাপি, সব- সবই আমার। আমি ছাড়া ওর শরীরে কেউ হাত দিতে পারবে না। আমি ছাড়া ওর শরীরের ব্যাকরণ কে ভাল বুূঝবে? ওর যৌবন বসন্তে অন্য কোন ভ্রমর মধু খাক আমি তা চায় না। ওর যত মধু সব আমি চুষে খেতে চাই। আর কেউ না— কেউ না —কেউ না—-কেউ না—–

পিয় পাঠক, আমার চাচার সাথে বুঝাপড়ার তিন দিনের মাথায় আমার সোনাকে নিয়ে পালিয়ে গেলাম। আমি বহু চেষ্ট করেছিলাম, যাতে সমস্ত ঘটনা তিনি সহজ ভাবে মেনে নেন। তাতে তার সব কিছুই বজায় থাকত। তিনি তার ধারের কাছেও গেলেন না। বাবা পর্যন্ত টেলিফোনে সব কথা শুনে তাকে অনুরোধ করলেন। তিনি কারো চোখের পানি, অনুরোধ কিছুই শুনলেন না। তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। আমিও আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

প্রিয় পাঠক, আর একটু ধৈর্য ধরুন। অধির হবেন না। আমাকে গালা গালি করবেন না। আমার এই লেখা পড়ে হয়তো বুদ্ধিজীবি ধাড়ী পাকা চুল ওয়ালা অভিভাবকরা বলবেন, হারামজাদাকে জুতিয়ে গালের সব ক’টি দাঁত ফেলে দেওয়া দরকার। কিন্তু আপনারাই বলুন, সামাজিক রীতিনীতি  আর বড়দের হুমকি ধামকিতে প্রেম কি কখনও চাপা পড়ে? আপনারা হয়তো আপনাদের জীবনের প্রেমকে অস্বীকার করে মহৎ হয়েছেন। কিন্তু আমি আমার প্রেমকে স্বীকার করেই মহৎ হতে চাই– তাই তো আমি আমার নীলা সোনাকে নিয়ে পালিয়ে গেলাম।

রাজরানী নীলা সোনাকে নিয়ে পালানো পর যে সময় আমাদের কাটল, যে সমস্যায় আমি নিপতিত হয়েছিলাম সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলতে হবে। আজ না বলতে পারলে আমি আর কোন দিনই বলতে পারবো না। কারণ আমার হোস্টেলে পুলিশ রেড এলার্ট জারি করেছে। কোন কোন রুমে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সবই শুনতে পাচ্ছি। হয়তো একটু পরে আমি পালিয়ে যাব, নয়তো গুলি খেয়ে মারা যাব, নতুবা আমি পুলিশের হাতে ধরা পড়ব। তখন পুলিশের লাঠির গুতো খেয়ে সব ভূলে যাব। এই ছাদে এখন আর কেউ নেই। উপরে আকাশ, তার, ছোট ছোট পাখি মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে। পাশে অনেক বড় বিল। ধান গাছ বাতাসে দুলে দুলে উঠছে, অন্ধকারে ঢেউয়ের মত লাগছে। একটা মোমবাতির যে আলো তাও আবার আমি আড়াল করে রেখেছি যাতে বেশি দুর হতে বোঝা না যায়। হ্যঁ, আমার সেই অভিজ্ঞতা বড়ই বিচিত্র , বড়ই করুন। সোনা রানীর সাথে পালিয়ে দিন কাটানো ঘটনাকে লিখতে আমার হাত কাপছে। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে হাতের কব্জি। তবুও–তবুও– আমাকে লিখতে হবে।

অপরিকল্পিত ভাবে পালিয়ে প্রথম একটা হোচট খেলাম। কোথায় যাব, থাকব ঠিক ছিল না। ঢাকার বাইরে একটা অখ্যাত হোটেলে আশ্রয় নিলাম। প্রথম দিন গেল খোজ খবর নিতে। প্রথমে ঠিক করলাম দেশের কোন এক অখ্যাত গ্রামে আশ্রয় নেব। পরে বুঝলাম, সেটা ঠিক হবে না। সারা দেশ চষে ফেলাবে আমার নকশানলী কসাই চাচা। ঠিকই ধরে নিয়ে যাবে আমার সোনারাণীকে। এমন এক জায়গায় যেতে হবে যেখানে আমার কসাই চাচা পৌছাতে পাবেনা। এই প্রথম বুঝলাম, প্রেম করে পালাতে হলে ভূ-গোল সম্পর্কেও ভাল জ্ঞান থাকা চাই। এই দিকটাই আমি দুর্বল। ঠিক করলাম কোন একজন ভাল ভূ-গোল বিদের কাছে জানতে হবে পৃথিবীর কোন কোন এলাকায় এখনও জনবসতি গড়ে উঠেনি। কিংবা কোথায় আশ্রায় নিলে আমাদের কেউ খুজে পাবে না। তেমন একজনকে পেয়েও গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-গোল বিভাগের চেয়ারম্যান। ভদ্রলোক প্রথমে আমাকে আমল দিলেন না। ভ্রু কুচকে তাকাতে লাগলেন। শেষে একটা কার্ড দিয়ে বললেন, সন্ধার পর বাসায় এসো, এখন ব্যস্ত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একটা সন্দেহ মনের কোণে উকি মারল। সোনাকে নিয়ে পালিয়েছি আজ দু’দিন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়নি তো ছবি দিয়ে? ফার্মগেট থেকে কয়েকটা পত্রিকা কিনলাম। তন্ন তন্ন করে ঘাটলাম। কোথাও আমাদের খরব ছাপা হয়নি। কিছুটা দুঃচিন্তা মুক্ত হলাম। ভাবলাম সমানে বড় কঠিন পথ এই পথ আমাদের একা একা চলতে হবে। আমাদের এই প্রেমের স্বীকৃতি কেউ দেবেনা। নিজেদের প্রেমের পথে নিজেদেরকেই চলতে হবে।

সন্ধ্যা হতে তখন চার ঘন্টা বাকী। এই সময়টা কি করা যায়? নীলাকে রেখে এসেছি সেই হোটেলে। সেখানে আপাতাত নিরাপদ আছে। কারও মনে কোন সন্ধেহ জন্মেনি। একবার ভাবলাম হোটেলে যেয়ে একবার ওকে দেখে আসি। পরক্ষণে ভাবলাম সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। আমাদের কিছু কেনা কাটা করতে হবে। সেটা আগে করা দরকার। আমি গুলশান- মতিঝিল এলাকার দোকান গুলোর ধারে কাছে গেলাম না। কারণ ওসব দোকানের কর্মচারী, ম্যানেজার সবাই আমাকে দেখেছে চাচার সাথে। শেষে সব ধুলোয় মিশে যাবে। আমি ঢুকলাম ফার্মগেটের পাশে কিছু দোকান আছে সেখানে। একটা ব্যাগ কিনলাম। আমার জন্য কয়েকটা প্যান্ট, গেঞ্জি, রাফ ইউজের জন্য তিনটা হাফ শার্ট, চারটা তোয়ালে। নীলার জন্য এক ডজন স্কার্ট,মোজা, কেডস। সামনে শিত কাল সেজন্য ওম ধরনের গরম কোর্ট। চুলের ফিতা, গাদার, সিনেটারী প্যাড, কিছু ঔষধ পত্র। ওখান থেকে বাংলা বাজার গেলাম। কিছু বই কিনার দরকার। দীর্ঘ পথের সাথি বই। নীলার খুব পছন্দের কিছু ম্যাগাজিন। রূপ চর্চার উপর তিনটি বই। একটা পৃথিবী ভ্রমণের গাইড ও একটি বিশ্ব মানচিত্র। এই সব কিনতে কিনতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। জিনিষ গুলি গুছিয়ে একটা দোকানে রাখলাম। বললাম একটু পরে নিয়ে যাব, ধরেন এক ঘন্টা পর। দোকান দার কাচা-পাকা চুলের মাঝারী বয়েসের মাইডিয়ার টাইপের একজন লোক। তিনি হাসি মুখে সম্মতি দিলেন।

ঠিক সন্ধ্যায় আমি প্রফেসর সাহেবের বাসায় উপস্থিত হলাম। ভদ্রলোককে দেখে মনে হলো তিনি আমার জন্য রেডি ছিলেন। চোখের চশমা খুলতে খুলতে বললেন বসো। আঙ্গুল দিয়ে সোফা দেখিয়ে দিলেন। আমি বসলাম। ঘরের দেয়ালের দিকে তাকালাম, নানা রঙ্গের ছবি বাধানো। দৃশ্যাবলি, পাহাড়, নদী এই সব ছবি। তিনি বললেন, বল তুমি কি জানতে চাও? আমি বললাম, স্যার, পৃথিবীর এমন কোন জায়গা কি আছে সেখানে সারা জীবনের জন্য পালিয়ে থাকা যায়? কেউ খুজতে যাবে না— আমার প্রশ্ন শুনে হা-বনে গেলেন। তিনি বললেন, সব জায়গায় তো যাওয়া যায়। তা না হলে সেখানে যারা থাকে তারা গেল কি ভাবে? বসতি গড়ল কি ভাবে? আমি ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম যে, স্যার এমন কোন জায়গায় আমি যেতে চাই যেখানে আমাদের খুজতে যেতে পারে কিন্তু খুজে পাবে না, লুকানোর অজশ্র জায়গা থাকবে। প্রফেসর সাহেব খানিকক্ষণ ভাবলেন। তার পর বললেন, এশিয়ার মধ্যে একটাা জায়গার নাম বলতে পারি, এটা ভারত নেপাল সিমান্তে। তাপল্যাং নামক জায়গায়। ওখানে ভারতীয় পুলিশ ও যায় না, নেপালী পুলিশও যায় না। যায়গাটা সাংঘাতিক নিরাপদ। তবে সেখানে পৌছানো খুবই কঠিন। পাহাড়ী উচু নিচু পথ। প্রচন্ড ঠান্ডা বরফ পড়ে। ওখান থেকে সম্ববত নেপালের মধ্য দিয়ে চীনেও যাওয়া যায়। চীনের কিছু পাহাড়ী এলাকা আছে যেখানে তুমি চিরকালের মত লুকিয়ে বসবাস করতে পার। তিনি তাপল্যাং যাওয়ার একটা গাইড লাইন দিলেন। আর এই বিষয় সংক্রান্ত কিছু বইয়েল নাম লিখে দিলেন যাতে আমি নিজে পড়ে সে সব যায়গায় যেতে পারি। প্রফেসর সাহেব আমার প্রশ্ন শুনে প্রথমে ভেবেছিলেন আমি খুন টুন করেছি কিনা? পরে আমি সত্য কথা বললে সামান্য হেসে স্বাগত জানালেন। আমাদের সুখী জীবন কামনা করলেন। চলে আসার সময় তাঁকে ইনফরমেশন ফি বাবদ দুটো কচকচে পাঁচশত টাকার বের করে দিলাম। তিনি নিতে চাননি। আমি জোর করে দিলাম। দ্রুত ব্যাগ বই পত্র গুছিয়ে আমি একঘন্টার মধে হোটেলে উঠলাম। কলিং বেল টিপতেই নীলা দরজা খুলে দিল। দেরির জন্য কিছু কপট রাগ দেখাল। তাতে ওর সৌন্দর্য বেড়ে গেল দ্বিগুন। আমি রাগ কমানোর জন্য জড়িয়ে ধরে হালকা আদর করলাম। চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। ভেবেছিলাম– মা-বাবাকে ফেলে এসে নীলা খুব ভেঙ্গে পড়বে। হয়তো কান্না কাটি করবে। আমাকে দোষারোপ করবে। ফিরে যেতে চাইবে। তার কোনটিই করলনা। বরং কিছু পরে খুব আনন্দে ও ফেটে পড়ল। জামা কাপড় বই দেখে নেচে উঠল। এত সব কেন? আমি বললাম, রাজ কন্যার জন্য এসব তো লাগবে। সেদিন রাতটা কেটেছিল অনেকটা চিন্তামুক্ত ভাবে। আগের দিনের মতো  ভয়ে ভয়ে নয়। সেদিন বেছে বেছে চকৎকার একটা স্কাট পরল ও। পয়ে দিল  কেডস। এর পর আমরা রাতের খাবার খেতে গেলাম। নিকটেই একটা খাবার হোটেল পেলাম। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ফিট ফাট। পছন্দ মত খাবার খেলাম। আমি কিছুটা কম খেতে চাইলে নীলা রাগ করল। বলল, তুমি কি টাকা বাচাচ্ছ কম খেয়ে? আমি কিছু বললাম না। নীলা বলল, যে টাকা আমি এনেছি আগামী ছয় বছর যদি আমরা দু’জন প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে বেড়ায় আর প্রথম শ্রেণী হোটেলে থাকি আর খাই তবুও ফুরাবে না। এখন ভাল করে খাও। টাকার চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। ছয় বছর কম সময় নয়, এর মধ্যে কিছু একটা উপায় হবে। বার বছর বয়সের একটা মেয়ের এই ধরণের পাকা পাকা কথায় আমি না হেসে পারলামনা। খেয়ে দেয়ে হোটেলে ঢুকলাম। ম্যানেজারকে একটা গিফট দিলাম। বললাম, আমরা এই হোটেলে আছি বাবা শুনেছেন, তাঁর পক্ষ থেকে আপনার উপহার, যেন আপনি আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন- এই আর কি! ম্যানেজার গলে গেলেন যেন। কোন অসুবিধা হবে না এই বাক্যটি অন্তত দশ বার বললেন। আরও বললাম, বাবা হয়ত আপনার কাছে টেলিফোন করতে পারেন, খেয়াল রাখবেন। ম্যানেজার ঘাড় নাড়লেন। রুমে ঢুকেই নীলা বইয়ের উপর হামলে পড়ল। রুপ চর্চার বই দেখে থ হয়ে গেল। আরও রূপ চাই? আমি হাসলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মেতে উঠলাম। তাপল্যাং এর কথা শুনে নীলা আনন্দে আটখানা হয়ে গেল। মাউন্ট এভারেষ্ট, সাদা সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়, গাছ- সব যেন ওর চোখের তারায় ভেসে উঠল। আমি বললাম, নীলা, এত আনন্দ করো না এখনও আনন্দের সময় আসেনি। আগে একটা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা দরকার। পাসপোর্ট অফিসে যাওয়া দরকার। কাল এক ঘন্টার মধ্যে পাসপোর্ট বের করতে হবে। দেখতে দেখতে রাত এগারটাা বেজে গেল। নীলা হাই তুলছে দু’হাত উচু করে। এই সময় ওর বুকের উপর থেকে উড়না সরে গেল। আমি দেখলাম লোভী চোখে। ও একটু হাসল। ঠোট চেপে মুখ নীচু করে বলল, এ্যাই, তুমি গোপনে এসব দেখনাকি? আমি বললাম, কি-কি দেখি? কিছু না বলে ও পালাতে গেল। আমি পালাতে দিলাম না। দু’হাতে জোরে এটে ধরলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, বল না সোনা- আমি তোমার কি দেখি? আমার সোনা লজ্জায় মরে গেল যেন। দু’হাতে মুখ  এটে ধরে বলল, বলব না, বলব না। ছাড়, ছাড় কেউ দেখে ফেলবে। আমি আরও জরে এসে ধরলাম বুকের মধ্যে। ওর শরীরের উষ্ণু স্পর্শ আমার বুকে লেগে পাগল করে তুলল। থুতনি ধরে মুখ উচু করে ঠোটে চুমু খেলাম। অজশ্র আদর করলাম। আমার আদরে ও অতিষ্ট হয়ে উম্ উম্ শব্দ করতে লাগল। জড়িয়ে ধরে থাকলাম অনেক্ষণ। আর পালাতে পারলো না আমার সোনা। আমার অজশ্র আদরে ও গলে গেল। কত সময় আমি ওকে বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরেছিলাম ঠিক খেয়াল নেই। ডুবে ছিলাম দু’জন দু’জনার আদরের সাগরে। সেদিন আমার প্রিয়া সোনার রূপ দেখে আমি পাগল হয়েছিলাম, ওর রূপ সুধা চুষে খেয়েছিলাম। আমি বুঝতে পারলাম, ওর ঘুম ছুটে গেছে। যে কামনার ঝড় ওর শরীরে বয়ে চলেছে তার চুড়ান্ত নিস্পতি না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে পাবে না। ওর চোখে মুখে চুড়ান্ত কামনার আহবান- আবার উত্তেজনা দমাবারও প্রবল ইচ্ছা। ও থর থর করে কাপতে লাগল। আমি ওকে বিছানায় শুয়ে দিলাম। মাথা টিপে দিলাম। হাত ম্যাসেজ করে দিলাম। অনেক পরে ও শান্ত হল। মাথায় দু’টো বালিশ দিয়ে দু’হাটু ভাজ করে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তুৃ পাঠক, বিশ্বাস করুন, আমি আমার সোনা রাণীর দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করিনি। আমি ওকে অপবিত্র করিনি। গোপনে আমার সোনা রাণীর মধু চুরি করিনি। যাকে আমি ভাল বাসি যার গর্ভে তার মত আর এক ভবিষ্যত সোনা রাণীর আগমণ ঘটবে, তাকে আমি কি করে অপবিত্র করব? এতটা চরিত্রহীণ, বেহায়া আমি নই। আমার বাবা, চাচা, চাচী, সমাজ সবাই আমাকে দিন্দা করতে পারে কিন্তু দোষি করতে পারবে না। অনেক রাত্রে নীলার ঘুম ভাঙ্গল। পানি খেতে চাইল। পানি দিলাম। ফ্লাক্সে রাখা চা একটা বিস্কুট ও কয়েকটা  আফেল দিলাম। শান্ত ভাবে খেল। খাওয়া শেষে আমার সোনা আমার বুকের মধ্যে কুন্ডুলি পাকিয়ে দু’হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। মাঝে মাঝে আমার পায়ের উপর ওর উরু, হাটু উঠে আসতে লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সোনা বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে? ঘুমের ঘোরে বলল মার কথা।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙ্গল সকাল সাতটায়। ঘুম জড়ানো চোখে আমি দেখলাম, নীলা আমার মুখের উপর ঝুকে পড়া, ওর এলো চুলগুলো মুখের উপর কয়েকগোছা, কয়েক গোছা ওর পিঠে ছড়িয়ে আছে। ডান হাতটা আমার মাথার চুলের গোড়া ধরে হালকা টান দিচ্ছে, চোখ দুটি আশ্চার্য মায়াময় হরিনীর মত।

আমাকে বলল, এই আর কত ঘুমাবে, বল? আমি বললাম, আরও দু’ঘন্টা, ও বলল, ইশ কুড়ের বাচ্ছা। উঠ আর ঘুমাতে হবে না। আমি বললাম উঠে কি করব? ও বলল, গল্প করব। আমি বললাম, ঠিক আছে তুমি গল্প বল আমি শুনি।

নীলা সোনা আমার ঘুমের আবেশ বুঝতে পারল। বলল ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমি তোমার মাথা ম্যাসেজ করে দিই। বুঝলাম, আমার সোনা বেশ পাকা গিন্নী হয়ে গেছে। মাথা ম্যাসেজ করতে করতে বলল, ইস দেখেছ, তোমার নাকের গোড়ায় মস্ত একটা ব্রোন, কেটে দেব? আমি বললাম, ব্যাথা পাবতো। আমার সোনা রানী বলল, দাড়াও আস্তে দিচ্ছি। ব্যাথা লাগবে না। দেখতে বিশ্রী দেখাচ্ছে। আমি ঘুমের ভান করলাম। ও মুখের ব্রোন কাটার পর আস্তে আস্তে আমার ঠোটে আঙ্গুল বোলাতে লাগল। আশ্চর্য শিহরন জেগে উঠল আমার মধ্যে। পরে আস্তে করে হামি খেতে লাগল। ও আস্তে আস্তে আমাকে কমনার দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমি বাধা দিলাম না। ওর কামনার শিহরনে, আদরের অত্যাচারে আমার ঠোট ছিড়ে যেতে লাগল। আমি আমার হাত দুটো দিয়ে ওর চুলে বোলাতে লাগলাম। ও পরম তৃপ্তিতে আমাকে আদর করতে লাগল। ও জ্বিব দিয়ে ঠোট চাটতে লাগল। নোনতা স্বাদ পেতে লাগলাম। একসময় আমার চোখের পাতা চোখ, গলা, ঘাড়ের নীচে নরম চুলে আদর বসিয়ে দিল। আমি চেষ্টা করলাম নিজেকে দমন করতে। আমি একটি হাত ওর মাথার চুলের মধ্যে থেকে সরিয়ে পিঠে বোলাতে লাগলাম। কি কোমল আমার সোনা রানীর পিঠ! আমি প্রান পনে নিজেকে দমন করলাম। আমি ইচ্ছা করলে আমার সোনারানীর সমস্ত সম্পদ সেই সময় চুরি করতে পারতাম, ওকে নিঃস করে ছোবড়ার মত ফেলে দিতে পারতাম। আমি তা করিনি। আমার সোনারানীকে আমি ধ্বংস করিনি, ঠকাইনি। রক্ষা করেছি। চরম বিপর্যয়ের মুহুর্ত থেকে ওকে আমি সরিয়ে পবিত্র রেখেছি।

আমার সোনার কামভরা ভালবাসার আঠা থেকে নিজেকে মুক্ত করে বাথরুমে গেলাম। প্রথম কর্মটা সারলাম। ফিরে এসে দাত ব্রাস করলাম। বিস্কুট, ফল, আর চা দিয়ে নাস্তার শেষে নীলাকে বললাম, সোনাগো, আমরা পালিয়েছি, তোমার বাবা আমাদের সন্ধান পেলে আমাকে গুলি করে মারবে, তোমাকেও আস্ত রাখবে না। নীলা কিছু বলল না।

আমি আবার বললাম- নীলা, আমরা যে পথে বেরিয়েছি, এক সাথেই আমাদের থাকতে হবে। একই খাটে শুতে হবে। তুমিতো ভাল ভাবেই বোঝ। একই পর্যায়ের একটা ছেলে একটা মেয়ে একসাথে থাকলে প্রথমে একটু বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। তার পর বন্ধুতের সুবাদে, একটু আদর স্নেহ বিনিময় হয়। এক সময় আরও অনেক কিছু করার ইচ্ছা জাগে।

নীলা হাসতে হাসতে বলল, অনেক কিছুটা কি? আমি বললাম, বলবনা। ও প্রায় হামলে আমার মুখের উপর মুখনিয়ে এসে বলল, এই বলনাগো- কি করার ইচ্ছা হয়? আমি একটু আস্তে বললাম সহবাস করার ইচ্ছা হয়॥

নীলা প্রায় সাথে সাথে বলল, এই তুমি একটা আস্ত ফাজিল, চোর। তুমি আমাকে চুরি করেছ। তোমাকে পুলিশে দেব। আমি বাবা ও সব কিছু করতে পারবনা বলে দিলাম। আমি হাসলাম সোনার দিকে তাকিয়ে। খুশিতে ওর চোখ ঝলমল করছে। আমি বললাম, ঠিক আছে- কিছুৃ না কর, একটা সম্পর্ক তো তৈরী করা দরকার। চল আমরা বিয়ে করি। সেদিন সকাল নয়টায় আমি হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। প্রথমে খেয়ে নিলাম। নীলার জন্য খাবার রুমে পাঠিয়ে দিলাম। ওকে রেষ্ট নিতে বলে আমি বেরিয়ে পড়রাম। সেদিন বেরুনোর উদ্দেশ্য ছিল দুটো । একটা পাসপোর্ট অফিস, দ্বিতীয়টা হল কাজী অফিস খোজ করা।

আমি প্রথমে গেলাম পাসপোর্ট অফিসে। কিচূ দালাল সেখানে ঘোরা ঘুরি করে। পাসপোর্ট নেয়ার নিয়ম, সময ও টাকার পরিমান একটা নোটিশ বোর্ডে মারা। সেদিকে তাকিলাম না। খুজতে লাগলাম দালালদের। বিপদের সময় এসব অসৎ মানুষেরা বেশী উপকারে আসে। পেয়ে গেলাম এক দালালকে। এক ঘন্টার মধ্যে পাসপোর্ট করে দেয়ার দাবী শুনে আকাশ থেকে পড়ল যেন। আমি নগদ চারখানা চকচকে পাচশত টাকার নোট সামনে মেলে ধরলাম। বললাম কাজ হলে তোমার জন্য স্পেশাল পুরুস্কার। তোমার বসকে তুমি ম্যানেজ কর। বাংলাদেশে টাকা দিলে সব হয়। যত টাকা লাগুক, দেব। তবু এক-দুই ঘন্টার মধ্যে আমার পাসপোর্ট চাই-চাই। পুরস্কারের লোভে দালাল সামলাতে পারলনা। ছুটে গেল তার বসের কাছে। হাসিমুখে ফিরে এল। ছবি আর টাকা পয়সা নিয়ে গেল। পাঁচ মিনিট পরে আমাকে ফরম পুরুন করতে ডাক পড়ল। আমার দিকে তাকিয়ে তার বসের চোখ স্থির হয়ে গেল। মনে হল, তিনি যেন আমাকে খুজছেন। মুখে শুধু বলল, ও আই সি, তাহলে ইউ আর। আমাকে বললেন, বস এখানে। আমি বসলাম। অফিসার বাথরুমের দিকে গেলেন। এক কর্মচারীকে বললেন, মফিজ তুমি ফরমটা পুরুন করে সই সাক্ষর করিয়ে নাও আমি কয়েকটা জরুরী টেখিফোন করব, তুমিতো জান  আমার ওয়াইফ এখন ইন্ডিয়ায় পিয়ারলেস হসপিটালে চিকিৎসাধীন, ওখানে খোজ নিতে হবে। বলে একটু চোখ ইশারা করলেন। তার পর বললেন, ওনাকে চা দাও। এত বড় মালদার পার্টি, একটু আদয় যতœ কর। আমার সন্দেহ হল। আমি আগে একবার বলেছিযে, আমার আই, কিউ, ভাল। চাচীর ধারনা আমার আনুমান ক্ষমতাও ভাল। আমি ঘোরতর সন্দেহের মধ্যে পড়লাম। নিশ্চয় কোন ষড়যন্ত্র আছে। আমার চাচা সমস্ত অফিসে ব্যাপারটা জানিয়ে দেয়নি তোই? পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়নি তো? সাথে সাথে স্থির হয়ে গেলাম। আগে পত্রিকা দেখতে হবে। আমি উঠব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু তড়িঘড়ি করলে সন্দেহের মধ্যে পড়ব বলে পকেটে হাত দিয়েই বললাম এই যা। মফিজ বলল, কি হল? আমি বোকার মতো হেসে বললাম, ভাই সর্বনাশ হয়ে গেছে। টাকা আনতে পরিনি, শার্ট চেঞ্জ হয়ে গেছে। আমি আধা ঘন্টার মধ্যে এনে দিচ্ছি। বলে পকেট থেকে আর একখানা পাঁচশত টাকার নোট মফিজকে দিলাম। বললাম এটাও রাখুন বাকী টাকা আনতে যাচ্ছি এসে দেব। তবে কাজটা দ্রুত করেন। জি আচ্ছা বলে মফিজ তার বসকে ডাকতে গেল। আমি এই ফাঁকে বেরিয়ে পড়লাম। আগে পত্রিকা অফিসে গেলাম। চার পাঁচটা জাতীয় পত্রিকা কিনলাম। একি! সব পত্রিায় আমাদের ছবি সহ বিজ্ঞাপন দিয়েছে। সন্ধান চেয়েছেন। সন্ধান প্রার্থী আমার চাচা নয়, স্বয়ং স্ব-রাষ্ট্র সচীব, আমি পাথর হয়ে গেলাম, পালাতে পারব তো! ঘোরতর সন্দেহ হল আমার পিছনেই কোন গোয়েন্দা নেই তো? একসময় মনে হল আমাকে কে একজন অনুসরণ করছে। আমি পিছন ফিরে তাকাতেই সেও তাকাচ্ছে। আমি হাটলাম তো সেও হাটল। লোকটার চোখে কাল চশমা। কদমছাট চুল। আমি নিশ্চিত হলাম, ব্যাটা পুলিশের লোক। আমি হঠাৎ একটু জেদি হয়ে গেলাম, একটু চ্যালেঞ্জ নিলাম ব্যাটা কেমন পুলিশের লোক। আর কিভাবেই বা আমাকে অনুসরন করে। একবার ভাবলাম ওনার কাছেই না হয় সিগারেট চেয়ে নেব। সাহসে কুলালো না। আমার চাচা যে মানুষ তিনি হযত শুধু পুলিশকেই জানাননি গোটা ঢাকা শহরের মানুষকে লেলিয়ে দিয়েছেন আমার পিছনে। আমি সাহস হারালাম না। এগলি ওগলি এ দোকানে ও দোকানে করে প্রায় আধা ঘন্টা পর লোকটাকে আর দেখলাম না। আমি সরাসরি বাসে না উঠে, রিকসা ভ্যন চড়ে চড়ে হোটেলে ফিরলাম। হোটেলে এসে দেখি নীলা রাজবানীর মত সেজে বসে আছে। চোখে কাজল সুরমাও দিয়েছে। লাল রঙ্গের স্কার্ট মোজা আর কেডস পরে খাটে বসে বিশ্ব ভ্রমনের গাইড দেখছে। আমাকে দেখেই নেচে উঠল আনন্দে।

আমি বললাম সর্বনাশ হয়েছে নীলা। ও ফ্যাকাসে হয়ে বলল, কি হয়েছে? আমি পত্রিকা গুলো ওর সামনে ফেলে দিলাম। ও দেখল। আমি দেখলাম ও কিছুটা ভয় পেয়ে গেছে। আমি কিছুটা সন্দেহের মধ্যে রাখলাম ওকে। ভালকরে যাচাই করা দরকার। চরম বিপদে অনেক সময় সবাই দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারে না। যে আবেগে আমার সাথে ঘর ছেড়েছে। এই দুর্যেগে জীবন মরনের সন্ধিক্ষনে হয়ত ওর মোহ কেটে যেতে পারে। আমি বললাম এখন কি করবে নীলা? নীলা বলল, কি করব আবার, পালাতে হবে। আমি বললাম, নীলা এখন আবেগের চেয়ে যুক্তির বেশী প্রয়োজন। তুমি ভেবে দেখ- তোমার বাবা যে কাজটা করেছে- তাতে গোটা প্রশাসন আমাদের খুজে বেড়াচ্ছে। এখনও সময় আছে, তুমি তোমার বাবার কাছে ফিরে যাও। তুমি তার একমাত্র মেয়ে। তিনি তোমাকে ক্ষমা করবেন। আমি তাদের বংশের একমাত্র প্রদীপ। আমাকেও হয়ত ক্ষমা করতে পারেন। অথবা আমাকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারেন। কেউ কিছুই জানতে পারবেনা। এইটাই সম্ভবনা বেশী। তুমি ইচ্ছা করলে তোমার বাবার কাছে ফিরে যেতে পার কিন্তু আমার পক্ষে আর কোথাও ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারন এই ঘটনার জের হিসেবে আমার বাবাকেও হয়ত এতক্ষন পুলিশ জিঞ্জাসা বাদ করছে। নীলা বলল-তাও অসম্ভব কিছু না। খুনীরা আপন পর মানে না। আমি বললাম, নীলা আমার নীলা সোনা, স্বপ্নের রাণী আমার, তুমি তোমার বাবার কাছে ফিরে যাও। তোমার ছোয়া যতটুকু পেয়েছি তাতে এই পৃথিবীতে আমার আর কিছুই পাবার নেই। সেই স্মৃতি নিয়ে আমি সারা জীবন বেচে থাকব।

নীলা বলল- তার মানে তুমি আমাকে নিতে চাচ্ছ না? তুমি এতই ভীত? আমাকে কি ভেবেছ বলত? তোমাকে বিপদে ফেলে আমি ফিরে যাব বাবার কাছে? না- গো সোনা তা আর হয় না। যে পথে পা বাড়িয়েছি সেই পথই আমার একান্ত আপন। তুমি বিশ্বাস না কর চল কাজী অফিসে। আমি দেখলাম নীলাকে আর ফেরানো যাবে না। দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টে নিলাম। আমি বললাম, এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। দ্রুত গোছ গাছ কর। এক্ষুনি বেরুতে হবে। সময় মাত্র দশ মিনিট।

সেদিন দশ মিনিটের মধ্যে আমরা হোটেল ত্যাগ কললাম। আসার সময় ম্যানেজারকে বললাম, বাবার এক বন্ধুর ম্যাসিভ হার্ট এটাক হয়েছে। যখন তখন অবস্থা। হাসপাতালে আছে। তাই চলে যাচ্ছি। আরও একখানা পাঁচশত টাকার নোট বকশিস দিলাম ম্যানেজারকে। পথে এসে একটা ট্যাক্সি নিলাম। ট্রাক্সিতে করে সায়েদাবাদ নামলাম। ঠিক করলাম আগে সীমান্ত বর্তী কোন এলাকায় যাওয়া দরকার। আনেকটা নিরাপদ হবে। ওখানকার পুলিশরা চোরাকারবারীদের ধরার জন্য ব্যাস্ত থাকে। আমাদের মত প্রেমিক – প্রেমিকাদের জন্য ওদের নজর কম।

 

ছয়-৬

সেদিন বাসে উঠে আমার রানী সোনার নতুন রূপ দেখলাম। হোটেলে যে স্কার্ট আর কেডস পরেছিল সেটা পাল্টে কাঁচা হলুদ রংয়ের একটা স্কার্ট পরেছে। পায়ে কুসুম কালারের মোজা, সাদা কেডস, চোখে সান গ্লাস মোটা ফ্রেমের। আমি থ হয়ে দেখতে লাগলাম। গাড়ির ড্রাইভারের পিছনে আমাদের ছিট। জানালার ধারে ও বসা। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো ভাবে উড়ে আমার মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। মিষ্টি মিষ্টি একটা গন্ধ আমার নাকে এল। ঠোটে আবার হালকা লিপষ্টিক ও দিয়েছে। তারই ফাঁক দিয়ে মুক্তোর মত দাঁত বের করে কথা বলতে লাগল। আমি বললাম, মাথায় একটা টুপি, হাতে একটা ছড়ি নিলেনা কেন? ও বলল কেন? আমি বললাম, যে সাজা তুমি সেজেছ এই দুটো নিলে পুরো ফরাসী মেম হয়ে যেত্ েআমি একটু সাহেব সাহেব ভাব দিয়ে তোমার পাসে বসে থাকতে পারতাম আর কি? নীলা বলল, ফাজলামী করনা সোনা। চুপ কর। আমি চুপ করলাম।

আমি এখনও এক হাজার ডলার বাজী ধরে বলতে পারি সেদিন নীলা যে,, ভাবে সেজেছিল তাতে গাড়ীর প্রত্যেক পুরুষ উতালা হয়েছিল। এমনতেই নীলা শ্রেষ্ট সুন্দরী। তার উপর একটু সাজগোজ, পোশাক, সব মিলিয়ে ওকে যে কি রুপবর্তী আর ব্যক্তিত্বময় করে তুলেছিল তার তুলনা করা সত্যিই মুসকিল।

এরই মধ্যে একটা সমস্যা বাধিয়ে দিল নীলা। আমি তখন ম্যাগাজিন দেখছি। নীলা দেখছে চরংঢ়ষধু ড়ভ ভঃড়ধিৎ পত্রিকাটা। এই সময় একটা ত্রিশোর্ধ পুরুষ নীলাকে জিজ্ঞাসা করল, প্লিজ ম্যাডাম, কিছু মনে করবেন না, আপনি কি একা? নীলা হেসে উত্তর দিল ঘড়ঃ ধঃ ধষষ, নঁঃ যিু? ইংরাজীতে উত্তর দেওয়ায় লোকটা হচকচিয়ে গেল। লোকটা আবার জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি অনেক দূরে যাবেন? নীলা বলল, ওঃ রং ধহ ড়ষফ ঃৎরপশ.  আপনি কি জানতে চান, সরাসরি বলুন। লোকটা আমতা আমতা করতে লাগল। আমি কথা বলতে যাব এমন সময় নীলা বলল, তুমি চুপ কর। আমি এই সমস্ত পথে ঘাটে প্রেম নিবেদন কারীদের ভালভাবে চিনি। লোকটা থতমত খেয়ে তার জায়গায় গিয়ে বসল। আমি নীলাকে বললাম, ছি নীলা, এভাবে মাথা গরম করনা। লোকটা পুলিশের লোকও হতে পারে। আমরা সন্দেহ হচ্ছে। শেষে সব কয়লা হয়ে যাবে। আমার কথায় পর নীলা যে উত্তর দিল তার উপর আর কোন কথা চলে না। নীলা বলল, নামো তুমি গাড়ি থেকে। নামো বলছি। আমাকে বাসায় রেখে এস। আমি তোমার সাথে যাব না। একজন ভীতু লোক আমার স্বামী হতে পারে না। একজন ভীতু মানুষের সাথে আমাকে সারা জীবন কাটাতে হবে ভাবতে ভাললাগছেনা। নীলার হাসিমাখা রূপ দেখেছি, অভিমানি রূপ দেখেছি, কামনায় রূপ দেখেছি, কাঁদলে সেই জবাফুলের মত ফোলা ফোলা রূপও দেখেছি। কিন্তু রেগে গেলে কেমন দেখায় সেই দিন দেখলাম। আমি অবাক হয়ে বললাম, আর একটু রাগকরনা সোনা.. রাগলে তোমাকে যে কি ভাল লাগে.. নীলাকে কথা গুলো এমন ভাবে বললাম যে, নীলার রাগ নেমে গেল। মুখ নীচু করে হাসতে লাগল। একটু পরে দেখলাম, ওর চোখ দুটো একটু ভেজা ভেজা। একটা হাত আমি হাতের মধ্যে টেনে নিলাম। গাড়ির মধ্যে লোকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে যত টুকু আদর করা যায় করলাম।

আমার সোনাকে নিয়ে যখন মেঘনার উপর উঠলাম, তখন আনন্দে আতœহারা হয়ে গেল। আঙ্গুল দিয়ে নীলা পানি দেখাতে লাগল। রেল সেতু দেখছে, ওর কাছে যেন সব কিছুই একটা ছন্দময় আনন্দ। একবারও ওর মনে হয়নি যে, বাংলাদেশের গোটা পুলিশ প্রশাসন আমাদের খুজে বেড়াচ্ছে। এই মুহুর্তে গাড়ির মধ্যে থেকে একজন এসে বলতে পারে, কোথায় পালাচ্ছ বদমাইয়েশের দল? ঐ হারামীদের জেলে পাঠাও আমি পুলিশের লোক। এই দেখ আমার পরিচয় পত্র। প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি আমরা নিরপদে সিলেটে পৌছলাম।

সিলেটে পৌছানোর পর নতুন একটা অনুভুতি উপলব্দি করলাম। শহর টাকে মনে হল রক্ষকবচ মায়ের মত। মনে হল যেন, আমি পবিত্র মাটিতে পা দিয়েছি। এই মাটি আমাকে আশ্রয় দেবে। যখন টার্মিনাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসলাম, তখন হঠাৎ মনে হল আমি বাংলাদেশে নেই, লন্ডন। এখনকার অনেক মানুষ লন্ডন বসবাস করে। বিল্ডিংগুলোও সেরকম ধাচে তৈরী করা। একারনে সিলেটকে বলা হয় বাংলাদেশের লন্ডন। আমি সেই লন্ডনে আমার প্রিয়া সুন্দরীকে নিয়ে হাজির হলাম এদিক ওদিক কিছু সময় পরিচিত ভঙ্গিতে ঘোরাঘুরি করলাম অহেতুক ভয় এড়ানোর জন্য। শেষে একটা আবাসিক হোটেলের খোজ করতে লাগলাম।

হোটেল খুজতে আমার জান কয়লা হয়ে গেল। রাস্তায় যাকে জিজ্ঞ্যেস করি, সেই বলে ঐ তো সামনে। একটু আগে, একটু ঘুরে, এই ভাবে। এদিকে আমার সোনার খিদেও পেয়ে গেছে। হাটতে পারছেনা। রিকসা নেব তারও উপয় নেই। দু’মিনিটেই খালি রিকসা চোখে পড়ছে না। শেষে এক বৃদ্ধ বললেন, সামনের ট্রাফিক আইল্যান্ড পার হয়ে বায়ে একটা হোটেল আছে, নাম সূর্যমুখী।

হোটেলের সামনে বেশ চমৎকার একটা ফুলের বাগান। তাজা তাজা ফুল ফুটে আছে। লাইট পড়ে চকচক করছে। ভীড় একটু কম। বুঝলাম এটা বড়লোকদের হোটেল। আমি ম্যানেজারের সাথে কথা বলছি, এই ফাকে নীলা ফুল বাগানের দিকে এগুলো। একটু পরে দেখি আমার সোনা মস্ত একটা তাজা ফুল তুলে বুকে চেপে ধরে গন্ধ নিচ্ছে। আমি বুঝলাম, আমার সোনা এই ভাবে আমাকেও বুকের মাঝে চেপে ধরবে। কোন দিনও কোথাও যেতে দেবে না। আমি এক সপ্তাহের বুকিং দিলাম। হোটেলের খাতায় লিখলাম এম, সঞ্জু, এবং নীলা। ঠিকানা পাচ বাই এক, উত্তরা, ঢাকা। সম্পর্ক- স্বামী-স্ত্রুী। উদ্দেশ্য-হানিমুন। ২০৩ নম্বর লেখা একটা চাবি আমার হাতে দিলেন। সাথে একজন বয় পাঠলেন। ২০৩ নম্বর ঘরের সামনে পৌছালে বয়কে একটা পাঁচশত টাকার নোট দিলাম। বললাম বকশিস।

তালা খুলে ঘরে ঢুকলাম। ডবল বেড মাঝারী আয়না। পাশে বাথরুমের দরজা। দরজায় আয়না লাগানো। কাচের জানালা, নীল রঙের পর্দা টাঙ্গানো। দুটো চেয়ার। বেতের তৈরী, কাচ লাগানো টেবিল, মেঝেতে সুন্দর কার্পেট, চিনা মাটির তৈরী লাইট ল্যাম্প পিছনের দিকে ঝুলন্ত বারান্দা। কাঠের তৈরী। বিচিত্র প্রজাতির ফুলের টব দিয়ে সাজানো। আমার সোনা ঘরে ঢুকেই আয়নার সামনে দাড়াল। নিজেকে দেখছে। কাঁচা হলদে রঙের পোশাকে নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হচ্ছে। রূপসুধা পান করছে। আমি ডাকলাম নীলা, ও মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। হাসল। আমি বললাম- রেষ্ট নাও। সারাদিন গাড়িতে জার্ণি করে এসেছ, খিদেও পেয়েছে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নাও।

আমি ঘামে ভেজা চট চটে শার্ট প্যান্ট খুলে বাথরুমে ঢুকলাম। গোসল করলাম। ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। প্রথমে ম্যানেজারের সাথে ভাব জমালাম। কোথায় কি দেখার আছে , কি ভাবে যেতে হবে ভাড়া টাড়া কেমন, লোকজন ভদ্র কিনা, বখাটে ছেলেদের উৎপাত আছে কিনা! এরকম সমস্যায় পড়লে জরুরী টেলিফোন নাম্বর, ভদ্রলোক সব তথ্য দিলেন। বললেন, জাফলং, মাধবকুন্ড, হযরত শাহজালাল (র) মাজার খুবই আকর্ষনীয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বেড়াতে আসে এখানে। হাচান রাজার বাড়িও দেখে আসতে পারেন। খুব মরমী গান লিখেছেন তিনি। নামকরা লোক। ম্যানেজারকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে রুমে ঢুকলেন।

এর মধ্যে নীলা গোসল সেরেছে। লেবু গ্েন্ধর সাবান মেখেছে। সুমিষ্ট গন্ধে ঘর খানা ভরে আছে। আয়নার সামনে চেয়ারে বসে চুল আচড়াচ্ছে। আমি পিছন তেকে ওর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করালাম। ও বলল, এখন আর আদর করতে হবে না, ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে। আমি আদর করলাম। আমার আদর খেয়ে সুটকেসের কাছে গেল। চাবি খুলে একটা শাড়ি পরল। দোর্দান্ত আকর্ষনীয় গোলাপী টাইপের একটা শাড়ী । চুলগুলো পিঠের উপর ছড়িয়ে আমার বুকের মধ্যে মাথা গুজে দিল। প্রানপন আবেশে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। প্রান ভরে আদর করলাম। মিষ্টি গন্ধ শুকলাম। ওর মাথায় নরম চুলের মধ্যে আমি মুখ ডুবিয়ে মিষ্টি স্বাদ নিলাম। কিছু পরে আমার বাহু থেকে মুক্ত করে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম খেতে। মাছভাজি আর খাশির পোলাও খেলাম। আমি বললাম, ঠান্ডা কিছু খাবে। ও বলল না। খাওয়ার পাঠ চুকিয়ে দ্রুত রুমে ফিরে আসলাম। রুমে ঢুকে দুজন চুপচাপ শুয়ে থাকলাম কিছু সময়। খানিক বাদে নীলা বলল, একটা জিনিস লক্ষ করেছ? আমি বললাম কি? ও বলল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোন পুলিশ আমাদের সন্ধান পাবেনা। আমি বললাম, কি করে বুঝলে? ও বলল আজ দিনটা লাকী বুঝতে পারছনা? তুমি যে ভাবে ভয় পাইয়ে দিলে তাতে আমি তো ভেবে ছিলাম এতক্ষন এই হোটেলে না থেকে আমি থাকতাম বাসায় আর তুমি থাকতে জেলে হাজতে । আমি বললাম, তা ঠিক। নীলা বলল, এখন কি করবে ঠিক করেছ? আমি বললাম, কিছু খোজ নিয়েছি। এক সপ্তাহের বুকিং দিয়েছি। যাতে আমাদের উপর নজর না পড়ে। তবে তিন চার দিনের মধ্যে আমরা হোটেল পাল্টাবো। তবে একটা ব্যাপার হবে। ও বলল কি? আমি বললাম কাল যাখন আমরা বেড়াতে বের হব, খাতায় লিখছি আমরা হানিমুনে এসেছি, সেইভাবে উচ্ছাস বাহার রাখতে হবে। কোন বিষন্নতা যেন চোখে না পড়ে। নীলা বলল, ঠিক আছে। আমি দেখলাম, নীলার চোখে ঘুম নেমে আসছে। কথা জাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি কথা বাড়ালাম না। ও ঘুমিয়ে পড়ল। আমি একটা বই ঘাটতে লাগলাম। ঘুমের মাধ্যে নীলা অদ্ভুত একটা কান্ড করল। ও শুয়ে আছে কাত হয়ে, বাম হাতটা মাথার তলে, ডান হাতটা মুখের আছে থুতনির নিচে। পা ভাজ করা। শাড়ির একটা প্রান্ত হাটুর উপর উঠে গেছে। লাইট পড়ে ওর ফর্সা পা জ্বল জ্বল করছে রুপোর মত। হঠাৎ ও কি যেন বলতে শুরু করল বিড় বিড় করে। বোঝার চেষ্টা করলাম। অস্পষ্ট কথা। কাকে যেন ডাকছে। বার বার বলছে, এই এই। হাত নাড়ছে। ঘুমের মধ্যে বালিশ টানছে। আমি ওর হাতটা ধরলাম। ও টানছে আমাকে। আমি ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলাম। ঘুম জড়ানো চোখে দুষ্টামির হাসি। আমি ডাকলাম ও উউম উউম করে ডাক শুনল। হাটুতে হাটু ঘসছে। আমি ওর মাথাটা বুকের মধ্যে তুলে নিলাম। ও চোখ খুলে আমাকে দেখল। হাসল। আবার চোখ বুঝল। আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর রেশম রেশম নরম বুকের চাপ আমার বুকে ঠেকল। আমি কেপে উঠলাম। ঠোটে আদরের ছোয়া দিলাম। ওর ঘুম ছুটে গেল। ও দুপায়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমরা দু’জন কামনার গভীরে প্রবেশ করতে চাইলাম। ও আমাকে আদরে আদরে ক্ষত বিক্ষত করতে লাগল। প্রেমের আবেগে ও আমাকে ওর সর্বস্ব দিতে চাইল। ওর নরম হাত দুটো  আমার দু’ চোয়াল ধরে ঠোট চুষতে লাগল। আমি জ্বলে যেতে লাগলাম। নোনতা স্বদে গাল ভরে গেল। ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধে আমাকে আবিষ্ট করে তুলল। আমি বুঝতে পারলাম, ও কামনায় চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছাতে চাচ্ছে। আমি নিজেও চাচ্ছি। কিন্তু পারলাম না- আমার সত্যবোধ, সৎচরিত্রবোধ,      পবিত্রতা বোধ,  আমাকে দমন করে দিল। ওকে আমার বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম, ও থর থর করে কাপতে লাগল।

প্রিয় পাঠক, আমার প্রিয়া সোনার দপদপে যৌন শিখায় আমি পুড়ে পুড়ে খাক হয়েছি। ক্ষত বিক্ষত হয়েছি। যন্ত্রনা চেপে ধরেছি। ওর আহবানকে অপমান করেছি। বাহুর বন্ধন কে ছিন্ন করেছি নিষ্টুর কসাইয়ের মত। ওর কষ্ট অনুভব করে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবুও আমার দুষ্ট প্রিয়া সোনাকে আমি নষ্ট করিনি। ওর পবিত্রতার মূলে আমি আঘাত করিনি। মোম শিখার গলনের মত আমি গলে গলে ভিজে গেছি। তবুও আমার সোনাকে আমি অক্ষত রেখেছি। ওর প্রেমকে আমি কলঙ্কিত করিনি। করতে পারিনা। আমার সোনা সুন্দরীর রানী, পাবিত্রতার দিক থেকে ওকে ছোট করতে চাইনি। আমার সেই পবিত্র সোনা, কামনার সোনারানী, দুষ্ট মেয়ে এখন কোথায় তুমি…..ওগো সোনা  আমার —-যেখানেই থাক ভাল থাক।

সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আর আমাদের ঘুম হল না। আমরা আগামী দিন গুলোতে কি করব, কোথায় কোথায় ঘুরব, তাপল্যাং কি ভাবে যাব তাই নিয়ে ভাবতে লাগলাম ।সিলেটে দেখার জায়গার বর্ণনা শুনে ও আনন্দিত হয়ে উঠল। চা বাগান, জাফলাং

মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের নাম শুনে ও ছোট সোনা পরীদের মত ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখতে লাগল। ঐ সময় ও যেন এ্রকটা খুশির গানও গুন গুন করে গাইতে শুরু করল। আমি বললাম, এক্ষুনিই বেরুবে নাকি? মিষ্টি করে হেসে বলল, জান, আমি যেন চা বাগান চোখে দেখতে পাচ্ছি। কি সবুজ! কি চমৎকার সবুজ দৃশ্য। ওহ কখন যে সকাল হবে? আমি বললাম সোনা, আগে ঠিক কর কোথায় প্রথমে বেড়াতে যাবে? চা বাগানের চমৎকার দৃশ্য দেখতে হলে শ্রীমঙ্গল যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলকে চায়ের দেশ বলা হয়। আমি এমন ভাবে কথাটা বললাম, যাতে মনে হয় শ্রীমঙ্গল অনেক অনেক দূর, যাওয়াও কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। কারণ আমি আগে যেতে চেয়েছিলাম জাফলং। নীলা বলল, ঠিক আছে, তুমিই ঠিক কর প্রথমে কোথায় যাবে? আমি বললাম , আগে জাফলং চল, বই থেকে জেনেছি, সিলেটের যত সৌন্দার্য আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ট সৌন্দার্যময় স্থান হল জাফলং। তার পর মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ।ও বলল ঠিক আছে, তুমি যেটা চাইবে সেটাই হবে। আমি হেসে বললাম, এই তো আমার সোনা ভাল বুঝেছে। একটু আদর করতে গেলে নীলা বলল, থাক প্লিজ, এখন আর না। বড্ড ঘুম আসছে। একটু ঘুমাব। আমার সোনারানী সেদিন রাত প্রায় দুইটা বার মিনিটে ঘুমিয়ে পড়ল একটা নাইট গাউন পরে। আমি ঘুমাতে পারলাম না। ঘুমান্ত সোনারানীর দিকে তাকিয়ে থাকলাম বহু সময়। সাংঘাতিক রূপবতি নীলা নাইট গাউন পরে আরও সরল রূপবতীতে পরিণত হয়েছে। মাথায় একরাশ কালচুল বালিশের উপর ছড়ানো। বাম দিকে কাত হয়ে শুয়েছে। পা ভাজ করা। দুটো বালিশই মাথায় দিয়েছে। আমি কিসে মাথা রাখব তা ভাবেনি আমার সোনা। ওর অপুর্ব সুন্দর মুখ খানা মুহুর্তেই আমার কাছে দুঃখী মনে হলো। আমি আস্তে আস্তে নীলার মাথার কাছে বসলাম, ওর চোখে মুখে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। ভাবতে লাগলাম, এই তো সেই মেয়ে যে তার আদর্শ বোধ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ভালবাসার মুল্যদিতে সে সাগরে ঝাপ দিয়েছে। সে জানে না তার তীর কোথায়—॥ সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিলাম। উঠে এসে ঝুলান্ত বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে বসলাম। চার দিকে নিস্তব্দ। গভীর রাতে বৈদ্যুতিক আলোকেও অনেকটা ক্লান্ত মনে হল। এই সময় আমার মনটা একটু দুর্বল হয়ে গেল। বাবা-মা চাচীর কথা মনে পড়ল। আর ভাবতে পারলাম না। প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম॥

সাত-৭

পর দিন সকাল সাড়ে আটটায় ঘুম ভাঙ্গল। জেগে দেখি নীলা গোসল সেরে কাপড় পাল্টাচ্ছে। সেজেছেও খানিকটা। চোখে কাজলও দিয়েছে। আমার নড়াচড়া দেখে বলল, ঘুম ভাঙ্গল! আমি বললাম হুম— তুমি কখন উঠলে, নীলার তার কোন উত্তর দিলনা। সোজা বিছানায় নেমে আসল। আমার মাথায় বাম হাত রাখল। ডান হাতটা বুকের উপর দিয়ে চোয়াল ছুয়ে বলল, এই সোনা তাড়াতাড়ি ওঠ, বেড়াতে যাবে না? এখনও গোসল করবে, নাস্তা করবে, কত কাজ, ওঠ॥ আমি ইচ্ছা করে বললাম, ভাল লাগছে না। আর একটু শুই। চোখ বুঝে বিছানায় শুয়ে থাকতে ভাল লাগে। আমার সোনা বলল, তুমি চোখ বুজে আরাম করে শোও। আমি মাথাটা একটু টিপে দিচ্ছি। আরাম করে আর শোয়া হলনা। ওর শরীরের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ আর উঞ্চ স্পর্শ আরমের বারটা বাজিয়ে দিল। সকালের শান্ত পরিবেশ কে অশান্ত হয়ে উঠল। ভাবলাম- আর লুকোচুরি নয়। সত্যি সত্যিই কাজী ডাকতে হবে। এই পবিত্র সিলেটের হযরত শাহাজালাল (র) দরগা শরীফেই বিয়ে করতে হবে। আর শোয়া হল না। ওর আদরের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উঠে পড়লাম। গোসল করলাম। বাহিরে থেকে নাস্ত করলাম। রাতেয় পরিকল্পনা অনুসারে জাফলং দেখতে রওনা হলাম, সকাল দাশটায়। শহর থেকে জাফলং মাত্র দুই ঘন্টার পথ। পথে যেতে যেতে আমার নীলা মনির আনন্দ আর ধরে না। জানালায় চোখ রেখে শুধু হাসতে লাগল। সাদা ঝকঝকে দাত মুক্তের মত লাগল। দেখতে দেখতে শ্রীপুরে চা বাগানের নৈশঙ্গিক দৃশ্যে ওর হৃদয় গলে যেতে লাগল। বেলা প্রায় বারটার দিকে জাফলং নামক শান্ত নিরিবিলি একটা গ্রামে আমরা পৌছালাম। জাফলংয়ের মেঘ, পাহাড়, অরন্য আর নদী যেন সত্যিই প্রকৃতির এক অপরুপ মিলন মেলা। সেখানকার সৌন্দার্য হৃদয় ছোয়া। পাহাড়ের চুড়ায় যেন মেঘদের মেলা। তামাবিল সীমান্তে উচু পাহাড়ের গায়ে পাহাড়ী ঝর্ণার দৃশ্য সাদা বরফের মতো সবুজের বুক চিরে এসব ঝর্ণা  প্রবাহ নৈসর্গিক দৃশ্যকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলেছে। হিমালয় পর্বত থেকে আগত নদীটি সাপের মত একে বেকে জাফলংয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশ ভারতের সীমানা এঁকে দিয়েছে। সীমানার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। মেঘের দেশ মেঘালয়কে দেখে আমার সোনারানীর আনন্দ আর ধরে না। ময়ুরের মত নেচে নেচে সৌন্দার্য উপভোগ করতে লাগল। জাফলং নদীর রং বেরং এর পাথর দেখে বায়না ধরল পাথর কুড়াবে। সোনালী রঙের চিক চিক করা পাথর দেখে নীলা কেবলই হাত ধরে আমাকে দেখাতে লাগল। দেখগো কি স্ন্দুর! নদীর তীরে আমরা হাটতে লাগলাম। নদীর তীরে শুধু পাথর আর পাথর দেখে মনে হল জাফলং শুধু পাথরের দেশ। দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়রাম। পাথরের উপর বসে নদীর পরিস্কার পানি, পাহাড়, ঘন সবুজ বন দেখতে লাগলাম। নৌকা চড়লাম। এই সময় ভাবলাম এই দিনের  স্মৃতিকে ক্যামেরা বন্দী করলে কেমন হয়? এই প্রথম ক্যামেরার অভাব অনুভব করলাম। ভাবলাম প্রেম করে পালাতে গেলে একটা ক্যামেরাও থাকা চাই, নইলে রঙ্গীন মধুর স্মৃতিকে ধরে রাকবো- কি করে? দেশ সমাজের আইনে যখন জীবন কয়লা হয়ে যাবে তখন এই ছবিই আনন্দ দেবে। এই সময়কে স্মরণ করিয়ে দেবে, যে সময় শুধু আবেগের, আনন্দের। সীমাহীন সৌন্দার্য্যরে জাফলংয়ের পাহাড় নদী, মেঘ, ঝর্ণা, পাখির ডাক আর অরন্যের রুপসুধা একসঙ্গে পান করতে করতে আমাদের সময় চলে গেল। আমার সোনার যে কি আহল্লাদ! বলে, এখান থেকে যাব না। এই পাহাড়ের গুহায় আমরা পালিয়ে বেড়াব, ঝর্ণার পানিতে স্নান করব, সাতার কাটব। আমি বললাম সোনামনিগো, আমাকে নিয়ে কি করবে? সোনারানী প্রথমে আবেগেময়ী হাসি ফুটিয়ে বলে, ভালবাসা গো শুধু ভালবাসব। বললাম আর কিছু হবে না? শুধু ভালবাসা -ভালবাসা আর কতদিন চলবে? সোনা বলে অনন্ত কাল—–।

আর বেশী সময় দেরী করতে পারলাম না। এই নৈসগিকি সৌন্দর্য কে বিদায় জানাতে আমাদের জান ফেটে গেল। বিকাল তিনটায় বাজার থেকে কিছু খেয়ে গাড়িতে ওঠলাম। গাড়িতে উঠে আর এক চিন্তা মাথায় ঢুকল। রাতের চিন্তা। দিনটা ভালই কাটে। রাত হলে অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হয়। আমার সোনারানীর দাপাদাপি শুরু করে। সে দাপাদাপি আমার সহ্য হয়না। ওর কষ্ট আমার হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ ঘটায়।

প্রিয় পাঠক, আমার নীলা সোনার রাতের যন্ত্রনা, আর দাপাদাপি বন্ধ করার জন্য আমি একটা নতুন কৌশল নিয়ে ছিলাম। ঘটনাটা হয়ত আপনারা সমর্থন করবেন না। ভাববেন আমি একটা নির্জীব। তবুও অন্তত আমাকে দোষী করার আগে একবার ভেবে দেখুন- আমার জায়গায় আপনারা হলে কি করতেন? আপনারাতো জানেন, আমি আমার সোনারাণীর সরল আবেগের সুযোগ নেইনি। তাকে কলূষিত করিনি। তাকে পবিত্রতার চরম শীর্ষে রাখতে চেয়েছি। তাকে অবৈধ ভাবে আমি দখল করতে চাইনি। তাই সেদিন আমি একটা ঔষধের দোকান থেকে কিছু ঔষধ কিনলাম। রাতে ঘুমাবার সময় কৌশল করে পানিতে গুলে খাইয়ে দিলাম। আমার সোনা আধা ঘন্টার মধ্যে হাই তুলতে তুলতে ঘুম জড়ানো দুষ্টামির হাসি ঠোটে মেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

আমি চমৎকার দীর্ঘ ঘুমের সুযোগ পেলাম। পরের দিন খুব দেরী করে নীলার ঘুম ভাঙ্গল। মিষ্টি করে হাসল। হাসিতে একটু আদর করলাম। ওর শরীরে ওম ধরানো একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ ছড়িয়ে দিলাম। বললাম, বেড়াতে যাবেনা? ও প্রায় নেচে উঠল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর লীলাভুমি মাধবকুন্ড জলপ্রাপাতের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম আমরা। প্রায় চার ঘন্টা লেগে গেল। পাহাড়, বন আর জলপ্রাপাত। দুধের মত সাদা স্রোতের মত ঝর্ণা ঝরছে অবিরাম। প্রায় দু’শফূট উচু থেকে পাহাড়ের বুক চিরে অবিশ্রান্ত ধারায় নেমে আসছে সাদা জলবাশি। আমি দেখছি নীলা ছুটো ছুটি করছে। বার বার উচু থেকে পড়া জলরাশী ছুতে যাচ্ছে। আমি বাধা দিচ্ছি। সৌন্দার্য দেখতে দেখতে মুগ্ধ হচ্ছি। শত শত মানুষের মাঝে নীলার চাল চলন বেশী মাত্রায় চঞ্চল। সবাই খেয়াল করছে আমাদের। কেউ কেউ আমার সোনারানীর চঞ্চলতা দেখছে, হাসছে। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সেই মানুষটি আমাদের লক্ষ করছে, গাড়িতে নীলার সাথে যে মানুষটি কথা বলেছিল। আমার শিরদাড়া ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত হলাম সে পুলিশের লোক। মাথায় কদম ছাট চুল। দ্রুত নীলাকে ডেকে নিলাম। চা বাগান, পাহাড়, বন, ঝর্ণা মুহুর্তে ফিকে হয়ে গেল। আমিও সতর্ক হয়ে গেলাম। নীলাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। নীলাও লোকটাকে চিনতে পারল। এক বার ভাবলাম পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে যাই। পারলাম না। মানুষের ভীড়ে লোকটার চোখ এড়িয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠলাম।

প্রায় চার ঘন্টা পর সিলেট শহরে পৌছলাম, কিছু খেলাম, সরাসরি হোটেলে উঠলাম না। শহরের প্রান কেন্দ্র হযরত শাহজালাল (র) এর দরগা শরীফে গেলাম। অসংখ্যা মানুষ। তার মাঝে নিজেদের আড়াল করে রাখলাম। মাজার শরীফ জিয়ারত করলাম। আল্লাহর কাচে প্রান ভিক্ষা চাইলাম। ভাবলাম মাজারের খাদেমকে ধরে বিয়ে করে ফেলি আজই, পারলাম না। সন্ধ্যার পর হোটেলে ফিরলাম। ম্যানেজার কৌতুহলি দৃষ্টিতে আমাদের দেখলেন। মনে মনে ভাবলাম আমরা ধরা পড়ে গেছি। তবুও সাহস হারালাম না।

নীলাকে হোটেলে রেখে আমি বেরিয়ে পড়লাম শহরে। একজন সরকারী কাজীকে খুজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম। সব শুনে কাজী সাহেব যা বললেন তাহল এই রকম—ছেলের বয়স পঁচিশ আর মেয়ের বয়স আঠার না হলে বিয়ে আইন সিদ্ধ হবে না। বিয়ে পড়ালে তারও জেল হবার সম্ভবনা। আমি অবাক হলাম। বার বার বললাম আমরা প্রাপ্ত বয়স্ক। কাজী সাহেব তত মুখ ঘুরিয়ে বলতে লাগলেন না কোন মতে আইনের বাইরে কিছু করা যাবে না। তোমারও আমার জেল খাটতে হবে। আমার পাঁচশত টাকার চকচকে নোট কাজী সাহেবের মনে কোন লোভ ধরাতে পারলনা। জেল খানার লোহার শিখ তার চোখে ভেসে উঠল। আমি হতাশ হয়ে হোটেলে ফিরলাম। ফিরে এসে দেখলাম এর মধ্যে আমার সোনারানী একটা শাড়ী পরে জম কালো সেজেছে। চুলগুলো পিঠের উপর ঢেউ খেলানো। কপালে ছোট করে একটা টিপ, কানে মার্বেল সাইজের লাল- নীল পাথরের দুটো দুল, হাতে চুরি, চোখে কাজল, মুখে জরি ছড়ানো। আমাকে দেখে ভুবন ভোলানো একটা হাসি দিল। মনে হল মাধবকুন্ড দু’শো ফুট উচু থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণা। আমি বললাম, এমন করে সাজলে কেন? ও বলল জানিনা, যে ভাবে পিছনে পুলিশ ছুটছে যে কোন সময় হয়ত ধরা পড়ে যাব। যদি আর সময় না পাই। আমি কিছুটা শান্ত হয়ে গেলাম, দাড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। ও আবার বলল, কি দাড়িয়ে থাকবে? আমি কিছু বললাম না। আমার একটা হাত ধরে বিছানায় নিয়ে এসে আমার কাধের উপর মাথা রেখে বলল, ওগো আমাকে একটু দেখবে না? দেখনা আমি কেমন সেজেছি। আমি ওর মুখটা উচুকরে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। সত্যিই অপূর্ব। আলোয় ঝলমল করছে ওর রূপ। ও সুন্দরী শ্রেষ্ঠা। ওরমত স্ন্দুরী অতীতে কোনদিন কোন নারী ছিলনা, আজও নেই, ভবিষ্যতেও হবে না। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওকে দেখলাম। আস্তে আস্তে বুকের মধ্যে টেনে নিলাম। কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে কাটল। এক সময় ও বলল, ওগো বিয়েটা সেরে নাও্ আর সময় পাবে না। চার দিকে শত্র“, আমি আর পারছিনা। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। কাজী সাহেবের কথা বলতে পারলাম না। বললম, কালই একটা ব্যবস্থা করব সোনা। এখন কি একটু ঘুমাবে? ও মাথা নাচিয়ে সায় দিল।

বেশ কিছু সময় আদর যতœ করার পর আমার পরীসোনা ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে আমি পালানোর জন্য এক পরিকল্পনা একে ফেললাম। পরিকল্পনাটি ছিল এমন- প্রথমে সাতক্ষীরা যাব। বাবার সাথে একটু দেখা করব।্ কোন দালাল ধরে পড়ার ক্রস করব। কলকাতা হয়ে দিল্লী যাব। সেখানে লোকে সিলিগুড়ি অথবা ঘুম পৌছাব। হাই হিলে সান রাইজ দেখব। আকাশ ভাল থাকলে হয়ত কাঞ্চন জঙ্ঘও দেখা যেতে পারে। ওখান থেকে ওয়ায়চুং হয়ে নেপাল সীমান্তে তাপলং পৌছাব। প্রফেসর সাহেব যে যায়গায়র কথা বলেছিলেন ম্যাপদেখে এই রকমই একটা পথের কথা ভেবে নিলাম। তবে দালালের কথাটা আবরও ভাবলাম। ওরা যদি বিশ্বস্ত না হয়? আমি যদি ওদের খপ্পরে পড়ি? ওরাতো পাচারও করে দিতে পারে? তখন আমার কিছুই করার থাকবে না। বিকল্প আর একটা পথের সন্ধান পেলাম, সেটা হল এমন জাফলং সীমান্ত অতিক্রম করে মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করে বার্মায় যেতে হবে। সেখানে কিছু দিন বৌদ্ধ মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে হবে। কিছুদিন থাকার পর চীনে ঢুকলে কোন সমস্যা হবে না। পাহাড় পর্বতে গহীন জঙ্গলে গুহার যে কোন একটা নিরাপদ আশ্রয় আমরা খুজে নেব। যেখানে বাংলাদেশের পুলিশ আর খুজতে যাবে না। দুটো পরিকল্পনাই আমার পছন্দ হল। কোনটা বেচে নেব, নীলা জেগে উঠলে দুজনে আলোচনা করে ঠিক করব। পরিকল্পনা গুলো বড় বাড়া বাড়ি রকমের হয়ে গেল। মনে হল প্রেমের ক্ষেত্রে এমন বাড়া বাড়িই উপযুক্ত। যদি এতটুকু সাহস না থাকে, এতটুকু ঝুকি নিতে না পারি তাহলে পরীমেয়েদের সাথে প্রেম করি কেন? অসম্ভব রূপবতী সব মেয়েদের রূপের ঝাজে পুড়ে গলে গলে খাক হব আর অনন্ত সুখের জন্য এতটুকু করতে পারব না? দেশের পুলিশ আমাদের ধরবে, হাজাতে দেবে, কিন্তু ঐ ভারত, বার্মা, চীন, ওরা? না ওরা আমাদের কিছুই বলবে না। ওরাতো আমাদের দেশের মা-বাবার মত কসাই না। ওরা আমাদের যদি ধরেও ফেলে সব শুনে অন্তত গহীন পাহাড়ের কোন একটা গুহায় আমাদের জায়গা করে দেবে। হয়ত অনাবাদী কোন নির্জন জায়গায় আমার আর আমার সোনার জীবন গড়তে দেবে। আমরা সেখানে ঘর বাধব, সংসার করব, আর আমার সোনারানীর পেট থেকে অসংখ্য ছোট পরী জন্ম নেব্।ে সমস্ত পাহাড়, ঝর্ণা, সব ছোট ছোট পরীতে ভরে যাবে- হ্যাঁ –হ্যাঁ–হ্যাঁ। আমার পরী সোনা তখনও গভীর ঘুমের দেশে। আমি জেগে ঘুম আনতে চেষ্টা করলাম। এলোমেলো ভাবে কিছু সময় পায়চারি করলাম। আয়নায় নিজের চেহারা দেখলাম, বাথরুমে গেলাম, চোখে পানির ঝাপটা দিলাম, তবুও ঘুম আসল না। শেষে একটা কাগজ কলম নিলাম, ভাবলাম, বাবাকে একটা চিঠি লিখি, চাচীকে একটা লিখলে কেমন হয়? আবার ভাবলাম কি হবে বাবা- চাচীকে লিখে? কাগজ কলম হাতে ধরা, ভাবলাম কিছু একটা কি লিখব? কি লিখব? সোনাকে নিয়ে কবিতা ,গল্প, উপন্যাস কিছু একটা শুরু কি করব? আমি শুরু করি, আর অন্য জীবনের কোন এক মানুষ এসে তার ইতি টানুক। শেষে ভাবলাম- না কোন চিঠি, গল্প নয়। কিন্তু কি লিখি? হঠাৎ কাজী সাহেবের কথাটা মনে পড়ল সোনারানী বয়স হতে হবে আঠারো আমার পচিশ। মনে মনে হাসলাম। এ দিকে যৌবন টস টস করছে আর শালার আইন বলে বিয়ের বয়স হয়নি। হারামী কাজী, মনে হয় মান্দু টাইপের কোন মানুষ এই আইন তৈরী করেছে। তা না হলে কি করে এই ছয় বছর আমার সোনাকে দেরী করতে বলে? ওর দাপা দাপি, কি ওরা দেখে? দেখতে হয় আমাকে। তাইতো সান্তনা দিই। ধমক দিই। সৎচরিত্রের কথা শোনাই। আদর্শ বোধ জাগিয়ে তুলি। সব শেষে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই। বিষয়টা নিয়ে আমার মধ্যে একটা ভাবনা চলে এল। ভাবনাটা এমন-

বাংলাদেশে একটা মেয়ে নয় থেকে বার বছরের মধ্যে যৌবনবর্তী হয়। সন্তান ধারনে সক্ষম হয়ে ওঠে। আবার চৌদ্দ পনের বছরের একটা ছেলে সন্তান জন্ম দানে সক্ষম। তাহলে কেন আঠার আর পঁচিশ বছর বিয়ের বয়স সিদ্ধ হবে? আমি এই আইনের তীব্র বিরোধীতা করছি এবং প্রতিবাদ করছি।

এই আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হলে শারীরিক সমস্যা দেখা দেবে। আবার জনসংখ্যা বেড়ে যাবে। আমি এই দুটো ধারনার সাথে একমত নই। যৌবন প্রাপ্তির সাথে সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে শরীর সুস্থ্য থাকে। মনে প্রফুল্লতা আসে, কাজে উদ্যম আসে। আর যৌবন জোর করে চেপে রাখার সমস্যা অনেক বেশী। অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এসব ক্ষেত্রে একমাত্র চিকিৎসা বিয়ে। আর জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ধারনা তো পুরোপুরি অমূলক। কারণ বিয়ে হবার পরও জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রন করা যায়। সেক্ষেত্রে আইনটা একটু উল্টো তুলে ধরতে হবে। আইন করতে হবে অবশ্যই আঠার বছরের আগে কোন সন্তান নেওয়া যাবে না। তার জন্য মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীদের নিয়োগ করতে হবে। তাহলে একদিকে মানসিক প্রফুল্লতা থাকবে, অন্য দিক  চরিত্র বজায় থাকবে, জনসংখাও নিয়ন্ত্রনে থাকবে। আর এই যে আইন এটা সরাসরি মানুষকে অবৈধ মিলনে উদ্ধুব্ধ করছে। মাঝের থেকে লাভবান হচ্ছে ঔষধ কোম্পানী, এরা জন্মনিয়ন্ত্রনের উপকরণ আর ঔষধ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে। হিসাব করলে দেখা যাবে বিবাহিত দম্পতির চেয়ে অবিবাহিত মানুষরাই বেশী বেশী এই সব ঔষধ ক্রয় করে। আইন করে কি যৌবন চেপে রাখা যায়? যৌবনের কি কেলো আইনরে বাবা————–

আর পারলাম না ভাবতে। আমিতো কোন নামকরা বুদ্ধিজীবি নই। নই কোন নামকরা আইনবিদও।  আমি হলাম হালকা টাইপের কবি, আর প্রেমিক। আমি কি করে আইনের ঔসব ফাক ফোকর বুঝাব?

এই সময় একটা কান্ড ঘটল। হঠাৎ শুনলাম নীলা ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। ওরদিকে তাকালাম। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে নিশ্চই। আমি ওর কাছে গেলাম। গায়ে ধাক্কা দিলাম। এই এই নীলা কাদছ কেন? কোন জবাব দিল না। আরও জোরে কাঁদছে। আমি জোর করে ওকে ডাকলাম। অনেক ধাক্কা দেয়ার পর চোখ বড় করে তাকাল আমার দিকে। ওর মাথাটা কোলে তুলে নিলাম। কোলে মাথা রেখে ছাদের দিকে তাকাল, চোখের দুই ধার দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। ভাবলাম মোহ কেটে যাচ্ছে না তো? ওকি নিজের কাজের জন্য অপরাধ বোধ করছে? হয়ত নিজের মধ্যে ভয় লজ্জা, অনুশোচনা কাজ করছে, কিন্তু বলতে পারছেনা। সামনে সাম্ভব্য বিপদে ভয় পাচ্ছে। ভাবলাম এই সরল আবেগ কেটে গেলে আমাকেই দোষ দেবে। পৃথিবীর কোন যুক্তি আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। ওর জবান বন্দীই হবে সত্য। আমি যা বলব সব হবে মিথ্যে। একটা প্রবাদ বাক্য মনে পড়ল, মেয়েলোক যা বলে তাই সত্য আর পুলিশ যা বলে তাই আইন, আমি একটু শক্ত হলাম। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে শেষ যাচাই করতে হবে।

আমি ওর চোখের পানি মুছে দিলাম। মুখটা শুকনা হয়ে গেছ্ েআমার সোনার। আস্তে করে বললাম, নীলা মায়ের কথা মনে পড়ছে? ওবলল না। বললাম তবে কাঁদছ যে? ওবলল চাচাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছা হচ্ছে। আমি বললাম নীলা একটা কথা বলব? ও বলল বল! বললাম নীলা চল বাড়ি ফিরে যাই। কেউ কিছু জানবে না। ভাববে বেড়াতে গিয়েছিলাম। নীলা বলল না সোনাগো তা আর হয় না। তোমাকে ছাড়া আমি একটা দিনও বাচতে চাইনা। আমিও বহু দেখেছি, বুঝলাম তোমাকে ছাড়া আমার জীবন নিরর্থক। আমার সমস্ত দিন, রাত আমার চঞ্চলতা সবই তোমার জন্য। তুমি আমাকে ফেলে দিও না সোনা।

বললাম তোমার কি মনে হচ্ছে আমি ছেড়ে যা্িচছ! ও বলল স্বপ্নে দেখলাম যে- আর বলতে পারলনা। ঝর ঝর করে কেদে ফেলল, আমি ওর কান্না থামানোর চেষ্টা কররাম, বুকের মধ্যে ওর মাথা তুলে নিলাম। আদর করলাম, ভালবাসলাম। আমরা ভালবাসার গরমে ওর কান্না কমে এল। চুম্বকের মত আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর শরীরের উঞ্চতা স্পর্স আমাকে জালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিল।

আস্তে আস্তে ওর শরীরে ঝড় কমে এল, বাহুমুক্ত হলাম আমরা। আমি উঠে গেলাম ঝুলন্ত বারান্দায় ও আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে সাজাল।

পরে ও বলল, স্বপ্নে দেখছে আমি নাকি জোর করে ওকে ওর বাবার কাছে তুলে দিযে চলে যাচ্ছি। মানে হয়  এরকম একটা স্ব্েপ্নর?

পর দিন আর সিলেট থাকা নিরাপদ মনে কররাম না। রাতে যে প্লান করে ছিলাম। তার জন্য আমার সোনা আমাকে চমৎকার সব বিশেষণ দিল নামের সাথে। ও জাফলং হয়ে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনাটা পছন্দ করল। আমরা সেই মত খুব ভোরে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে জাফলং পৌছলাম। খুব সস্তা ধরনের কিছু খাবার খেলাম। জাফলং নতুন করে ভাল লাগতে লাগল। ওর হৃদয় নেচে উঠল। ঐ তো নদী, ওর পর পাহাড় আর বন, ওটা পেরুতে পারলেই বিপদ মুক্ত। দ্রুত একটা নৌকা ঠিক করলাম। আরো কজন আমাদের সাথে উঠতে চাইলো , কিন্তু নিলাম না। হঠাৎ একজন চওড়া কাদ, কদম ছাট টাইপ চুলওয়ালা একজন বলে উঠলেন প্লিজ আমাকে একটু নিন না। সেই লোকটি। নিশ্চিত হলাম শালা ব্যাটা পুলিশ। মুচকি হাসল, বলল দেখ সোজা নৌকা থেকে নেমে এস, কোন ঝামেলা করতে ০চাইলে গুলি করে এই নীল পানি লাল  করে দেব। মুখে মুচকি হাসি, কিন্তু কথা গুলো বেশ কটমট করে বললেন। তিনি আবার বললেন, শোন নীলা আর সঞ্জু  তোমাদের এক্ষুনি ঢাকায় ফিরতে হবে। যদি সহজে না যেতে চাও তাহলে- বলে- তিনি পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করলেন। দেখিয়ে বললেন এর সব কটা গুলিই বেরিয়ে যাবে নির্দয় ভাবে। আমি কথা বাড়ানোর কোন প্রয়জন বোধ করলাম না। নীলা ভয়ে পাংসু হয়ে গেল। আমাকে জড়িয়ে ধরল্ বলল ওগো বরং চল গুলি খেয়ে মরি। তবুও ঢাকায় বাবার কাছে ফিরে যাব না। লোকটা কড়া একটা ধমক দিলেন- চুপ বেয়াদপ মেয়ে। এতটুকু মেয়্ েএত সাহস, নেমে এস!

আমরা নৌকা থেকে নামলাম- পিছনে নীল পানি আর সাদা পাথর বয়ে যেতে লাগল। কিছু কৌতুহলী মানুষ আমাদের দেখতে লাগল। মনে হল ওরা খুব মজা পাচ্ছে। কেউবা হয়ত মজা দেখার নাম করে আমার নীলা সোনার রূপও চুষতে লাগল। নীলা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। খুব করুন অথচ শক্ত ভাবে বলল শুনুন একটা কথা বলব? লোকটা মাথা নাড়ল, বললেন বল!

নীলা বলল, দেখুন আমার কাছে নগদ চৌদ্দ লক্ষ টাকা আছে, এই চার দিনে কিছু খরচ হয়ে গেছে, বেশ কয়েক ভরি সোনার গহনা আছে। জামা কাপড় আছে বেশ দামি দামি, আমি এই গুলো আপনাকে দিচ্ছি। নগদ টাকার সব গুলো আপনার। শাড়ি আর গহনা গুলো আপনার। মেয়ের বিয়ের জন্য উপহার দিচ্ছি, বিনিময়ে শুধু আমাদের ছেড়ে দিন। ঢাকা থেকে আমাদের পিছু নিয়েছেন্ ধরতে পারেননি, গাড়ির মধ্যে ইচ্ছা করলে ধরতে পারতেন ধরেন নি। এটা আপনার দয়া। লোকটা বললেন গাড়ীর মধ্যে ধরার হুকুম আমার ছিলনা। কোথায় যাও সেটা দেখাই আমার দায়িত্ব ছিল। পরশু দিন যখন এখানে তোমরা এসেছ, ভাবলাম পাগলামির শেষ সীমান্তে চলে যাচ্ছ তোমরা। সব জানতেই তোমাদের ধরার হুকুম পেয়েছি। এমন কি গুলি করারও হুকুম আছে। নীলা আবার বেশ আবেগ ঘন কন্ঠে বলল দেখুন এই দুই পা এগুলেই নৌকা। ঐ বয়ে যাওয়া নীল পানির স্রোত। স্রোতে নৌকা খানা ভাসালে মাত্র পনের মিনিট লাগবে ও পারে পৌছাতে। ওপারে ভারত। ঐ যে বুনো পদ ম্পর্শ বিহিন পথ পাহাড়ে উঠে গেছে ঐ পথে আমরা চলে যাব। পাহাড়েরে গুহায়, বনে, জঙ্গলে, পশু- পাখির সাথে আমরা ঘর বাধব। আপনি শুধু আমাদের যেতে দিন। এই মাত্র পনের মিনিটে আপনি মাঝারি সাইজের ধনী হয়ে যাবেন। সারা জীবন চাকরী করেও এতটাকা চোখে দেখতে পাবেন না। আর আপনার মেয়ের জন্য যে গহনা আর শাড়ী কাপড় দিলাম, তাতে ও খুশিতে আটখানা হয়ে যাবে। এর বিনিময় আমাদের যেতে দিন। ঐ তো পাহাড় জঙ্গল, ওখানে কোন মানুষ নেই আছে পশু পাখি-জীব জন্তু।  ওদের সাথে আমরা বেশ থাকতে পারব। তবুও-… নীলা সোনা কাঁদতে লাগল।

আমি দু’হাতে ওর চোখ থেকে হাত সরাতে চেষ্টা করলাম। পরলাম না। লোকটা আবার বললেন, পুলিশে চাকরী করি। এসব মায়া কান্না দেখলে চাকরী চলে যাব্।েদ্রুত চল, তোমাদের জন্য বিশেষ গাড়ী অপেক্ষা করছে। এবার নীলা অন্য বেশ ধরল। দুর্দান্ত মায়াবি চাউনিতে লোকটাকে কাবু করার চেষ্টা করল। কিছু পরে বীরঙ্গনার মত বলে উঠল- শুনুন- আমার শরীরে যে পোশাক আছে এর দাম তিনহাজার দুইশত টাকা। এতে প্রায় দুই আনা ওজনের পাত সোনার পাত আছে। আমার হাতের হীরার আংটি- এর দাম পনের হাজার টাকা। গলায় চেনটার দাম দশহাজার এগুলোও খুলে নিন। একে বারে খালি হয়ে নগ্ন হয়ে আমি বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেব। ফিরেও আসব না কোন দিন। এই নগ্ন অবস্থায় খালি শরীরে ওপারে চলে যাব। ওই পাহাড়ে তো কোন মানুষ নেই্। ওখানে আমরা শরীর দেখারও কেউ নেই। এই নগ্ন অবস্থা আমরা দু’জন পাহাড়ের গুহায় আদিম মানুষ হয়ে ঘর বাধব। পশু পাখিদের নিয়ে সহ অবস্থান করব। তবুও আমাদের ছেড়ে দিন। বলেই নীলা ওর হাতের হীরার আংটি, গলার চেইন, খুলে লোকটার পায়ের নিকট ফেলে দিল। জামা খুলতে শুরু করল। আমি বাধা দিলাম।

ছি নীলা এত পাগলামি কর না। ও অঝোরে কাঁদতে লাগল। বার বার বলতে লাগল- স্যার আমাদের ছেড়ে দিন। আমি ওকে শান্তনা দিতে পারলাম না। এক বার ভাবলাম ব্যাটাকে খুন করে ফেলি, ঐ তো নদী। পেরিয়ে যেতে পারব। পরক্ষনেই ভাবলাম হয়ত চার দিকে পুলিশ আমাদের ঘিরে ধরেছে। পালানো সম্ভব নয়। আমার মরতেও কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমার সোনা? অকালে ওকে হারাতে চাইনি।

 

আট-৯

ঢাকায় নিয়ে আমার চাচা আমাকে আচ্চা মার  দিলেন। কেটে টুকরো টুকরো করে কুকুর দিয়ে খাওয়াতে চাইলেন। নীলাকে গুলি করবে পরিকল্পনা করলেন। চাচীর কান্নাতে সে গুলো করতে পারলেন না। আমাকে কুকুরের মত বের করে ছিলেন। নীলার কান্নায়, সমন্ত বাড়ি কাপতে লাগল থর থর করে। কোন কান্নায় আমার কসাই চাচার মন গলল না।

নীলার ঐ সানসিক অবস্থার মধ্যে বিয়ের আয়োজন করল এক সপ্তাহের মধ্যে। নীলার বিয়ের জন্য আমার চাচা ঢাকার সমস্ত মানুষদের খাওয়ানোর যে পরিকল্পেনা করেছিলেন তা বাতিল করে দিলেন। তবে বিদেশ থেকে বিয়ের সাওদাপাতি করলেন। ছেলে ভারতের কাশ্মীরে থাকে, ব্যবসায়ী। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যবসা করে। ওর বিয়ে হল। আইন আমার সোনার বিয়ে ঠেকাতে পারলনা। বয়স বার কিন্তু কোন কাজী বলেননি যে বিয়ে পড়াতে পারবনা। সব ঠিক ঠাক মত হয়ে গেল। আমার নীলা সোনা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। অনেক অনেক অনেক দূর। আমি জানি ও কোনদিনও আর ফিরে আসতে পারবেনা। আসবেও না কোন দিন। শুধু হৃদয়ের বোবা কান্নায় ওর দু’চোখে পানি ভরে যাবে। কাশ্মিরের আনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যকে ওর কাছে ফিকে মনে হবে। ও চলে গেল কাশ্মীর। আমি হোস্টেলে ফিরে আসলাম। কিছু দিন পর চিঠি পেলাম- ওগো রাজা সোনা, তুমি বিশ্বাস কর, আমি এখনও তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে ছাড়া বাচব না। বিশ্বাস করো আমি এখনও ঐ পশু লোকটাকে আমার শরীর ছুতে দিইন্ িযেদিন ওই পশু আমার শরীরের গভীরে প্রবেশ করবে সেই দিনই আমার মৃত্যু হবে। সোনাগো আমি তোমাকে পাগলের মত ভালবাসি, এই জীবনেই তোমার সাথে আমার বিয়ে হবে। ভাল থাক রাজা – নীলা।

এই জাতীয় পত্র পেতাম হোস্টেলের ঠিকানায়। আমার সামনে এই কলেজ, পুকুর, মাঠ, গাছ-পালা, আকাশ, রাতের জ্যোৎস্না সবই মিথ্যে-ছলনা। বাবার সাথে অনেকদিন আর দেখা হলনা। কোন মুখে বাবার সামনে দাড়াব? আমার অধঃপতনে বাবা খুব কষ্টে একদিন স্ট্রোক হয়ে মারা গেলন। আমি হয়ে পড়লাম একা। সান্তনা দেবার মত কেউ রইল না। বাবার প্রচন্ড ভালবাসার স্মৃতি আমার এখনও মনে পড়ে। চাচা-চাচী বাবার মৃত্যুর পর আসলেন। খুব কান্নাকাটি করলেন। চাচী আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদলেন। গোপনে আমাকে খরচাপাতি দিতে চাইলেন। আজ খুব জানতে ইচ্ছা করে, এই চরম দুঃখে আমার সোনা আমাকে কি মনে করেছিল? ওকি ঐ মাঝ বয়সি ভদ্রলোক ব্যবসায়ী মানুষটিকে কবুল করেছিল?

দিন যায় রাত আসে, আকাশে জ্যোৎস্না আর তারায় রাত ঝিকিমিকি করে, পাখির ঝাক মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। চারদিক আলোয় ভরে যায়। এভাবে চলতে চলতে একদিন হিসাব করলাম, বেশ মাস খানিক আমার নীলা, আমার আতœা, ভালবাসা, আমার নিশ্বাস, প্রেরনা আমাকে চিঠি লেখেনি। ভাবলাম এটাই স্বাভাবিক। অতীত অতীতই। কেন তাকে ঘাটাই বার বার। অবশেষে একখানা চিঠি পেলাম। আজও মনে হয় এই চিঠি না পাওয়াই ভাল ছিল। চিঠি খানা যে ভাবে মনে আছে তুলে দিচ্ছি- ওগো রাজাসোনা, আমার সময় শেষ  হয়ে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছা ছিল তোমাকে শেষ দেখব, পারলাম না। আমাকে ভালবেসে তুমি শুধু অপমানিত হলে। কিছুই তোমাকে দিতে পারলাম না। ভেবেছ আমি স্বামী(?) কে নিয়ে ভাল আছি? ওগো আমার- স্বামীগো আমার ভালবাসা, আমার জীবন, মরন, সবইতো তুমি। এই কথা ঐ পশুকে বলেছি বলে আমাকে ভীষণ সাস্তি দেয়। জানি তুমি আমাকে উদ্ধার করতে পারবেনা। আমাকে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে জাপান নিয়ে যাবে। ওখানে আমাকে চিকিৎসা করাবে। আমি জানি, গোপনে ডাক্তারকে দিয়ে আমাকে হত্যা করবে। ওর ডায়েরী পড়ে তাই জেনেছি। আমি বাধা দেব না। একটা কথা তোমাকে বলি, সোনা আমাকে তুমি ক্ষমা করোনা। আমার শরীরকে আমি আজও পবিত্র রেখেছে। তোমার নীলা আজও পবিত্র! এখনও আমি আমার শরীরকে স্পর্শ করতে দিইনি- নীলা, লালারক, কাশ্মীর।

চিঠি পড়ার পর আমি বদ্ধ উম্মাদ হয়ে গেলাম। ভিটেমাটি জমি জমা বিক্রি করে জাপান যাবার জোগাড় করতে লাগলাম। আমার অস্বাভাবিক আচারণ কারও চোখ এড়াল না। হেস্টেল সুপার একদিন বললেন মদটদ খাওনাকি? কোন উত্তর দিলাম না। একদিন বুঝতে পারলাম জাপান যাওয়া হবে না। আমার সোনাকে উদ্ধার করতে পারব না। ও তীলে তীলে মরবে।

জমি বিক্রি করে যে টাকা পেলাম, তাই দিয়ে হোটেলের এক বৎসরের চার্জ মিটিয়ে দিলাম। বন্ধুদের খাওয়াতে লাগলাম। হোটেলে লাইব্রেরী ছিলনা। ত্রিশ হাজার টাকার বই কিনে লাইব্রেরী করে দিলাম। নাম দিলাম ‘নীলা গ্রন্থাগার’। দশ হাজার টাকা দিয়ে একটা রিভলবয় কিনলাম। কিছু কার্তুজ ।

সন্ধ্যার পর বেরিয়ে পড়তাম ফাকা একটা মাঠে। ফ্রি হ্যান্ডে গুলি ছুড়তে প্রাকটিস করতাম। ভাল ওস্তাদও পেয়ে গেলাম। ৫০ ফুটের মাথায় নিশানা অব্যার্থ হয় এমন প্রকটিস করলাম। মোটা অংকের পুরস্কার দিলাম গুরুকে।

‘নীলা গ্রন্থাগার’ উদ্দোধনের সময় প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে খুব প্রসংসা করলেন। নীলা কে? জানতে চাইলেন। যত বার তারা প্রশ্ন করলেন, তত বার আমার চোখ পানিতে ভরে গেল। বার বার রুমাল দিয়ে চোখ মুসলাম। প্রকাশ্যে অনেকগুলো মানুষের সামনে এমন ভ্যদভেদে কান্না বড়ই বিরক্তিকর। তবুও আমাকে কাঁদতে হয়েছে। চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারিনি। শিক্ষক, ছাত্র, কলেজ এলাকার সুধী মহলে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ল। ওদের প্রশাংসায় আমার সুখ লাগার কথা ছিল। কিন্তু হায়! কোথায় আমার সুখ? সেতো সবই হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব।

সেদিন রাতে হালকা টাইপের সবজিযুক্ত খাবার খেলাম। ছাদে উঠলাম রাত এগারটায়। চার দিক শুনসন নীরবতা। আকাশ ভরা তারা। গাঢ় অন্ধকার। দূরে একটা দুটো জোনক আলো ছড়িয়ে পরিবেশকে ভৌতিক করে তুলেছে। কিছুতেই মনকে প্রবোধ দিতে পারলাম না। বার বার নীলা আমার রাজ্যে ভিড় করতে লাগল। মনে হল ও তো আমার পাশে। ঐ তো চুড়ির টুন টুন শব্দে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। মনে হল চিৎকার করে বলি নীলা-নীলা-নীলা-নীলা-সোনা আমার নীলা ————–।

সেদিন নীলা বিরহে আমি কাতর হয়ে পড়লাম। রাত প্রায় দুটোর দিকে রুমে ফিরে একটা কবিতা লিখলাম- কবিতাটা হল।

নীলা- আমার সোনা, আমার রাণী-

হারিয়ে গেছ তুমি গহীন অন্ধকারে।

সেদিন এসেছিলে ঝড় তুলতে আমার হৃদয়ে,

এই ভবে——-।

আজ কেন লুকালে আধারে?

দেখ কি বিষন্ন আমি।

কি হতাশ আমি-

কত বিবর্ণ এই রজনী।

আকাশ ভরা তারা-

তবুও অন্ধকারে ভরা

এই ধরণী–।

নেই তো কোথাও আলো–

কে জ্বালাবে বাতি-

কে দুর করিবে অন্ধকার রাতি।

এসেছিলে তুমি আমার-

-সাথে বাধবে বলে ঘর।

সেই আমি-পাজি-আইনের মানুষের বলে

হয়ে গেলাম পর।

ওগো- আমার রনী

কোথায় তুমি–

কেমন করে কাটাও তুমি

এ কঠিন দিবস-রজনী॥

কবিতাটি তিন দিন পর এক বন্ধুর চাপে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। দুদিন পর প্রকাশ পেল। খুব প্রশংসা পেলাম। কয়েকজন সমালোচনা করে বলল, বিরহ কাতর প্রেমিক কবি।

নীলাকে ভুলে থাকতে চেষ্টা করতাম, মাঝে মাঝে রিভলবরের নলটা নিজের কপালে টেকিয়ে বসে থাকতাম। যদি অন্যমনস্কভাবে আঙ্গুলটা ট্রিগারে চাপ দিত? তাহলে নীলার জ্বালা রক্তের সাথে ভেসে যেত। আমাকে আর জ্বলতে হত না। পুড়তে হত না।  মনে মনে নীলার স্বামী, ওর বাবাকে গালাগালি দিতাম। একবার ভাবলাম ওর বাবাকে আগে খতম করে দেই। ও একটা আদর্শহীন মানুষ। ওদের পাপাচারিতে দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ওদের রেখে কি লাভ এদেশে? ওরাতো প্রেমের শত্র“, আবার দেশেরও শত্র“। ওদের অপরাধের বিচারতো কেউ করেনি, কেউ কোনদিন করবেও না। আমি নিজেই না হয় নিজের আদালতে বিচার করে ওকে মৃত্যুদন্ড দিলাম- ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে মৃত্যু, প্রকাশ্যে নয়- গোপনে, কোথায় পাব জল্লাদ? আমি —আমি— ওরে –আমি, আমি অভিযোগকারী আমি আদালত, আমি বিচারক, আমিই জল্লাদ, স্পটটা কোথায় হবে?

মনে মনে ভাবতে লাগলাম———

কি ভাবে ওর বাবাকে খুন করলে ধরা পড়ার সম্ভবনা কম, তা নিয়ে গবেষনা করতে লাগলাম। গুপ্ত হত্যাসংক্রান্ত কিছু বইপত্র পড়লাম। বেশ কিছু পদ্দতি বার বার কল্পনা করতে লাগলাম। কিন্তু বই পড়া পদ্ধতির উপর বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভাবলাম, এগুলো সবই কল্পনা- ফাকাবুলী, টাকা কামাই করবার জন্য লেখক এই সব আজগুভী পদ্ধতির কথা লিখেছে- এগুলো ফুল প্র“প না। এই পদ্ধতি অনুসারে কাজ করতে গেলেই হাতে নাতে ধরা পড়তে হবে। ঠিক করলাম বাস্তব খুনীদের কাছে পরামর্শ নিতে হবে। উপযুক্ত বকশিস পেলে ওরা হড় হড় করে বলে দেবে। খুনের দায়িত্বটাও ওরা নিতে চাইবে। কিন্তু আমি ওদের দিয়ে কাজটা করাব না। আমি নিজে কাজটা করতে চাই। নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে কি হয়? না তাতে তৃপ্তি পাওয়া যায়? আমার দরকার আতœতৃপ্তি, চরম তৃপ্তি। আমার সামনে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করবে, আমি হাসব, যেমন আমার নীলা সোনা কেঁদে ঘর ফাটিয়েছে, সে শুনেনি। সেও ওই রকম চিৎকার দেবে। মৃত্যুর চিৎকার। কাশ্মীর কিংবা জাপান থেকে আমার সোনা শুনতে পাবে। আমি দাঁতে দাত চেপে হাসব- তৃপ্তির হাসি—-হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁ।

বেশ কিছু টাকা খরচ করে একদিন দু’জন পেশাদার খুনীর সাথে দেখা করলাম। ওদের চেহারা দেখে বুঝা গেলনা যে এরা এতবড় কিলার। খুনটাকে এরা একেবারে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। মাসে দু’একটা ওডার পেয়ে থাকে। পেমেন্টের ক্ল্যাসিফিকেশন আছে। দামী মানুষ বিগ পেমেন্ট, সাধারণ মানুষ লাইট পেমেন্ট। তবে কোন বাকীতে এরা কাজ করে না। সবই এডভ্যান্স করতে হয়। এডভ্যান্স করে কাজ না হলে টাকা ফিরিয়ে দেয়। মেরে দেয় না। আমাকে পেয়ে ওরা খুশী হল। আমাকে একটা ক্লাইয়েন্ট ভেবে বসল। খাতির যতœ করল চা- কপি খাইয়ে। আমি খেলাম, সবশেষে আমি আমার কথা বললাম—॥ ওরা হতভম্ব হয়ে গেল, কপালের চামড়া ভাজ হয়ে গেল। বলল এই পথে কেন ভাইজান? এ কাজে নেমনা ভাই। আর বেরুতে পারবেনা। আমরা কি পেরেছি? বেশ দীর্ঘ নিঃস্বাস ফেলে  বলল জান ভাই- আমাদের এই চেহারাটাই যা সুন্দর। আর কিছুই সুন্দর নেই, সব মরে গেছে। এক সময় সবই ছিল। তোমার মত বয়সে দলদারী করতাম। নেতারা আমাদের ব্যবহার করতে শুরু করল। তখন ভাবতাম, রাজনীতিই আসল আদর্শ। লেখাপড়া কি করব। আগে দেশ বাচাই। আমাদের কথা শুনে নেতারা খুশি হত। একটু একটু করে আমাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে লাগল। টুক টাক বাধা আাসলে নেতাদের টেলিফোন বেজে উঠত। সমস্যা মিটে যেত। একদিন নেতাদের প্রয়োরচানায় কলেজের অফিসরুমে আগুন ধরিয়ে দিলাম। বেধড়ক পিটাতে লাগলাম ছাত্রদের। শিক্ষকদের তিনজন আগুনে পুড়ে মারা গেল। আইন আমাদের কিছু করতে পারলনা। তবে নেতারা এই আগুন লাগনোর ঘটনাকে পুজি করল। যখন তখন বীর বাহাদুর খুনী বলে ডাকত। নেতা হবার পরিবর্তে একদিন খুনীই হয়ে গেলাম। আর বলতে পারল না। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল। তার পর বলল, জান ভাই- টাকা নিয়ে মানুষ মারি সেটা ঠিক। তবে কেউ যদি স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের, যারা ছাত্রদের তাদের সার্থে ব্যবাহার করে শিক্ষাঙ্গন রক্তাক্ত করছে তাদের টার্গেট করে আসে তবে রেট কনসিশন করব। এমনকি সেভেনটি ফাইভ পারসেন্ট রেট কন্সিশেন করব। একেবারে ফ্রি করলে তৃপ্তি পেতাম- কিন্তু ফ্রি করলে তো আর ব্যবসা চলে না, খাব কি? সংসার চালাব কি দিয়ে। বাজার দর যে ভাবে বেড়ে চলেছে সব মিলিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। আমি বেশ কিছু সময় লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, লোকটা দাত বের করে হাসতে লাগল। কান্নার ভাব কেটে গেছে। বলল- ভাই, নিজেতো খুন করতে পারবেনা। হয়ত ট্রিগার চাপ দিবার আগেই প্যান্ট ভরে পেশাপ করে কাপড় চোপড় নাপাক করে ফেলবে। হেসে উঠল লোকটা। তার পর বলল হাসতে হাসতে, মধ্যখান থেকে তুমি জেলে ঢুকবে। লোকটা বেচে যাবে, আর আমাদের কিছু টাকা হাতছাড়া হয়ে যাবে। বোঝতো ভাই- যাদের যা পেশা তাদের তাই করতে হয়। এখন যদি সবাই দাড়ি সেভ করার মত সব কাজ নিজেরা করে তাহলে ডড়ৎশ পষধংংরভরপধঃরড়হ  বলে কিছু থাকে না। ওদের কোন পরামর্শ আমার কানে ঢুকলনা। বললাম, আমি প্রফেশনাল করষষবৎ হতে চাইনা। মাত্র দুটো খুন করতে চাই, একটা দেশে আর একটা কাশ্মীর কিংবা জাপান। আমি বললাম, একটা পদ্ধতি বলার জন্য একহাজার টাকা ফিস দেব। কয়েকটা পদ্ধতি শুনব, এরপর যে পদ্ধতি আমার পছন্দ হবে তার জন্য আতিরিক্ত পাচহাজার টাকা পুরস্কার দেব। ইচ্ছা করলে আমাকে বিশ, পঞ্চাশ, একশ পদ্ধতি বলতে পারেন। প্রতিটির জন্য এক হাজার করে দেব। কাজ করে যা পেতেন তার চেয়ে অনেক বেশী রোজগার হবে। তবুও আমার কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করাব না।

নয়-১০

যে পদ্ধতিটা আমার পছন্দ হল সেটা বেশ শক্ত মনে হল। ওদের আড্ডা থেকে বেরিয়ে একটা রেস্টুরেন্ট ঢুকলাম। চোখে মুখে পানি দিতে রেস্টুরেন্টের পিছনে ট্যাপে গেলাম। সামনে লূকিং গ্লাস, নিজেকে দেখলাম। না, কোন খুন খুন ভাব জেগে ওঠেনি। বেশ শান্ত-শান্ত পাগল বিরহকাতর ব্যর্থ প্রেমিকদের মতই মুখের চেহারা। এই চেহারা বজায় রাখলে একশটা খুন করলেও ধরতে পারবেনা। আচ্ছা করে চোখে পানি ছিটালাম। একটা আনন্দ উত্তেজনা শুরু হল। খালি একটা চেয়ারে গা এলিয়ে বসলাম, বেয়ারার ডাকে চমকে উঠলাম। ওকে কড়া করে এককাপ কপি আর দুটা সোমাচা আনতে বললাম। এই ফাকে পাশে রাখা খবরের কাগজটা টেনে নিলাম। সমস্ত পাতা জুড়ে আলফাল খবরে ছাপা। ধর্ষন, ছিনতাই, প্রতারনার খবর দিয়ে কাগজ ভরে ফেলছে। আহা যদি এমন খবর থাকত বিবাহ আইন শিথিল করা হয়েছে- এখন থেকে দশবছরের মেয়ে পনের বছরের ছেলের মধ্যে বিয়ে আইন সিদ্ধ, তবে শর্ত থাকে যে, মেয়ের বয়স কুড়ি বছর না হলে কোন বাচ্চা নিতে পারবেনা। এই শর্ত ভঙ্গ কারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার। একাজ তদারকির জন্য মাঠ কর্মীদের সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালনে জোর তাগিদ দওেয়া হল। হাঁ—হাঁ —।

এমন সময় বেয়ারা কপি সোমচা নিয়ে এল। কাগজ রেখে দিলাম। কপির কাপে চুমুক লাগালাম। বেয়ারা বলল স্যার খবর শুনছেন? আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, এই বেচারা কি আমার পরিচিত? এ আমার কি খবর দেবে? তবুও বললাম, কি খবর? বলল, না মানে আপনার আমার খবর না, তবে সবাই আলোচনা করছে যে ভাবে মনে হয় খবরটা ওদের সবারই নিজের। আমার অবশ্য এই সব শুনতে ভাল লাগেনা। তবুও আপনি জানেন কিনা তাই বললাম, তা দেখছি আপনিতো এই জগতের বাসিন্দা না। হলে ওই রকম করে তাকাতেন না।

আমি বললাম কি খবর?

বেয়ারা একটু হতাশ হয়ে বলল, ঐ দেখেন আপনার কাছেই আছে । বাংলাদেশের মেয়ে জাপানে নিয়ে চিকিৎসার নামে হত্যা। ওর বাবা কিযে কান্না কাটি করতাছে। জাপান বাংলাদেশ নাম শুনে আমি চমকে উঠলাম। কান, মাথা গরম হয়ে উঠল, দ্রুত কাগজ টেনে নিলাম। সেদিন খবরের কাগজ পড়ে আমি থ হয়ে গেলাম। সাভ্যতার নামে এই কি বর্বরতা? খবরের বর্ননা এরকম- নীলা নামের একটি বাংলাদেশী মেয়ে চিকিৎসা করতে স্বামীর সাথে জাপান আসে। লোকটি কোটি কোটি টাকার মালিক। জাপানী ডাক্তারদের চিকিৎসার নামে মেয়েটিকে হত্যা করার জন্য প্রস্তাব করে। ডাক্তর পিচাশ লোকটির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। এবং বলে বাচানোই আমাদের ধর্ম, মারা নয়। তাছাড়া এটা জাপানী সভ্যতার পরিপন্থি। লোকটা মোটা অংকের ডলারের প্রস্তাব করে কিন্তু ডাক্তার তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় এবং আইনি ব্যবস্তা নেবার জন্য হুমকি দেয়। এতে লোকটা ডাক্তারের কাছে ক্ষমা চায় এবং তার কাজে লজ্জিত হয়। একসময় লোকটা স্ত্রীর সেবার নামে স্যালাইনের সাথে পয়জন ঢুকিয়ে দেয়। এতে মেয়েটির মৃত্যু ঘটে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপসন অনুযায়ী ঔষধের কারনে মৃত্যু হবার কোন সম্ভবনা নেই। কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স, সাথে সাথে পুলিশকে খবর দিয়ে লোকটিকে গ্রেফতার করায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষবাদী হয়ে লোকটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাৎক্ষণাত ভাবে ব্যাবস্থা গ্রহণ করে। এক পর্যায়ে পিচাস লোকটি স্বীকার করে যে, তার স্ত্রীকে সেই হত্যা করেছে বিষ প্রয়োগ করে। জাপানী আইন অনুযায়ী লোকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্তা নেয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। সবশেষে নীচে লেখা- মেয়েটির বাব ঢাকার বাসিন্দা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ছাকিব হোসেন। জাপানী দুতাবাসে লাশ নিয়ে আসার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং মেয়ের স্বামীকে উপযুক্ত শাস্তির দাবী করে। আমার সমস্ত রক্ত সঞ্চালন মুহুর্তেই বন্ধ হয়ে গেল। মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। মনে হল মাথার উপর একহাজারটা বাজ পড়ে পৃথিবী ধ্বংম হয়ে যাচ্ছে। সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ঘর বাড়ি, গাছ-পালা সব থর থর করে কাপছে, চারি দিকে চিৎকার চেচামেচি শুরু হয়েছে। বাচাও বাচাও আর্তনাদ ভেসে আসছে। কপি সমাচা পড়ে রইল। কিছুই খাওয়া হল না। রেস্টুরেন্টা থেকে বেরিয়ে আসলাম। বাইরে তীব্র আলো, ধুলোবালি লোকের ভিড়। কেউ আমার দিকে তাকিয়ে নেই। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। মনে হল আমার কাছে যদি বোমা- ছোট খাট বোমা নয়- একেবারে ভিয়েত নামীদের উপর ফেলা নাপাম বা হাইড্রোজেন বোমা কিংবা হিরোশিমো নাগাসাকীর এটম বোমা যদি থাকত। আমি এই মুহুর্তে সমস্ত পৃথিবী লন্ড ভন্ড করে দিতাম, এই পৃথিবীতে আমার নীলা নেই এখানে কারোরই বেচে থাকর অধিকার নেই। কারোরই নেই- এমন কি আমারও না।

আমি দ্রুত হোস্টেলে ফিরলাম। পিস্তল সোনাকে তুলে নিলাম, গুলি ভরলাম, পকেটে রাখলাম। ভাবলাম, ঢাকায় পৌছাতে বাসে গেলে চার ঘন্টা লাগবে। যশোর থেকে প্লেনে গেলে কেমন হয়? ঘড়ি দেখে বুঝলাম, প্লেনের সময় পার হয়ে গেছে। মনে মনে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গালাগালি করলাম। দ্রুত একটা বাসে উঠে বসলাম। ড্রাইভরকে বললাম- তোমাকে প্রতি মিটিটে একশত করে দেব যদি তুমি ঘন্টায় ১ হাজার মাইল বেগে গাড়ি চালাতে পার। ড্রাইভার আমার প্রস্তাবে অবাক হয়ে গেল। মুখ ফেকাসে হয়ে গেল। লোকটার সরল চেহারা আমার পছন্দ হল। জামার কলার ধরে পিচনের ছিটে নিয়ে আসলাম। পিস্তল সোনা পকেট থেকে বের করে নলটা ওর কপালে ঠেকিয়ে বললাম-কোন ট্যাফো করবে না- জানে মারা পড়বে। দ্রুত গাড়ী চালাবে আর কোন চেক পয়েন্টে বা পুলিশ দেখলে গাড়ী থামাবে না। পুলিশ গাড়িতে উঠার আগেই তোমার মাথার খুলি উড়িয়ে যাবে। ওকে বেশ হতাশ মনে হল। বললাম- যদি এর ব্যতিক্রম কর তোমার জীবন তো বটেই তোমার পুরা ফ্যামিলিও সেই সাথে শেষ হবে। আর সোজা পথে চললে- পুরুস্কার। এই নাও- বলে ১০ হাজার টাকা মেলে ধরলাম ওর চোখের সামনে। চোখ জ্বলে উঠল ওর। মৃদ হেসে আমার প্রস্তাব মেনে নিল।

ঢাকায় পৌছানোর পর আমার মাথায় কোন কৌশল আসলনা। এক অন্য কৌশল মাথায় খেলা করতে লাগল। ভাবলাম- টাকা গুলো শুধু শুধু গরচা গেল। আমি আমার চাচার নকশি বাড়িতে ঢুকলাম। দেখি চাচি অজ্ঞান, মরে গেছে কিনা বোঝা গেলনা। চাচা তার পাশে বসা- চুল এলোমেলো। আমাকে দেখে ক্ষেপে উঠল। বলল- তুই- হারামজাদা-স্কাউন্ড্রেল- তোর জন্য আমার মেয়েল এই অবস্থা। কি চাস তুই? বেরো এখান  থেকে বের। আমি একটু রহস্যের হাসি ফুটিয়ে তুললাম ঠোটে। বললাম থাকতে আসিনি- শুধু একটা জিনিস নিতে এসেছি, নিয়েই চলে যাব। চাচা বলল- কি চাস তুই, বল কি চাস? এটা কি তোর বাবার বাড়ি যে চাইলেই পাবি? বললাম- চাই তোমার জান। সাহসী লোকটি হঠাৎ আতকে উঠল। ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখতে লাগল। বলল- তোর এত বড় সাহস? বললাম- কথা বাড়িও না জীবনে কোন সখ থাকলে মিটিয়ে নাও, আর শোন- ভদ্র ভাবে কথা বল। পিস্তল বের করলাম- ওর দিকে তাক করলাম। লোকটি নাকি সাহসী! একটা ব্যাঙের যে সাহস থাকে তার তাও নেই। ভয়ে আধ মরা হয়ে গেছে। তবে সাহস খুজে পেতে চেষ্টা করছে। আমি জানতাম- আতœরক্ষার জন্য ওর একটা পিস্তল আছে। সেটা দোতলায় থাকে। দেখলাম- নজরটা বার বার সিড়ির দিকে বোলাচ্ছে। ও ভয়ে ভয়ে বলল- সোন সঞ্জু তুমি আমার ভায়ের ছেলে, আমারও ছেলে। আমাকে মের না। হাদিসে আছে পিতা হত্যা মহা পাপ। তুমি এমন পাপ করোনা। নীলা মারা গেছে ও আর আসবে না। এই সব সম্পত্তির মালিক এখন তুমি। সেই দুটি কটন মিল এখনও তোমার নামে চলে। তোমার নামে ইনকামট্রাক্সের রশিদ আমাকেই কাটটে হয়। এই দেখ তার রশিদ- বলে- লোকটা আলমারির দিকে এগুতে লাগল। আমি সাঁ করে একটা ফাঁকা গুলি ছুড়লাম। কাঁচের কোন জিনিস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। একটা সাদা মেছো বিড়াল দৌড়ে পালাল। একুইরামের মাছ গুল্ োসাতার কাটতে ভূলে গেল। ও সম্বিত ফিরে পেল। বলল- ছি- সঞ্জু মাথা খারাপ করো না- তুমি কি পত্রিকা পড়ে মাথা খারাপ করে এখানে এসোছ? ছি এটা ভদ্র লোকের বাড়ি না? পাগলামী করো না। যাদু আমার, লক্ষী ছেলে পিস্তল ফেলে দাও। ও একটু একটু করে পিছাতে লাগল। আমি ওর মতলব বুঝতে পারলাম- ও সময় বাড়াতে চায়, আতœরক্ষার চেষ্টা আর কি! ভাবলাম- লোকটাকে সিড়ির উপরে তুলে একটা দৌড় দিতে বলি। একটা খুন খুন খেলা- চাচা-ভাতিজার খুন খুন খেলা। খেলার বিষয় নীলা- ওর মেয়ে আমার প্রেমিকা ……হাঁ…..হাঁ।

আমি দাঁত বের করে হাসতে লাগলাম। একুইরামের মধ্যে পানি আর মাছ টলমল করছে। একটা গুলি করে ভেঙ্গে চুরমার করে দিলাম। পানিতে ঘর ভেসে গেল। মাছ গুলো ছটফট করতে লাগল। দেখি- এই ফাকে ও সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে চেষ্টা করছে। আমি একটা গুলি ছুড়লাম। সোজা ওর হাটুতে লাগল। রক্তে ঘর ভেসে যাচ্ছে। গোংগাছে, কাতরাচ্ছে। দাঁত দিয়ে ঠোট চেপে ব্যাথা সামলাচ্ছে। আমি হাসছি। খোড়াতে খোড়াতে দোতালায় উঠতে চেষ্টা করছে ও। বাধা দিলাম না। সারা মেঝেতে রক্ত লেগে লাল হয়ে গেছে। ভাবলাম- আহারে – রক্ত যদি লাল না হয়ে নীল হত তাহলে দেখতে বেশ হত। সমস্ত ঘর নীল হত। রক্তে হিমোগ্লবিনের জন্য রক্ত লাল হয়, কোন উপাদান থাকলে রক্ত নীল হয়? আহা- আমি যদি চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে রক্ত লাল না বানিয়ে নীল বানাবার গবেষনা করতাম তাহলে আজ এই ঘর লাল না হয়ে নীল হয়ে যেত। আমার নীলা সোনার স্মৃতি চিহ্ন নীল- সমস্ত ঘর নীলাময় হয়ে যেত। ভাবতে পারলাম না। পিচাসের মত হাসতে ইচ্ছা করল। ভাবলাম- দ্রুত খেলা শেষ করি, কেউ এসে পড়বে হয়তো। কিন্তু পারলাম না। আরো খেলতে ইচ্ছা করল। আমি একটা সুযোগ দিলাম। সুযোগ পেয়ে মৃত্যুর মধ্যেও হেসে উঠল। ও পিস্তল খুজতে আলমারিতে হাত বাড়াল। সাথে সাথে আমি গুলি ছুড়লাম। রক্ত ঝরতে শুরু করল হাত থেকে। ওর প্রচন্ড কাতর মিনতি আমাকে ফেরাতে পারল না। সাথে সাথে আরও দুটি গুলি করলাম ও ঢলে পড়ে গেল। রক্তে সমস্ত ঘর লাল হয়ে গেছে। আসলে কি লাল? না লাল নয়। আমি দেখলাম সমস্ত ঘর নীল রক্তে ভেসে গেছে। চারদিক নীলার শরীরের গন্ধে ভরে উঠল। প্রাণ ভরে চোখ বুজে শ্বাস নিলাম। বুঝলাম এক ধরনের বিভ্রম শুরু হয়েছে। দ্রুত ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেলাম। আর এখানে নয়, বেরুতে হবে, পালাতে হবে। নীলা নেই তবে নীলাকে অমর করে রাখতে হবে। নীচে নেমে এলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম অজস্র মানুষের ভিড়ে। হারিয়ে গেলাম মানুষ সমুদ্্ের।

 

এগার

ঢাকা শহরে কিছু দিন উদ্দেশ্য হিন ভাবে ঘুরে বাতাসে নীলার শরীরের গন্ধ শুকে বেড়ালাম। পুলিশ দেখলে ড্যামকেয়ার ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে টানতে হেটে যেতাম। দাঁত বের  করে স্থায়ী ঢাকাইয়াদের মত হাসতাম। ভিক্ষুকদের পয়সা দিতাম। ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে চা কপি খেতাম। পয়সা দিতাম বেশি।

ঢাকা শহরে আর বেশী দিন থাকতে পারলাম না। যে বাতাসে নীলার গন্ধ শুকে বেড়াতাম, সেই বাতাসই দু’দিনে অসহ্য হয়ে উঠল। রঙ্গিন মধুর স্মৃতি গুলো বার বার সামনে হাজির হতে লাগল। ভাবলাম- এইভাবে আমার মৃত লাশকে টেনে বেড়ানোর কোন মানে হয় না। হয় এই জীবনের অবসান করি, নতুবা ভালভাবে বাচি। সবাই চলে গেছে- এখন আমি স্বাধীন। উপদেশ দেবার, শাসন করবার কেউ নেই। হাতে প্রচুর টাকা আছে। যেমন ইচ্ছা খরচ করতে পারি। কিছু দিন অজথা খরচ করলাম। দান খয়রাত করলাম। এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম- ভাবলাম- আর না- আমাকে বাঁচতে হবে। নীলা নেই তো কি হয়েছে? শারীরিক নীলা নেই, কিন্ত নীলা আমার অন্তরে, নিশ্বাসে, রক্তে, ধমনি শিরায় মিশে আছে। এই স্মৃতি নিয়ে আমি বেচে থাকব। নীলাকে আরও নীলাময় করে তুলব। নীলার নামে স্কুল, হাসপাতাল গড়ে দেব। এসব চিন্তায় মন কিছুটা নরম হয়ে এল। ফিরে আসলাম হোস্টেলে। কিছু দিন শান্ত ভাবে থাকার চেষ্টা করলাম। নীলা গ্রহ্নগারে বই পড়ে সময় কাটালাম। ভাবলাম- এলোমেলো ভাবনাগুলো কোন দাম নেই। আমাকে হারিয়ে যেতে হবে একটা নির্দিষ্ট ভাবনার মধ্যে। কোন ভাবনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখব? অনেক ভাবনা মাথার মধ্যে আসতে লাগল। শেষে ঠিক করলাম- আমি পর্বত্য এলাকায় যাব। ওই এলাকার উপজাতীয়দের মধ্যে নিজকে বিলিয়ে দেব। ওরা অশিক্ষিত, দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধা বঞ্চিত। এব্যাপারে প্রচুর লেখা পড়া করলাম। পড়ে পড়ে যা জানলাম তা হল- ওদের হাতে এখন অস্ত্র। অধিকার প্রতিষ্ঠায় ওরা আনাড়ি ভাবে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। বিশ্বের এক শ্রেণীর মানুষ তাদের অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। ওদেরকে ধ্বংশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি ঠিক করলাম- আর দেরি নয়। আমার মত নিঃস্ব মানুষকে ওদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। ওদের হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে কলম তুলে দিতে হবে। ওদের  বোঝাতে হবে- জীবন মানে কি? জীবনের অর্থ কি? দেশ কি? বলতে হবে- এদেশ ভাই তোমাদেরও। কেন ভাই হয়ে ভায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিচ্ছ? কেন তোমরা নিজেদেরকে অন্যের মস্তিস্ক দিয়ে পরিচালিত করছ? মুক্তি যুদ্ধে কি তোমরা অংশ গ্রহণ করনি? তাহলে- তাহলে কেন বাংলাদেশকে জাফনা বানাবার আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্রের মারবেল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছ? বেশ কিছু দিন এই বিষয়ে ভাবলাম- কি ভাবে এই সব বাস্তবায়ন করা যায়? এসময় নিজের মধ্যে খুন খুন অপরাধ বোধটা কেটে গেল। ঠিক করলাম এই ভাবে বললে পার্বত্য এলাকার মানুষের হাতে কলম তুলে দিতে পারব না। আগে ওদের মাঝে যেতে হবে। ওদের একজন হতে হবে। স্কুল গড়ে দিতে হবে। স্বাস্থ্য সেবা দিতে হবে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। নীলার মত ভালবাসার বাধনে বাধবার মন্ত্র ওদের শেখাতে হবে। আমার সোনা রানীকে ওদের মাঝে শ্রেষ্টত্বের আসনে বসাতে হবে। পাহাড়ের চুড়া, সবুজ গাছ পালা, ঝর্ণাকে নীল ভালবাসায় নীলাময় করে তুলতে হবে। অশিক্ষিত, অসহায় দরিদ্র উপজাতীদের মধ্যে হতে হাজার হাজার লক্ষ কোটি ছোট নীলা পরি সোনার জন্ম দিতে হবে। ওরা হাসবে, গাইবে, ঝর্ণায় স্নান করবে আমি দেখব- শুধু দেখব- ওদের মধ্যে আমি নীলাকে খুজে পাব। নীলার জন্ম মৃত্যু দিবস পালন করব। ওই দুই দিন নীলাকে নিয়ে কবিতা, গল্প লিখতে বলব। পুরুস্কার দিব। আমি পার্বত্য এলাকায় যাবার জন্য তৈরী হলাম। প্রয়োজনীয় বই পত্র, জামা কাপড়, ঔষধ পত্র কিনলাম। এত ব্যস্ত থেকেছি তবুও এর ফাকে আমি নীলার বিরহে গলে গলে পড়তে লাগলাম। ভাবলাম- চলে তো যাব বাংলাদেশের এই অংশে আর কোন দিনও ফিরে আসবো না। চিরকালের মত বিদায়। শেষটাই এই জন্ম ভূমির জন্য মনটা একটু ভারি হয়ে উঠল। ঠিক করলাম আরও দুদিন থেকে যায়। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল গোয়েন্দা পুলিশের আনা গোনা।

আমি শুনতে পাচ্ছি নিচে জোরে কথা বার্তা হচ্ছে। রুমে রুমে তল্লাশি হচ্ছে। জিপ ভর্তি পুলিশ গেটের বাইরে অপেক্ষা করছে। ওরা হয়তো আমাকে জ্যান্ত ধরার চেষ্টা করবে। না পারলে গুলি করেও মারতেও পারে।  শব্দ গুলো আস্তে আস্তে সিড়ি বেয়ে উপরে দিকে উঠে আসছে। হয়ত নিশ্চিত হয়েছে আমি হোস্টেলে কোথাও লুকিয়ে আছি। বুটের গট গট শব্দ ক্রমে জোরে শুনতে পাচ্ছি। তবে আমার সিদ্ধান্ত আমি পাঠককে জানিয়ে দিয়ে যাই- আমার হোস্টেলের পিছনে কাদা পানির বিল আছে আমি এখন তিন তলার ছাদ থেকে ওখানে লাফিয়ে পড়ব। পালাতে চেষ্টা করব। যদি না পারি তবে গুলি খেয়ে মরব। তবুও আমি এই পুলিশের কাছে ধরা দেব না। হয় মৃত্যু নয়ত আমি চলে যাব আমার কঙ্খিত লক্ষ্যে। যেখানে থাকবে শুধু নীলার স্মৃতি- নীলা-নীলা-নীলাময় পাহাড়, ঝর্ণা, সবুজ বনভূমি, আর নীল আকাশ।

লেখক

হারুনূর রশীদ

প্রধান শিক্ষক

জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়

তালা, সাতক্ষীরা।

মোবাঃ ০১৭৩৫-৫৫২২০১

দুই দিনের সফরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হক সাতক্ষীরায়

ডেস্ক রিপোর্ট : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক গত বৃস্পতিবার রাতে সাতক্ষীরায় এসেছেন। মন্ত্রীর একান্ত সচিব আসাদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সফরসূচি অনুযায়ী মন্ত্রী আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা পৌরসভায় মাদক দ্রব্য নিধন অভিযানে যোগদান এবং বিকাল ৪টায় দেবহাটা উপজেলার চিলেডাঙ্গা গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্বোধন করবেন। তিনি শনিবার সকাল ৯টায় আশাশুনি উপজেলায় মৎস্য সপ্তাহ উদ্বোধন ও ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেক প্রদান করবেন। বিকাল ৫টায় মন্ত্রী যশোর সার্কিট হাউজে খুলনা বিভাগীয় চিকিৎসকদের সাথে মতবিনিময় করবেন।

স্বাস্থ্যখাতের মানব সম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য কানাডার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক। চিকিৎসক এবং টেকনোলজিস্টদের পাশাপাশি বাংলাদেশের নার্স ও মিডওয়াইফদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কানাডা ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত মিজ হেদার ক্রডেন গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলে তিনি এই অনুরোধ জানান। এ সময় রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেন, এই গতিকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্য কানাডা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়। বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাপ্রদান কার্যক্রমের উন্নয়নে বাংলাদেশের আরো করণীয় আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো এবং টিকা প্রদান কার্যক্রমের সাফল্যস্বরূপ আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আজ দেশব্যাপী বিস্তৃত। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক থাকায় স্বাস্থ্যসেবা আজ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য সেবা আরো দক্ষতার সাথে নিশ্চিত করতে পারে তার জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ দরকার। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ প্রসূতি মা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতে অনিচ্ছুক। এই পরিস্থিতিতে খুব ঝুঁকিপূর্ণ মাকে চিহ্নিত করে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান দূরূহ। এজন্য স্বাস্থ্যকর্মী ও মিডওয়াইফদের কার্যকর প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, দেশের শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। ধনী জনগোষ্ঠী উন্নত চিকিৎসা পেলেও গরীব জনগণ এখনো উন্নত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। তিনি জানান, এ বছরের মধ্যেই দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অর্থায়নের প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে। এসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ খন্দকার মোঃ সিফায়েত উল্লাহসহ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় মাঠ কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিগণের সাথে বৈঠক করেন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ হাশেন আলী, মহাসচিব এম হারুন-অর-রশিদ, প্রধান উপদেষ্টা ডা. কে এম শফিউল আলম বাদশা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। তথ্য বিবরণী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. রুহুল হক সাতক্ষীরায় আসছেন আজ

ডেস্ক রিপোর্ট : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক আজ বৃস্পতিবার সাতক্ষীরায় আসছেন। মন্ত্রী আজ রাত ৮ টায় সাতক্ষীরা পৌছাঁবেন। মন্ত্রীর একান্ত সচিব আসাদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সফরসূচি অনুযায়ী মন্ত্রী আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা পৌরসভায় মাদক দ্রব্য নিধন অভিযানে যোগদান এবং বিকাল ৪ টায় দেবহাটা উপজেলার চিলেডাঙ্গা গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্বোধন করবেন। তিনি শনিবার সকাল ৯টায় আশাশুনি উপজেলায় মৎস্য সপ্তাহ উদ্বোধন ও ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেক প্রদান করবেন। বিকাল ৫টায় মন্ত্রী যশোর সার্কিট হাউজে খুলনা বিভাগীয় চিকিৎসকদের সাথে মতবিনিময় করবেন।

ফতেপুরের সহিংসতার নায়ক মোশারাফের মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কালিগঞ্জে পোস্টারিং, জনমনে নানা প্রশ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট : কালিগঞ্জের ফতেপুর ও চাকদাহের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনও মাথা গোজার মতো পরিবেশ তৈরী করতে পারেনি। সহিংসতায় জড়িত কয়েকজন দুর্বৃত্ত গ্রেপ্তার হলেও অনেকে এখনও পুলিশের ধরাছোয়ার বাইরে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের কয়েকজন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। সংঘাতের নেপথ্য নায়ক মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনকারী ‘দৃষ্টিপাত’ পত্রিকার ডিক্লারেশন জেলা প্রশাসন বাতিল করলেও সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে বন্ধের আদেশের উপর স্থগিতাদেশ পেয়ে পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশনা শুরু করেছে। নতুন করে উষ্কানীমূলক সংবাদ পরিবেশন করে ঘটনার পরম্পরায় ফতেপুর ও চাকদাহের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ সচেতন ও শান্তিপ্রিয় মানুষ বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। এদিকে ফতেপুরের সহিংসতার নায়ক হিসেবে কেএম মোশারাফ হোসেন এবং তার সহযোগী জাপা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষ্ণনগর, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলকায় পোস্টারিং করা হয়েছে। কেএম মোশারাফ হোসেনের ছবি সংবলিত পোস্টার দেখে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি পোস্টার দেয়ালে সাটানোর সময় মোশারাফ হোসেনের কর্মীদের অনেকেই বিতাড়িত করেছে বলে জানা গেছে। এদিকে মোশারাফ হোসেন ও সকল জাপা নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহের দাবি সংক্রান্ত পোস্টারে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান হয়েছে। ফতেপুর ও চাকদাহে সৃষ্ট সহিংসতায় তাহলে প্রকৃত দোষী কারা? এনিয়ে বিশে¬ষণে বেরিয়ে আসছে গরুত্বপূর্ণ তথ্য।

ফিরে দেখা : ২৭ মার্চ ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে রাত ১০টার দিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদে অভিনিত ‘হুজুর কেবলা’ নাটকের মঞ্চায়ন হয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী মীর শাহিনুর রহমানের সংকলনে প্রখ্যাত প্রবন্ধকার ও রাজনীতিক আবুল মুনসুর আহম্মদের ‘হুজুর কেবলা’ নামক গল্প নাটকে রূপ দিয়ে উপস্থাপিত হলে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্দুল হাকিম সরদার, বাঁশতলা যুবলীগ আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ মিন্টুসহ ২/৩ জন দর্শক নাটকটি বন্ধ করতে বলেন। এর প্রেক্ষিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ ‘হুজুর কেবলা’ নাটক বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালার পরিচালনায় যৌতুক প্রথা প্রতিরোধ সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক নাটক ‘বাঁচতে চাই’ এর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ হয়। ২৮ ও ২৯ মার্চ যথারীতি স্কুলের ক্লাস চলে। ‘হুজুর কেবলা’ নাটকে মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে অবমাননা করা হয়েছে মর্মে ২৯ মার্চ সাতক্ষীরার ‘দৈনিক দৃষ্টিপাত’ পত্রিকায় একটি মিথ্যা উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যার শিরোনাম ‘কালিগঞ্জে নাটকে মহানবী সম্পর্কে কটুক্তি, তৌহিদী জনতার বাধার মুখে নাট্যানুষ্ঠান ভন্ডুল’’। ঐ রিপোর্টে মহানবী (সাঃ) এর ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে বিভিন্ন নাটকে ছিল না এমন সব মিথ্যা উক্তি প্রকাশ করা হয়। পত্রিকার সংবাদটি দৃষ্টিগোচর হলে কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ফরিদ উদ্দীন ২৯ মার্চ বিকেলে ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুন, বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদেরকে পান্ডুলিপি নিয়ে থানায় হাজির হতে বলেন। ২৭ মার্চের অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি শাহিনুর রহমান সংকলিত ‘হুজুর কেবলা’ নাটকে পান্ডুলিপিটি থানায় রেখে দেয়া হয়। কিন্তু দৃষ্টিপাত পত্রিকার প্রতিনিধি মিজানুর রহমান ২৯ মার্চ প্রকাশিত সংবাদটি ফটোকপি করে কালিগঞ্জের বিভিন্ন মসজিদের ইমামের নিকট প্রেরণ করেন।

‘দৃষ্টিপাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের জের ধরে ৩০ মার্চ শুক্রবার দক্ষিণশ্রীপুর বাজার এলাকায় রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। খবর পেয়ে কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ফরিদ উদ্দীন, এসআই লস্কর জায়াদুল হক, এসআই আজগর আলী দক্ষিণ শ্রীপুরে যান। পরবর্তীতে অফিসার ইনচার্জ ফরিদ উদ্দীন দক্ষিণশ্রীপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ দিদারুল ইসলাম, ইউপি সদস্য আবু জাফর সাপুইকে নিয়ে ফতেপুর স্কুলে যান। সেখানে প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুন, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সাবেক মেম্বর মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল, আব্দুল হাকিম সরদার, সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালাসহ কয়েকজন শিক্ষককে স্কুলে ডেকে নেয়া হয়। এক পর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফরিদ উদ্দীন নাটকের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত থাকার আহবান জানান এবং ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুন ও সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যান। শুক্রবার জুমা’র নামাজের খুতবায় ‘দৃষ্টিপাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ফটোকপি মুসুল¬¬ীদের সামনে পেশ হয়। উপজেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন মসজিদের মুসুল¬ীরা জুমা’র নামাজ শেষে একের পর এক মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদ, ইউএনও’র বাসভবন প্রদক্ষিণ করে। পরে তারা ফুলতলা মোড় এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাহার হোসেন কান্টু, বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম মনু, জাতীয় ইমাম সমিতির কালিগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি হাফেজ মাওলানা আব্দুল গফুর, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আশরাফুল ইসলাম, গণপতি সরদারহাট মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুস সবুরসহ বেশ কয়েকজন নেতা মহানবী সম্পর্কে কটুক্তির সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনকে ১ সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় বিক্ষোভ সমাবেশ চলার পর দক্ষিণ শ্রীপুর ইউপি’র ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বর আবু জাফর সাপুই বাদি হয়ে হুজুর কেবলা নাটকের নাট্যকার মীর শাহিনুর রহমানকে প্রধান আসামি, ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুন, সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালা, ইউপি চেয়ারম্যান শেখ দিদারুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম সরদার, মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুলসহ ৭ জনের নামোলে¬¬খ এবং অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। (মামলা নম্বর: ৩৫, তারিখ: ৩০/০৩/১২। ধারা : ১৫৩/২৯৫)। ওই মামলায় প্রধান শিক্ষক রেজওয়ান হারুন ও সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।

৩১ মার্চ শনিবার ফতেপুর ও এর আশপাশের এলাকায় শান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ কালিগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও কৃষ্ণনগর ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান কেএম মোশারাফ হোসেনের নেতৃত্বে ব্যানার সহকারে একটি জঙ্গি মিছিল কৃষ্ণনগর থেকে ফতেপুরে আসে। মোশারাফ হোসেনের নেতৃত্বে জঙ্গী মিছিলের লোকজন প্রথমে ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দরজা জানালা ভাংচুর করে। এরপর তারা সাবেক ইউপি সদস্য ও ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল এর বাড়িতে হামলা করে। সেখানে তার মেজ ভাই মনিরুল ইসলাম, সেজো ভাই শাহিনুর ইসলাম, ছোট ভাই হাসানুজ্জামান লিটন ও তার পিতা মীর জিয়াদ আলীর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তাদের ঘরবাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। এরপর শিক্ষিকা মিতা রানী বালার বাড়ি, ফতেপুর সাংস্কৃতিক পরিষদের অফিসে অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট করে। আব্দুল হাকিম সরদারের বাড়ি ও পার্শবর্তী বাজারে আব্দুল হাকিম কম্পিউটারস এন্ড প্রিন্টিং দোকানে হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর চালায়। সেসময় এমপি এইচ এম গোলাম রেজার বিশ্বস্থ কেএম মোশারফ হোসেনের সাথে ফতেপুরে উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আনছার উদ্দীনের কর্মীসমর্থকদের একটি বিশাল মিছিল ফতেপুরে এসে কেএম মোশারাফের বাহিনীর সাথে পাল¬া দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। বেলা ২টা পর্যন্ত চলে তাদের তান্ডব। দুপুরের দিকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী,কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী, কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার সৈয়দ নজরুল ইসলাম ফতেপুর স্কুল মাঠে উপস্থিত হন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার  উত্তেজিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। নাটকের সাথে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় এনে বিচারের প্রতিশ্র“তি দিয়ে তাদেরকে ঘরে ফেরার অনুরোধ জানান। পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়।

শনিবার বিকেলে দক্ষিণশ্রীপুর বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ ওয়াহেদুজ্জামান দক্ষিণশ্রীপুর বাজারে এসে সমাবেশ আহবানকারী পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির নেতা জুলফিকার আলী সাপুই, তার সহোদর আবু জাফর সাপুইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সমাবেশ স্থগিত করেন। কিন্তু বিকেলের সমাবেশ বন্ধ হলেও সন্ধ্যার পূর্বেই জুলফিকার আলী সাপুইয়ের নেতৃত্বে দক্ষিণশ্রীপুর থেকে একটি মিছিল ¯ে¬াগান দিতে দিতে ফতেপুর গ্রামে যায়। সেখানে টহলরত পুলিশ সদস্যদের সামনে দিয়ে ফতেপুর গ্রামের লক্ষীপদ মন্ডলের বাড়ীতে  সীমাহীন লুটপাট চালানোর পর তার বসতঘর, ধানের গোলা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এরপর সকালে ভাংচুর হওয়া মিতা রাণী বালার বাড়ীতে ও প্রতিবেশী সুভাষ হাজরার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অভিযোগ ওঠে, বিগত ইউপি নির্বাচনে লক্ষীপদ মন্ডল শেখ দিদারুল ইসলামের পক্ষে ভোট দেয়ায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জাপা নেতা জুলফিকার আলী সাপুইয়ের নেতৃত্বে ওই সংখ্যালঘুর বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এদিকে ৩১ মার্চ শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের হুইপ এইচএম গোলাম রেজা ঢাকা থেকে সরাসরি ফতেপুর এলাকায় পৌছে ফতেপুর মাঠে জাতীয় পার্টি আয়োজিত জনসভার বক্তব্যে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করার পাশাপাশি আব্দুস সাত্তার মোড়লকে গ্রেপ্তার করার দাবী করেন। পরবর্তীতে ১ এপ্রিল কালিগঞ্জের মথুরেশপুর ইউনিয়নের চাকদাহে এমপি এইচএম গোলাম রেজার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মাসুম বিল্যাহ সুজনের নেতৃত্বে সংখ্যালঘুদের ৭টি বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দৃষ্টিপাতের দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়ন প্রতিনিধি মিজানুর রহমান, প্রকাশক জিএম নূর ইসলাম নামে একটি মামলাসহ ফতেপুর ও চাকদাহের সহিংসতার ঘটনায় পৃথক ৫টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় মিজানুর রহমানসহ মোট ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে পুলিশ। তবে সহিংসতায় উস্কানিদাতা ‘দৃষ্টিপাত’ এর সম্পাদক  পত্রিকার কার্যালয়সহ সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেনি।

এব্যাপারে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দীন জানান, মামলায় জিএম নূর ইসলামের ঠিকানা সাতক্ষীরা উলে¬¬খ করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালানো হলেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে নূর ইসলামকে গ্রেপ্তারের জন্য সাতক্ষীরা সদর থানায় রিকুইজিশন দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাতক্ষীরা সদর থানা থেকে আসামি জিএম নূর ইসলামকে পলাতক উল্লেখ করে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান হয়েছে। তবে নূর ইসলাম সম্প্রতি সাতক্ষীরায় প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করছে বলে তারই পত্রিকায় প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ফুল নেওয়ার ছবি সম্বলিত প্রকাশিত খবর থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারপরও তাকে গ্রেপ্তার না করায় ফতেপুর ও চাকদাহের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যসহ সচেতন মহলের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মদদদাতা ‘দৃষ্টিপাত’ সম্পাদক নূর ইসলামকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ প্রশাসনসহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

কালিগঞ্জের ফতেপুর ট্রাজেডির মামলার ১৯ আসামির রিমান্ড মঞ্জুর

বিশেষ প্রতিনিধি : কালিগঞ্জের ফতেপুরে হামলা, লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি কেএম মোশারাফ হোসেনসহ ১৯ আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে সাতক্ষীরার বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: শহীদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালিগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জসিম উদ্দীন জানান, গত ২৭ মার্চ রাতে কালিগঞ্জের ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবসের নাটককে কেন্দ্র করে গত ৩১ মার্চ শনিবার সকালে ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সহকারি শিক্ষিকা মিতা রাণী বালা, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল, আব্দুল হাকিম সরদারের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নাট্যকার মীর শাহিনুর রহমান, লক্ষীপদ মন্ডলের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এঘটনায় মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুলের ভগ্নিপতি হাবিবুর রহমান বাদি হয়ে কৃষ্ণনগর ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক কেএম মোশারাফ হোসেনকে প্রধান আসামি করে গত ৫ এপ্রিল কালিগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর: ৬। এ মামলায় ৩০ জনের নাম উলে¬খসহ অজ্ঞাতনামা ১ হাজার/ বার শ’ জনকে আসামী করা হয়। কেএম মোশারাফ হোসেন, জাপা নেতা জুলফিকার আলী সাপুই, মাসুম বিল্যাহ সুজনসহ ১৬ আসামী হাইকোর্ট থেকে ২ মাসের জামিন লাভ করেন। পরবর্তীতে গত ১২ জুন সাতক্ষীরা আদালতে হাজির হলে বিজ্ঞ বিচারক সকল আসামির জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এদিকে গত ১৩ জুন মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত টিম কালিগঞ্জের ফতেপুরে সরেজমিন তদন্তে এলে তদন্ত টিমের কার্যক্রম মোবাইলে ভিডিও করার সময় কেএম মোশারাফ হোসেনের চাচাত ভাই ও কৃষ্ণনগর গ্রামের জিয়াদ আলী কাগুজীর ছেলে রওশন আলী কাগুজিকে (৩৮) গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্তকারি কর্মকর্তা আদালতে জামিন না মঞ্জুর হওয়া ১৬ আসামি মোশারাফ হোসেন, মাসুম বিল্যাহ সুজন, জুলফিকার আলী সাপুই, ডাবলু, আবু সাঈদ, ছিদ্দিক গাজী, মিলন গাজী, মিন্টু গাজী, হাসান, মান্নান গাজী, শফিকুল শেখ মাহমুদ আলম মন্টু, আহসান হাবিব, শহর আলী পাড়, শেখ আফছার আলী, মোস্তফা তরফদার এবং পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হওয়া আবু তালেব, শহিদুল ইসলাম ও রওশন আলী কাগুজিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনে রিমান্ডের আবেদন জানান। গতকাল শুনানি শেষে বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১৯ আসামীর প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আসামিদের কালিগঞ্জ থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সম্পর্কে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জসিম উদ্দীন জানান, ১৯ জন আসামি একত্রে জিজ্ঞাসাবাদ করাটা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ অনুযায়ী তাদেরকে জেলহাজত থেকে রিমান্ডের জন্য থানায় আনা হবে।

অপরিকল্পিতভাবে মধু সংগ্রহ করায় মৌমাছির বংশ বিস্তার বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে : ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার

উপকূলীয় প্রতিনিধি : জেলা প্রশাসক ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেছেন, সুন্দরবনের উপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে মধু সংগ্রহসহ নানা কাজে বনে যেয়ে বনজীবীরা সুন্দরবনের মূল্যবান গাছ কেটে আনে। তিনি আরও বলেন, অনেক মৌয়াল দল যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় সুন্দরবনে ঢুকে মধু সংগ্রহের সময় মৌচাকের সম্পূর্ন অংশ কেটে ফেলে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আগুন জ্বালিয়ে মৌমাছি তাড়ানোর সময় তারা অসতর্কতাবশত অসংখ্য মৌমাছি মেরে ফেলে। গতকাল সকাল ১০টায় শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে মৌমাছি চাষীদের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত মৌলিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সমগ্র বিষয়টি অনুধাবন করে পালিত মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ কার্যক্রমের প্রতি সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এই পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ মধু পাওয়া যায় বলেও তিনি উলে¬খ করেন।

শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন ও সাতক্ষীরা বিসিক’র বাস্তবায়নে অুনষ্ঠিত ৩ দিনের ঐ প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ দৌলতুজ্জামান খান। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল, মৌচাষী সমিতির সভাপতি মোতালেব হোসেন, শওকত হোসেন, বিসিক প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা অলিউর রহমান প্রমুখ।

ড. জুলফিকারের ফের প্রতারণা : সার্ভার খরচ বাবদ কেটে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা, অফিসের সামনে ভরাটে মাস্তান নিয়োগ, সাংবাদিকদের উপর হামলা

নিজস্ব প্রতিনিধি : কোয়া-ল্যান্সার নামের অবৈধ পিটিসি ও এলএমএল কোম্পানির নামে হাতিয়ে নেয়া ১০ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করছেন না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের জামায়াত সমর্থিত শিক্ষক ড. জুলফিকার আহম্মেদ।

গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে সমুদয় টাকা ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে আইডিপ্রতি ৫ থেকে ২ হাজার টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। সার্ভার খরচ হয়েছে এই অজুহাত দেখিয়ে  গ্রহকদের মূল বিনিয়োগকৃত টাকা থেকে সার্ভার খবচ বাবদ টাকা কেটে নেয়ায় বিনিয়োগকারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যারা সার্ভার খরচ বাবদ টাকা কেটে দিতে রাজি হচ্ছেন না তাদেরকে টাকা ফেরত দেয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা প্রতিবাদ করছেন তাদেরকে সায়েস্তা করতে সেখানে বুধবার সকাল থেকে ওই অফিসে ভারাটে মাস্তান নিয়োগ করা হয়েছে। এদিকে, গতকাল বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে কয়েকজন সংবাদিক কোয়া-ল্যান্সার পিটিসি ও এমএলএম কোম্পানির অফিসে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ড. জুলফিকার আহম্মেদের নির্দেশে অফিস স্টাফ ও তার ভারাটে সন্ত্রাসীরা প্রথম আলো, এটিএন বাংলা, সমকাল, দেশ টেলিভিশন, করোতোয়া, বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক সংবাদ, মোহনা টেলিভিশনের সাংবাদিকের উপর হামলা করার চেষ্টা করে। হামলাকারীদের অধিকাংশই জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বলে জানাগেছে।

বুধবার বেলা আড়াইটায় জেলা শহরের রসুলপুরস্থ কোয়া-ল্যান্সার পিটিসি অফিসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করে বলেন, রাবি শিক্ষক ড. জুলফিকার আহম্মেদ মঙ্গলবার গ্রাহকদের সমুদয় টাকা ফেরত দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা ভঙ্গ করছেন। শ্যামনগরের খাগড়াঘাট গ্রামের আমিনুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ২টি ও ১২ হাজার টাকা দিয়ে ২টি আইডি খুলেছিলেন তিনি। তার মোট বিনিয়োগ করা (মূলটাকা) ৫৪ হাজার টাকা। তাকে ফেরত দেয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। বাকী ১৪ হাজার টাকা সার্ভার খরচ বাবদ কেটে নেয়া হয়েছে। আশাশুনির মহেশ্বরকাটি গ্রামের অনিরুদ্ধ মন্ডল জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ২টি আইডি খুলেছিলেন। আইডিতে এখনও পর্যন্ত কোন কাজ দেয়নি, অথচ তার কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা কেটে নিয়ে ২০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন। প্রতিবাদ করলে তাকে কোন টাকা ফেরত দেয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। শহরের সুলতানপুর এলাকার রাজু জানান, ৫ মাস আগে তিনি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি আইডি খুলেছিলেন। গত ৪ মাস কাজ করার পর এ মাসেই তার মূল টাকা (৬০ হাজার) উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী এখনও ৭ মাস তার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে আর টাকা দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তার জিজ্ঞাসা ৫ মাস ধরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লিক করে সে যে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছে তার পারিশ্রমিক কে দেবে? লাবসা গ্রামের বাবু জানান, যাদের ১৫ হাজার টাকার আইডি রয়েছে তাদের কাছ থেকে আইডিপ্রতি ৫ হাজার টাকা এবং যারা ১২ হাজার টাকা দিয়ে আইডি খুলেছিলেন তাদের কাছ থেকে আইডিপ্রতি সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ২০০০ টাকা করে কেটে নেয়া হচ্ছে। তার কাছ থেকেও একইভাবে টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। এতো বড় প্রতারণা মেনে নেয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ড. জুলফিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষক হয়ে যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন। যে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার প্রায় অর্ধেক টাকা সার্ভার খরচ বাবদ তিনি কেটে নিচ্ছে। কেই যাতে প্রতিবাদ করতে না পারে সেজন্য বুধবার সকাল থেকে ওই অফিসে ভারাটে সন্ত্রাসী নিয়োগ করেছেন। তিনি ওই প্রতারক শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানান।

কোয়া-ল্যান্সার অফিসের ম্যানেজার আব্দুস সাত্তার রাজু জানান, বুধবার বেলা ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত ৮৩টি আইডির টাকা ফেরত নেয়ার জন্য আবেদন পড়েছে। এর মধ্যে ৬২টি আইডি বাবদ ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৩  টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী ৬২টি আইডি বাবদ ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৭ টাকা ফেরত দেয়ার কথা। অথচ ৬২টি আইডি থেকে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ১১৪ টাকা সার্ভার খরচ বাবদ কেটে নেয়া হয়েছে। বিধায় লাভ তো দূরের কথা কেউ মূল টাকা ফেরত পাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ড. জুলফিকার আহম্মেদ জানান, ১৫ হাজার টাকা আইডিতে ৫ হাজার টাকা এবং ১২ হাজার টাকার আইডি যারা ১ মাসের মধ্যে খুলেছেন তাদের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা এবং এক মাস আগে যারা আইডি খুলেছেন তাদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা সার্ভার খরচ বাবদ কেটে নেয়া হচ্ছে এ অভিযোগ সত্য। কারণ তার অফিস খরচ ও সার্ভার খরচ যা হয়েছে সে টাকা গ্রাহকদের কে দিতে হবে।

এদিকে, গ্রাহকদের মূল বিনিয়োগকৃত টাকা থেকে সার্ভার খরচ বাবদ টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে এ অভিযোগ জানার পর বিষয়টির সঠিকতা যাচায়ের দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জি, এটিএন বাংলা ও দৈনিক সমকালের এম কামরুজ্জামান, দেশ টেলিভিশনের শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন, করোতোয়ার শেখ মাসুদ হোসেন, বাংলাবাজার প্রতিকার গোলাম সরোয়ার, সংবাদের আবুল কাশেম, মোহনা টেলিভিশনের আব্দুল জলিলসহ কয়েকজন ফটো সাংবাদিক গতকাল বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে কোয়া-ল্যান্সার অফিসে গেলে ড. জুলফিকার আহম্মেদ সাংবাদিকদের উপর তেড়ে আসেন এবং বলেন, এই সাংবাদিকদের কারণেই তাকে আজ টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। এর পরপরি সেখানে আগে থেকে ভাড়া করে আনা সন্ত্রাসী এবং ওই অফিসের কয়েকজন স্টাফ সাংবাদিকদেরকে অকথ্য ভাষার গালাগালি করতে থাকে। এ সময় কোয়া-ল্যান্সার অফিসের স্টাফ হাহিদ হাসান, আবুল খায়ের, জিয়াউর রহমান, রনজিৎ মন্ডল, হেদায়েতুল্লাহ পলাশ, কুদ্দুস, রাজুর নের্তৃত্বে ভারাটে সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের উপর হামলা করার চেষ্টা করলে পুলিশের হস্তক্ষেপে হামলাকারীরা পিছুহাটে। হামলাকারী ভারাটে সন্ত্রাসীদের অধিকাংশ জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বলে জানাগেছে। তার হামলাকারী অফিস স্টাফরা অধিকাংশই জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানাগেছে।

র্যাবে’র অভিযানে ৩ কেজি গাঁজাসহ আটক মাদক ব্যবসায়ীকে দেড় বছরের সাজা প্রদান

নিজস্ব প্রতিনিধি : র‌্যাব ৬ এর অভিযানে ৩ কেজি গাঁজাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী আটক হয়েছে। পরে আটককৃতকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেড় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ধৃতের নাম রবিউল ইসলাম (৩৭)। তিনি সদর উপজেলার উত্তর তলুইগাছা গ্রামের মৃত এলাহি বক্সের ছেলে। গতকাল সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে সদর উপজেলার কুশখালি বাদহিলকী এলাকা থেকে র‌্যাব-৬ এর অভিযানকারী দল তাকে আটক করে। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মাসরুবা ফেরদৌস তাকে উপরিউক্ত সাজা দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫০ বোতল ফেনসিডিলসহ এক যুবক আটক

ডেস্ক রিপোর্ট : শহর উপকণ্ঠের বাকাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ৫০ বোতল ফেনসিডিলসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতের নাম তরিকুল ইসলাম বাবু। সে জেলার দেবহাটা উপজেলার নলতা কাজলা এলাকার রমজান খার ছেলে। গতকাল সকালে বাকাল কোল্ড স্টোর এলাকা থেকে মহেন্দ্র গাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।

ডিবি পুলিশের এসআই শহিদ জানান, তরিকুল শ্রীরামপুর এলাকার জনৈক বাপ্পীর বাড়ি থেকে ফেনসিডিল নিয়ে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। খবর পেয়ে তিনিসহ সঙ্গীয় ফোর্স উক্ত স্থানে হানা দিয়ে তাকে আটক করে। তরিকুল এই ব্যবসা করার জন্য খুলনার নিরালার জাহেদুর রহমান সড়কে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে বলে ডিবি পুলিশকে জানিয়েছে।

শ্যামনগরে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টে কাশিমাড়ী ও খাগড়াদানা চ্যাম্পিয়ন

শ্যামনগর প্রতিনিধি : গতকাল শ্যামনগরে উপজেলা পর্যায়ের বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের বালক ও বালিকা বিভাগের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বালিকা বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনালে ৪নং কাশিমাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক গোলে ৪৭নং পদ্মপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পরাস্ত করে। বিজয়ী দলের দলনায়ক জোৎস্না পারভীন দলের পক্ষে জয় সূচক গোলটি উপহার দিয়ে সতীর্থসহ সমর্থকদের উল¬াসে ভাসিয়ে দেন।

এছাড়া বালক বিভাগে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ৯১নং খাগড়াদানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩-০ গোলে ৫নং ডুমুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয় বারের মত উপজেলায় শ্রেষ্ঠত্ব দেখায়। খেলায় আব্দুল জলিল (ভান্ডারী) জাকারিয়া ও ইমরান একটি করে গোল করে।

নকিপুর এইচ সি পাইলট  মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে টুর্ণামেন্ট পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দৌলতুজ্জামান খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করেন। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাইমারি শিক্ষা কর্মকর্তা ভবাণী শংকর দাস, এইচসি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার নজরুল ইসলাম, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি সাংবাদিক মোস্তফা কামালসহ উপজেলা সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তাবৃন্দ। ফাইনাল খেলা দুইটি পরিচালনা করেন তৈয়েবুর রহমান বাবলু, জাহাঙ্গীর কবীর, আবু তালেব, আলমগীর হোসেন ও জুলফিকার আলী জুলু। খেলার ধারা বিবরণী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন শিক্ষক আশরাফুল হুদা ও মাইনুল ইসলাম।

 

ইফার বই বিরতণ অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলাম: ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না

নিজস্ব প্রতিনিধি : জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেছেন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কোন ধর্মই সন্ত্রাস জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের সুমহান নীতি ও আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। কোমল মতি শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ যাতে ইসলামী মূল্যবোধে জীবন সাজাতে পারে সে জন্যই জন্ম হয়েছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। ধর্মীয় শিক্ষকদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে ধর্মকে সহজ করে উপস্থাপন করবেন। ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলুন। নীতি, নৈতিকতা ও ইসলামের সুমহান আদর্শের পরশে শিক্ষার্থীদের সৎ, চরিত্রবান, দেশ প্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলুন। গতকাল সকাল ১০টায় সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী পুরুস্কার ও পাঠ্য বই বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আছাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন জেলা তথ্য অফিসার মোঃ জাহারুল ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক লোকমান হোসেন, সহকারি পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক। এর পর প্রধান অতিথি ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩ জন করে শিক্ষার্থীর পাঠ্য পুস্তক বিতরণ করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেয়ার টেকার মাহববুর রহমান।

 

খুলনায় বিদেশী পিস্তল ও গুলিসহ আটক ২

খুলনা ব্যুরো : খুলনার গল্লামারী থেকে একটি বিদেশী পিস্তল ও দু রাউন্ড গুলিসহ হেলাল উদ্দীন অন্তর (৩৬) এবং রবিউল ইসলাম (৩০) কে হাতে নাতে আটক করেছে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ। গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায় তাদের আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় গল্লামারী পুলিশ বক্স এর সামনে থেকে শিবজয় ডিলাস্ক নামক গাড়িতে এসআই হালিম ও হাবিলদার হাকিম ফোর্স নিয়ে তল্লাশীকালে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজেলার যশোদিয়া গ্রামের মৃত্যু আঃ ছালামের পুত্র গাজী হেলাল উদ্দীন অন্তর ও তার সঙ্গী সাভারের বাদশা মিয়ার পুত্র রবিউল ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করলে গাজী হেলাল উদ্দীন অন্তর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় হাবিলদার হাকিম দৌড়ে তাকে আটক করে এবং তার কাছ থেকে একটি ইউএস’র তৈরী ৭.৬২ বোরের পিস্তল ও দু রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে । ঐ সময় তার অপর সঙ্গী রবিউল ইসলামকে এসআই হালিম আটক করে। এসময় হাবিলদার হাকিম সাময়িক আহত হয়। এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে অস্ত আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছিল।

দরগাহপুর-কুল্ল্যা সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাক খাদে

শেখ তাজমিনুর রহমান, দরগাহপুর : আশাশুনি উপজেলার কুল্যা-দরগাহপুর সড়কে একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট ১৬-১৫৭১) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সোমবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ট্রাকটি যশোর থেকে অটো পালিশ লোড নিয়ে বাঁকা বাজারে যাচ্ছিল। কাদাকাটি-হলদেপোতা ব্রীজের আনুমানিক ২০০ গজ পূর্ব দিকে অর্ধেক নির্মাণাধীন কালভার্টের উপরে উঠলে ট্রাকটির পিছনের চাকা আটকে খাদে পড়ে সম্পূর্ণ উল্টে যায়। এতে ট্রাক চালক ও হেলপার গুরুতর আহত হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন আছে। এছাড়া নষ্ট হয়ে যায় ট্রাকে থাকা মালামাল। অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, প্রায় ৬-৭ মাস ধরে কালভার্টটি নির্মাণের নামে এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে রাতের আধারে বা দিনের বেলা হালকা ভারী যানবাহন প্রায় দুর্ঘটনায় স্বীকার হচ্ছে।

খুলনায় জমে উঠেছে বৃক্ষমেলা

খুলনা ব্যুরো : খুলনায় শেষ মুহুর্তে জমে উঠেছে বৃক্ষমেলা। খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে জেলা প্রশাসন এবং সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ-এর আয়োজনে ২২ জুন থেকে শুরু হওয়া এ’মেলা চলছে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।

জানা যায়, ‘সবুজ নগর সবুজ দেশ, লাল সবুজের বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত এ মেলায় খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত বৃক্ষচাষীদের বিভিন্ন স্টলে নানা রকম বনজ, ফলজ, ভেষজ আর শোভাবর্ধনকারী বিভিন্ন গাছ পাওয়া যাচ্ছে। দিনভর চলছে বিকিকিনি। এ’বছর কেমন বিকিকিনি হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে করিম নার্সারির স্বত্ত্বাধিকারী মোঃ আব্দুল করিম জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ’বছর বিক্রির হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে মেলা শেষ হয়ে আসার মুহুর্তে আশানুরুপ বিকিকিনি হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদী।

খুলনায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবির

খুলনা ব্যুরো : গতকাল বুধবার তা’লীমুল মিল্লাত রহমাতিয়া ফাযিল মাদরাসার আয়োজনে এবং কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ বাংলাদেশ ও বিএনএসবি শিরোমনি এর যৌথ উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা শিবির অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত চক্ষু চিকিৎসা শিবিরে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুয়েত সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কালচারাল এ্যাডভাইজার আব্দুল্লাহ আমের ও ফয়েজ আল শাম্মেরী, কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ বাংলাদেশ অফিস এর মহা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডঃ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এছাড়া  উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ এএফএম নাজমুস সউদ, মোঃ এমদাদুল হক খালাসী, মুজিবুর রহমান, আবু সাঈদ মোঃ আব্দুল্লাহ, মাসুদ সাইফুল্লাহ প্রমূখ। চিকিৎসা শিবিরে প্রায় ৫ শতাধিক চক্ষু রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।

 

আলিপুরে গভীর রাতে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে ঢোকার অভিযোগে এক ব্যক্তি আটক

পত্রদূত রিপোর্ট : সদর উপজেলার আলিপুরে কবিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে গভীর রাতে প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে ঢোকার অভিযোগে আটক করেছে এলাকাবাসী। সে আলিপুর চেকপোস্টের জোহর আলীর ছেলে।

জানা যায়, গতকাল রাত ২টার দিকে প্রবাসী মফিজুলের স্ত্রী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের দরজা খুলে বাইরে যায়। এই সুযোগে আগে থেকে উৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী কবিরুল ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে। পরে মফিজুলের স্ত্রী ঘরে প্রবেশ করে কবিরুলকে দেখে ডাক-চিৎকার শুরু করে। এসময় স্থানীয়রা এসে তাকে গণ ধোলাই দিয়ে ঘরের ভিতর হাত-পা বেধে রাখে। পরবর্তীতে কবিরুলের বড় ভাই আব্দুল মালেক এসে আবারও তাকে মারধর করার সময় সুচতুর কবিরুল পালিয়ে যায়। আরো জানা গেছে, কবিরুল এর আগেও এ ধরনের অভিযোগে একাধিকবার ধরা পড়ে।

রাজার বাগানে একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে পাওয়া গেছে

নিজস্ব প্রতিনিধি : ১২/১৩ বছর বয়সী বুদ্ধি প্রতিবন্ধী একটি মেয়ে পাওয়া গেছে। তার গায়ের রং কালো। মুখে কালো কালো দাগ আছে। সে তার নাম ফারজানা বলে জানিয়েছে। তার বাড়ি কোথায় সে বলতে পারছে না। কখনো বরিশাল, কখনো রাজাপুর, কখনো বলছে তার মা থাকে স্বরুপ কাটি। পিতামাতার নামও মেয়েটি বলতে পারছে না। তার কথাবার্তায় ধারণা করা হচ্ছে সে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। সে জানায়, জনৈক ব্যক্তি তাকে বরিশাল থেকে বাসে তুলে দেয়। কিন্তু কিভাবে সে সাতক্ষীরায় এসেছে তা সে বলতে পারছে না। বর্তমানে মেয়েটি সাতক্ষীরা পৌর এরাকার রাজার বাগানের আব্দুর রশিদের বাড়িতে আশ্রিত রয়েছে। তবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ওই মেয়েটি মাঝে মধ্যে এদিকে সেদিক চলে যাচ্ছে। ০১৭৪৮৯৩১১১৭/০১৭২৩১১৪৭০৪ নম্বরে যোগাযোগ করে মেয়েটির সন্ধান পেতে তার আত্মীয়স্বজনদের অনুরোধ জানিয়েছেন আব্দুর রশিদ।