তালায় চরমপন্থীরা সক্রিয় : দফায় দফায় গোপন বৈঠক, সশস্ত্র কর্মীরা মাঠে, আতংকে মানুষ


প্রকাশিত : জুলাই ১৩, ২০১২ ||

পত্রদূত রিপোর্ট : সন্ত্রাসী জনপদ হিসেবে পরিচিত তালায় চরমপন্থীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন কারাগারে আটক বা আত্মগোপনে থাকার পর একে একে সন্ত্রাসীরা খোলস পাল্টে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অনেকে কারাগারে আটক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এদের মধ্যে অনেকে পুরানো সংগঠন চাঙ্গা করতে উঠতি বয়সের বেকার-যুবক ছেলেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে। উপজেলার কয়েকটি স্থানে তারা কয়েকবার গোপন বৈঠকও করেছে। বৈঠকে তারা কয়কটি বাহিনী গঠন করেছে। বাহিনীতে প্রায় ৫০ জন প্রথম শ্রেণির নেতা রয়েছে। বৈঠকে সরকার ও প্রশাসনকে জানান দিতে, মাঝারি নেতাদের হাতে অস্ত্র দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে। তারা অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ ও দল গোছানোর কাজে অর্থ জোগাড় করতে এলাকায় ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে দিন দিন এলাকার আইন-শৃংখলার অবনতি হচ্ছে। সম্প্রতি ইউপি সদস্য রাসেদ সানার উপর সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের ঘটনার পর তথ্য অনুসন্ধানে এমনই চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

এদিকে সন্ত্রাস দমনে পুলিশের অবহেলায় প্রতিনিয়ত হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও চরমপন্থী ও অভিযুক্ত আসামিরা সরকারদলীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তাদের কারণে পুলিশও নীরব ভূমিকা পালন করছে। পুলিশ চরমপন্থী ক্যাডার আটক করলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তাদের বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে উঠে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে এলাকায় মানুষের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে, উপজেলার জাতপুর, আলাদিপুর, জেয়ালানলতা, মহান্দী, হাজরাকাটি, খলিলনগর, তালা সদর, মাগুরা, খেশরা, বালিয়া ও ডুমুরিয়ার সীমান্তবর্তী চন্ডিপুর, মাগুরাঘোনাসহ কয়েকটি এলাকায় চরমপন্থীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদের দলনেতা হিসেবে মাগুরা এলাকার বিদ্যুৎ বাছাড়, জাতপুরের ওয়াজেদ বিশ্বাস, চন্ডিপুরের হযরত আলী, ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরাঘোনা গ্রামের করিম ওরফে লিটনসহ কয়েকজন বাহিনী পরিচালনা করছে। এসব সন্ত্রাসীর নামে তালাসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এরা সকলে থানা পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর এসব সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরছে। ইতিমধ্যে জাতপুর, ডাংঙ্গানলতা, চন্ডিপুরসহ কয়েক স্থানে দফায় দফায় গোপন বৈঠকও করেছে। এছাড়াও তারা ইতিমধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে গড়ে তুলেছে নিজস্ব সন্ত্রাসী গ্র“প। এসব সন্ত্রাসী গ্র“প অনেক সময় ভাড়ায় ডাকাতির কাজেও ব্যবহার হয়ে থাকে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আর তাদের মদদ দিচ্ছে জনপ্রতিনিধি নামের সন্ত্রাসী গডফাদার ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের প্রথম দিকে খলিষখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলে একক আধিপত্য বিস্তার করতো নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি। একের পর এক চাঁদাবাজি, হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে তারা। চাঁদার টাকা ভাগাভাগি কে কেন্দ্র করে পার্টির মধ্যে কোন্দল দেখা দেয়। ঠিক ওই সময় আলোচিত হয়ে উঠে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির লিডাররা। পূর্ববাংলা পার্টি থেকে ছুঁটে আসা সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ভারী অস্ত্র। ওই সময় আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি। এতে করে দুই পার্টি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এ সুযোগে মুখোশধারী রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার লোভে সন্ত্রাসীদের শেল্টার দিতে শুরু করে। শুরু হয় একের পর এক বোমাবাজি, ঘেরদখলসহ হত্যার মতো অপরাধ। ১৯৯৫ সালে ৩১ মার্চ রাতে খলিষখালী ইউপি চেয়ারম্যান শোক্তার আলী খাঁকে গুলি করে হত্যা করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় হত্যার রাজনীতি। সর্বশেষ আটারই গ্রামের স্কুল ছাত্রী আসমা, ঘোনা গ্রামের রাবেয়া বেগম, আগোলঝাড়া গ্রামের নাসিমাবেগম, জেয়ালানলতা গ্রামের বাবলু নিকারী, জাতপুর এলাকার আরশাফ মোড়ল হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল বা বর্তমানেও আছে। এসব ঘটনায় মামলা হওয়ায় পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছে বহাল-তবিয়াতে। এ কারণে অপরাধীরা অপরাধ করলেও পার পেয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অপরাধের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা জড়িত। যে কারণে এলাকায় চরমপন্থীরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ঘের দখল ও লুটপাটের মতো একাধিক ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয় না। অন্য কোন মামলায় অথবা সন্ত্রাসী অভিযানে তারা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলে রাজনৈতিক নেতারা তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পুলিশের কছে থেকে তাদের ছাড়িয়ে নেয়। এ কারণে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, চরমপন্থী সন্ত্রাসীদরে আটক করলেই রাজনৈতিক নেতাদের তদবির বেড়ে যায়। তাদের কথা না শুনলেই বদলীসহ নানা ধরনের হুমকি দেয়া হয়। এ কারণে প্রশাসনের মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

তালা থানার ওসি মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, ইতমধ্যে চরমপন্থীদের নতুন করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালা উপজেলায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ববাংলা জনযুদ্ধ, নিউ বিপ্লবী ও লাল পতাকার ৩২ জন নেতাকে সনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ তাদের উপর নজর রাখছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু করা হবে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী-চরমপন্থীরা কে কোন রাজনৈতিক দলের সেটি কোন বিষয় না। অপরাধী হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তালা উপজেলার উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার জানান, সন্ত্রাসী বা চরমপন্থীদের কোন দল নেই। তিনি জেনছেন দোহার, শ্রীমন্তকাঠি, এলাকায় মোজাফ্ফর বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। তিনি জানান, মহাজোটের নেতারা তাদের কোন প্রকার প্রশ্রয় দেয় না। তাদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে আটক করে পুিলশে দেওয়া হবে। পুলিশ সুপার মো: আছাদুজ্জামান জানান, শুধু তালা নয় জেলাব্যাপী চরমপন্থীদের তৎপরতা কিছুটা বেড়েছে। তালার মোজাফ্ফর, বিদ্যুৎ বাছাড়, কালাম, শওকাত নিকারি বাহিনী গঠন করেছে। ইতিমধ্যে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের তালিকা প্র¯ু—ত করা হয়েছে। পুলিশর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চরমপন্থীদের গ্রেপ্তার করার জন্য শাড়াশি অভিযান চালানো হবে।