ভোমরা বন্দরে বিল অব এণ্ট্রি’র ৩ হাজার ফাইল গায়েব : ৯৬ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ, ১৪ ব্যবসায়ীকে নোটিশ


প্রকাশিত : July 14, 2012 ||

নিজস্ব প্রতিনিধি : ভোমরা স্থল বন্দরে সিএণ্ডএফ ব্যবসায়ীদের আমদানিকৃত পণ্যের খালাস হওয়া প্রায় ৩ হাজার বিল অব এণ্ট্রির ফাইল গায়েব হয়ে গেছে। যার প্রতি বিল অব এণ্ট্রি ফাইলে গড়ে ৩ লাখ টাকা করে রাজস্ব ধরা হলে প্রায় ৯০ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার। এর মধ্যে বিগত ২০১১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাসের মধ্যে আমদানিকৃত পণ্যের ফাইল গায়েব হয়েছে। বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা গত মাসের ২১ জুন ১৪ জন সিএণ্ডএফ ব্যবসায়ীকে গায়েব হওয়া ফাইলের বিল অব এণ্ট্রির কাগজসহ সমুদয় পেপারস জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মাত্র ৩ দিনের বেধে দেওয়া সময় সীমার মধ্যে বেশির ভাগ কাগজ জমা দিতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। এর আগে মৌখিকভাবে বার বার জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নোটিশে। এ ঘটনায় বন্দরের ব্যবসায়ীরা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

ভোমরা বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বন্দরের মেসার্স শফিক এণ্ড ইসলাম এর স্বত্তাধিকারীকে ২য় (২) ইটি/ভোমরা/বিবিধি/০৯/৫৮৫/১(২) নং স্মারকে জানিয়েছেন, বিগত বছরের ২৪ আগস্ট থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৪টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল অফিসে না পাওয়ায় পুনরায় জমা দেওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিটি বিলে আনুমানিক ৩ লাখ টাকা করে রাজস্ব ধরা হলে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হয়েছে। মেসার্স সিলেক্ট লাইনস এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮৬/৩(২) নং স্মারকের নোটিশে ৭৫৪টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ২২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশরনাল এর স্বত্তাধিকারীকে গায়েব হওয়া ১৫১টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়েছে। যার রাজস্ব ৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। যে নোটিশে কোন স্মারক নং দেওয়া হয়নি। মেসার্স শাওন এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৭৪/১(২) নং স্মারকে ৩৩টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়। যার রাজস্ব আসে ৯৯ লাখ টাকা। মেসার্স রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৭৫/১ (২) নং স্মারকে ৩১টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৯৩ লাখ টাকা। মেসার্স আযাদ ক্লিয়াফোর্ড এসেন্সির স্বত্তাধিকারীকে ৫৭৬/১(২) নং স্মারকে ৩৯টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়। যার রাজস্ব আসে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। মের্সাস আহাদ এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৭৭/১(২) নং স্মারকে ২৩৭টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যার রাজস্ব আসে ৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। মেসার্স ওভারসীজ ট্রেডিং এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৭৮/১(২) নং স্মারকে ১৪৬টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়। যার রাজস্ব আসে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। মেসার্স শাহনাজ এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮০/১(২) নং স্মারকে ২৯টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৮৭ লাখ টাকা। মেসার্স তানভির এণ্টারপ্রাইজ এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮১/১(২) নং স্মারকে ১৫৫টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। মেসার্স শাওন এন্টার প্রাইজ এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮২/১(২) নং স্মারকে ২২টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৬৬ লাখ টাকা। মেসার্স আল মদিনা ট্রেডিং এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮৩/১(২) নং স্মারকে ১৫৪টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে বলা হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। মেসার্স ই এণ্ড কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এর স্বত্তাধিকারীকে ৫৮৪/১(২) নং স্মারকে ২৯১টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল হাজির করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার রাজস্ব আসে ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এদিকে বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক এই নোটিশ প্রদানের পূর্বেই প্রস্তুতকৃত অপর একটি খসড়া তালিকায় কমপক্ষে ৪০ জন সিএণ্ডএফ ব্যবসায়ীর নামের তালিকা ও বিল অব এণ্ট্রি ফাইল চূড়ান্ত করা হলেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৪ জন ব্যবসায়ীকে। ফলে ব্যবসায়ীদের নোটিশ দেওয়া নিয়েও রাজস্ব কর্মকর্তার কারসাজি ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র আরও জানায়, বিগত ২০১১ সালের আগস্ট থেকে যে ফাইল তলব করা হয়েছে তৎকালীন সময়ে উক্ত বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পর্যায়ক্রমে দায়িত্বে ছিলেন এমএম কামাল হোসেন, বাহার মিয়া, মবিনুল ইসলাম মবিন প্রমুখ। এমএম কামাল হোসেন বলেন, বদলি হয়ে যখন চলে এসেছি তখন সমুদয় কাগজপত্র বুঝে দিয়েছি। এক বছর পর এখন যদি কোন কাগজপত্র না পাওয়া যায় তাহলে আমি দায়ি থাকবো না, কারণ ওই কাগজপত্র দেখার জন্য তো ওখানে বসে থাকার দায়িত্ব আমার নয়। তিনি আরও বলেন, আমি চলে আসার পর ষড়যন্ত্র করে কেউ এসমস্ত ফাইল সরিয়ে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে বন্যার কারণে অনেক ফাইল নষ্ট হতে পারে বলেও তিনি ধারণা করছেন।

এসমস্ত বিষয়ে ভোমরা বন্দরের চলতি দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা মঞ্জরুল হক জানান, যাদের নোটিশ দিয়েছি তাদের অধিকাংশই কাগজপত্র জমা দিয়েছে। এতদিন পরে কেন পুরাতন কাগজপত্র তলব করা হল বা সেই ফাইল গুলো গেল কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে সহকারি কাস্টমস কমিশনার আল-আমীন জানিয়েছেন এটা রুটিন ওয়ার্ক। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ৫ বছর পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্যের কাগজপত্র দেখার নিয়ম রয়েছে।

অপর দিকে তৎকালীন সিএণ্ডএফ’র সভাপতি শেখ আশরাফুজ্জামান আশুর কাছে ফাইল গায়েব হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অসুস্থ্য কথা বলতে পারছি না। মেসার্স আহাদ এণ্টার প্রাইজের স্বত্তাধিকারী বেনাপোলের আহাদ মুঠোফোনে জানান, ২৩৭টি বিল অব এণ্ট্রি ফাইল জমা দিতে নোটিশ দেওয়ার পর তার অধিকাংশ জমা দিয়েছি। কিছু এখনও জমা দিতে পারিনি।