মাদকের সর্বনাশা ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে সমাজ: নেশার টাকা জোগাড় করতে না পেরে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে


প্রকাশিত : জুলাই ১৫, ২০১২ ||

ইয়ারব হোসেন : নেশার টাকা জোগাড় করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে তরুণরা। অতিরিক্ত মাদক সেবন করে মৃত্যু হচ্ছে। তারপরও কমছে না মাদকের ভয়াবহতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান ও বিভিন্ন সংস্থার মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রচার কোনো কাজে আসছে না।

সাতক্ষীরা শহরের শতাধিক ধর্ণাঢ্য ও শিক্ষিত পরিবারের প্রধানদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অধিকাংশ পরিবারের কোনো না সদস্য নেশার সঙ্গে জড়িত। নেশাগ্রস্ত তরণদের পরিবারের প্রধান কিংবা বাবা-মা প্রথম অবস্থায় বিষয়টি হালকাভাবে নেন। প্রতিবেশীদের কাছে গোপন করেন। নেশাগ্রস্ত তরুণ যাতে নেশার জন্য বাইরে অন্য কোনো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে না পড়ে এ জন্যে গোপনে নেশার টাকাও যোগান দেন। নেশার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার চাহিদাও বাড়ে। পরিবার থেকে টাকার যোগান দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে বাড়ির জিনিসপত্র চুরি করে বিক্রি করে। একপর্যায়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে চুরি, ছিনতাইসহ নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব পরিবারের প্রধানরা তাদের ছেলেদের বার বার চেষ্টা করেও নেশা থেকে নিবৃত করতে পারেনি। জেলে পাঠিয়েছেন, চিকিৎসা করিয়েছেন, কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি।

সাতক্ষীরা শহরের সেলিনা খাতুন নামের এক মা জানান, একমাত্র ছেলে নেশার কারণে অমানুষ হয়ে গেছে। ওর বাবাকে অকথ্য ভাষায় প্রথম প্রথম গালিগালাজ করতো। পরে গায়ে হাত তুলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। যে কোনো মূর্হতে খুন করে ফেলতে পারে এভয়ে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। লাখ লাখ টাকা নষ্ট করে ফেলছে। যখন তখন নেশাখোর বন্ধুদের নিয়ে এসে বাড়ির মধ্যে বসে যা খুশি তাই করে।  দিনের পর দিন ধর্ণা দিয়েছি থানায় ওকে গ্রেপ্তারের জন্য। সম্প্রতি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমি চাই আমার ছেলে নূরজ্জামান জেলে থাকুক, যতদিন ভালো না হয়। একথা শুধু সেলিনা খাতুনের কথা নয়, সাতক্ষীরা শহর, বিভিন্ন উপজেলা ও শহরতলীর অসংখ্য পরিবারের মধ্যে বিরাজ করছে একই অবস্থা।  জেলার কলারোয়া উপজেলার খোলশে গ্রামের এক অসহায় মা রোকেয়া খাতুন জানান, নেশার টাকা না দেওয়ায় আমাকে পায়খানা ঘরে তিনঘণ্টা আটকে রেখেছিল। ওর বাবাকে ও আমাকে প্রায় মারধর করে। ভয়ে ওর বাবা আর বাড়ি আসে না। রাত কাটায় এখানে ওখানে। ঘরের জিনিসপত্র চুরি করে বিক্রি করে দেয়। ওকে কিছুদিন জেলে রাখার জন্য কতজনের কাছে ধর্ণা দিয়েছি। থানায় অভিযোগ করেছি। কিন্তু পুলিশ ওকে আটক করে না। এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়। সর্বনাশা মাদক আমার ছেলে রাজু আহমেদকে অমানুষে পরিণত করেছে।

সাতক্ষীরা শহরের হাটের মোড়ের হোটেল ব্যবসায়ী আনছার আলীর মেয়ে টুকু জানান, ১৯ মে সন্ধ্যায় ফেনসিডিল পান করে তার বাবার মৃত্যু হয়। বাবা নেশা করার জন্য বাড়িতে প্রায়ই অশান্তি করতো। যন্ত্রণা সহ্য করতে না মা তাদেরকে নিয়ে কয়েক বার বাপের বাড়িতে চলে গেছে। মাদকের ছোবল বাবাকে এভাবেই শেষ করে ফেলবে এটা তাদের অপ্রতাশিত ছিল না।

জানা গেছে, নেশার টাকা জোগাড় করতে না পেরে ও হতাশায় জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি খান এ কবীর ময়না গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। একইভাবে হেরোইনের টাকা যোগাড় করতে যেয়ে বাড়ির সম্পত্তিসহ স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে ফেলছিল সাতক্ষীরা শহরের মো: ডিউক। পরিবার থেকে তাকে  কয়েকবার জেল হাজতে পাঠানো হয়। মাদকাসক্তির কারণে স্ত্রীও তাকে তালাক দিয়ে চলে যায় অন্যত্র। সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে ফেলে নেশার টাকা জোগাড় করতে। একপর্যায়ে নি:স্ব হয়ে বিষ পানে আত্মহত্যা করে তিনি।

জানা যায়, সাতক্ষীরার শহরতলীর পশ্চিম মাছখোলা এলাকার হুমায়ুন কবীরকে মাদকাসক্তির কারণে বার বার জেল হাজতে পাঠানো হতো। শহরতলীর মাছ খোলায় ছিল তার শ্বশুর বাড়ি। মাদকের টাকা যোগাড় করতে না পেরে প্রায়ই স্ত্রীকে নির্যাতন করতো সে। দু’সন্তানকে নিয়ে তার স্ত্রীকে বছরের অধিকাংশ সময় বাপের বাড়িতে কাটাতে হতো। একপর্যায়ে  গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করে হুমায়ুন কবীর।

সাতক্ষীরার মাদকাশক্ত নিরাম কেন্দ্রে আদর-এর নির্বাহী পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, ২০০৬ সালে  শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন নেশাগ্রস্ত মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে ভালো করা হয়েছে। বতর্মানে ১৫ শয্যার এ নিরাময় কেন্দ্রে ১৫জন রোগীকে তিন মাস ধরে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে সমাজের বিত্তবানেরা উদ্যোগ নিলে অনেককেই ভালো করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সাতক্ষীরার বিশেষ করে শহরের তরুণ সমাজের এক বড় অংশ কোনো না কোনো নেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন থানায় অভিভাবকরা এসে তাদের ছেলেদের ধরে আনতে বলে। এতে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়, নেশা করতে না পারলে অনেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এ ঝুঁকি কোনো কর্মকর্তা নিতে চায় না। তারপর ধরে নিয়ে এসে কারাগারে পাঠানোর কয়েকদিন পর অভিভাবকরা আবার জামিন করিয়ে নিয়ে আসে। ফলে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমছে না।