বাঘ শাবক পাচারের ঘটনায় তদন্ত টিমের জিজ্ঞাসাবাদে ইছা: সাদা রং-য়ের নোহা মাইক্রো বাসযোগে শাবকগুলোকে পাচার হয়


প্রকাশিত : জুলাই ৭, ২০১২ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর : একটি সাদা রং-য়ের নোহা মাইক্রো বাসযোগে সুন্দরবন থেকে নিয়ে আসা বাঘ শাবক ৩টিকে পাচার করা হয়। “মাইক্রো বাসটি নিজে আড়াই হাজার টাকার চুক্তিতে ঠিক করে,” বন অধিদপ্তর গঠিত তদন্ত টিমের কাছে এমন তথ্য দিয়েছে বাঘ শাবক পাচার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি আবু ইছা। আবু ইছা আরও জানিয়েছে, অনেকেই প্রচার করছে মা বাঘিনীকে হত্যার পর শাবকগুলোকে ধরা হয়। কিন্তু এসব বক্তব্যকে অসত্য দাবি করে পাচার চক্রের হোতা আবু ইছা জানায়, তিন শাবককে দুগ্ধ পান করানোর সময় গরানের সুঁচালো লাঠি মেরে বাঘিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে শাবকগুলোকে ধরে আনা হয়। আর সুন্দরবন থেকে বাঘ শাবক নিয়ে আসা সাতজনের অন্যতম রইস উদ্দীনের মুখ থেকে তিনি এসব কথা শোনেন বলে দাবি করেছেন।

এছাড়া বাঘ শাবক পাচারের ঘটনায় আলোচিত হয়ে ওঠা আবু ইছা দাবি করেছেন, উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেতে তাদের মোট পয়ঁত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, শাবক ৩টি ঢাকার শ্যামলী থেকে উদ্ধারের সাত/আট দিন পূর্বে সেগুলো সাতক্ষীরা থেকে পাচার করা হয়। এছাড়া মাসুদ নামের এক ব্যক্তি শাবকগুলোকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করে দাবি করে সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণ শিকারসহ পাচারের সাথে জড়িত আবু ইছা বলেন, মাসুদ ঢাকায় যাবে বলে তার জন্য এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ত্রিশ হাজার টাকা পাঠান।

এদিকে সুচতুর এবেং ধুরন্ধর স্বভাবের আবু ইছা মাসুদের সাথে আগে পরে একাধিকবার মোবাইলে কথা বলাসহ বিভিন্ন স্থানে সৌজন্য স্বাক্ষাত করলেও তদন্ত টিমের কাছে মাসুদের নাম উল্লেখ ছাড়া আর কোন তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে বলে উল্লেখ করলেও ইছা মাসুদের আর কোন ঠিকানা জানে না দাবি করে বলে, ভেটখালী থেকে শাবকগুলো একটি দস্তার হাড়িতে করে সাতক্ষীরা নেওয়ার জন্য সে নিজে মাইক্রো বাসটি চুক্তি করে কিন্তু মাসদু শাবক গুলো নিয়ে পারুলিয়া এলাকায় নেমে যায়।

ইছা আরও জানায়, বাঘ শাবকগুলো নিয়ে ঢাকায় যাওয়া নিয়ে সে সংশয় প্রকাশ করলে মাসুদ (ইছাকে) তাকে আশ্বস্থ করে জানায়, এসব প্রাণি পরিবহনের লাইসেন্স রয়েছে তার।

মাসুদের বাড়ি ঢাকার বাইরে। মাসুদ সম্পর্কে আর কোন তথ্য জানা নেই দাবি করে মাদকদ্রব্য পাচারসহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িত আবু ইছা জানায়, সুন্দরবন থেকে শাবকগুলোকে নিয়ে আসার দু’তিন দিন পর ঢাকায় পাচার করা হয়। তদন্ত টিমের কাছে ইছা নিজে হরিণ শিকার করে না দাবি করে বলে, সে মাঝে মধ্যে হরিণের মাংস খেয়ে থাকে। আবু ইছা জানায়, মাসুদ রইছ উদ্দীনের নিকট থেকে গত বেশ কয়েক বছর যাবত মধু ক্রয় করতো। তাদের সেই পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে শাবকগুলো পাচার কাজে মাসুদ জড়িয়ে পড়ে বলে সে জানায়। ইছা আরও জানায়, সে ঢাকা যাওয়ার কথা বললে রইস তাকে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়। এসময় সে ভেনাস অটোতে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে যায় বলেও জানায়। যে টাকা পরবর্তীতে ভেনাস অটো থেকে রইস গ্রহণ করে বলে সে নিশ্চিত করে। উল্লেখ্য ভেনাস অটোতে ইছার এক ভাই চাকুরী করে। তার মাধ্যমে টাকা লেনদেন হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। তদন্ত টিম সংশ্লিষ্টরা তাদের প্রথম বৈঠকের মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে, আবু ইছাকে যথাযথভাবে আরও অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত ঘটনার বিবরণ জানা গেলে অপর আসামিদের গ্রেপ্তার ও পাচার চক্রের ব্যাপ্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে।

 

বাঘ শাক পাচারের ঘটনায় গঠিত তদন্ত টিমের দ্বিতীয় দফা বৈঠক

শ্যামনগর প্রতিনিধি : সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা থেকে ৩টি বাঘ শাবক পাচারের ঘটনায় গঠিত তদন্ত টিমের সদস্যরা দ্বিতীয় দফা বৈঠক করেছে। গত বৃহস্পতিবার শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ঐ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন অধিদপ্তর গত ১২ জুন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক আকবর হোসেনকে আহবায়ক করে ৬ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত টিম গঠন করে। এর আগে বিভাগীয় বন সংরক্ষক সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ তৌফিকুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয় বাঘ শাবক পাচার ঘটনা তদন্তে। গত বৃহস্পতিবার তদন্ত টিমের সদস্যরা তাদের দ্বিতীয় বৈঠকে প্রথম বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো পুুনঃপর্যালোচনা করে। এছাড়া তারা সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত “মা বাঘিনীকে হত্যা করে শাবকগুলো সুন্দরবন থেকে নিয়ে আসা” সংক্রান্ত কয়েকটি রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন এবং ঐসকল প্রকাশিত সংবাদ উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। এক পর্যায়ে তদন্ত টিম সুন্দরবন থেকে বাঘ শাবক লোকালয়ে আনার ঘটনার সাথে বাঘের আক্রমণে শহর আলীর নিহত হওয়ার ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কিনা সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় শহর আলীর সাথে সুন্দরবনে যাওয়া বনজীবী সোরা গ্রামের বাবুর আলীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে চারজনের পাশ নিয়ে বাবু ও তার সহযোগীরা বনে যেতে চাইলেও শহর আলীসহ আরও কয়েকজন অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহের জন্য।

তদন্ত টিমের প্রধান আকবর আলী জানান, সুন্দরবনে প্রবেশকারী সোরা গ্রামের আইয়ুব আলী, রইস উদ্দীন, জহুর আলী, মনিরুল ইসলাম, সামছুর গাজী, খোকন মোড়ল ও রুহুল আমিনদের যে কাউকে আটক করা গেলে কিভাবে বাঘের বাচ্চা সুন্দররবন থেকে লোকালয়ে এসেছে সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। তবে ইতিমধ্যে ডিবি পুলিশের হাতে আটক হওয়া আবু ইছা যে ঐ চক্রের সাথে জড়িত ছিল সে বিষয়টি তাদের কাছে ষ্পষ্ট বলে তিনি জানান।

ডিবি’র হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আবু ইছার “কানেকশন” বেশ লম্বা এবং সে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে- এমন বক্তব্যও বৈঠকে প্রাধান্য পায়। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়ন’র প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন জাহিদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ দৌলতুজ্জামান খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ আমীর তৈমুর ইলি, খুলনা অঞ্চলের সহকারি বন সংরক্ষক আবু নাসের মোহসিন হোসেন, বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোঃ ইয়াছিন নেওয়াজ, সাংবাদিক সালাউদ্দীন বাপ্পী, আনিছুজ্জামান আনিছ।